song of rain

বর্ষার গান ও বর্ষামঙ্গল

রবীন্দ্রনাথ ঋতুর ভিন্নতার সঙ্গে তুলনা করেছেন সামাজিক বর্ণ ভেদের । তাঁর মতে গ্রীষ্মকে বলা যেতে পারে ব্রাহ্মণ । “ সমস্ত রসবাহুল্য দমন করিয়া, জঞ্জাল মারিয়া তপস্যার আগুন জ্বালিয়া সে নিবৃত্তিমার্গের মন্ত্রসাধন করে’ | শীতকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘বৈশ্য’ হিসেবে । অতি কেজো, হিসেবি এক ঋতু হিসেবে দেখেছেন তাকে তিনি । “ তাহার পাকা ধান কাটাই –মাড়াইয়ের আয়োজনে চারিটি প্রহর ব্যস্ত, কলাই যব ছোলার প্রচুর আশ্বাসে ধরণীর ডালা পরিপূর্ণ “ ! ‘শূদ্র’ বর্ণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যুক্ত করেছেন শরৎ এবং বসন্ত – এই দুই ঋতুকে । লিখেছেন, “একজন শীতের, আর-একজন গ্রীষ্মের তলপি বহিয়া আনে” । ব্যতিক্রমী তাঁর কাছে বর্ষা ঋতু । ‘বর্ষা’কে ক্ষত্রিয় বলিলে দোষ হয় না । “গুরু গুরু শব্দে মেঘের দামামা বাজে – যার শেষ অল্পে নয় – দিগবিজয় করাই যেন তার কাজ। লড়াই করিয়া সমস্ত আকাশটা দখল করিয়া সে দিক্চক্রবর্তী হইয়া বসে” । এ ছাড়াও বর্ষা ঋতুর প্রভাব অপার। মরু বিজয়ের কেতন তো সেই-ই বহন করে আনে তার প্রাণ ভরণের , তৃষা হরণের মধ্য দিয়ে । কেজো জীবনের বাইরে এসে, “ সংসারব্যবস্থার” সঙ্গে কোনরকমভাবে না জড়িয়ে আসলে সে যে কখন রামগিরি বা শিলং পর্বতে বা চেরাপুঞ্জির ডাকবাংলায় এমন মেঘদূত জমিয়ে তুলবে সবার অলক্ষ্যে – তা বোঝা মুশকিল । রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধিতে বর্ষার এই প্রচ্ছন্ন রূপ আসলে হৃদয়ের বাধা ব্যবধান ভুলিয়ে দেয় এবং পারতপক্ষে “ সে সময়টা বিরহি-বিরহিণীর পক্ষে বড়ো সহজ সময় নয়” !
বর্ষার পাকচক্র থেকে নিস্তার পাননি তিনি নিজেও।

মহর্ষির সঙ্গে বোটে যাত্রাকালে একদিন হাতে এসে পড়েছিল জয়দেবের পুরনো এক গীতগোবিন্দ। সংস্কৃত ভাষা অন্তরায় হলেও মনের মধ্যে কোথাও প্রবেশ করেছিল তার ছন্দ আর মাত্রা । পরবর্তীকালে বিদ্যাপতির মৈথিলী মিশ্রিত ব্রজবুলি ভাষায় লিখেছিলেন “ গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে” – যার মধ্য দিয়ে উৎসারিত হয়েছিল সদ্য কৈশোর প্রাপ্ত এক কিশোরের বর্ষা ঋতুতে লেখা প্রথম গান । আর প্রথম বর্ষার গান , সেও ঐ ব্রজবুলি ভাষা আশ্রিত – “শাওনগগনে ঘোর ঘনঘটা”, প্রকাশিত হয় তার অব্যবহিত পরেই , ১৮৭৮ সালে। আর সেই সূত্র ধরেই “ভানুসিংহ” আত্মপ্রকাশ করেন।

” ভারতবর্ষের প্রত্যেক ঋতুরই একটা –না-একটা উৎসব আছে । কিন্তু কোন ঋতু যে নিতান্ত বিনা –কারণে তাহার হৃদয় অধিকার করিয়াছে তাহা যদি দেখিতে চাও তবে সংগীতের মধ্যে সন্ধান করো । কেননা সংগীতেই হৃদয়ের কথাটা ফাঁস হইয়া পড়ে ‘। আর ঠিক এই ভাবেই রবীন্দ্রনাথ নিজেও মেতেছিলেন ঋতুবৈচিত্রের ভাব অনুসন্ধানে ও প্রকাশে। সঙ্গীতশাস্ত্রের হিসেবে সব ঋতুর জন্যই কিছু রাগ রাগিণী বরাদ্দ থাকে – কিন্তু বর্ষার ক্ষেত্রে তার সংখ্যা কিঞ্চিৎ অধিক – “ সঙ্গীতের পাড়ায় ভোট লইলে বর্ষারই হয় জিত” । তাঁর সারাজীবনের ২৮৩ খানা ঋতুভিত্তিক গানের মধ্যে ১১৫ টিই বর্ষার গান । এও কি তবে সেই সংখ্যাধিক্যের প্রতিফলন ?

আসা যাক, বর্ষামঙ্গল প্রসঙ্গে । তিনি উল্লেখ করেছিলেন প্রত্যেক ঋতুরই একটা –না-একটা উৎসব আছে । বর্ষামঙ্গল হ’ল সেই উৎসব – যা বর্ষা বরণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির প্রতি এক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন । শান্তিনিকেতনে প্রথম ঋতু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০৭ সালের শ্রীপঞ্চমীতে কবির কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সমবয়সী আরও কয়েকজন ছাত্রের “বসন্ত উৎসব” নামে বসন্ত উদযাপনের সূত্রে । তার দশ মাসের মধ্যেই শমীর মৃত্যুতে সবকিছু বদলে যায় হঠাৎ। পরের বছর ১৯০৮ সালের বর্ষাকালে ( জুলাই মাসে ) বর্ষা উৎসব হয় ক্ষিতিমোহন সেন এবং বিধুশেখর ভট্টাচার্য এর প্রযোজনায় । তাঁরা বৈদিক উক্তি চয়ন করে দেন এবং ছাত্ররা তাই আবৃত্তি করে । এভাবেই আদিতে আশ্রমে পালিত হতো বর্ষা উৎসব । এর পরে, সেই একই বছরে হয় শারদোৎসব। শান্তিনিকেতনে যে-কোনও উৎসব অনুষ্ঠানের অন্যতম অঙ্গ হল গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটক। এ যেন, সেই উৎসবের অর্চনা। বর্ষার আমেজে শান্তিনিকেতনে যে-যে উৎসব হয়ে থাকে, তার অন্যতম বৃক্ষরোপণ উৎসব; প্রতি বছর ২২ শ্রাবণ, গুরুদেবের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে। পরেরদিন সকালে, শ্রীনিকেতনে আয়োজিত হয়, হলকর্ষণ উৎসব। ১৫ অগাস্টের দিন সকালে, পতাকা উত্তোলনের পর, সন্ধ্যায় স্বদেশি গানের অনুষ্ঠান হয়। পরেরদিন, ১৬ অগাস্ট প্রতি বছর সন্ধ্যায়, আয়োজিত হয় বর্ষা ঋতুর উদ্‌যাপন, বর্ষামঙ্গল।

rabindranat thakur

১৯৩৯ সালের বর্ষামঙ্গল উৎসব ছিল খানিক আলাদা । যার বর্ণনা পাওয়া যায় শৈলজারঞ্জন মজুমদারের লেখায়, যিনি সে সময়ে রসায়নের শিক্ষক শান্তিনিকেতন আশ্রমে। সমান্তরালে কবির গানের গায়ন , স্বরলিপি করণ এবং তার শুদ্ধ ভাব ও অবিকৃত উচ্চারণে প্রচারের কাজে যুক্ত ছিলেন শৈলজারঞ্জন । অগাস্টের শুরু থেকে চলেছে বর্ষামঙ্গলের মহড়া। ইংরেজি মতে সেবার ২৭ শে অগাস্ট বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠান ( তখনও নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠানের রীতি প্রবর্তিত হয়নি )। শৈলজাবাবুর বুদ্ধিমত্তা হল- কেমন করে তিনি গুরুদেবকে উত্তেজিত করে একের পর এক গান লিখিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিকথা “ যাত্রাপথের আনন্দগান” এ বিবৃত করেছিলেন তার ইতিহাস। ছ’টি মাত্র গান- তাও পুরোনো; তাই নিয়ে বর্ষামঙ্গলের প্রস্তুতি চলছিল শৈলজারঞ্জনের পরিচালনায়। শৈলজাবাবু লেখেন- “আমি উত্তরায়ণে গানের দল নিয়ে গিয়ে ছ’টি পুরনো গানের মহড়া গুরুদেবকে শোনালাম।… খেতে যাবার ঘণ্টা পড়ল, ছেলেমেয়েরা খেতে চলে গেল। এই সুযোগে আমি গুরুদেবকে বললাম যে, ছেলেমেয়েরা বলছে নতুন গান চাই, পুরনো গানে আর ওরা বর্ষামঙ্গল করবে না “ । প্রথমে কবি খানিক গররাজি হলেও পরের দিন শৈলজারঞ্জনের হাতে দিলেন এই তালিকার প্রথম গান ‘ ওগো সাঁওতালি ছেলে ‘ l দ্বিতীয় দিনের গান ‘ বাদল -দিনের প্রথম কদম ফুল ‘ । এবার তাঁর মাথায় এল , কবি তো বেহাগসিদ্ধ , বর্ষামঙ্গলের গান বেহাগ রাগিণীতে লিখতে বললে কেমন হয় ! পরদিন ভোরবেলা তিনি গুরুদেবের খাস ভৃত্য বনমালীর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি কাগজে ‘বেহাগ ’ কথাটি লিখে যখন গুরুদেবের লেখার টেবিলে চাপা দিয়ে রেখে এলেন । সেটা দেখে পড়ামাত্রই কবিগুরু বনমালীকে ডেকে বকতে শুরু করেন, বনমালী ‘যাকে-তাকে’ তাঁর লেখার ঘরে ঢুকতে দেয় বলে। তিনি লিখছেন – ‘ বনমালী চাপা হাসি হেসে চলে গেল। সেই বেহাগে পেলাম এই গান- ‘আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে’। এর পরদিন আবার কাগজে লিখে এলাম ‘ইমন’, পেলামও- ‘এসো গো, জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি’ গানটি …লিখে রেখে এলাম, ‘তান দেওয়া গান’। পেয়ে গেলাম, ‘আজ শ্রাবণের গগনের গায়।” ষষ্ঠ গানটি গুরুদেব নিজেই লেখেন- ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর-দিনে’। মীড়ের ওপরে তৈরি করা গানটির প্রথম সুর বদলে খানিক হালকা করলেন , কথা বদলে “উদাসী মেঘে” হল “ উদভ্রান্ত মেঘে “ ! ছয় ছয়টি গান লেখা হয়ে যাওয়ার পর কবির এবার থামবার বাসনা । শৈলজারঞ্জন ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন । বললেন “ এক ডিজিটের মুল্য কী ? অন্তত দুটি ডিজিট করে দিন , একের পাশে অন্তত শূন্য চাই “ । পরের গান এল “ স্বপ্নে আমার মনে হল” । অমিতা ঠাকুর, ( দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র , অজীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী ) এর উদ্দেশে লেখা হল “ এসেছিলে তবু আস নাই “ । “এসেছিনু দ্বারে তব “ এবং “ নিবিড় মেঘেরও ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে “ পাওয়া গেল পরপর এই দুটি গানও । দশের ঘর ছুঁতেই রবীন্দ্রনাথ এবার নিশ্চিন্ত হলেন , যাক একের পর শূন্য বসে গেছে , এবার শেষ । কিন্তু না , শৈলজারঞ্জন এবার অন্য হিসেব দিলেন – “ শূন্যের কোন মুল্যই নেই , একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন “ । চিরকুট লেখা হল দুটি – একটিতে লেখা হ’ল “ কীর্তন “অপরটি “বাউল” । চাপা রইল লেখার টেবিলে । “ পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে” আর “ শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে “ – গান দুটি লিখে দিলেন কবি ; পূরণ হ’ল বারো । এবার তিনি কড়া ভাবে থামতে বললেন শৈলজারঞ্জনকে । আর নয় । বললেন , “ বর্ষা মঙ্গলের দেরিও তো হয়ে যাচ্ছে “ !

কিন্তু কবির প্রিয়পাত্র শৈলজার মাথায় তখন অন্য চিন্তা খেলা করছে । হাত জোড় করে বললেন “ ষোলোকলায় পূর্ণ করে দিন , আর চাইব না “ !
মানতে হল তাঁকে এই অনুরোধ । রচিত হল “ আজি মেঘ কেটে গেছে সকাল বেলায় “ । আবার সেই পুরনো পন্থা অবলম্বন করলেন শৈলজা । চিরকুটে লেখা হ’ল “বাগেশ্রী “ ! বাগেশ্রীতে আমার বর্ষার গান লেখা যায় নাকি ? গুরুদেব রীতিমত ভেঙে পড়লেন । শৈলজারঞ্জনও ছাড়বেন না । আনা হ’ল “গীতবিতান “ , গাইলেন “ যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে “ । “পরদিন পেলাম বাগেশ্রীতে ‘সঘন গহন রাত্রি ঝরিছে শ্রাবণ ধারা’ “ । পঞ্চদশ গান হ’ল “ ওগো তুমি পঞ্চদশী” । খানিক টপ্পা আঙ্গিকের গান । এরপরেই গুরুদেব প্রায় বিদ্রোহ করেন ।

rainy day

“ আর বর্ষামঙ্গলের গান নয় …এদিকে শরৎকাল আসছে , বর্ষামঙ্গল আর কত পিছিয়ে যাবে “ ?
সেবার অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়েছিল পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীর পরিচালনায় চারটি নৃত্য । গুরুদেব নিজেকে সংযুক্ত করেছিলেন আবৃত্তি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে । নির্দিষ্ট দিনে লাইব্রেরির বারান্দায় শুরু হয় বর্ষামঙ্গলের অনুষ্ঠান তাঁর উপস্থিতিতে । সবগুলি নতুন গান গাওয়া হবে । কিন্তু ঐ সময় ঘিরে দিন দিন খারাপ হচ্ছিল তাঁর শারীরিক অবস্থা । অনুষ্ঠানের মাঝেই চলে যেতে হবে স্বাস্থের কারণে । শৈলজারঞ্জনের বিশেষ অনুরোধে “ পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে” শুনে বিদায় নিলেন তিনি । অনুষ্ঠানও বন্ধ করে দয়া হ’ল ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয় সেবারের বর্ষামঙ্গল । কয়েকদিন পরেই শৈলজারঞ্জনের ডাক পড়ল । সেদিনের অসমাপ্ত অনুষ্ঠান এবার যাতে যথাবৎ সমাপন করা যায় তাঁর পরিকল্পনা করেছেন । এবার “উদয়ন” বাড়ির সামনে হবে ‘বাসি বর্ষামঙ্গল ‘। ঠিক হ’ল পুরনো পুরোনো ছয়টি গান এবং নতুন লেখা পনেরটি গান গাওয়া হবে সেখানে । শুধু গান দিয়েই সাজানো হবে অধিবেশন।

“ সেদিন সকালবেলা অনুষ্ঠানসূচি নিয়ে আমি যখন গুরুদেবের কাছে গেলাম তখন গুরুদেব বললেন, যদি তোমাকে আরেকটি নতুন গান শিখিয়ে দিই তা হলে সন্ধ্যের অনুষ্ঠাণে গাওয়াতে পারো কি ? এটা হলে তোমার প্রস্তাব মত ষোলোটি গান হয়ে যায় , ষোলোকলা পূর্ণ হয় ” ! কি অদ্ভুত সমাপতন ! লিখে দিলেন ষোড়শ গানটির কথা – ‘ যবে রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা ‘ । সেদিনের সান্ধ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়েছিল এই গানটিও । তাঁর প্রয়াণের পূর্বে , এই ছিল গুরুদেবের শেষ পূর্ণাকার বর্ষামঙ্গল । “আষাঢ় “ প্রবন্ধে লিখেছিলেন তিনি “ ঋতুর মধ্যে বর্ষাই কেবল একা একামাত্র । তাহার জুড়ি নাই” । রবীন্দ্রগানের মধ্য দিয়ে তার এই কৌলীন্যগর্ব যেন বার বার প্রকাশিত হয়েছে ।