একজন পেশায় ছিলেন নিতান্তই গৃহ পরিচারিকা। স্বামী প্রান্তিক দিন মজুর। বলতে গেলে, দিন এনে দিন খাওয়া বলতে যা বোঝায়, আর্থ সামাজিক অবস্থানে সেই শ্রেনীর মানুষ গ্রামের মেয়ে কলিতা মাজি ও তাঁর স্বামী। সব অর্থেই জীবনের উজ্জ্বল, আলোকিত দিকগুলি তাদের কাছে ছিল মরীচিকার মত অধরা। নির্বাচনে লড়ার আগে প্রত্যেক প্রার্থীকেও নিজেদের আয়, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির খতিয়ান পেশ করতে হয়।
সেই হিসাবে, গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি কাজ করে কলিতার মাসিক আয় ছিল সাকুল্যে হাজার চারেক টাকা। আর শিক্ষা গত তিনি কিন্তু এখন রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য। পয়লা জুন লোকভবনে তাঁকে রাজ্যপাল। প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথবাক্য পাঠ করান। কলিতা এই মুহুর্তে সারা দেশের কাছেই নারী স্বশক্তিকরণের এক উজ্জ্বল ও দৃষ্টান্ত মূলক প্রতীক। আর বুধবার ১০ জুন তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে আবাসন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব পেলেন। দিন মজুরের ” বউ ” যে কলিতা এতদিন সংসারের মুখ চেয়ে উপার্জনের তাগিদে লোকের বাড়ি বাড়ি বাসন মেজে দিন গুজরান করতেন, এবার তিনি লাখো লাখো গরিব মানুষের মাথার গোঁজার স্বপ্ন সফল করতেন।
অন্যদিকে রাজ্য মন্ত্রিসভায় রয়েছেন স্বপন দাসগুপ্ত। প্রকৃত অর্থেই অভিজাত, উচ্চ শিক্ষিত, মার্জিত তথা বাংলার নব জাগরণের আদি অকৃত্রিম ঘরানার একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাঁর শিক্ষা জীবনের রেখচিত্রটা একবার দেখা যাক। পড়াশোনা সেন্ট পলস ও লা মার্টিনিয়ের স্কুল, সেন্ট ষ্টিফেন কলেজ, দিল্লি স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়! বাংলার অন্যতম নামী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা তাঁর দাদু। স্বপনবাবু নিজে ছিলেন ভারত বিখ্যাত ইংরাজি দৈনিকের সম্পাদক। তিনি হাজারো আর্থিক সংকট বিশেষ করে বেকার সমস্যায় জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব সামলাবেন।

বলা ভাল, বুধবার রাজ্য মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত তালিকা সরকারি ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সেই শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গেই শপথ নিয়েছিলেন, অগ্নিমিত্রা পাল, দিলীপ ঘোষ, ক্ষুদিরাম টুডু এবং অশোক কীর্তনীয়া। তাঁদের দফতর বন্টন হয়ে গেলেও, সমস্ত দায়িত্ব দেওয়া তখনই সম্পূর্ণ করা হয়নি। মন্ত্রী হিসেবে স্বপন দাশগুপ্ত, তাপস রায়, শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বা অন্যান্যরা শপথ নিলেও, দফতর বন্টন নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। অবশেষে বুধবার, প্রকাশ্যে এল, বিজেপি মন্ত্রিসভার তালিকা। পূর্ণমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে মোট ৩৫ জন মন্ত্রীর দফতর বন্টন হয়ে গেল শুভেন্দু মন্ত্রিসভায়। সেই সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেল, বিজেপির কোন কোন মন্ত্রী কোন কোন মন্ত্রক পাচ্ছেন?
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই মন্ত্রিসভা আগেকার মমতা মন্ত্রিসভা গুলির মত গ্ল্যামারের ছটায় ” ঢলোঢলো ” সঙ্গীত – নাটক – নভেল – চলচ্চিত্র পাড়ার সেলেবদের ঠাঁই হয় নি। মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য মুখ হিসাবে রুদ্রনীল ঘোষ বা রূপা গাঙ্গুলী – দের নাম উঠে এলেও, তা বাস্তবে হয় নি। বরং জায়গা করে নিয়েছেন কলিতার মত আটপৌরে মানুষ। আছেন নামী চিকিৎসক ও বিদ্বতজনেরা। আর আছেন অর্জুন সিং বা তাপস রায়ের মত পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদরা।
অর্জুন সিং রাজ্যের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন । অর্জুন সিং এর আগে ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতে বিজেপির সাংসদও হয়েছিলেন অর্জুন সিং। তবে রাজ্যের মন্ত্রী এবার প্রথম। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কেরিয়ার তাঁর। পোড়খাওয়া রাজনীতির লোক তিনি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেসের তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে কার্যত দুরমুশ করে দিয়েছেন তিনি। আগেই মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর অর্জুন সিংকে ‘কেমন লাগছে’ জিজ্ঞেস করায় জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন খুব ভাল লাগছে। দায়িত্ব যেটা আছে পালন করতে হবে।’ তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে কারওর উপর রাগ আছে । তিনি জানান কোনও রাগ নেই । এমনকী যারা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল , তাদের উপরেও রাগ নেই । তিনি সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

অর্জুন সিং আরও বলেছিলেন, ‘এখন কাজ দল, সরকার যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই দায়িত্ব পালন করা। প্রায়োরিটি হিসেবে আমাদের ম্যানিফেস্টোর প্রতিটি অক্ষর পালন করতে হবে। সরকারের উপলব্ধি মানুষের আরও কাছে নিয়ে যেতে হবে।’ সেই অর্থে তিনি কিন্তু গুরুদায়িত্বই পেয়েছেন । তাঁকে সামলাতে হবে পর্যটন দফতর। তাঁর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিশেষ করে খাস কলকাতা ও বৃহত্তর কোলকাতায় নগর জীবনের অন্যতম অঙ্গ সরকারি পরিবহন ব্যবস্থা তলানিতে ঠেকেছে। গত টি এম সি সরকারের আমলেই সরকারি পরিবহন পরিকাঠামোর কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হযেছিল। অথচ একসময় ভোর রাতে কল্লোলিনী কলকাতার ঘুম ভাঙতো প্রথম ট্রামের চলার শব্দে আর ঘন্টির আওয়াজে। আর একদা সুনীল – শক্তি- সন্দীপনের মত যে যুবকেরা রাতের কলকাতাকে শাসন করত , তাদের বাড়ি ফিরিয়ে দিত কিন্ত সরকারি বাসই..! অতীতের সেই সব দিন আজ মনে হয় স্বপ্নচারিতা। ফলে অর্জুনের সামনের পথ মোটেই ফুলের পাপড়ি ছড়ানো নয়।
অন্যদিকে , কলিতার কথায় ,”আমার বিধানসভার জন্য প্রথম কাজ ছিল হাসপাতাল বানানো এবং ফায়ার ব্রিগেড, জল। মানুষের জলের খুব অসুবিধা ছিল.যখন বিধায়ক ছিলাম, তখন এটা ছিল আমার প্রতিশ্রুতি। এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে, চিন্তাভাবনা অনেকটাই বেশি’। চিন্তাভাবনা অনেকটাই বেশি’।

দায়িত্ব পাওয়ার পরের দিনই উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়েছেন রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী। তার আগের দিন সাংবাদিক বৈঠকে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেন স্বপন দাশগুপ্ত। প্রথম দিনে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা ও তা বোঝার চেষ্টা করেছেন রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী। স্বপন দাশগুপ্ত বলছেন, ‘সবার সঙ্গে কথা বলে আগে সমস্যার কথা জানতে হবে। সব জিনিস বোঝার চেষ্টা করছি। শিলিগুড়িতে গিয়ে চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা হবে।’ স্বপন দাশগুপ্ত রাসবিহারী কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন তিনি।
শিল্পমন্ত্রী হলেন তাপস রায়। মানিকতলা কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন তিনি। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী হচ্ছেন ডাক্তার শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। বিধাননগর কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। শিক্ষা, বস্ত্রমন্ত্রী হচ্ছেন দীপক বর্মন। ফালাকাটা কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন তিনি। পরিবহণ অর্জুনের বাড়তি দ্বায়িত্ব শ্রম দপ্তর । কৃষিমন্ত্রী হচ্ছেন দুধকুমার মণ্ডল। ময়ূরেশ্বর কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন তিনি।পর্যটন, পরিষদীয় মন্ত্রী হচ্ছেন শঙ্কর ঘোষ। শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন তিনি।বন, পরিবেশমন্ত্রী হচ্ছেন মনোজ ওঁরাও। কুমারগ্রাম কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন তিনি। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ, জনশিক্ষা ও গ্রন্থাগার পরিষেবার দায়িত্ব যাচ্ছে, গৌরীশঙ্কর ঘোষের কাঁধে। তথ্যপ্রযুক্তির দায়িত্বে থাকছেন, কল্যাণ চক্রবর্তী। সেচের দায়িত্ব পাচ্ছেন, অরূপ কুমার দাস। পূর্ত ও জনস্বাস্থ্য কারিগরির দায়িত্ব পেলেন, অজয় পোদ্দার।
এদিন মন্ত্রীত্ব নেওয়ার পরে শারদ্বত মুখোপাধ্যায় অভয়ার ন্যায়বিচার নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, কারা প্রমাণ লোপাট করেছিল, সেই সমস্তটা প্রকাশ্যে আনবেন তিনি। কথা বললেন রাজ্যের স্বাস্থ্যের উন্নতি নিয়েও। অন্যদিকে এদিন, তাপস রায় কথা বললেন, সিঙ্গুরের শিল্প নিয়েও। রাজ্যের শিল্পমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে রাজ্যে শিল্পের উন্নতির বিষয়টিতেও নজর দেবেন বলে জানিয়েছেন।
ছবি: সৌরভ দত্ত

