রথ এগিয়ে চলার প্রতীক। আসিরিয়ার শিল্পকলা রিলিফে খোদিত ভাস্কর্যে সম্রাটের সিংহ শিকারের দৃশ্যতে চাকা সমেত এক ধরনের রথযানের চিত্র পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে মিশরীয় সৈন্য দলে ঘোড়ায় টানা দুই চাকার রথী বাহিনী ছিল। রোমে বিজয় উৎসবে সাদা ঘোড়ায় টানা রথে সেনাপতি নগরে বের হতেন। ভারতে সম্রাট অশোক রথে চেপে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। পঞ্চম শতাব্দীতে চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন পাটলিপুত্রে সেই রথ দেখেন।

পুরাণ অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় রথে চলেছেন, সেই দৃশ্য বহু শিল্প ভাস্কর্যে স্থান পেয়েছে। টেরাকোটার চিত্রে রথে চেপে কৃষ্ণ মথুরা গমন করছেন। তখন রাধা ও গোপিকারা বিরহে কেঁদেছিলেন। বিভিন্ন মন্দির স্থাপত্যের গায়ে সেই চিত্র পাওয়া যায়। কৃষ্ণ ও বলরামকে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অক্রুরের রথে। পুরাণের সেই চিত্রটিও কুলুঙ্গির মধ্যে পাওয়া যায়। রথে চড়ে রাম রাবণের যুদ্ধ বা সীতা হরণ দেওয়াল চিত্রে বিখ্যাত।

নীলাচলে রত্ন সিংহাসন থেকে প্রভু জগন্নাথ ‘নন্দীঘোষ’, বলভদ্রর ‘তালধ্বজ’, দেবী সুভদ্রা ‘দর্পদলন’ রথে চেপে মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দির যান। জগন্নাথের সারথি দারুক। বলভদ্রর সারথি মাতালি।
শ্রীচৈতন্যদেব বলতেন, পুরীর জগন্নাথদেব আসলে ‘ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণ’। তার দুপাশ থেকে উড়ে আসে ফুলের পাপড়ি। চান্দুয়া পাখা দিয়ে দেবতাকে হাওয়া করা হয়। আগে দেবদাসীরা ‘মহারি নৃত্য’ জগন্নাথের সামনে পরিবেশন করতেন তাকে প্রসন্ন করতে। মহারি নৃত্য থেকে ওডিসি ধারাটি এসেছে।

ঐতিহাসিক হান্টার সাহেব ‘স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গল’ গ্রন্থে ষোড়শ শতাব্দীর হুগলি মাহেশের কথা বলেন। বিদেশি শিল্পী বালথাজার সলভিন্স মাহেশের পাঁচটি রত্ন বিশিষ্ট রথ এঁকেছিলে। সেই রথটি দান করেন কৃষ্ণরাম বসু। বর্তমানে সাহেবদের ‘মার্টিন বার্ন’ কোম্পানির রথ মাহেশে টানা হয়। কথায় বলে, ‘জগন্নাথ শ্রীক্ষেত্র থেকে গঙ্গাস্নান করতে মাহেশে এসে বিশ্রাম নেন’।

বাংলায় একই রথ প্রতি বছর ব্যবহার হয়। শ্রীচৈতন্যদেব অচিন্ত্যভেদাভেদ ধারায় বাংলার রথযাত্রা ও ভক্তদেরকে একত্র করেছিলেন। বাংলায় রথের সঙ্গে ঘোড়া, সারথি, সৈন্য, দেব-দেবী, বৈষ্ণব বৈষ্ণবী, বাদক বাদিকার কাঠের মূর্তি থাকে। কাঠের রথে কোণায় উপর থেকে নিচ অবধি নেমে আসে সৈন্য সামন্ত, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ শিকারের দৃশ্য। এমন আশ্চর্য নিদর্শন একমাত্র বাংলার রথেই পাওয়া যায়। যাকে মৃত্যুলতা বা বর্শা বলে।

মুর্শিদাবাদে নাটোর রাজাদের সতেরো চূড়া রথ হত। বিষ্ণুপুরে মল্ল রাজাদের পাথরের রথ এক অনন্য সৃষ্টি। বাংলার বহু মন্দির স্থাপত্যের গায়ে টেরাকোটায় জগন্নাথের চিত্র পাওয়া যায়।
গুপ্তিপাড়ার রথ নয় চূড়া। সেখানে রথের একটি দড়ি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। ‘চার চক, চৌদ্দ পাড়া, তিনঘাট এই নিয়ে রাজবলহাট।’ সেখানকার রথে থাকেন রাধাকৃষ্ণ। মহিষাদলের রথেও জগন্নাথদেবের পাশাপাশি কুলদেবতাকে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্ধমান রাজবাড়ির কাঠের তৈরি রাজা ও রানীর রথেও থাকেন গোপাল ও লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ। মেহতাব চাঁদ এই রথযাত্রার সূচনা করেন। শোনা যায় রানির রথটি এক সময় ছিল রুপোর। রানিরা সেই রথ টানতেন। আষাঢ়ের মেঘলা আকাশ, কাঁসর ঘণ্টার শব্দ, আর চোখের সামনে প্রভুর চলমান রথের রূপ – মন যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে যায়। যা মিলন উৎসব।
তথ্যসূত্র :
১) স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গল
২) সুধীর কুমার মিত্র
৩) তারাপদ সাঁতরা

