debaki kumar basu

দেবকীকুমার বসু স্মরণে

নভেম্বরের একদম শেষ লগ্নে যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস-এর উপেন্দ্রকিশোর সভাগৃহে তপন সিংহ ফাউণ্ডেশন ও ছায়ানট (কলকাতা) যৌথভাবে ‘দেবকী কুমার বসুর চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ শিরোনামে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল।

১৮৯৮ সালের ২৬ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতনামা পরিচালক দেবকী কুমার বসু। বর্ধমান জেলার আর এক কৃতী সন্তান মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামও জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ সালে। সমসাময়িক এই দুই গুণী মানুষের মধ্যে ছিল শ্রদ্ধার সম্পর্ক। বাংলা সাহিত্য অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা দেবকী কুমার বসুকে কতখানি শ্রদ্ধা করতেন তা জানা যায় তাঁর কন্যা গীতা দত্তের স্মৃতিচারণা থেকে — “কল্লোল গ্রুপে তিনি যুক্ত ছিলেন। তিনি খুব কনিষ্ঠও ছিলেন। একবার শান্তিনিকেতনে সিনেমাকে নাটকে রূপান্তরিত করতে গেলে আসল ভাবধারাকে বজায় রেখে কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে বলায় সভাসদরা হৈ হৈ করে উঠেছিলেন। কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘দেবকী ঠিকই বলেছে। আমরা যখন বসন্ত রায় রোডের বাড়িতে ছিলাম, তখন প্রায়ই উল্কার মত বাবরি চুল, পাজামা-পাঞ্জাবী পরে প্রচুর পান খেতে খেতে কাজী নজরুল ইসলাম জোরে জোরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে বাড়ি মাতিয়ে গান গাইতেন। শ্রোতা ছিলেন আমার পিতৃদেব। কিছু প্রাণে, কিছু মনের যোগ ছিল — দুজন দুজনকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন।’

নজরুলের বাল্যবন্ধু, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘হারিয়ে-যাওয়া দিনগুলি’ শীর্ষক লেখায় দেবকী কুমার বসুর কথা উল্লেখ করেছেন — ‘নিউ থিয়েটার্সে ঢুকেছিলাম ছাত্রের মনোভাব নিয়ে। সিনেমা সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যাপার বেশ ভালো করে শেখবার জন্যে গিয়েছিলাম সেখানে। নিউ থিয়েটার তখন সরগরম। মাইনে করা বড় বড় ডিরেক্টর — প্রমথেশ বড়ুয়া, দেবকী বোস, নীতীন বোস, হেমচন্দ্র চন্দ্র। স্বনামধন্য সব বড় বড় অভিনেতা-অভিনেত্রী মাস মাইনেয় বাঁধা। দু’জন বাঘা-বাঘা মিউজিক ডিরেক্টর। দু-দুটো পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্ট। অভাব কিছুই নেই। হাতী মার্কা ছবির চাহিদাও যত, সুনামও তত। নিউ থিয়েটার্স তখন সারা ভারতের গৌরব।’

কাননদেবী জানিয়েছেন, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়– কাজীদার বাণীতে আমার আর একটি স্মরণীয় গান। তিনি এ গানটি আমার বৌ বাজারের বাড়ীতে বসে লিখেছেন। ‘সাপুড়ে’ ছবির গান ও কাহিনী তিনি আমার বাসায় বসে লিখতেন।’

এভাবেই নজরুলের সঙ্গীতের ছোঁয়ায় দেবকী বসু পরিচালিত ‘সাপুড়ে’ জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পায়। বিশিষ্ট চিত্র সমালোচক সেবাব্রত গুপ্ত যথার্থই লিখেছেন দেবকী কুমার বসু সম্পর্কে — ‘দেবকী বাবু তাঁর আমলেও অন্য গুণী পরিচালকদের চাইতে স্বতন্ত্রই ছিলেন। তাঁর জায়গা ছিল আলাদা। সিনেমা মিডিয়ামে তিনি সাহিত্যের রস পরিবেশন করতেন, কখনও বা মানবিকতা। দেবকী বসুর ছবির সেটাই আসল পরিচয়।’

মানবতার পূজারী নজরুলও ৫ নভেম্বর, ১৯৩৩ সালে একটি কবিতার মাধ্যমে তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন এই মহৎপ্রাণের প্রতি —
পরীস্থানের “হে” পরিচালক, তরুণ চিত্র কবি!
তোমার প্রসাদে বাণী মুখর হল মূক বোবা ছবি।

অনুষ্ঠানে ‘দেবকী কুমার বসুর চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ’ বিষয়ে তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা করেন অরিজিৎ মৈত্র। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা আবৃত্তি করেন অমৃতা দাস, তাপসী হালদার, শর্মিলা পাল, সোমা রায়, অনিন্দিতা ঘোষ, সায়ন্তনী বসু, পাপিয়া ঘোষ, ড. বৈশাখী দাস, অম্বালিকা পাল চৌধুরী, সুভাষ মিত্র এবং রুমা চ্যাটার্জী। শুভাঙ্গী মুখোপাধ্যায় ২টি নজরুল-সঙ্গীত পরিবেশন করেন। দলীয়ভাবে পরিবেশিত হয় ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত নজরুল-সঙ্গীত ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ এবং ‘দাদাঠাকুর’ চলচ্চিত্রে সমবেত কণ্ঠে ব্যবহৃত নজরুল-সঙ্গীত ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’। সোমঋতার একক কণ্ঠে শোনা যায় দেবকী কুমার বসু পরিচালিত ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত নজরুল-সঙ্গীত ‘আকাশে হেলান দিয়ে’, ‘হলুদ গাঁদার ফুল’, ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত নজরুল-সঙ্গীত ‘মধুর ছন্দে নাচে আনন্দে’ এবং ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত নজরুল-সঙ্গীত ‘শাওন রাতে যদি’।

অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আয়োজকরা ভবিষ্যতে এরকম অনুষ্ঠান আবারও আয়োজন করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন।