shailajananda

সেলুলয়েডে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়

ডাক্তার নায়ক যখন বিজাতীয় একটি মেয়ে আশাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন, নায়কের বদরাগী বাবা মেনে নিতে পারেননি সেই বিয়ে। ফলে পিতা পুত্রের মধ্যে বিচ্ছেদ। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে আশা বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ছেলেকে দাঁড় করান নায়ক। সম্পর্ক যখন জোড়া লাগতে শুরু করেছে, তখন আশা কোথায়? এমন পারিবারিক গল্পের লেখক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। ছবির নাম ‘আনন্দ আশ্রম’। ছবিটি পরিচালনা করলেন শক্তি সামন্ত। ১৯৭৭ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। ডাক্তারের চরিত্রে উত্তম কুমার। আশার ভূমিকায় শর্মিলা ঠাকুর। ডাক্তারের বাবার চরিত্রে অশোক কুমার। এছাড়াও এই ছবিতে অভিনয় করলেন উৎপল দত্ত, রাকেশ রোশন, মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়, অনিতা গুহ, অসিত সেন সহ বহু শিল্পী । ‘আনন্দ আশ্রম’ শৈলজানন্দের যে কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত, সেই ‘ডাক্তার’ নিয়ে ছবি নির্মিত হয়েছিল ১৯৪০ সালে। পরিচালক ফনী মজুমদার। এখানে নাম ভূমিকার শিল্পী পঙ্কজ মল্লিক সুরকার স্বয়ং ।বাবার চরিত্রে অহীন্দ্র চৌধুরী। আসলে এমন সংবেদনশীল গল্প দর্শকদের ভালো না লেগে কখনই যায় না।

uttam kumar sarmila tagor
আনন্দ আশ্রম ছবির একটি দৃশ্য

উপন্যাসের চিত্ররূপ কোনও নতুন খবর নয় । তবে সাহিত্যিক হিসেবে যাঁর খ্যাতি তিনি ছবি নির্দেশনায় নেমেছেন বাংলা ছবির জগতে তেমন ঘটনা মাত্র দু’জন সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে ঘটেছে । তাঁদের একজন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, অপরজন প্রেমেন্দ্র মিত্র ।এই আলোচনা অবশ্য শৈলজানন্দকে ঘিরেই। তাঁর লেখা গল্প নিয়ে প্রথম যে ছবিটি নির্মিত হল সেটির নাম ‘পাতালপুরী'( ১৯৩৫ )।পরিচালক প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়। চিত্রনাট্য ও গীত রচনা করলেন শৈলজানন্দ। পরিচালক রূপে তাঁর আত্মপ্রকাশ করার পূর্বে ‘পাতালপুরী’ ছাড়াও আরও তিনটি ছবি মুক্তি পায়। যার লেখক ও চিত্রনাট্যকার হলেন শৈলজানন্দ। সেগুলি হল ‘দেশের মাটি’ , ‘জীবন মরণ’ এবং ‘ডাক্তার’। এর মধ্যে নীতিন বসু পরিচালিত জীবন মরণ সুপারহিট ছবি এবং সেখানে সায়গলের গাওয়া গান, ‘এই পেয়েছি অনল জ্বালা তারেই শুধু চাই’ — তখন সকলের মুখে মুখে। সায়গল ও লীলা দেশাই জুটি সকলের অন্তর স্পর্শ করেছিল। ‘জীবন মরণ’ এর পরেই ‘ডাক্তার’।নিজের কাহিনির এমন সফল চিত্ররূপ দেখেই সম্ভবত পরিচালক হওয়ার কথা ভাবলেন শৈলজানন্দ।

পরিচালক রূপে প্রথম যে ছবিটি মুক্তি পেল তার নাম ‘নন্দিনী'( ১৯৪১ )। বন্ধু কাজী নজরুল ইসলাম গান লিখলেন। সুর দিলেন হিমাংশু দত্ত। ভূমিকা লিপিতে ছিলেন অহীন্দ্র চৌধুরী,জহর গঙ্গোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য। মোটামুটি সফল ছবি ‘নন্দিনী’ । পরের ছবির নাম হল ‘বন্দী। সেই ছবি পরিচালক হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিল। ছবি বিশ্বাস, জহর গাঙ্গুলী, রেনুকা রায় প্রমুখ ছিলেন ভূমিকা লিপিতে । ‘বন্দী’ মুক্তি পায় ১৯৪২সালে। যে ছবির দৌলতে তিনি সকলের নজরে পড়লেন সেই ছবির নাম হল ‘শহর থেকে দূরে’ ( ১৯৪৩)। সেও এক ডাক্তারের গল্প ।ধীরাজ ভট্টাচার্য এবং রেনুকা রায় প্রধান জুটি।বহু প্রতিকূল পরিস্থিতি পার করে তাঁরা মিলিত হয়েছিলেন । এক নিঃসন্তান রমণী চরিত্রে মলিনা দেবীর অভিনয় উজ্জ্বল হয়ে থাকে। গোল্ডেন জুবিলী বা প্ল্যাটিনাম জুবিলী নয়, প্রায় এক বছর ধরে চলার গৌরব অর্জন করেছিল ‘শহর থেকে দূরে’।২৪ ডিসেম্বর (১৯৪৩ )এ ছবিটি রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে তা টানা এক বছর ধরে চলেছিল।

bengali film
‘শহর থেকে দূরে’ পোস্টার

এরপর শৈলজানন্দকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৪৫ সালে তাঁর পরিচালিত তিনটি ছবি মুক্তি পেল ‘অভিনয় নয়’, ‘মানে না মানা’, ‘শ্রী দুর্গা’। তাঁর গ্রুপের শিল্পীরাই এখানে অভিনয় করলেন যাঁদের মধ্যে ছিলেন অহীন্দ্র চৌধুরী, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য, মলিনা দেবী, রেনুকা রায়, সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়, নবদ্বীপ হালদার, তুলসী চক্রবর্তী প্রমুখ। মোহিনী চৌধুরী গীতিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেন তাঁর ছবিগুলির গান লিখে। ‘শ্রী দুর্গা’ ছবির বাড়তি আকর্ষণ ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ।

১৯৪৭ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালনা করলেন দশটি ছবি ।সেগুলি হল ‘রায় চৌধুরী’, ‘ঘুমিয়ে আছে গ্রাম’, ‘রংবেরং’, ‘সন্ধ্যাবেলা’, ‘রূপকথা’, ‘একই গ্রামের ছেলে’, ‘ব্লাইন্ড লেন’, ‘বাংলার নারী’, ‘মনি আর মানিক’, ‘কথা কও ‘, ‘আমি বড় হব ‘। পরিচালনা করার পাশাপাশি সবকটি ছবির কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা তিনি। সুরকার হিসেবে শৈলজানন্দ প্রতিষ্ঠা দিলেন শৈলেন দাশগুপ্ত ,রাজেন সরকার, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সুবল দাসগুপ্তদের।

পরিচালনা করার কাজ ছেড়ে দিলেও ছবির জগতের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। তাঁর গল্প অবলম্বনে বহু ছবি নির্মিত হয়েছে ।কোনও কোনও গল্প নিয়ে একাধিকবার ছবি হয়েছে। ‘ডাক্তার’ এবং ‘আনন্দ আশ্রম’ এর কথা শুরুতেই বলা হল। ‘শহর থেকে দূরে’ দ্বিতীয়বারের জন্য পরিচালনা করলেন তরুণ মজুমদার । আশ্চর্যের বিষয়, যে ‘শহর থেকে দূরে’ একদা সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছিল, শহর থেকে দূরে দ্বিতীয়বার যখন তরুণ মজুমদারের হাতে তৈরি হল, তখন তা মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই মুখ থুবড়ে পড়ল। ছবিতে যে গ্রাম বাংলা ফুটে ওঠে ভাল তরুণ বাবুর হাতে, কিন্তু তাঁর হাতে পড়েও শহর থেকে দূরে জমল না । তরুণ মজুমদারের ‘শহর থেকে দূরে ‘ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮১ সালে।

শৈলজানন্দের ‘সন্ধি’ গল্প নিয়ে একাধিকবার ছবি নির্মিত হয়েছে। প্রথমবার ১৯৪৪ সালে ।পরিচালক অপূর্ব মিত্র। নায়ক নায়িকা বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুমিত্রা দেবী। আর দ্বিতীয় সন্ধির পরিচালক অমল দত্ত। নায়ক নায়িকা দীপঙ্কর দে ও মিঠু মুখোপাধ্যায়।

bengali film upahar
উপহার ছবির পোস্টার

তাঁর গল্প নিয়ে ছবি করেছিলেন তপন সিংহ ।ছবির নাম ‘উপহার’। ১৯৫০ সালে মুক্তি পায় ।উত্তম কুমার মঞ্জু দে,সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ,নির্মল কুমার ,কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, ছবি বিশ্বাস ছিলেন প্রধান ভূমিকা গুলিতে। সাবিত্রী এই একটিমাত্র ছবিতেই তপন সিংহের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সুধীর মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য সহকারী বিনু বর্ধন শৈলজানন্দের ‘দুই পর্ব’ কাহিনির চিত্ররূপ দিলেন ।সেখানে নতুন নায়ক নায়িকা এলেন সুমন মুখোপাধ্যায় ও জোৎস্না বিশ্বাস। পরবর্তীকালে তাঁরা পরিণয়ের সূত্রে আবদ্ধ হয়ে ফিল্মকে বাই বাই জানিয়েছিলেন। বারোইয়ারি উপন্যাস ‘রসচক্র’ যেখানে শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে শৈলজানন্দ সহ মোট ১২ জন ঔপন্যাসিক মিলে রচনা করেছিলেন , সেটি যখন ছবি হয়ে এলো তখন তার নাম দেয়া হল ‘জয়া’।পরিচালনা করলেন চিত্ত বসু । নাম ভূমিকাতে ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। রবীন চট্টোপাধ্যায় সুরে গান গাইলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। সুশীল মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘বড় ভাই’ ছবিটি মুক্তি পেল ১৯৮০ সালে। নাম ভূমিকায় সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। ছোট ভাই সন্তু মুখোপাধ্যায়। অন্যান্য চরিত্রে বিকাশ রায়, দীপঙ্কর দে ,আরতি ভট্টাচার্য প্রমুখ। তাঁর লেখা গল্প নিয়ে ‘রূপ সনাতন’ ছবিটি নির্মিত হল ১৯৬৫ সালে। সেখানে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন মজুমদার সহ বহু বিশিষ্ট শিল্পীরা ছিলেন। কীর্তনকলা নিধি রথীন ঘোষের সুরে হেমন্ত সন্ধ্যা মানবেন্দ্র ধনঞ্জয় প্রতিমা নির্মলা আরতি গান গাইলেন বটে, কিন্তু ছবি জমল না।

তাঁর গল্প নিয়ে শেষ যে ছবিটি নির্মিত হয়েছে তারও পরিচালক তরুণ মজুমদার। মূল গল্পের নাম ‘চিরশত্রু’। ছবির নাম ‘খেলার পুতুল’ । ভাইবোনের ঝগড়া ভালবাসা কী পরিণতি পায় ,তারই অশ্রুসজল কাহিনি এই খেলার পুতুল। এখানে ভাই অনুপ কুমার । বোন সন্ধ্যা রায়। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কমল মিত্র , সন্ধ্যারানী প্রমুখ শিল্পী।

এখনও শৈলজানন্দের গল্প সহৃদয় কোন পরিচালক যদি নির্বাচন করে ছবি করেন,তবে সেটি হবে তাঁর প্রতি আমাদের যথার্থ সম্মান জ্ঞাপন।