sajani kanta

বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধিতে সজনীকান্ত দাস

বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক হিসেবে যিনি নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে পূর্ণতা দান করেছিলেন তিনি হলেন সজনীকান্ত দাস। সেই সঙ্গে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একজন রসসমৃদ্ধ গবেষক হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যের বিবিধ অঙ্গনকে আলোকিত করেছিলেন। এছাড়া, সংগীত রচনাকার ও সাময়িকপত্র পরিচালক হিসেবে সমকালীন পর্যায়ে তাঁর খ্যাতি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাতেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। একদা ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁর প্রধান পরিচিতি সর্বত্র পৌঁছে গিয়েছিল। সেই পর্বে তিনি কামস্কাটকীয় ছন্দের কবিতা রচনা করে বাংলা ব্যঙ্গ সাহিত্যে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে সেই সময়ে তিনি অন্যান্য লেখক সাহিত্যিকদের অঙ্গনে তিনি বিচরণ করেননি। সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁর অবাধ বিচরণ থাকায় তিনি কালক্রমে একজন যথার্থ সমালোচকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর নিজের ব্যক্তিত্বের গভীরে যে প্রতিভার দীপ্তি তাঁকে নিরন্তর অলোকিত করত, সেই দীপ্তির বলে তিনি সকল লেখক সাহিত্যিককে যথাযথ চিহ্নিত করে তাঁদের সৃষ্টির বিচারে অগ্রসর হতে সমর্থ হয়েছিলেন।

সজনীকান্ত দাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯০০ সালের ২৫শে আগস্ট অবিভক্ত বর্ধমান জেলার বেতালবন নামে একটি গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে। পিতা হরেন্দ্রনাথ দাস ও মাতা ছিলেন তুঙ্গলতা দেবী। তাঁর পিতৃভূমি ছিল বীরভূম জেলার রায়পুর গ্রামে। পিতার কর্মসূত্রে সজনীকান্তকে তাঁর শৈশব ও কৈশোরকালে মালদহ, বাঁকুড়া, পাবনা ও দিনাজপুরে কালযাপন করতে হয়েছিল। সজনীকান্ত ১৯১৮ সালে দিনাজপুর জেলা বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে গিয়ে আইএসসি ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই ব্রিটিশ শাসনকালে সেই কলেজ পরিত্যাগ করে তিনি বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ান মিশনারি কলেজে গিয়ে পুনরায় সেই আইএসসি ক্লাসে ভর্তি হন। সেখানে সেই ক্লাসে উত্তীর্ণ হয়ে সজনীকান্ত তারপর ১৯২২ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করে বারাণসীতে চলে যান। সেখানকার একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে আবার সেই কলেজ পরিত্যাগ করে তিনি পুনরায় কলকাতায় চলে আসেন। পরিশেষে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি পড়তে পড়তে তিনি ১৯২৪ সালে অশোক চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় যোগদান করেন। সেখানে তিনি ‘ভাবকুমার প্রধান’ ছদ্মনামে লেখালেখি করতে শুরু করেন।

বাংলা সাহিত্যের যথাযথ সমালোচনা করার মাধ্যমে সজনীকান্ত দাস বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে একজন যথার্থ সমালোচক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ব্যঙ্গধর্মী ও ভাবগম্ভীর কবিতা রচনা করে তিনি একদা আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন।

সজনীকান্ত দাস তাঁর জীবনে অধ্যয়নপর্ব সম্পন্ন করে একনিষ্ঠ কর্মজগতে প্রবেশ করে বাংলা সাহিত্যসাধকের সৃষ্টিকর্ম বিশ্লেষণে মগ্ন হয়ে যান। অশোক চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার একাদশতম সংখ্যা অর্থাৎ ১৯২৮ সাল থেকে নবীনপ্রাণ সজনীকান্ত সেই পত্রিকার সম্পাদনা ও পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। সেই সমকালীন পর্বে তিনি এ বঙ্গের অনেকগুলি খ্যাতনামা সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। সেইসব পত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘প্রবাসূ’, ‘মডার্ন রিভিউ’, ‘দৈনিক বসুমতূ’, ‘বঙ্গশ্রী’ ও ‘শনিবারের চিঠি’। ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকার তিনি সহ-সম্পাদক ছিলেন ১৯২৫ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত। তাছাড়া ‘প্রবাসী’ প্রেসের মুদ্রাকর ও কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত। ‘দৈনিক বসুমতী’ পত্রিকার তিনি সাময়িক প্রসঙ্গের লেখক ছিলেন ১৯৩২ সালে। এছাড়া ‘বঙ্গশ্রী’ মাসিকপত্রের তিনি সম্পাদনার দায়িত্বভার পালন করেছিলেন ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত। ‘শনিবারের চিঠি’র প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পর থেকেই তিনি আজীবন এই পত্রিকার সম্পাদক ও পরিচালক হিসেবে এর দায়ভার পালন করেছিলেন সেই ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত। সর্বোপরি, তিনি তাঁর জীবনের প্রান্তিক লগ্নে ‘শনিরঞ্জন প্রেস’ এবং ‘রঞ্জন পাবলিশিং হাউস’ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সজনীকান্ত দাস বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে তাঁকে ওই সংস্থার সম্পাদক পদে বরণ করা হয়েছিল। ১৩৫২ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৫৫ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন। এই সংস্থার সহসভাপতি পদে তিনি বৃত ছিলেন ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ এবং ১৩৬৩ বঙ্গাব্দ থেকে ১২৬৭ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত। তিনি এই সংস্থার কোষাধ্যক্ষ পদে অসীন হয়েছিলেন ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে। একটা সময়ে তিনি সাহিত্য-পরিষৎ পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে। সর্বোপরি, ১৯৪৮ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিভাষা সংসদের সদস্য পদে বৃত ছিলেন। কর্মতৎপর সেই মানুষটি একটা সময়ে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থাধ্যক্ষ পদে আসীন হয়েছিলেন। এছাড়া, অসাধারণ সেই মানুষটিকে নিখিলবঙ্গ সাময়িক পত্র সংঘ, সাহিত্যসেবক সমিতি, পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতি, অ্যাডাল্ট এডুকেশন কমিটি, ফিল্ম সেন্সর বোর্ড প্রভৃতি অগণিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের যথাযথ সমালোচনা করার মাধ্যমে সজনীকান্ত দাস বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে একজন যথার্থ সমালোচক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ব্যঙ্গধর্মী ও ভাবগম্ভীর কবিতা রচনা করে তিনি একদা আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন। তিনি সমগ্র জীবনে ৬০-এর অধিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে কবিতা গ্রন্থ রচনা করেন ১১টি। সেই গ্রন্থগুলি হল— ‘অঙ্গুষ্ঠ’ (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ), ‘মনোদর্পণ’ (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ), ‘বঙ্গরণভূমে’ (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ), ‘রাজহংস’ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ), ‘আলো-আঁধারী’ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ), ‘কেডস্ ও স্যান্ডাল’ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ), ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ), ‘মানস সরোবর’ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ), ‘ভাব ও ছন্দ’ (১৩৫৯ বঙ্গাব্দ), ‘পান্থ-পাদপ’ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ) ও ‘পথ চলতে ঘাসের ফুল’ (১৩২৩ বঙ্গাব্দ)।

তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে, কঠোর ও নম্রভাবে তিনি বাংলা সাহিত্যের সমালোচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। হাস্যরসাত্মক সমালোচনার সূত্রপাত করে তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত তাঁর রচিত ‘বাঙ্গালা গদ্যের প্রথম যুগ’ তৎকালীন সাহিত্যিকদের নানা অসঙ্গতির মধ্যে অবস্থান করেও তাঁরা সঠিক লক্ষ্যে অগ্রসর হতে সমর্থ হয়েছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের বিবিধ অঙ্গনে পরিক্রমা করতে গিয়ে সজনীকান্ত দাস একদা বাংলা সাহিত্যে অন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। বিশেষত, বিংশ সাহিত্যের সকল শাখায় সেই সময় তাঁকে তাঁর মেধা ও মননচর্চায় সবিশেষ আত্মনিবেদন করতে হয়েছিল। তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে, কঠোর ও নম্রভাবে তিনি বাংলা সাহিত্যের সমালোচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। হাস্যরসাত্মক সমালোচনার সূত্রপাত করে তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত তাঁর রচিত ‘বাঙ্গালা গদ্যের প্রথম যুগ’ তৎকালীন সাহিত্যিকদের নানা অসঙ্গতির মধ্যে অবস্থান করেও তাঁরা সঠিক লক্ষ্যে অগ্রসর হতে সমর্থ হয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। সজনীকান্ত দাস নিজে যেমন তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে নিরন্তর নিমগ্ন থাকতেন, ঠিক তেমনই সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য লেখকদের সৃষ্টি নিয়েও তিনি ব্যাপক পর্যালোচনায় মুখর হতেন। তিনি একথা বিশ্বাস করতেন যে, সৃষ্টিশীল রচনার বৈষয় বৈচিত্র্য ও প্রাসঙ্গিকতায় কোনোপ্রকার অসঙ্গতি থাকলে পাঠক সাময়িকভাবে তাতে পরিতৃপ্ত হলেও অদূর ভবিষ্যতে তার প্রয়োজনটাই যেন নিঃশেষ হয়ে যায়। সেই জন্য সজনীকান্ত সংশ্লিষ্ট লেখকের সৃষ্টিশীলতার সর্বজনীন বোধকে স্বীকৃতি দিলেও সাময়িক ভাবনার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন না।

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট দেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে যে দেশাত্মবোধক সংগীতটি সম্প্রচারিত হয়েছিল সেটি রচনা করেছিলেন সজনীকান্ত দাস। আর সংগীতটি বেতারে পরিবেশন করেছিলেন বাংলার বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সুকৃতি সেন।

বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামের পরিপূর্ণ আবেগদীপ্ত সাময়িক ভাবনাজাত কোনও সৃষ্টিকে তাই তো তিনি প্রশংসার মাধ্যমে ধন্য বলতে পারেননি। নজরুল ইসলাম ব্যতীত রবীন্দ্রনাথ সহ অন্যান্য খ্যাতিমান আধুনিক কবি ও সাহিত্যিকদের তিনি অতি নিঃসঙ্কোচে সমালোচনা করে বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিশীল জগৎকে আরও বেশি মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে একজন সৎ ও নিরপেক্ষ সমালোচক হিসেবে সজনীকান্ত দাস সমকালীন পর্বে যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তাতে তাঁর নিজস্ব প্রতিভাদীপ্ত শক্তি হয়তো কিছুটা খর্ব হয়েছিল। এর পরিবর্তে সেই সময়ে তিনি যদি সৃষ্টিশীল কোনও ক্রিয়াকর্মে নিজেকে উৎসর্গ করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারটি হয়তো আরও অনেকখানি সমৃদ্ধ হত। সমকালীন পর্বে সজনীকান্ত দাস বাংলা সাহিত্য সমালোচনা ছাড়াও চলচ্চিত্র জগতের চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
সজনীকান্ত দাস বাংলা গদ্য সাহিত্যে সুনিপুণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওযা সত্ত্বেও একটা সময়ে তিনি কিন্তু কবিতা লিখতে উৎসাহিত বোধ করতেন। এমনকি, রসজ্ঞ সংগীত রচনাতেও তিনি আগ্রহী হতেন।

উল্লেখ করা যায় যে, ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট দেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে যে দেশাত্মবোধক সংগীতটি সম্প্রচারিত হয়েছিল সেটি রচনা করেছিলেন সজনীকান্ত দাস। আর সংগীতটি বেতারে পরিবেশন করেছিলেন বাংলার বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সুকৃতি সেন। গীতিকার হিসেবে কালক্রমে সজনীকান্ত বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত এবং কানন দেবী ও প্রমথেশ বড়ুয়া অভিনীত বিখ্যাত ছায়াছবি ‘মুক্তি’ সহ বহু জনপ্রিয় বাংলা আধুনিক গানের গীতিকার ছিলেন সজনীকান্ত। তাঁর এই গীতিকার জীবন মূলত ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বলাবাহুল্য, চলচ্চিত্র, বেতার, গ্রামোফোন কোম্পানি সহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগসূত্র গড়ে উঠেছিল। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। একটা সময়ে তিনি দেশাত্মবোধক সংগীতও রচনা করেছিলেন। সজনীকান্ত দাস সাহিত্য সাধনার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক্ষেত্রে নিরন্তর বিচরণ করতেন। বিশেষত, উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের গবেষণার জগতে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে তিনি বড়ই উৎসাহিত বোধ করতেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৬ সালে তিনি বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম যুগকে অবলম্বন করে একটি গবেষণামূলক কাজ করেছিলেন। সেটি তাঁর একটি মৌলিক সৃষ্টি বলে কেউ কেউ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। সাহিত্যসাধক চরিতমালায় সজনীকান্ত দাস বেশ কয়েকটি চরিতকথা রচনা করেছিলেন। তাছাড়া, তাঁর রচিত ‘রবীন্দ্রনাথঃ জীবন ও সাহিত্য’ গ্রন্থখানি রবীন্দ্রপ্রেমিক মানুষদের কাছে একসময় বেশ রসসমৃদ্ধি সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া, ‘কলিকাল’, ‘আকাশ-বাসর’, ‘স্বনির্বাচিত গল্প’ প্রভৃতি গ্রন্থের জন্য কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি আজও বহন করে চলেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে, ‘শনিবারের চিঠি’ তিনি বহুকাল ধরে সম্পাদনা করেছিলেন। তবে নানাকারণে মাঝে কয়েকটি বছর তিনি সম্পাদনা করতে পারেননি। সেই সময় এই পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছিলেন যোগানন্দ দাস, নীরদ চৌধুরী, পরিমল গোস্বামী প্রমুখ। অশোক চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ‘শনিবারের চিঠি’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সেই ১৯২৪ সালে। বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক সজনীকান্ত দাস নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা ও শ্রমদান করে প্রায় ৩৮ বছরকাল বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছিলেন। বহু গুণসম্পন্ন প্রজ্ঞামণ্ডিত এই সাহিত্যসাধক দীর্ঘায়ুর অধিকারী না হয়ে অবশেষে ১৯৬২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।

sajani kanta

তথ্যসূত্রঃ ভারতকোষ, পঞ্চম খণ্ড, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রকাশিত, শ্রাবণ ১৩৮০ বঙ্গাব্দ

‘শনিবারের চিঠি’র প্রাণপুরুষ সজনীকান্ত দাসের ৬৪ তম প্রয়াণদিবসকে স্মরণ করে নিবন্ধটি প্রকাশিত হল।