keema-khichuri-recipe

এ ভরা বাদরে কিমা খিচুড়ি

রঞ্জন ঝাড়গ্রামে থাকে। রঞ্জন হাঁসদা। পাঁচ – আট। ভিভ রিচার্ডসের মতো গায়ের রঙ আর ঔজ্জ্বল্য। মুক্তো বাঁধানো নির্মল হাসি। আদতে পালামৌ। এক কলেজে সাত বছর কাটিয়ে এখন সরকারি ডাক্তার। আমদের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। প্রার্থনা কিরো ওর বৌ। জামশেদপুরে। স্পোর্টস কোটা।

কাল সন্ধ্যায় আমরা চার বন্ধু দুটো বাইক নিয়ে ওর কোয়ার্টারে হানা দিয়েছি। কিছুটা ইচ্ছে, কিছুটা অগত্যা। ফিরছিলাম মারোমার থেকে। নাম শোনেননি? অদ্ভূত সুন্দর এক অরণ্য। নেতারহাটের খানিক আগে। ফরেস্ট বাংলো আছে। মহেন্দার আছে দেশি কুঁকড়ো আর হাতরুটি খাওয়ানোর জন্যে। ঔরঙ্গা যেখানে কোয়েলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই মোহনা আছে। যৌবনের আকাঙ্ক্ষার মতো লোধ জলপ্রপাত। লাতেহার ভারি সুন্দর। পুরো ঝাড়খণ্ডই সুন্দরী। বুনো সুন্দরী। কপালকুণ্ডলা। বারবার টানে। আঁকড়ে ধরে। আকুল করে। জানোয়ার দেখতে তো শহরই আছে। আপনার আমার শহর। দাঁত নখের শহর। জঙ্গল দেখতে চাইলে ওখানে যাবেন। পারলে বর্ষায় যাবেন। ভিজে শাল, আসান, কুসুম, খয়ের, কড়ম গাছের, পাতার যৌবনের গন্ধ। আদিম পথ ধরে ভিজে স্তূপাকার পাতার স্পঞ্জ মাড়িয়ে হেঁটে যাওয়া। নেশা মশাই। নেশা।

এই হল আমার সমস্যা। কথান্তরে, দ্বীপন্তরে বারে বারে চলে যাওয়া। ক্ষমাঘেন্না। প্লিজ। তো আমরা গালুডি পেরিয়ে আসার পর দু চার ফোঁটা। আকাশ ভেঙ্গে নামলো। তখনও ঝাড়গ্রাম থেকে দশ বারো কিলোমিটার। বিকেল পাঁচটায় যেন সন্ধ্যার ঘনঘটা। চারকাপ চায়ে বাদাম বিস্কুটের দিব্যি। তক্ষুনি অপারেশন রঞ্জনের প্ল্যানিং। বৃষ্টি একটু ধরতে বেরিয়ে পড়া। হাসপাতালে ডাক্তারের কোয়ার্টার খুঁজে পাওয়া দুনিয়ার সহজতম কাজের একটা। আর তার ওপর যদি কালো করে, চিকনা করে সে হয়? দু মিনিট। এমনকি দেখা গেল, সে আছে। পাজামা আর ফতুয়া শোভিত। ভূত দেখলেও বোধহয় এতটা চমকাত না। আড়াইটা ঘর। ঘরণী টাটা। আমাদের মৌরসিপাট্টা । সেই হোস্টেল লাইফ। নরক গুলজার। লাড্ডুর মুখের অম্লমধুর শেষ হলে চা মুড়ি চপ। এখানে, আসলে পুরো মেদিনীপুরেই খেসারির ডালের বেসন। তাই চপ এতো স্বাদু। যা ক্ষতি করে, তার স্বাদই তো বেশি হয়। তাই না?

রাতে হোম ডেলিভারির রুটি চিকেন। কালাকাঁদ। সকালে বেরিয়ে পড়ার প্ল্যান। ভোর থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি। রঞ্জনের কাজের মাসি এসে বলল, এ এখন থামবেনি। আজ দিনভর লাগাতার। সেরকম কোনও কাজও নেই। বাড়িতে জানিয়ে দেওয়া হল আজ এখানেই। লিস্ট নিয়ে রঞ্জনের ভার্তিদি বড় কালো ছাতা নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমরা সেই সব সোনালি দিনরাতের জাবরকাটায় কালাতিপাত।

বৃষ্টির খাওয়া মানেই খিচুড়ি। অম্বরের মোতি বিরিয়ানী দিলেও খাবো না। একমাত্র কাছাকাছি আসবে হালিম কিন্তু খিচুড়ির কাছে দশ গোল। আর আমার ফেভারিট হচ্ছে কিমা খিচুড়ি। সেদিন আমরা দু’রকম কিমা খিচুড়ি বানিয়েছিলাম। পুরোনো ধাঁচে বাংলা কিমা খিচুড়ি আর বোরা কিমা খিচুড়ি। ও, বোরা কিমা খিচুড়ি জানেন না। তাই তো? বোরহা হল এক শিয়া মতাবলম্বী মুসলিম সম্প্রদায়। আদি বাস গুজরাট। তারপর এরা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ বিদেশে। উঁহুহু। নজর উঁচুতে। এদেরই বুরহানি বলে। এবার চেনা চেনা লাগছে? লাগবেই তো। শিক্ষিত এবং ধনী মুসলিমদের মধ্যে এরা প্রথম শ্রেণিতে। নিজস্ব ভাষা আছে। লিশান আল দাওয়াত গুজরাটি আর উর্দু ভাষার এক চমৎকার মিশেল। পয়গম্বর হজরত মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমার উত্তরাধিকারীদের এরা ইমাম বলে মনে করেন। গুজরাটি ভরভু মানে ব্যবসা থেকে এই বোহরা শব্দ। অনেক পরিবারের রান্না একসঙ্গে হয়। মানে কমিউনিটি কিচেন আর কি। তো এই রন্ধনশৈলীর এক উদাহরণ এই বোরা কিমা খিচুড়ি।

প্রথমেই গোটা ছয় বড় বড় পিঁয়াজকে কেটে সাদা তেলে বেরেস্তা করে নিতে হবে। এবার একটা হাঁড়িতে অনেকটা জল দিয়ে তাতে দিন কটা ছোট এলাচ, দারুচিনি, গোটা জিরে, লবঙ্গ, অল্প কিছু কালো মরিচ, কিছুটা নুন আর হলুদ। জলটা ফুটে উঠলে ধুয়ে, জল ঝরিয়ে রাখা বাসমতি চাল। একটু শুকনো খোলায় ভেজে তারপর ধুয়ে নেওয়া সমপরিমাণ সোনা মুগের ডাল। আশি শতাংশ সেদ্ধ হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে রেখে দিন। ওই পিঁয়াজ ভাজার তেলে এবার দুটো বড় এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, গোটা শুকনো লঙ্কা। আর দিন আদা রসুন কাঁচা লঙ্কা বাটা। অর্ধেক বেরেস্তা। খানিক নাড়াচাড়ার পর ওতে যোগ করুন ধনে গুঁড়ো, হলুদ আর লঙ্কা গুঁড়ো। নুন পরিমাণমতো। মশলার সুগন্ধে চারদিক ম ম। তেল ছাড়লে ওতে এক কাপ টম্যাটো পিউরি দিয়ে পুরোটা ভালো করে মিশিয়ে কম আঁচে চাপা দিয়ে রান্না। মিনিট পাঁচ পর দেখবেন জলীয় ভাবটা কমে এসেছে। মাঝারি করে কুচনো কিমা দিয়ে দিন। নাড়তে থাকুন হাল্কা হাতে। কিমা যদি আমাদের মাপে হয়, মানে পাঁচশো গ্রাম, ফেটানো দই লাগবে দুশো গ্রামের মত। পরিমাণমত নুন দিয়ে একটু কষিয়ে নিন। ঢাকনা দিয়ে মৃদু আঁচে বিশ মিনিট। এবার একটা ডেকচি। একটু ঘি ব্রাশ করে নিন। একদম নিচে অর্ধেকটা খিচুড়ি, তার ওপর কিমা। গোটা কয়েক দেশি মুরগির ডিম সেদ্ধ অর্ধেকটা করে কেটে আর ডুমো করে কেটে ডুবো তেলে ভেজে নেওয়া কয়েক টুকরো আলু সাজিয়ে নিন।আবার তার ওপর বাকি খিচুড়ি। বাকি বেরেস্তাটা ওপরে সাজিয়ে দু চামচ ঘি ছড়িয়ে দিতে হবে। এবার মিনিট কুড়ি দমে রাখলেই বোরা খিচুড়ি তৈরি।

বাংলা কিমা খিচুড়ি তৈরি খুউব সহজ। কিন্ত সত্যি বলছি, আমার এটাই খেতে অসম্ভব ভালো লাগে। আসলে ছোট থেকে চেনা স্বাদ। তাই আপন। জিভের স্বাদকোরকগুলো এর অপেক্ষায় থাকে। এক্ষেত্রে কিমাটা একটু মোটা নিতে হবে। মাটনের কিমা কোথাকার সবচেয়ে ভালো জানেন তো? পাঁজরের। সঙ্গে এক তৃতীয়াংশ কিডনি ফ্যাট। উফফ। জিভে জল চলে আসে। পাঁচশো গ্রাম কিমার জন্যে এক বাটি গোবিন্দভোগ চাল। ভালো করে ধুয়ে (অন্ততঃ দু তিন বার) ঘণ্টাখানেক ভিজিয়ে রাখলে ভালো হয়। আধ বাটি মসুর ডাল (পালিশ ছাড়া) ধুয়ে ঘন্টা তিনেক ভেজানো। সোনা মুগের ব্যাপারটা একটু আলাদা। আধ বাটি। শুকনো কড়াইতে আগে একটু সেঁকে নিন। কাঁচা ডালের গন্ধ বদলে যাবে সুগন্ধে। দানাগুলো সেদ্ধ হওয়ার পরেও আকার বজায় রাখবে। হজমের সুবিধাও বেশি। তারপর মুগডালটাকেও একইভাবে ভালো করে রগড়ে রগড়ে ধুয়ে তিন ঘন্টা ভিজতে দিন।

একটা প্রমাণ সাইজের ডেকচি। মাঝারি আঁচ। ঝাঁঝালো গন্ধের ঘানিতে পেষা সর্ষে তেল। তেল গরম হলে ইঞ্চিখানেক মাপের দুটুকরো দারচিনি। কিছু গোলমরিচ। গোলমরিচ বলতে আমরা কিন্ত কালো মরিচ বুঝি। ভুলেও সা মরিচে হাত দেবেন না। উফফ সে বড় সুগন্ধী। এরপর আসরে নামবে গোটা তিন ছোট এলাচ, একটা বড় এলাচ, একটা ছোট তেজপাতা। এক চিমটে গোটা জিরে। লবঙ্গ ছিটকে উঠেছে? এবার তিনটে বড় পেঁয়াজ কুচি। ভাজতে থাকুন। প্রেমসে। হালকা সোনালি আভা এলেই দুটো টম্যাটো। ছোট ছোট টুকরো করে কাটা। একটু কষা। এবার আদা রসুন বাটা। এক চামচ করে। খুন্তি যেন থেমে না যায়। গুনগুন করে গান গাইতে পারেন। জোর গলায় গাইলে মশলা কষার ঝাঁঝে কাশি এসে যেতে পারে। এবার গুঁড়ো মশলার পালা। হলুদ, জিরে, লঙ্কা, কাশ্মিরী লংকা। বাঙালি স্টাইল রান্নায় ধনের ব্যবহার কম। জিরে বেশি। বোধহয় পেট গরমের উদভ্রান্ত ধারণা। আর বাঙালির সব রোগই তো ওই গ্যাস অম্বল। রাগ করলেন? পরিমাণমত নুন, বড় এক চামচ চিনি। তেল আর মশলা আলাদা হয়ে এলে এক চামচ জল দিয়ে আর একটু নাড়াচাড়া। এবার কিমা। সমস্ত ব্যপারটা ভালোভাবে মিলেমিশে গেলে এবার ওই ভিজিয়ে রাখা চাল আর দু রকম ডাল দিয়ে দিন। কষতে থাকুন। ক’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি ভালোবাসবে! এখানে হবে, ক’ফোঁটা ঘাম ঝরিয়েছো যে তুমি ভালো রাঁধবে! এবার জল। পসন্দ আপনা আপনা। খিচুড়ি ঘন হবে না পাতলা হবে একান্তই আপনার ইচ্ছে। শুধু একটা কথা। রান্নার মাঝে জল দিতে হলে অবশ্যই গরম জল দেবেন। না হলে টেস্ট খারাপ হলে আমি দায়ী নই। মোটেই না। মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করে মিনিট কুড়ি। তৈরি আপনার কিমা খিচুড়ি। কয়েকটা কাঁচালঙ্কা দিয়ে দিন। সুগন্ধ। আর কিছু না। বড় এক চামচ গাওয়া ঘি। স্বাদ এবং গন্ধ। দুইই। আমি একটু ধনেপাতা ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসি। আপনি দিতেও পারেন, না দিলেও মহাভারত কিছু অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।

এবার সাইড ডিশ। বেগুনি আর অমলেট তো খিচুড়ির সঙ্গে যাবেই যাবে। নিরামিষ খিচুড়িতে অবশ্য লাবড়া আর আলুরদম সাজিয়ে না দিলে ঠাকুর পাপ দেন। বেগুনির জন্যে লাগবে বেগুন। লম্বা আর পাতলা করে কেটে নেওয়া। কিঞ্চিৎ নুন মাখিয়ে একটা জালির ওপর রাখুন। জল ঝরুক। একটা বড় বাটিতে বেসন তিন হাতা আর চালগুঁড়ো এক হাতা। পরিমাপে নুন, আধ চামচ গুঁড়ো হলুদ, এক চামচ গুঁড়ো লঙ্কা, এক চিমটে বেকিং সোডা, ধনে – পুদিনার পেষ্ট এক চামচ। এক চিমটে জোয়ান আর এক চিমটে কালোজিরে। একটু একটু করে জল মেশান আর নাড়তে থাকুন। ব্যাটার চমৎকার না হলে সব গুবলেট। মিশ্রণটা শেষে এমন হবে, চামচে লেগে থাকবে কিন্তু চামচকে ধরে রাখবে না। একটু সরষে তেল শেষে মিশিয়ে নিন। সামান্য। এবার বেগুনের ফালিগুলো শুকনো কাপড়ে চেপে চেপে অতিরিক্ত জল শুষে নিন। কড়ায় তেল ভালো করে গরম হলে বেগুনের ফালি ব্যাটারে ভালো করে মাখামাখি করে মাঝারি আঁচে ছ্যাঁক ছ্যাঁক। সোনালি বাদামি রঙে ভেজে তুলুন। মুচমুচে আর টেস্টি। আহা। টেস্ট করতে গিয়ে সবকটা খেয়ে ফেললে খিচুড়ির সঙ্গে খাবেন কী? ওহ অমলেট তো আছেই।

একটু অন্যরকম অমলেট বানাই? মিহি করে কুচোনো পিঁয়াজ লঙ্কা, সামান্য টম্যাটো কুঁচি। পাঁচটা ডিম ফাটিয়ে মগে নিয়ে প্রয়োজন অনুসারে নুন আর ফ্রেশ গোলমরিচ গুঁড়ো। এক হাতা জল। ভালো করে ফেটিয়ে নিন। এবার নন স্টিক প্যানে সামান্য সরষে তেল দিয়ে মাখিয়ে নিন। খানিকটা ডিম গোলা দিয়ে প্যানটাকে কাত করে করে ব্যাটারটা খুন্তি দিয়ে চক্রাকারে ঘোরাতে থাকুন। একপিঠ মোটামুটি হয়ে গেছে? উলটে দিয়ে ত্রিশ সেকেন্ড। এতে অমলেটে ফোলা ভাব বেশি আসবে আর বেশি নরমও হবে। মখমলি। আরও হাজার গণ্ডা খাদ্য, ভাজাভুজি খেতেই পারেন কিমা খিচুড়ি দিয়ে। কিচ্ছু ছাড়াও শুধুই খেতে পারেন আনন্দ করে। আপনার ব্যাপার।

আমরা সেদিন এটুকুই খেয়েছিলাম। আর হ্যাঁ। খিচুড়ির পর কিন্তু অনেক জল পান করতে হবে। মনে আছে তো? গানে গল্পে রসনাতৃপ্তিতে হই হই করে কেটে গেল বাদলা দিনরাত। ফিরে পাওয়ার, পড়ে পাওয়ার হোস্টেল লাইফ। আমদের জীবনের সোনায় মোড়ানো কয়েক বছর। পরদিন সকালে বেরোনোর সময় প্রার্থনার সঙ্গে দেখা। কেমন কাটল বন্ধুরা? সবই হল, খাতির যত্ন ছাড়া। রানী ছাড়া রাজমহলে কি আর জৌলুস থাকে? আমি প্রগলভ। সে কি? আমি তো কাল আসছিলাম। রঞ্জনই তো মানা করল। বন্ধুরা একসঙ্গে সময় কাটাবে বলে। ভেতরের দরজায় হেলান দিয়ে আমাদের ভিভ রিচার্ডস থার্টি টু অল আউট। কী সুন্দর ঝকঝকে সাদা দাঁত।।