কোনও রকমে নাগরা আর ওড়না ঠিক করতে করতে দৌড়। আরে আরে…. সাবধানে। বন্ধুরা কি তোকে ফেলে রেখেই চলে যাবে মায়াপুর? কাকিমার বকবক স্বচ্ছন্দে এ কান ওকান হয়ে বায়ুভূত। উবের ট্যাক্সি সামনেই। একটু জলদি। প্লিজ। পেঁয়াজ রাঙা লাহোরি স্যুট। পশমিনা ওড়না। আয়ত দু’চোখ ঢেকে যায় এভিয়েটর সবুজে। ফেব্রুয়ারিতে শীতশেষের শিরশির বাতাস। সকাল আটটার আদুরে রোদ।আউট্রাম ঘাটের সামনে ক্রিমরঙা রয়াল এনফিল্ড মেটিওর ৬৫০ । ঈষৎ হেলান দিয়ে ব্লু ডেনিম শার্ট সাদা জিনস আর চওড়া ফ্রেমের কালো সানগ্লাস। ওকে দেখতে পেয়ে হালকা হাসি। মন ভালো থাকার এক দিনের শুরু।
আজ ওদের চেনা জানার বার্ষিকী। প্রথম। দীপন আর শবনম। নামগুলো চেনা? হতেই পারে। সত্যি নাম তো আর নয়! বাড়িতে একটু নিরামিষ মিথ্যে। ত্রিশের কোঠায় দুজনেই। স্বাবলম্বী। তাই একটু আধটু ডেটিং চলুক না। এই লুকোছাপাটাই মজা। থ্রিল। জানাজানি হলেই তো মধ্যবিত্ত মনের চাপ। সমাজ। সংসার। তাই আজ দ্বিচক্রযান ছুটল সাগর মাঠ পেরিয়ে। কোন্নগরে গঙ্গা ছুঁয়ে নীপবন হাউজিং। ওখানে দীপনের একটা ফ্ল্যাট। বারান্দায় বসে হিজিবিজি আড্ডা সারাদিন। আর …আর কিছু না।
বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে বম্বে রোড থেকে ওরা ডাইনে। ফালতু চায়ের দোকানে মিনিট কুড়ি। তবে চমৎকার মাটির ভাঁড়ে চা। বাদাম বিস্কুট। চাকার মতো দেখতে বিস্কুটগুলো কেন প্রজাপতি বিস্কুট? ফালতু মাথা চুলকে সলজ্জ হাসে। বেলুড় বালি গঙ্গার ধারে ধারে রাস্তা। ডাইনে বাড়ি ঘরের ইতি উতি দিয়ে নদীর একটু আধটু। বাবা বলে আসল ঈশ্বর তো সূর্য্য, নদী, পাহাড় আর মাটি। ওরা নেই তো প্রাণ নেই। গান নেই। এমন অনেক কথা। চোখের কোণা ভিজে ভিজে।
হাউজিংটা গাছপালায় ভরা। তিন-তলা চার-তলার আটটা টাওয়ার। পাঁচটা গঙ্গার ধারে। মাঝেরটায় ওরা লিফট চড়ে চার তলায়। বেতের চেয়ারে পাটের কুশন। ওপেন কিচেন আর ডাইনিং। তিনটে ঘর। আসবাব সামান্যই। রুচির ছাপ সর্বত্র। শবনমের ভালো লাগছে। ওর আঁকা একটা তিব্বতের ছবি দীপনকে দেবে। ডাইনিং স্পেসের দক্ষিণের দেওয়ালে ফাঁকা জায়গাটা যেন ওই ছবিটার অপেক্ষায় দিন গুনছে। দু মগ কফি আর চিজ কুকিস নিয়ে ওরা বারান্দায় বসে। এত কথা ওরা বলে কেমন করে? প্রেমে পড়লে লোকে নাকি প্রগলভ হয়ে ওঠে। সত্যিই বোধহয় ওরা প্রেমে পড়েছে। কখনও কিচ্ছু না বলে তাকিয়ে থাকে চোখে। হয়তো মনে।
একজন দেখাশোনা করার লোক আছে। সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। প্রয়োজনে বাজার হাট। টাটকা ফল সবজি আমিষ। আজ তার ছুটি। আসলে দীপন ওকে নিজের প্যাশনে একটু ভাগীদার করতে চায়। রান্না ওর কাছে ভাললাগার এক রকমফের। কিচেনটা হরেক গ্যাজেট আর টুকিটাকি সমাহার।
‘কী খাবে লাঞ্চে?’
‘যা আপনার মর্জি। মাথা ছাড়া সবই খাই। ‘
‘ সত্যি? ‘… হাসলে দীপনের ডান গালে টোল পড়ে। আর শবনমের বাম দিকের গজদাঁত দৃশ্যমান হয়। কী কান্ড!
লং প্লেয়িং রেকর্ডে খুউব হালকা ভলিউমে হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া। কিচেনের সামনে একটা হাই স্টুলে শবনমকে বসতে বলে। নাচের ছন্দে হাত চলছে দীপনের। মাঝে মাঝে একটু দুষ্টু চাহনি আর বকবক। চিকেন উইংস সেদ্ধ করতে দেয় একটা দারচিনি জলে দিয়ে। আজকের মেন্যু তাহলে সিম্পল। তন্দুরী রুটি, চিকেন ভর্তা আর সেমাই। চলবে ?
‘দৌড়বে।’
সোনালি গমের লাল আটা, টক দই, এক চামচ ম’ ম’ গন্ধ গাওয়া ঘি, সামান্য বেকিং সোডা, এক চামচ চিনি, আধ চামচ সা মরিচ গুঁড়ো আর কিছুটা নুন। ঈষৎ উষ্ণ জলে হাতে একটু ঘি মাখিয়ে মাখা। প্রতিটি আটার কণা যেন স্পর্শ পায় বাকি উপাদান আর জলের। ওই যে, প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর। এই জন্যেই তো মাখো মাখো প্রেম বলে। ইচ্ছে বা অনিচ্ছায় আটা মাখা আঙুল শবনমের গাল ছুঁয়ে যায়। ঈষৎ রক্তাভ হয়ে ওঠে গণ্ডদেশ। আহা…গাল বললাম। গাল।
‘এটা কিন্তু হাতের একটা দারুণ ব্যায়াম।’ একটা ভিজে কাপড়ে ঢাকা দিয়ে দেয় আটামাখাটা।
‘আসলে তন্দুরের ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি তো কম নয়। এঁটেল মাটির তৈরি এই উনুনে পোড়ামাটির বাসন থেকে গয়না। সিন্ধু সভ্যতায় কত যে পাওয়া গেছে! খাবার তৈরিতে নিশ্চয়ই ব্যবহার ছিল। আক্কাদিয়ান তিনুর,হাত আর সংস্কৃতি বদল হতে হতে তন্দুর। সংস্কৃতে বলত কান্ডু। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, ইরান, তুরস্ক সর্বত্রই তন্দুর আর খাদ্যসংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গী। তন্দুর তৈরি এক রাজসূয় যজ্ঞ। ইঁট, অভ্র, বালি, এঁটেল মাটি আরও হাজার উপাদান। উনচল্লিশ ধাপ। ভিতরে পালং , মেথি শাক, গুড়, সর্ষে তেল,দই আর নুনের মিশ্রণ লেপে ধীরে ধীরে গরম করা হয়। সব মিলিয়ে সময় লাগে প্রায় দিন দশেক।
অবাক হয়ে শুনছিল শবনম। ‘সত্যিই। খাওয়ার জন্যে কত কী !’
‘আবার আটা ময়দার ধরন, সঙ্গের উপাদান আর টেক্সচারের পার্থক্য। সঙ্গে এদেশ ওদেশ। কখনও তন্দুরী রুটি , নান, কখনও খামিরী রুটি, লাভাস কিংবা জর্জিয়ার টোনিস পুরি বা শটিস পুরি, আমার প্রিয় সাদা তিল দেওয়া টার্কিস ব্রেড নানা মত, নানা দেশ, নানা পরিচয়।’
একটা কড়া ওভেনে বসিয়ে ওর মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দীপন বলতে থাকে।
‘সেমাইতে কিন্তু এত হ্যাপা নেই। গ্রিক শব্দ সেমিদালিস। মানে হল ময়দা। তার থেকে এল সেমাই। মানে নুডুলস -এর দেশীয় সংস্করণ। ময়দার লেয়ারকে সরু সরু লম্বা টুকরো করে নিতে খিল সেমাই। ঘিয়ে ভেজে নিয়ে লাচ্ছা সেমাই।’
‘আর জর্দা সেমাই?’
‘ আরে ওটা তো প্রচুর মেওয়া দিয়ে হাল্কা মিষ্টি ঝরঝরে সেমাই।’ ঘিয়ে কটা ছোট এলাচ আর ইঞ্চিখানেক দারচিনি। সেমাই দিয়ে একটু নাড়াচাড়া। কাজু আর ছোট আফগানি কিসমিস কটা। একটু বেশি পরিমাণে দুধ দিয়ে কিছুক্ষণ ফুটতে দিতে হবে। পাঁচ মিনিট পর পরিমাণমত চিনি বা মিছরি। আরও পাঁচ মিনিট পর দু চামচ ফ্রেশ ক্রিম দিয়ে নেড়েচেড়ে ব্যস। শুরুতে একটা তেজপাতা দিলেও হয়, না দিলেও চলবে।
‘এবার চিকেন উইংস থেকে মাংসটা আলাদা করে নিতে হবে। ওভেনে ফ্ল্যাট কড়া। সরষে তেল। পিয়াঁজকুচি, খুউব ছোট করে কাটা রসুন আর আদাকুচি। পুরোটা দেবেন না যেন। এক তৃতীয়াংশ রেখে দিন। সবুরে মেওয়া ফলে। অল্প হলুদ, লঙ্কা, জিরে গুঁড়া। ধনে আর গোলমরিচ গুঁড়ো। নুন কিছুটা। অর্ধেকটা পাতিলেবু। গোলমরিচ সবসময় টাটকা গুঁড়ো। একটু দানাভাব যেনো থাকে। পাউডার হয়ে গেলে ওর জাত যাবে। একটু পরে চিকেন আর ধনেপাতা কুচি দিয়ে আদর করে নাড়াচাড়া। এরপর দুধ এক কাপ। ফুটে উঠলে একটু হাতা খুন্তির পরিশ্রম। গায়ে মাখা হয়ে এলে বাকি পেঁয়াজ আদা রসুনকুচি আর এক চামচ সর্ষে তেল দিয়ে নামিয়ে নেওয়া।’
মাঝে মাঝে মুখের দিকে তাকিয়ে কথা আর সমানে হাত চলছে দীপনের। শবনমের মনে হচ্ছে রনবীর ব্রা’র ইউ টিউব চ্যানেল দেখছে। সত্যিই লোকটাকে সব কিছু দেওয়া যায়। নাকি পুরোটাই ওর বিভ্রম? কে জানে ক’ঘণ্টার জীবন। অত হিসেবের খাতা না খুললেই কি নয়!
‘এবার রুটির পালা। আটা তার সমস্ত উপাদানের সঙ্গে এতক্ষণে অন্তরঙ্গ।’
‘ কিন্ত তন্দুর কোথায়? অতো জ্ঞান অর্জন করলাম যে!’
‘আরে, তন্দুরের এত ঝামেলার জন্যে খোদ পাঞ্জাবেও কমিউনিটি কিচেন সেই কবে থেকে। যে যার বাড়ি থেকে আটা নিয়ে চলে আসে তন্দুর থাকে যেখানে। ব্যস। সবাই মিলে পি এন পি সি আর রুটি তৈরি। গান বাজনা কখনও কখনও। কে কার বেওড়া মর্দকে বেলন দিয়ে কেমন পিটিয়েছে আর ভুট্টা ক্ষেতের থেকে কোন জোড়িকে বের হতে দেখা গেছে, সে রসের কথাও চলে নিশ্চয়ই।
শেষের কথাটায় শবনমের গালে লালিমা। হবেই তো।
‘গোল করে রুটি বেলে নিতে হবে। একটা ফ্রাই প্যান বেশ গরম হলে একটু জলের ছিটে। রুটিটা দিয়ে উলটো করে আগুনে রুটিটা সরাসরি সেঁকা। রোস্টেড ভাব ভালোভাবে এলে এবার প্যান সোজা করে সেঁকে নেওয়া। একটু ঘি ব্রাশ করে নিতে হবে। একদম ধাবা স্টাইল তন্দুর রুটি। হল তো? ‘
বলাই বাহুল্য যে লাঞ্চ দারুণ জমেছিল। মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতায় না গেলেও দীপনের সার্টিফিকেট প্রাপ্য।
শবনম কেমন করে সেই রিটার্ন গিফট দিয়েছিল আর ঠিক কত ঘন সন্ধ্যায় ওরা ফেরার পথ ধরেছিল সে সব কথা এখন থাক। বরং বাড়ি ফেরার পথে ফাউল শপে একটু থেমে কটা চিকেন উইংস ! কটা যেন লাগবে? ডিনারের প্লেট কটা হবে? পাঁচ? ছয়?…

