Mahasweta Devi cinema

সেলুলয়েডে মহাশ্বেতা দেবী

ধনী দুহিতা মিনতি তার পিতামাতার অমতে বিয়ে করে অজিত বসুকে। তখন তাদের চোখের সামনে বিরাট ভবিষ্যতের আশা। অলরাউন্ডার স্পোর্টসম্যান হিসেবে অজিতের নাম তখন ছড়িয়ে পড়েছে। সেই নাম ও কর্মদক্ষতায পেয়েছিল পার্ক অটোমোবাইল কোম্পানিতে সেলসম্যানের  চাকরি। কটা বছর মাত্র। তারপরে কোম্পানির মালিক বদল হতেই অজিতের চাকরি যায়।  শুরু হল জীবন যুদ্ধের খেলা। সংসারে দেখা দিল দারিদ্র্যের ছায়া। নিরূপায় অজিত যখন আশার আলো ভুলতে বসেছে তখনই একদিন তাদের বাড়িতে উদয় হল বনবিহারী সিং-এর। এককালে অজিতের মোটরসাইকেল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে বনবিহারী হয়েছিল তার বিরাট ভক্ত। সেদিনের বনবিহারী সিং আজ পানামা সার্কাসের মালিক। তার সার্কাসের ডেথ জাম্প দেখানোর জন্য খেলোয়াড় রাম বাহাদুরের নানান বায়নায় অতিষ্ঠ। তাকে বদল করে মোটা মাইনের এই অফার অজিত গ্রহণ করে। কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপন বের হয়। কাগজ হাতে নিয়ে মিনতির বাবা-মা দেখা করতে আসেন। তাঁরা অজিতকে বারণ করেন এই কাজটা করার জন্য। কিন্তু বাধা দেয় মিনতি। সার্কাস জীবন কয়েকদিনের মধ্যে খুব বন্ধু হয়ে ওঠে শিশির। জাগলারের খেলা দেখায়। মিনতি মা হতে চলেছে। অজিত কেমন নার্ভাস হয়ে পড়ে। শিশিরকে অনুরোধ করে সার্কাস টেন্ট ছেড়ে তাদের বাড়িতে চলে আসার জন্য। বিনা দ্বিধায় শিশির চলেও আসে। সার্কাসে তখন প্রচন্ড গন্ডগোল।  ট্রাপিজের খেলোয়াড় অন্য সার্কাস ভালো অফার পেয়ে যেতে পারছে না ট্রাপিজ কুইন সিনথিয়ার জন্য। এই সার্কাসে সিনথিয়া যেতে নারাজ। অথচ জুটি ছাড়া যাওয়া চলে না। খেলা দেখানোর জন্য তৈরি হয়ে বসে আছে অজিত। সেই মুহূর্তে খবর আসে মিনতি নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছে। খেলা না দেখিয়েই চলে আসতে চায় অজিত। বাধা দেয়ার সার্কাসের ম্যানেজার। দর্শকের অভাবে খেলা বন্ধ । লোকেরা গন্ডগোল শুরু করে দিয়েছে। অজিতের মোটরসাইকেল এগিয়ে এল। সার্কাসে ঢুকতেই গায়ে পড়ল জুতো। শুরু হল টিটকারি। আনমনা  মন নিয়ে অজিত খেলতে নামে। মোটরসাইকেল বাম্পারে গিয়ে ধাক্কা মারে। এরপরে অজিতের কিছু মনে নেই। মনে থাকার মত অবস্থাও ছিল না ।

akash choya cinema
এদিকে মিনতির কোলে এসে গেছে সদ্যোজাত শিশু পুত্র বহুদিন বাদে আবার দেখা গেল মিনতির বাবা-মাকে ।এবারে তারা আবার নিয়ে যেতে এসেছেন কিন্তু যেতে নারাজ মিনতি। দুঃসময় শিশির ছেড়ে যেতে চায় না।এই ঘটনা অজিতের মনে সন্দেহ জাগায়। সব বুঝে মিনতি  চাকরির চেষ্টা করে। জুটেও যায়। মনের সব দুঃখ ভোলার জন্য অজিত মদ খাওয়া ধরে। মনের দিক থেকে সেই একটু একটু করে নাবতে শুরু করে।একদিন বাবুকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে অজিত। মিনতি ও শিশিরকে পার্কে বসে হাসির গল্প করতে দেখে রাত্রে চরম অপমান করে। এরপর কয়েকটা বছর কেটে গিয়েছে। পুরনো বাড়ি ছেড়ে কম ভাড়ায় বাড়িতে উঠে এসেছে অজিতরা। এখন শিশির নেই। শুধুমাত্র মিনতি রোজগারে সংসার চলে। সংসার আর চলে না। এইরকম দুর্বল অবস্থা নিয়ে একদিন অজিত আত্মঘাতী হওয়ার জন্য  ঝাঁপ দেয় রেললাইনে। কিন্তু মরা তার হয় না।

যে গল্পটির কথা বললাম সেই গল্পকার হলেন মহাশ্বেতা দেবী। তার উপন্যাসটির নাম হলো আকাশ ছোঁয়া। প্রখ্যাত অভিনেতা পরিচালক দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় এই ছবিটি নির্মিত হয়েছিল। এর পরিচালক হলেন রাজেন তরফদার, যিনি গঙ্গা ছবির সূত্রে স্বনামধন্য হয়েই আছেন। তিনি এই গল্পের চিত্রনাট্যকারও বটে। সেখানে দুটি রবীন্দ্র সংগীত ব্যবহার করা হয়েছে পথের শেষ কোথায় এবং এবার নীরব করে দাও হে তোমার মুখর কবিরে। মুখ্য ভূমিকাগুলিতে অভিনয় করলেন অজিতের ভূমিকায় দিলীপ মুখোপাধ্যায়, মিনতি চরিত্রে সুপ্রিয়া দেবী, শিশিরের চরিত্রের অনিল চট্টোপাধ্যায়। এছাড়া এই ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন চারু প্রকাশ ঘোষ, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়,পারিজাত বসু, প্রশান্ত কুমার, শিখা ভট্টাচার্য প্রমুখ বিশিষ্ট শিল্পী। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৭ সালের ১৬ জুন রাধা পূরবী পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে। মাঝারি মাপের হিট হয়েছিল ছবিটি। কিন্তু সমালোচকেরা অত্যন্ত প্রশংসা করেছিলেন এই ছবিটির।

মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম শতবর্ষ চলছে। ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারিতে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। কল্লোল সাহিত্যের বিশিষ্ট সাহিত্যিক মনীশ ঘটক তাঁর বাবা। তাঁর মা ধরিত্রী দেবী, তিনিও বিখ্যাত লেখিকা। তাঁর কাকা হলেন বিশ্ববন্দিত পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। বিশ্বভারতী থেকে স্নাতক হয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়তে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে দেবী বিজয়গড় কলেজে অধ্যাপনা তিনি শুরু করেন। তাঁর প্রচন্ড লেখালেখির শুরুটা হয়েছিল তখন।  বীরসা মুন্ডার জীবন নিয়ে তিনি লিখলেন অরণ্যের অধিকার’, যেটি তাঁকে সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পেতে সাহায্য করেছিল। এছাড়াও তিনি লিখলেন হাজার চুরাশির মা, তিতুমীর প্রভৃতি উপন্যাস। তাঁর স্বামী বিখ্যাত লেখক অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্য। পুত্র স্বনামধন্য লেখক নবারুণ ভট্টাচার্য। জীবনে প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন পদ্মশ্রী,পদ্মবিভূষণ, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার এবং বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এমনকি পাঠভবনের ছাত্রী হলেও বিশ্বভারতীর অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করেছিলেন। এই মহীয়সী লেখিকাকে আমরা হারিয়েছি ২০১৬ সালের ২৮জুলাই।

অগ্নিশিখা ছবির পোস্টার
অগ্নিশিখা ছবির পোস্টার

মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে যে ছবিটি নির্মিত হয়েছিল বাংলায় তার নাম “অগ্নিশিখা”।  ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬২ সালের পয়লা জুন উত্তরা পূরবী উজ্জ্বলয়। শ্রীবিষ্ণু পিকচারস প্রযোজিত সেই ছবির পরিচালক রাজেন তরফদার। চিত্রনাট্যকার পরিচালক স্বয়ং। মুখ্য চরিত্রগুলিতে অভিনয় করেছিলেন বসন্ত চৌধুরী, কনিকা মজুমদার, ছবি বিশ্বাস,পাহাড়ি সান্যাল, কমলা মুখোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, দ্বিজু ভাওয়েল, ভানু বন্দোপাধ্যায়, জহর রায়, মঞ্জুলা বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়শ্রী সেন, সীতা মুখোপাধ্যায়,গঙ্গাপদ বসু, শিশির বটব্যাল। সুরকার হলেন রবীন চট্টোপাধ্যায়।গীত রচয়িতা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।গান গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, তরুন বন্দোপাধ্যায়, চিত্ত মুখোপাধ্যায়, মৃণাল চক্রবর্তী। এ ছবির প্রাণসম্পদ কণিকা মজুমদারের অসাধারণ অভিনয়।

মোমবাতি ছবির সিডি কভার
মোমবাতি ছবির সিডি কভার

উত্তম কুমার অভিনয় করেছেন মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত “মোমবাতি” ছবিতে। মূল গল্পের নাম অধিকার। সেখানে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১৮ জুন উত্তরা পূরবী উজ্জ্বলায়। বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার ব্যতিরেকে সুপ্রিয়া দেবী, অনিল চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ মুখোপাধ্যায়, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়, নন্দিতা বসু প্রমুখ শিল্পী। সংগীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষ।গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।

হাজার চুরাশির মা ছবির পোস্টার
হাজার চুরাশির মা ছবির পোস্টার

একটি স্মরণীয় ছবি  মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি শুরু হয়েছিল কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ হতে পারেনি। কাহিনীর নাম হাজার চুরাশির মা। বিখ্যাত পরিচালিকা অরুন্ধতী দেবী এই কাহিনি  নিয়ে নিজের চিত্রনাট্যে ছবিটি তৈরি করতে শুরু করেছিলেন এবং নাম ভূমিকার শিল্পী হিসেবে তিনি নির্বাচন করেছিলেন সুচিত্রা সেনকে। কিন্তু ততদিনে মারা গেলেন পরিচালিকা। যদি তিনি বেঁচে থাকতেন এবং ছবিটি সম্পূর্ণ করতে পারতেন তাহলে একটি স্মরণীয় ছবি হত বাংলা ছবির ক্ষেত্রে। কারণ সেখানে  কাহিনিকার মহাশ্বেতা দেবী, পরিচালিকা অরুন্ধতী দেবী এবং নাম ভূমিকায় সুচিত্রা সেন। কিন্তু সে ছবিটি সম্পূর্ণ হতে পারল না। তবে এই হাজার চুরাশির মা নিয়ে হিন্দিতে একটি ছবি তৈরি হয়েছিল। তার নাম ছিল হাজার চুরাশি কা মা। সেখানে অভিনয় করেছিলেন অনুপম খের, জয়া বচ্চন প্রমুখ শিল্পীরা। 

sunghursh cinema
সংঘর্ষ ছবির পোস্টার

মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি নিয়ে প্রথম যে হিন্দি ছবিটি নির্মিত হয়েছিল তার নাম সংঘর্ষ। সেখানে প্রধান চরিত্র দুটিতে অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার এবং বৈজয়ন্তিমালা এবং সেইখানে সঞ্জীব কুমার প্রথম খল চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের নজর আকর্ষণ করেছিলেন। এছাড়া তাঁর কাহিনি নিয়ে হিন্দিতে তৈরি হয়েছে “রুদালি” যার পরিচালিকা হলেন কল্পনা লাজমি এবং সেখানে প্রধান ভূমিকা দুটিতে অভিনয় করেছিলেন  ডিম্পল কাপাডিয়া ও রাখী গুলজার।

rudali cinema
রুদালি ছবির পোস্টার

তবে মহাশ্বেতা দেবীর প্রচুর গল্প উপন্যাস পড়ে আছে। সহৃদয় প্রযোজক পরিচালকরা যদি একটু নজর দেন তাহলে সেগুলো থেকে অসাধারণ ছবি হয়ে উঠতেই পারে। জন্মশতবর্ষে আমরা সেই কামনাই করব। আর এই লেখার মধ্য দিয়ে জন্ম শতবর্ষে মহাশ্বেতা দেবীকে জানাচ্ছি সশ্রদ্ধ প্রণাম।