tarashankar-bandyopadhyay-on-celluloid

সেলুলয়েডে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের পরে যে সাহিত্যিক আমাদের অন্তর জুড়ে বিরাজ করছেন, তিনি হলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)৷ এই বাংলার বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে ১৮৯৮ সালের ২৫ জুলাই তারাশঙ্করের জন্ম৷ একসময় সকলের অগোচরে ১৯২৯ সালে কল্লোল পত্রিকায় ‘রসকলি’ গল্প বেরোতেই তারাশঙ্কর যথেষ্ট খ্যাতি পেলেন৷ ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘রাইকমল’ উপন্যাস এবং ১৯৩৯ ও ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত ‘ছলনাময়ী’ ও ‘জলসাঘর’ গল্পগ্রন্থ তাঁকে‍ সাহিত্যিক হিসেবে রাতারাতি প্রতিষ্ঠা দিল৷ রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁকে‍ ডেকে প্রশংসা জানালেন৷

তারাশঙ্কর লিখেছেন অজস্র উপন্যাস ও ছোটোগল্প দুটি ক্ষেত্রেই তাঁর প্রতিভার প্রকাশ আমাদের অবাক করে দেয়৷ ছোটোগল্পকারের বিচিত্র ঐশ্বর্য এবং উপন্যাসের মহাকাব্যোচিত বিশালতা তারাশঙ্করকে কালজয়ী করে রেখেছে৷ ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘গণদেবতা’, ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’, ‘কবি’, ‘সপ্তপদী’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘বিপাশা’, ‘মঞ্জরী অপেরা’, ‘দুই পুরুষ’, ‘আরোগ্যনিকেতন’, ‘বিচারক’, ‘আগুন’, ‘ফরিয়াদ’, ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ প্রভৃতি উপন্যাসগুলি বহুপঠিত এবং সর্বজনবন্দিত গ্রন্থও বটে৷ একই সঙ্গে উচ্চারিত এই নামগুলি সমগোত্রের, তা বলব না৷ তবে অধিকাংশ উপন্যাসে দেখতে পেলাম তার প্রধান সম্পদ লেখার বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান৷ প্রায় ২০০টি ছোটোগল্প তিনি লিখে গিয়েছেন৷ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘জলসাঘর’, ‘দীপার প্রেম’, ‘অগ্রদানী’, ‘সন্ধ্যামণি’, ‘তারিণী মাঝি’, ‘ডাক হরকরা’, ‘ডাইনি’, ‘অভিযান’, ‘না’, ‘চাঁপাডাঙার বউ’, ‘কান্না’, ‘প্রতিমা’, ‘কালাপাহাড়’, ‘মধু মাস্টার’ প্রভৃতি গল্পগুলি৷ দীর্ঘ কর্মময় জীবনের শেষে ৭৩ বছর বয়সে ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি পরলোক গমন করেন৷ অসংখ্য পুরস্কার ও উপাধি তিনি পেয়েছেন৷ তার মধ্যে রয়েছে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার প্রভৃতি৷

তাঁর লেখা অসংখ্য গল্পের চিত্ররূপ আমরা পেয়েছি নানান সময়৷ কোনও কোনও কাহিনির একাধিকবার চিত্ররূপ আমরা পেয়েছি৷ যেমন— দুই পুরুষ, কবি, প্রতিমা প্রভৃতি গল্পগুলি৷ নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পুরোহিতের সন্তান কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি৷ চিকিৎসাশাস্ত্রে মেডিকেল কলেজে পড়তে এসে ঘটনাচক্রে পরিচয় হয়ে যায় এক শ্বেতাঙ্গিনী খ্রিস্টান যুবতীর সঙ্গে৷ নাম তার রিনা ব্রাউন৷ প্রথমদিকে কৃষ্ণেন্দু ও রিনার মধ্যে নানান কারণে ঘাত প্রতিঘাত, কিন্তু একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে এরা নিজেদের অনেক কাছাকাছি চলে আসেন৷ ছাত্র সংসদ আয়োজিত ‘ওথেলো’ নাটকের মঞ্চায়নকে কেন্দ্র করে এই প্রণয়ের সূত্রপাত৷ মঞ্চায়নের দিন ওথেলোরূপী কৃষ্ণেন্দু এবং ডেসডিমোনারূপী রিনা ব্রাউন দু’জন দু’জনের প্রণয়মুগ্ধ হন৷ এই প্রণয় পরিণয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম৷ কৃষ্ণেন্দুর ধর্মনিষ্ঠ কালীর উপাসক পিতা এই বিজাতীয় মেয়েটিকে পুত্রবধূ রূপে গ্রহণ করতে অপারগ৷ সরাসরি সে কথা তিনি জানিয়েও এলেন রিনা ব্রাউনকে৷ ইতিমধ্যে কৃষ্ণেন্দু খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে কৃষ্ণস্বামী হয়ে উঠেছেন৷ রিনা ব্রাউন কৃষ্ণেন্দুর জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন৷ অগত্যা ধর্মযাজক কৃষ্ণস্বামী ডাক্তার হয়ে রোগীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন৷ অনেক নাটকীয় ঘটনার পর কৃষ্ণেন্দু ও রিনা ব্রাউন মিলিত হন৷ এতক্ষণে পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন কোন্ কাহিনির কথা আমি বলছি, ছবির নাম ‘সপ্তপদী’৷ 

saptapodi cinema
সপ্তপদী ছবির পোস্টার

সাহিত্যের চিত্ররূপের ক্ষেত্রে অনেক রদবদল হয়৷ এখানেও মূল কাহিনিতে রিনা ব্রাউনের সঙ্গে ক্লেটনের বিবাহ হয়ে যায় আর ধর্মযাজক কৃষ্ণেন্দু কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন৷ কিন্তু অজয়বাবু যখন এই ছবির পরিচালনা করছেন, যেখানে কৃষ্ণেন্দুরূপী উত্তমকুমার রয়েছেন আর রিনা ব্রাউনরূপী সুচিত্রা সেন রয়েছেন, সেখানে এই দু’জনের মিল নাহলে কি চলে! তাই চিত্রনাট্যে অনেক ঘষা-মাজা করা হল৷ মূল চিত্রনাট্যকার বিনয় চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হীরেন নাগ নিয়মিত বসে যে চিত্রনাট্যটি খাড়া করলেন, সেখানে অবধারিতভাবে সুচিত্রা-উত্তম জুটির মিলনদৃশ্য এসেই গেল৷ ফলশ্রুতি হল এই যে, ছবিটি আজকের ভাষায় সুপার ডুপার হিট ছবি৷ সুচিত্রা উত্তমের পাশাপাশি ছবি বিশ্বাস, ছায়াদেবী, তরুণকুমার, তুলসী চক্রবর্তী, পদ্মাদেবী প্রমুখের অভিনয় অবিস্মরণীয়৷ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে হেমন্ত-সন্ধ্যার কণ্ঠে গাওয়া ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানটি চিরকালের গান হয়ে রয়েছে৷ সর্বোপরি ওথেলো ও ডেসডিমোনার ইংরেজি সংলাপে যেভাবে উত্তম-সুচিত্রা লিপ দিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়৷ মূল কণ্ঠস্বর উৎপল দত্ত ও জেনিফার ক্যান্ডেলের৷ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬০ সালের ২০ অক্টোবর রূপবাণী, অরুণা, ভারতীতে৷

নিতাই কবিয়াল-এর জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে যে উপন্যাস, তার নাম ‘কবি’৷ কবিয়ালের জীবনে এসেছে দুই রমণী৷ বসন এবং ঠাকুরঝি৷ বসন হল যাযাবর ঝুমুরের দলের শিল্পী৷ ঘর বাঁধার কথা সে কখনওই ভাবতে পারে না৷ অপরদিকে ঠাকুরঝির মন প্রাণ জুড়ে রয়েছে এই নিতাই কবিয়াল৷ এই উপন্যাস নিয়ে দু-দুবার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে৷ প্রথমবারের পরিচালক দেবকীকুমার বসু৷ অনিল বাগচীর সুরে তারাশঙ্করের কথায় অনেকগুলি গান ছিল এ ছবিতে৷ নাম ভূমিকায় রবীন মজুমদার এসেই দর্শকদের মোহিত করেন৷ একই কথা প্রযোজ্য ঠাকুরঝিরূপী অনুভা গুপ্ত এবং বসনরূপী নীলিমা দাসের সম্পর্কেও৷ অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন নীতিশ মুখোপাদ্যায়, নিভাননী, হরিধন প্রমুখ শিল্পীরা৷ ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি এ ছবি মুক্তি পেল উত্তরা, পূরবী ও উজ্জ্বলাতে৷ দ্বিতীয়বার এই ছবিটি নির্মিত হল ১৯৭৫ সালে, পরিচালক সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়৷ প্রধান তিনটি চরিত্রে এবার অভিনয় করলেন দেবরাজ রায়, মিঠু মুখার্জি ও ঝুমুর গাঙ্গুলী৷ ১৮ ফেব্রুয়ারি এ ছবি এল মিনার, বিজলী, ছবিঘর-এ৷ কিন্তু দ্বিতীয়বারের এ ছবি দর্শকদের তেমন করে মাতিয়ে দিতে পারেনি৷

‘দুই পুরুষ’ উপন্যাসেরও দু-বার করে চিত্ররূপ পাওয়া গেছে৷ প্রথমবার নিউ থিয়েটার্স-এর ব্যানারে নির্মিত হয়েছিল৷ সেখানে নুটুবিহারীরূপী ছবি বিশ্বাস সকলকে অভিভূত করেছিলেন৷ অন্যান্য চরিত্রে রূপদান করেন চন্দ্রাবতী দেবী, সুনন্দা দেবী, নরেশ মিত্র, জহর গাঙ্গুলি, অহীন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ৷ পরিচালনা করেছিলেন সুবোধ মিত্র৷ ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল মিত্রা প্রে‍ক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি পেল৷ দ্বিতীয়বারের ‘দুই পুরুষ’-এর পরিচালক সুশীল মুখোপাধ্যায়৷ এখানে নুটুবিহারীর চরিত্রে অভিনয় করলেন উত্তমকুমার, অন্যান্য ভূমিকায় সুপ্রিয়া দেবী, বিকাশ রায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণকুমার প্রমুখ শিল্পীরা৷ ১৯৭৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শ্রী, ইন্দিরা প্রে‍ক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি পেল৷

hasuli baker upokotha
হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’র পোস্টার

তপন সিংহ তারাশঙ্করের কাহিনি নিয়ে যে অসাধারণ চিত্র নির্মাণ করলেন, তার নাম ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’৷ বনওয়ারীর চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং করালীর চরিত্রে দিলীপ রায় চূড়ান্ত অভিনয় নৈপুণ্যের পরিচয় দিলেন৷ অন্যান্য চরিত্রগুলিতে রূপদান করলেন অনুভা গুপ্ত, করবী ঘোষ, রঞ্জনা, লিলি চক্রবর্র্তী৷ সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়৷ এ ছবি মুক্তি পেল মিনার বিজলি, ছবিঘর-এ৷

jalsaghar
জলসাঘর ছবির পোস্টার

সত্যজিৎ রায় একাধিকবার তারাশঙ্করের কাহিনির চিত্ররূপ দিয়েছেন৷ প্রথমবার ১৯৫৮ সালে, ছবির নাম ‘জলসাঘর’৷ সঙ্গীত পরিচালক বিলায়েত খান! বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্রে ছবি বিশ্বাস এবং তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় পদ্মাদেবী৷ এ ছবির বিশেষ আকর্ষণ রোশন কুমারীর নাচ৷ রাধা, পূর্ণ, প্রাচী প্রে‍ক্ষাগৃহে এই ছবি এল ১০ অক্টোবর৷ দ্বিতীয়বার সত্যজিৎ রায় তারাশঙ্করের ‘অভিযান’ গল্পের চিত্ররূপ দিলেন৷ এখানে মুখ্য চরিত্রগুলিতে অভিনয় করলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ওয়াহিদা রহমান, রবি ঘোষ, রুমা গুহঠাকুরতা, জ্ঞানেশ মুখার্জি প্রমুখ শিল্পীরা৷ শ্রী, ইন্দিরা, প্রাচীতে এই ছবি এল ১৯৬২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর৷ সত্যজিৎ রায় পরিচালিত এই দুটি ছবিই স্মরণীয় হয়ে আছে বাংলা ছবির ইতিহাসে৷

uttarayan
উত্তরাযণ ছবির বুকলেট

তারাশঙ্করের তিনটি গল্পের চিত্ররূপ দিয়েছেন৷ সেগুলি হল যথাক্রমে ‘বিপাশা’, ‘উত্তরায়ণ’এবং ‘মঞ্জরী অপেরা’৷ ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ জাপানি আক্রমণের সময় এই বাংলার কী পরিস্থিতি, তা প্রে‍ক্ষাপটে রেখে তারাশঙ্কর লিখেছিলেন ‘উত্তরায়ণ’৷ এখানে দুটি ভিন্ন চরিত্র প্রবীর ও রতন, একই রকম দেখতে৷ বর্মার যুদ্ধক্ষেত্রে দু’জনের মুখোমুখি দেখা৷ বোমার আঘাতে রতনের মৃত্যু ঘটে৷ রতনের অন্ধ-মা এবং স্ত্রীকে দেখাশোনা করার ভার নিয়ে চলে আসেন প্রবীর৷ এর পরিণতি কী, তা ছবির শেষ দৃশ্যে প্রতিফলিত৷ দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করলেন উত্তমকুমার, তার বিপরীতে সুপ্রিয়াদেবী ও সাবিত্রী চ্যাটার্জি৷ ১৯৬৩ সালের ২৬ এপ্রিল উত্তরা, পূরবী, উজ্জ্বলায় এ ছবি এল৷ 

‘বিপাশা’ কাহিনিটি দাঁড়িয়ে‍ আছে বিপাশার স্বামী দিব্যন্দেুর মায়ের পরিচয় উদ্‌ঘাটনের মধ্যে দিয়ে৷ বিরাট শিল্পীদল এই ছবিতে৷ নামভূমিকায় সুচিত্রা সেন, দিব্যন্দেুর চরিত্রে উত্তমকুমার৷ অন্যান্য চরিত্রে ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র, পাহাড়ি সান্যাল, ছায়া দেবী, নীতিশ মুখার্র্জি‍, জীবেন বসু, কেতকি দত্ত! রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি’ গানটি স্মরণীয় হয়ে আছে৷ ‘বিপাশা’ মুক্তি পায় ২৬ জানুয়ারি মিনার, বিজলী, ছবিঘর-এ৷ ‘মঞ্জরী অপেরা’ যাত্রা দলের জীবন সংগ্রাম নিয়ে রচিত৷ ত্রিকোণ প্রেমের গল্প মঞ্জরী, গোরাবাবু এবং অলোকা৷ এদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে কাহিনি এগিয়ে গেছে৷ সুধীন দাশগুপ্ত এ ছবির সুরকার৷ মুখ্য ভূমিকাগুলিতে অভিনয় করলেন উত্তমকুমার, সাবিত্রী, জ্যোৎস্না বিশ্বাস, অনুপকুমার, বঙ্কিম ঘোষ, গীতা দে প্রমুখ শিল্পীরা৷ এ চবি এল ২৭ নভেম্বর ১৯৭০ সালে উত্তরা, পূরবী, উজ্জ্বলাতে৷

bipasha cinema
বিপাশা ছবির পোস্টার

তরুণ মজুমদার তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের চিত্ররূপ দিলেন৷ জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাওয়া এই উপন্যাসের চিত্ররূপ ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণকমল পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়৷ দেবু পণ্ডিতের ভূমিকা সৌমিত্র, দুর্গা, মুচিনির চরিত্রে সন্ধ্যা রায়, অনিরুদ্ধ কামারের চরিত্রে শমিত ভঞ্জ, পদ্মর চরিত্রে মাধবী, শ্রীহরি পালের চরিত্রে অজিতেশ এবং রাজবন্দী যতীনের চরিত্রে দেবরাজ রায়ের অভিনয় দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল৷ ছবির প্রযোজক পশ্চিমভঙ্গ সরকার, চিত্রনাট্যকার রাজেন তরফদার৷ ছবিটি মুক্তি পেল ১৯৭৯ সালের ২৬ জুন মিনার, বিজলী, ছবিঘর-এ৷

বিজয় বসু তারাশঙ্করের দুটি উপন্যাসের চিত্ররূপ দিয়েছেন৷ প্রথমটি ‘আরোগ্য নিকেতন’, দ্বিতীয়টি ‘ফরিয়াদ’৷ জীবন মশাইয়ের চরিত্রে বিকাশ রায়, তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় দেখিয়েছেন ‘আরোগ্য নিকেতন’-এ৷ আতর বৌ-এর চরিত্রে ছায়া দেবী, প্রদ্যোৎ ডাক্তারের চরিত্রে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছেন৷ অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন সন্ধ্যা রায়, রুমা গুহঠাকুরতা৷ একটি অন্যবদ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এ ছবিতে৷ গানটি হল: ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’৷ ছবিটি এল ১৯৬৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর মিনার, বিজলী, ছবিঘর-এ৷

‘ফরিয়াদ’ গল্পটি এক নির্যাতিতার ভূমিকায় সুচিত্রা সেন, বরেনের চরিত্রে উৎপল দত্ত৷ দু’জনেই অসাধারণ অভিনয় করলেন৷ এ ছবির চিত্রনাট্যকার সমরেশ বসু৷ নচিকেতা ঘোষের সুরে আশা ভোঁসলের গাওয়া এ ছবির গানগুলি আজও জনপ্রিয় হয়ে আছে৷ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর৷

fariyad
ফরিয়াদ ছবির বুকলেট

সলিল সেন তারাশঙ্করের দুটি গল্পের চিত্ররূপ দিয়েছেন৷ প্রথমটি ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’, দ্বিতীয়টি ‘হার মানা হার’৷ ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ দাঁড়িয়ে‍ আছে বেদেদের জীবন নিয়ে, তাদের মা বিষহরি৷ এ ছবির শিল্পী তালিকায় রয়েছেন ছবি বিশ্বাস, কালী ব্যানার্জি, মঞ্জুলা ব্যানার্জি, সন্ধ্যা রায়. এ ছবির সুরকার রবিশঙ্কর৷ ১৯৫৮ সালের ৮ আগস্ট এই ছবি এল মিনার, বিজলী, ছবিঘর-এ৷

‘হার মানা হার’ মূল উপন্যাসটির নাম ‘মহাশ্বেতা’৷ নায়িকা মীরা ও দেশসেবক বিনয় সেন, এদের প্রণয়ের ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে এ ছবি দাঁড়িয়ে‍ আছে৷ প্রধান দু’টি চরিত্রের শিল্পী সুচিত্রা সেন ও উত্তমকুমার৷ অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করলেন পাহাড়ী সান্যাল, বিকাশ রায়, তরুণকুমার, হারাধন, কণিকা মজুমদার, শমিতা বিশ্বাস, ছায়াদেবী প্রমুখ শিল্পীরা৷ সুধীন দাশগুপ্তের সুরে মান্না দে ও আরতি মুখোপাধ্যায়ের অনেকগুলি গান আছে এ ছবিতে৷ ১৯৭২ সালের ১০ ডিসেম্বর এ ছবি এল মিনার, বিজলী ও ছবিঘর-এ৷ 

অগ্রগামী তারাশঙ্করের দু’টি গল্পের চিত্ররূপ দিয়েছেন৷ প্রথমটি ‘ডাকহরকরা’, দ্বিতীয়টি ‘কান্না’৷ ‘ডাকহরকরা’ ছবির মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন কালী ব্যানার্জি, সাবিত্রী, জহর গাঙ্গুলি, শান্তিদেব ঘোষ, শোভা সেন, গঙ্গাপদ বসু প্রমুখ শিল্পীরা৷ সুধীন দাশগুপ্তর সুরে এবং তারাশঙ্করের কথায় মান্না দে ও গীতা দত্তের গাওয়া গানগুলি সময়কে হার মানিয়েছে অনায়াসে৷ বিশেষ করে মান্না দে‍-র গাওয়া ‘প্রভু তোমার শেষ বিচারের আশায়’ এবং গীতা দত্তের গাওয়া ‘কাঁচের চুড়ির ছটা’ আজও লোকের মুখে মুখে ফিরছে৷ ১৯৫৮ সালের ১১ এপ্রিল উত্তরা, পূরবী ও উজ্জ্বলায় এ ছবি মুক্তি পেল৷

এ ছাড়া তারাশঙ্করের গল্প নিয়ে আর যেসব ছবি আমরা পেয়েছি, তার মধ্যে রয়েছে ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘সন্দীপন পাঠশালা’, ‘চাঁপাডাঙার বউ’, ‘রাইকমল’, ‘বিচারক’, ‘আগুন’, ‘শুকসারী’, ‘রাজাসাবে’, ‘বন্দিনী কমলা’, ‘অগ্রদানী’, দীপার প্রেম’, ‘প্রতিমা’৷ ‘প্রতি‍মা’র প্রথমবার চিত্ররূপ দেন তারাশঙ্করের ভ্রাতুষ্পুত্র পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ দ্বিতীয়বার ওই গল্পের চিত্ররূপ ‘অন্তরমহল’ নাম দিয়ে দর্শকদের উপহার দেন ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ’৷ কিন্তু মূল গল্পটিকে ঋতুপর্ণ যেভাবে ভেঙেছেন, তাতে গল্পের স্বাদ পাওয়া যায়নি ছবির মধ্যে৷ যদিও ‘অন্তরমহল’-এর শিল্পীতালিকা বিরাট (জ্যাকি শ্রফ, সোহা আলি খান, অভিষেক বচ্চন, রাইমা সেন, রূপা গাঙ্গুলি‍)৷ 

আপাতত তারাশঙ্করের গল্পের শেষ চরিত্ররূপ আমরা পেয়েছি ২০১২ সালে, পরিচালক অঞ্জন দাস, ছবির নাম ‘বেদেনী’৷ নামভূমিকায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, বিপরীতে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত! কিন্তু সব মিলিয়েও দুর্বল চিত্রনাট্যের জন্য ছবিটি দর্শকমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি৷ এখন যখন আবার বাংলা ছবিতে সাহিত্যের চিত্ররূপের ঢল নেমেছে, তখন আশা করব তারাশঙ্করের গল্প, উপন্যাসের সার্থক চিত্ররূপ আমরা আবার পাবো৷ সেটাই হবে তারাশঙ্করের প্রতি আমাদের সত্যিকারের সশ্রদ্ধ প্রণাম৷