rotho-yatra

রূপকথার রথযাত্রা

ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ….। রাজার ডঙ্কার শব্দটা ভেসে আসছিল দূর থেকে। শব্দটা যত স্পষ্ট হচ্ছিল কৌতূহলটাও তত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। হবে না?রাজদর্শন বলে কথা! অবশেষে হাতলে রুপোর বাঁট লাগানো ঝলমলে কাপড়ে সুসজ্জিত পালকিটা থেকে নেমে এলেন রাজা। সঙ্গে থাকা এক বেহারা মাথায় ধরে দাড়ালো সোনার জরিতে কাজ করা ছাতা। অনুচরেরা জলের ঝারি থেকে ছিটিয়ে দিল সুগন্ধি জল। সিল্কের জামা পরা নাগরা জুতো পায়ে দীর্ঘদেহী সুদর্শন মানুষটি পালকি থেকে নেমে দাঁড়ালেন। ইনিই তাহলে রাজা! তবে রূপকথার গল্পে পড়া রাজার ছবিটা ছেলেবেলায় কল্পনায় যেমন আঁকা থাকে, এ রাজা তো তেমন নয়। এ রাজা কেমন যেন সাধারন মানুষের মতো দেখতে। তবু এঁকেই স্থানীয় মানুষ রাজা বলে জানে। সারা বছর ইনি বোধহয় তাঁর প্রাসাদেই থাকেন। শুধু রথের সময় এলে তিনি প্রাসাদ ছেড়ে এসে দাঁড়ান পথে। যে পথ দিয়ে এগিয়ে যায় মানুষের টানা রথ। অবোধবেলায় এভাবেই রাজ দর্শনের সৌভাগ্য হয়েছিল।

এই রাজার বাস পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলে। প্রতি বছর সেখানে রথযাত্রা হয়। প্রসিদ্ধির দিক থেকে পুরী এবং মাহেশের পর এই মহিষাদলের রথযাত্রা উৎসবের স্থান। সেই উৎসবের হোতা মহিষাদলের রাজপরিবার। সরকারি নিয়মে রাজতন্ত্র বা জমিদারি প্রথা লোপ পেয়েছে বহুদিন। কিন্তু আজও মহিষাদল রাজ পরিবারের বংশধররা স্থানীয় মানুষের কাছে রাজা হিসেবেই খ্যাত। এদের কাছে হয়তো, ‘দিন আসে, দিন যায়’, রাজা বদলায় না। বদলায় না মনের মধ্যে থাকা রাজার মিথ। তাই আজও রথযাত্রার দিন রাজা এসে স্পর্শ করলে তবেই রথের কাছিতে পড়ে প্রথম টান। মহিষাদলের রথযাত্রায় আরাধ্য দেবতার মাহাত্ম্যের সঙ্গে রাজপরিবারের ঐতিহ্য এভাবেই মিলেমিশে গিয়েছে।

ratha-yatra

শোনা যায় ষোড়শ শতাব্দীতে উত্তরপ্রদেশ থেকে জনার্দন উপাধ্যায় ( গর্গ ) নামে এক ব্যক্তি এসেছিলেন বাংলায় ব্যবসার জন্য। তিনি বিস্তর জমি কিনেছিলেন এই মহিষাদলে। সেযুগেই এই জমির ক্রয়মূল্য ছিল ৭ লক্ষ টাকা। সেই গর্গ পরিবারের পরবর্তী বংশধর রাজা আনন্দলাল গর্গের মৃত্যু হলে রাজত্ব চালান তার ধর্মপ্রাণা পত্নী রানি জানকী। এই রানীর সময় প্রথম রথযাত্রার সূচনা হয় মহিষাদলে। অবশ্য এর দু’বছর আগে ১৭৭৪ সালে, একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। একদিন রানি জানকী স্বপ্নে দেখেন, মদনমোহন গোপাল জিউ তাঁকে বলছেন, ‘আমি এক ধীবরের বাড়িতে বন্দি হয়ে আছি, আমাকে তোর রাজ্যে প্রতিষ্ঠা কর।’ খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গেওখালী নদীতে ভেসে এসেছিল চোখ নাক আঁকা এক অদ্ভুত ধরনের কাঠ। এক জেলে সেই কাঠটিকে নিয়ে রাজচকে, তার বাড়ির চালে রেখে দিয়েছিল। রানির স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনে জেলে সেই কাঠ রানিকে দিয়ে দেয়। সেই কাঠ দিয়ে মহিষাদলের রাজবাড়িতে মদনমোহন গোপাল জিউ-এর মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়। সেই সঙ্গে রানি জানকী তাঁর গোটা রাজ্যসম্পত্তি গোপাল জিউ -এর নামে উৎসর্গ করে, দেবত্র করে দেন। বিরাট পরীখা বা গড়খাই দিয়ে ঘেরা গর্গের রাজত্ব বর্তমানে হলদিয়া উন্নয়ন পরিষদের একটি পর্যটন কেন্দ্রের মর্যাদা পেয়েছে।

মহিষাদলের রাজাদের দুটো প্রাসাদের প্রথমটি নির্মাণ হয়েছিল ১৮৪০ সালে। গোপাল জিউ -এর মন্দিরটি রয়েছে এই পুরনো প্রাসাদের কাছেই। আর নতুন প্রাসাদটি ১৯৩৭ সালে তৈরি হয়। সেখানে রাজপরিবারের লোকেরা আজও বাস করেন। সাধারণ মানুষের কাছে মিথকে সত্যি করে আজও রাজারা থাকেন মহিষাদলে। ১৭৭৬ সালে রানি জানকীর সময় যখন প্রথম রথযাত্রার সূচনা হয় তখন রথটি ছিল সতেরো চুড়া বিশিষ্ট। রথটি তৈরি করতে খরচ পড়েছিল ৭০০০ সিককা। বহু পরে ১৮৬১ সালে লছমন প্রসাদ গর্গের সময় রথের চূড়ার সংখ্যা কমিয়ে তেরো করা হয়। লছমন প্রসাদের ফরাসি বন্ধু মসিয়ে পেরু মহিষাদলের রথটিকে কৌণিক দারুভাস্কর্য দিয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত করেন। তিনি ফ্রান্সের মৃত্যুলতা (চেইন অফ ডেথ) ভাস্কর্যের অনুকরণে রথের চূড়াগুলির কারুকাজ করে দেন। আজও মহিষাদলের রথের চূড়ার ভাস্কর্যের এই নমুনা রাখা রয়েছে লন্ডনের অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে। লছমন প্রসাদই রথের বারান্দায় চারটে কাঠের সাধুমূর্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই মূর্তিগুলি আজও রথে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রহরীর মতো। ১৯১২ সালে সতী প্রসাদ গর্গ রথের সঙ্গে দুটো কাঠের ঘোড়ার সংযোজন করেন। এভাবেই কালের যাত্রায় রথের নানান সংস্কার হয়েছে।

বর্তমানে ৪০ ফুট উচ্চতার মহিষাদল রথের চাকার সংখ্যা ৩৪। প্রতিটি চাকার উচ্চতা ৪ ফুট, পরিধি ১২ ফুট। প্রতিটি চাকায় রয়েছে একশ কেজি লোহার তৈরি বেড়। বিরাট আকৃতির ঐতিহ্যময় রাত্রি সারাবছর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে মহিষাদলের রথতলায়। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে। তবে রথের আগে থেকে এর সাজগোজ শুরু হয়। বিশেষ করে রথযাত্রার আগের দিন বিকেলে লেতেচ্ছোব উৎসব হয় পুজোর আগমনীর মতো। এদিন রথের তেরোটি চুড়োয় বসানো হয় ঝকঝকে পিতলের কলস। সূক্ষ্ম কাজ করা বড় বড় চাকা, লাল পতাকায় সাজানো হয় সবকটি চুড়ো। রথের সামনে থাকা ঝাড়পোছ করা কাঠের ঘোড়া দু’টি তখন যেন রূপকথার পক্ষীরাজ। লেতেচ্ছোবের দিন রথের চারটি কাছিতে সিঁদুর লাগিয়ে চাকার সঙ্গে জুড়ে মাটিতে ফেলে রাখা হয়। সেই দড়ি দেখে মনে পড়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের ‘’রথের রশি’র কথাগুলো। ‘…এ যেন যুগযুগান্তরের দড়ি, দেশ দেশান্তরের হাত পড়েছে ওই দড়িতে।…’

ওই দড়িতে টান দিতেই তো রথের দিন অগণিত মানুষ সার দিয়ে দাঁড়ান জাতি ধর্ম নির্বিশেষে। পান্ডাতন্ত্রের আধিপত্য কিংবা পুরোহিততন্ত্রের অনুশাসন ছাড়াই মহিষাদলের রথ এগিয়ে চলে মাটির কোল ঘেঁষে, মাটির মানুষের দেওয়া কাছির টানে। সেই কাছিতে লেগে মহিষাদলের রাজারও হাতের স্পর্শ। রবীন্দ্রনাথের ‘রথের রশী’ গদ্য নাটকের যেন সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে মহিষাদলের রথযাত্রা উৎসবে।

mahishadoler rath mela

প্রথা অনুযায়ী পুরীতে রথ টানার সংবাদ পৌঁছানোর খবরটা আসার পর মহিষাদলের রথের কাছিতে পড়ে টান। রথের ওপরে কাঠের বারান্দায় গর্জে ওঠে বারুদের শব্দ। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি ওঠে… হরি হরি বল। সঙ্গে সঙ্গে কাতারে কাতারে মানুষ প্রতিধ্বনি করে ওঠেন… হরি হরি বল। রথের রশীতে পড়ে টান। বিশাল রথটা এগিয়ে চলে। এগিয়ে চলেন রথের তিনটি তলে আরূঢ় তিন আরাধ্য দেবতা। রথে চড়ে তাঁরা এগিয়ে চলেন প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তাঁদের মাসির বাড়ি, গুন্ডিচাবাটির গন্তব্যে।
আর সেই রথের রশীটিকে ছোঁয়ার জন্য কত মানুষ দাঁড়িয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। রোদ জলকে উপেক্ষা করে। মানুষের হাতে দেবতা গতি পান। যে দেবতা সব মানুষের জীবনের অমোঘ গতির নিয়ন্তা। দেবতা মানুষে এ এক আশ্চর্য গতিময় পারস্পরিকতা।

বোধহয় সেই কারণেই রথের দিনে ওই রশীটিকে ছোঁয়ার জন্য মানুষের এতো আকুতি । অজস্র মানুষের পায়ের চাপে পিষ্ট হওয়ার, জনতার ভিড়ে শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার ভয়টাকে জয় করে
কাদামাখা দড়িটিকে স্পর্শ করার জন্য এত আকুলতা। যেন এই রথের রশীটিকে ছোঁয়া মানেই বিরাট এক মানববন্ধনের শরিক হওয়া। কারণ কবিই যে বলে গিয়েছেন ‘…রথের দড়ি থাকে মানুষে মানুষে বাঁধা, দেহে দেহে প্রাণে প্রাণে…’। রথযাত্রার দিনেই যেন সেই প্রাণের গ্রন্থিটিকে স্পর্শ করা যায়। এই গোটা বিশ্ব যে গ্রন্থির বন্ধনে আবদ্ধ।

রথযাত্রার অনুষঙ্গ হিসেবে হাত ধরাধরি করে আসে রথের মেলা। সেখানে বহু মানুষের মেলবার আয়োজন। বিকিকিনির অছিলায়। মেলা ছাড়া ওইসব সওদা অন্যত্রও করা যায়। কিন্তু ওই মেলায় কেনাকাটির যেন আলাদা অনুভূতি, আনন্দ। মহিষাদলের রথের মেলা চলে তিন সপ্তাহ ধরে। সোজা রথের সাতদিন পরে উল্টো রথের দিন আবার জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ফেরেন মাসির বাড়ি (গুন্ডিচাবাটী) থেকে। এই সাত দিনের পরে আরো ১৫ দিন ধরে পূর্ণিমা রথের তিথি। ছেলেবেলায় দেখেছি রথের মেলার সময় বদলে যেত এখানকার বাসিন্দাদের রোজকার জীবনযাত্রা। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে যেন তখন অন্নপূর্ণার ভান্ডার উপুড় হয়েছে। মেলা উপলক্ষে ছোটদের হাতে জুটতো হাতখরচ। গ্রাম্যবধূদের হাতে পড়ে পাওয়া চোদ্দআনা। মিতব্যয়ী গৃহকর্তারা একটু হলেও দরাজহস্ত।

রথযাত্রার কয়েকদিন আগে থেকেই দূর দূরান্ত থেকে লরিতে করে আসতে থাকত আম-কাঁঠাল। একসময় হিজরী খাল বেয়ে নৌকোয় করে আসত কাঁঠাল। সে খাল বুঁজে গেলে পণ্য আসে লরি করে। মহিষাদলের রথের মেলা থেকেই পাইকারি ক্রেতাদের হাত ধরে কাঁঠাল চালানো হয় বিভিন্ন অঞ্চলে। স্পেশাল কাঁঠালের জিলিপি ভাজা হয় এই মরসুমে। তার গন্ধে মম করতে থাকে চারিদিক। মহিষাদল রথের মেলা তাই একরকম কাঁঠালেরও মেলা। এতো কাঁঠাল একসঙ্গে অন্য কোনও মেলায় আসে কিনা সন্দেহ।

রথ উপলক্ষে মহিষাদলের আশেপাশের গ্রাম থেকে বহু মানুষ এসে একত্র হয় মেলায়। তাদের জন্য থাকে ছোট-বড় হরেক কুটির শিল্পের পসরা। সূক্ষ্ম কারুকাজের মাদুরের স্টলে উপচে পড়ে ভিড়। সেই অসম্ভব ভিড়ের মধ্যে বড়দের হাত ধরে ঘুরতে ঘুরতে কানে আসত মাইকের ঘোষণা। …অমুক জায়গা থেকে এসেছেন অমুক চন্দ্র, আপনি যেখানেই থাকুন আমাদের মেলার অনুসন্ধান অফিসে চলে আসুন।এখানে আপনার জন্য বাড়ির লোক অপেক্ষা করছে…। শুনতে শুনতে বড় লোভ হত বড়দের হাত ছাড়িয়ে মেলায় হারিয়ে যেতে। তাহলে তো মাইকের ঘোষণায় নিজের নামটা শুনতে পাওয়া যাবে। সেই হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ অবশ্য ঘটেনি কোনদিন। তবে রথের মেলায় প্রত্যেকবার তালপাতার ভেঁপু কেনার সুযোগটা হাতছাড়া করিনি কখনও। প্রত্যেকবারই সেই ভেঁপুর স্বর এক পর্দা করে বেড়েছে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে। তাছাড়া রথের মেলায় কত রকমের রঙিন রঙিন পুতুল আসত। কোনওটা মাটির, কোনওটা কাপড়ের, কোনওটা কাঠের, কোনওটা আবার ঝিনুকের। সেসব দেখে মনে পড়ত রবিঠাকুরের কবিতার লাইন ক’টা। ‘… মাগো তুমি পাঁচ পয়সা সেবার রথের দিনে/সেই যে রঙিন পুতুলখানি আপনি দিলে কিনে…।’ কিন্তু পড়া বলতে না পারা শাস্তি হিসেবে গুরুমশাই পুতুলগুলো যে কেমন নির্দয় ভেঙে দিয়েছিলেন, কবিতার সেই লাইনটা মনে পড়ায় আর পুতুল কেনার লোভটাকে সম্বরণ করে রাখতেই হত।

রথ উপলক্ষে সারা মেলাটা হয়ে উঠত সব পেয়েছির আসর। কোথাও কাচের বাক্সে রংবেরঙের পাথরের গয়না। গান গেয়ে বেলোয়াড়ি কাচের চুড়ি বিক্রি করছে কেউ।কোথাও আবার প্লাস্টিকের খেলনা, নানারকম পশুপাখি। চিনেমাটির শোপিস থেকে ডোকরার শিল্পসামগ্রী | লোহার হাতা বেড়ি খুন্তির গৃহস্থালিতে দর কষাকষির সংলাপ। নানা রকমের আচার। আর সেইসব আচারের শিশির দিকে লোভাতুর চাহনি। আজকের শহুরে ফেয়ার বা মেলার সঙ্গে সেদিনের রথের মেলার কোনো তুলনাই চলে না।

আজও এই ধরনের মেঠো মেলায় গেলে চোখ আটকে যাবে মেলায় আসা কোন শিশুর হাতে ধরা ফতেঙ্গার ঘুরন চাকায়। তালপাতার ভেপুর শব্দে কানে এসে বাজবে হারানো শৈশবের কলতান। মেলার মধ্যে চূড় হয়ে থাকা গরম জিলিপি, তেলে ভাজা নিমকি, পাপড় ভাজার গন্ধে ফিরে আসবে কৈশোর স্মৃতির গন্ধ। মেলায় কেনা শীতলপাটি বিছিয়ে দিলে মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে কারো সঙ্গে গল্প করার হারানো দিনগুলো মনে পড়ে যাবে। ডাঁই করে রাখা কাঠিগজা, ফুট কড়াই, মঠের দিকে হাত বাড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য হেলথ কনসাসনেসের নিয়মকে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করবে। মেলাতে এরকমই টুকরো টুকরো স্মৃতি রূপে,রসে,গন্ধে, স্পর্শে আমাদের নস্টালজিক করে তুলবে আজও।

তবে মনে আছে শুধু এসবই নয়, মহিষাদলের রথের মেলায় একসময় থাকত অ্যাডভেঞ্চারেরও আয়োজন। আজও মনে পড়ে, বিরাট একটা মরণ কুঁয়ার (মাটির গভীর গর্ত) মধ্যে সাইকেল নিয়ে ঘুরতো এক আরোহী। কুয়োর মধ্যে তার ঘোরার বৃত্তটা যত গভীরে যেত, ততই হাড় হিম হয়ে যেত। একই বৃত্তপথে উল্টো ঘুরে সে মরণকুঁয়ার বাইরে আসা পর্যন্ত দম বন্ধ করে থাকতে হত। রথের মেলায় মরণকুঁয়ার সেই সেন্ট্রিপেটাল আর সেন্ট্রিফুগাল ফোর্সের খেলাটা আজ ব্যানড। কিন্তু বৃহত্তর জীবনে সেই দুই ফোর্স-এর খেলা চলছেই। কাছে ছিলে দূরে গেলে, দূর হতে এসো কাছে। জীবন ঘুরে চলে আঙুলে জড়ানো সুতোয় বাঁধা ঢিল হয়ে বৃত্তাকার কক্ষপথে। সেন্ট্রিপেটাল আর সেন্ট্রিফুগাল ফোর্স-এর টানে। এই বিরাট সত্যিটাকে অনুভব করতে ছেলেবেলার সেই রথের মেলার কথা মনে পড়ে যায়।

আর একটা খুব নিষ্ঠুর বাস্তবের মুখোমুখি হতে হত রথের মেলায়। সেই মেলায় আসত গঙ্গা-যমুনা নামে একটা প্রদর্শনী। সেখানে খুব ভিড় হত। তা ছিল গঙ্গা ও যমুনা নামে দুই শিশু কন্যার একসঙ্গে একটি জোড়া শরীর| যাদের উর্ধাঙ্গ দুটো আলাদা হলেও কোমরের নিচ থেকে একটাই শরীর ছিল| মেলায় গঙ্গা যমুনাকে দেখতে পয়সা দিতে হত তাদের সামনে রাখা অ্যালুমিনিয়াম থালায়। তা দেখে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠত গঙ্গা -যমুনার সামনে বসে থাকা লোকটির মুখ। হয়তো সে তাদের বাবা কিংবা অন্য কেউ। কিন্তু অত মানুষের কাছ থেকে দান পেয়েও গঙ্গা- যমুনার মুখে কোনও আনন্দই থাকত না। তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দিয়ে অন্যের উপার্জন হত। তখন ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড বলার চল ছিল না। মানবিকতার যুক্তিতে এই খেলা অবশ্য বহু দিন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজও রথের মেলার সেই নিষ্ঠুর দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসে।

মহিষাদলের রথের মেলা এরকম অনেক আনন্দ উৎকণ্ঠা বেদনার চিত্রকলা হয়ে আজও ধরা রয়েছে আমার স্মৃতির অ্যালবামে।
মেলার আরেকটা আকর্ষণ ছিল কাঠের নাগরদোলা। আকাশ আর মাটির সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার প্রথম মজার স্বাদ মিলেছিল এই রথের মেলায় নাগরদোলায় চেপে। এই এক পাকে একেবারে উঁচুতে উঠে আকাশটাকে দেখার সুযোগ আবার ঠিক পরে পাকেই একেবারে মাটির কাছাকাছি। জীবনের উত্থান আর পতনকে চিনতে শেখার প্রথম শুরুয়াত হয়তো বা নিজের অজান্তে হয়ে যায় মেলার এই নাগরদোলাতে|

তারপর জীবন গড়িয়ে গিয়েছে কত চড়াই উৎরাই ভেঙে ভেঙে। হারিয়ে গিয়েছে সেই আম কাঁঠালের সুঘ্রাণ। মেলাকে ঘিরে কৈশোরের সেই মুগ্ধ বিস্ময় ফিকে হয়ে গিয়েছে। মেলা থেকে উপহার কিনে দেওয়া মানুষগুলোর মুখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। তবু রথের দিন হলে স্মৃতির ঘুরণচাকায়
আজও পাক খায় নাগরদোলাটা। এক লহমায় চোখের সামনে চলে আসে মেলার সেই কোলাহল, সাড়ে বত্রিশ ভাজার পায়ের ঘুঙুরের আওয়াজ, রাজার ডঙ্কার শব্দ।

যদিও আজকাল সব গ্রামীণ মেলার চেহারাটাই প্রায় একই রকম। কিন্তু মহিষাদলের রথের মেলার নেপথ্যে রয়েছে এক রাজপরিবারের অবদান। কালের যাত্রায় তাদের রাজত্ব নেই | তবু এই রথযাত্রার উৎসবের মধ্যে রাজার অস্তিত্ব রয়ে গিয়েছে মন জুড়ে, রথের রশীর সঙ্গে জড়িয়ে। মহিষাদলের রথযাত্রা আজও আমার কাছে এক রূপকথার রথযাত্রা। যেখানে দিন আসে, দিন যায়, রাজা বদলায় না।