চারটে বছর অপেক্ষা করার পরে বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই রাতগুলো যেন কথা কাহিনির মধ্যে দিয়ে ইতিহাসে রূপান্তরিত হয়ে যায়৷ সঙ্গে আবেগ, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও স্বপ্ন সবার হৃদয়ে উঁকি দিয়ে যায়৷ নতুন প্রাণের সঞ্চারে যেন মহাকাব্য লেখা হয়ে যায়৷ বিশ্বকাপ ফুটবল তাই নব জাগরণের ডাক দেয়৷ নজির গড়ার শপথে সার্থকতার কথা বলে৷ আবার কখনও এক শিবিরে আনন্দে-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠা বিশ্বজয়ের কৃতিত্বে, আর অন্য শিবিরে একরাশ হতাশা-কান্না৷
স্বাভাবিকভাবে যখন বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি মাঠে নামেন, তখন তাঁদের প্রিয় দল আর্জেন্টিনার জয় দেখবার জন্য গ্যালারিতে ছুটে আসেন সমর্থকরা৷ তারপরে আবার বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে আর্জেন্টিনার লড়াই স্পেনের সঙ্গে৷ এদিকে তরুণ ব্রিগেডের চ্যালেঞ্জ দেশকে ট্রফি উপহার দেওয়া৷ তাই তো স্পেনের ফুটবলপ্রেমীরা সেই রাতটা জয়ের উৎসবে হারিয়ে যেতে ছুটে এসেছিলেন৷ আর্জেন্টিনা ও স্পেনের ফুটবল সৈনিকরা মাঠের যুদ্ধে হার মানতে রাজি ছিলেন না৷ গত কাতার বিশ্বকাপ জেতার পরে আর্জেন্টিনা আবার সেরা খেতাব তুলে নেওয়ার জন্য রূপরেখা তৈরি করে ফেলেছিল৷ সবাই জানতেন মেসিদের কোনওভাবেই আক্রমণে বড় জায়গা দেবেন না স্পেনের ফুটবলাররা৷ তাই তো খেলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের আক্রমণের গতি যেভাবে আর্জেন্টিনার শিবিরে আছড়ে পড়েছিল, তাতেই বোঝাই গিয়েছিল স্পেনের দাপটে বিশ্বকাপ ফাইনাল অন্য চেহারা নেবে৷

ভাবনা সত্যিই হল৷ আর্জেন্টিনার সেই ছন্দময় খেলা হারিয়ে গেল৷ স্পেনের তরুণ জ্যোতি লামিনে ইয়ামাল থেকে শুরু করে লাপার্তে, গার্সিয়া, পেদ্রো পারো, ওয়ারজাবাল ও পাট কুরাসিয়ারা আর্জেন্টিনার রণকৌশলকে যেভাবে ভেস্তে দিয়েছেন, তা অভাবনীয়! পাশাপাশি মেসিকে কীভাবে নিষ্প্রভ করে দেওয়া যায় সেই অঙ্কটা নির্ভুলভাবে সমাপন করেছেন স্পেনের ফুটবলাররা৷ এটাই স্বাভাবিক ফুটবলের জাদুকর মেসিকে একটু জায়গা দিলেও খেলার চেহারা একেবারে বদলে যাবে৷ সেই পথটা কোনওভাবে উন্মুক্ত রাখেনি স্পেন৷
ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা উল্টোমুখী হয়ে গিয়েছে৷ হয়তো সেই কারণে স্পেনের ফুটবলাররা লাগাম ছাড়েননি৷ আর এটাও বুঝে গিয়েছিলেন মেসি ছাড়া আক্রমণে শান দেওয়ার মতো কোনও ফুটবলার নেই৷ ম্যাক আলিস্টার, আলভারেজ বা রোমেরোরা আস্ফালন দেখাতে পারবে না৷ কোচ লিওনেল স্কালোনির গোপন ছক পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গিয়েছে৷ বরঞ্চ ফুয়েন্তের তুরুপের তাস আর্জেন্টিনাকে লণ্ডভণ্ড করে দিল৷ কে ভেবেছিলেন পরিবর্ত ফুটবলার ফেরান তোরেসের অসাধারণ হেডে স্পেন বাজিমাত করবে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে৷ ষোলো বছর বাদে আবার ফাইনালে উঠে বিশ্বজয়ের ইতিহাস রচনা করবে স্পেন৷ ফুটবলের লক্ষ্য বলতেই গোল৷ সেই শপথে সার্থক রূপ দিয়ে আর্জেন্টিনাকে উড়িয়ে দিয়ে স্পেন জয়ের আলোয় আলোকময় হয়ে উঠল৷ তোরেসের গোলটাই স্পেনের আকাশে লিখে দিল— আমরা বিশ্বজয়ী৷
খেলার নির্দিষ্ট সময়ে কোনও দেশই গোল করতে না পারায় অতিরিক্ত সময়ে তা গড়িয়ে যায়৷ অবশ্য তার আগেই এনজো ফার্নান্দেজ লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়তেই আর্জেন্টিনা শিবিরে বিপদ আরও ঘনীভূত হয়৷ সেদিন যদি এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বুক চিতিয়ে গোল রক্ষা না করতেন, তাহলে স্পেন আরও বেশি গোলের ব্যবধানে জিতলে কোনও কিছু বলার ছিল না৷ প্রায় চল্লিশের কাছে বয়সী লিওনেল মেসিকে কোনও সময়ে জ্বলে উঠতে দেখা যায়নি৷ তবে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্তে মরিয়া হয়ে উঠলেও গোলের দেখা মেলেনি৷

খেলা শেষ হতেই স্পেনের ইয়ামাল ও তোরেসরা আনন্দ জোয়ারে ভেসে গেলেন৷ আর প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা শিবিরে শুধু নিস্তব্ধতা আর হতাশার কান্না৷ ফুটবলের তারকা লিওনেল মেসি একা মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে হয়তো বলছিলেন— পারলাম না৷ স্বপ্নের সূর্যটা মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল৷ তাই বিশ্বকাপ ফুটবল এমন একটা অধ্যায় যেখানে লিপিবদ্ধ হয় হুঙ্কার, আস্ফালন, জয় উচ্ছ্বাসের পাশে হারের লজ্জা, বেদনা আর কান্না৷

