Taslima Nasrin

তসলিমা – যে নারীর কোনো দেশ নেই

বেছে বেছে স্বাধীনতার মাসে মানে আগস্ট মাসেই নির্বাসনের শৃংখলমুক্ত হয়ে এই শহরে প্রত্যাবর্তন হল তসলিমা নাসরিনের। পালাবদলের সরকারের আশ্বাসে এবং দুটি সেক্যুলার সংস্থার উদ্যোগ আয়োজনে সালের হিসেবে কুড়ি বছর পর এই শহরে পা রাখল তসলিমা। আমরা জীবনানন্দের ভাষায় বলতে পারলাম, ‘জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার তারপর আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!’

সত্যি আবার দেখা হল তিলোত্তমা আর তসলিমার। দেখা হল পুরানো সেই দিনের কথা হল। আসলে এই শহরের সঙ্গে তার জন্মের বন্ধন না হলেও মর্মের বন্ধন। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের মতোই গভীর। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর এই বাংলার এক আকাশের নিচে তসলিমা ঘর পাততে চেয়েছিল, নিঃশ্বাস নিতে চেয়েছিল এই বাংলার বাতাসে, বাংলা ভাষার মাটিতে তার জীবন ও সৃষ্টিকে নিবিড়ভাবে বুনে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু রাজনীতির নির্মাণ হিসেব ভোটের অংক এবং সাম্প্রদায়িক সমীকরণের ভয়ে একদিন এই বাংলা থেকে নির্বাসিত হতে হয়েছিল তসলিমা নাসরিনকে।

তবে তসলিমার আসল বসত তো মানুষের মনে। বহু ভীরু মেয়ের বুকের ভিতরে সাহসের রক্ত সঞ্চালন ঘটানো, সব সংস্কারের কালো পর্দাকে টেনে সরিয়ে দেওয়া, সমস্ত মৌলবাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার ভাষা শেখানো মানুষটির নাম তসলিমা। মনে আছে আমার কলেজবেলার শেষের দিকে হাতে এসেছিল তসলিমার সদ্য প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন ‘নির্বাচিত কলাম’। তখন সংবাদপত্রের পাতায় বহু বিখ্যাত মানুষের লেখা ‘কলাম’ পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এ যে একেবারে অন্যরকম। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বহু সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার যে ভাষাটা আমরা মনে মনে আওড়াই এই নির্বাচিত কলাম তারই ভাষ্য। এই প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে আগুন। যে আগুন প্রতিবাদের মশাল নয়। বরং যুক্তির শানিত তরবারির ফুলকি। সেই প্রবন্ধে ঈশ্বর বিশ্বাসও প্রশ্নাতীত নয়। সেখানে নারীর অর্গাজমের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা। আর সেটাই তো প্রত্যাশিত পেশায় চিকিৎসক তসলিমা নাসরিনের কাছে। সেই বইতেই নারীর শ্লীলতাহানির ব্যাখ্যায় বলা ছিল– ডিম নষ্ট হয়, দুধ নষ্ট হয়,আর নারী নষ্ট হয়|

কিন্তু এখানেই মানুষের ভুল হল। বেশ কিছু পুরুষ তসলিমা নাসরিনের এই নির্বাচিত কলামে চৌষট্টি কলার কামগন্ধ খুঁজে পেলেন| কেউ কেউ দাগিয়েও ফেললেন ‘নিষিদ্ধ’ বই হিসেবে| মনে আছে আমার এক বন্ধুর অনুরোধে আমি তসলিমা নাসরিনের নির্বাচিত কলাম বইটি তার জন্মদিনে উপহার দিয়ে লিখছিলাম ‘এক খোলা হাওয়ার মানুষকে।’ এই প্রথম আমি কোন পুরুষকে তসলিমা নাসরিনের বই পড়তে এতটা আগ্রহী হতে দেখেছিলাম। এবং বইটি পড়ে সদর্থক সমালোচনা করতেও দেখেছিলাম। পরে অবশ্য সেই ‘খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে ডুবতে রাজি আছি’ বলার অবকাশ হয়নি আমার। কিন্তু সে অন্য কথা। মোটামুটি ভাবে তসলিমার সঙ্গে তার লেখার মাধ্যমে আমার পরিচয়ের প্রথম পাঠ এভাবেই। তখনও তসলিমাকে চোখের সামনে দেখার সুযোগ হয়নি।

Taslima Nasrin nirbachito column

সেই সুযোগটা হল আরও কিছু পরে একাডেমিক পড়াশুনোর পাঠ চুকানোর পর। রবীন্দ্রসদনে একটা কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নীলমণিলতা’ কবিতার পরিবেশন ছিল তসলিমা নাসরিনের কণ্ঠে। তসলিমার পরনে সেদিন নীলরঙা শাড়ি।

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ অঙ্গনে এক বিদেশি নীল ফুল গাছের নামকরণ করতে ১৩৩৩ সনে এই কবিতা লিখেছিলেন।
“…অজানা পান্থর মতো ডাক দিলে অতিথির ডাকে/ অপরূপ পুষ্পচ্ছ্বাসে হে লতা চিনালে আপনাকে।…. তুমি সুদূরের দূতী নতুন এসেছ নীলমণি/ স্বচ্ছ নীলাম্বরসম নির্মল তোমার কন্ঠখানি…”
তসলিমার কন্ঠে ওই রবীন্দ্র কবিতার আবৃত্তি শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, কী আশ্চর্য!কবিতার পংক্তিগুলি যেন রবীন্দ্রনাথ ওর জন্যেই রেখে গিয়েছিলেন সেই কত যুগ আগে। তসলিমার অসম্ভব নরম কণ্ঠে ‘নীলমনিলতা’ কবিতার আবৃত্তি শুনে মনে হয়েছিল, যার কলম এত আগুন ছোটায় তার কণ্ঠ এতো নরম হয়। আসলে তসলিমা এমন এক আগুন- যা পোড়ায় না, যা নির্বাপিতও হয় না। সময় তসলিমাকে পুড়িয়ে ছাই করে না| তসলিমা কেবল আমাদের বোধের আশেপাশের আবর্জনারাশিকে ভস্ম করে নতুন বোধের জন্ম দেয়।

কিন্তু তসলিমার মতো আগুনপাখির ডানা ছাঁটার ষড়যন্ত্র তখন ভেতরে ভেতরে চলছিল বাংলাদেশে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও নির্যাতনকে বিষয় করে লেখা ‘লজ্জা’ উপন্যাস লেখার জন্য বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীর দাবিতে এবং সেখানকার প্রধান রাজনৈতিক দলের ফতোয়ায় ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাসের ৮ তারিখে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হল তসলিমা নাসরিন|

কিন্তু কেন? কী ছিল সেই ‘লজ্জা’য়? উপন্যাসের মূল চরিত্র সুরঞ্জন ধর্মে বিশ্বাসী ছিল না, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু শুধু হিন্দু পরিচয় এর কারণে তাকে গৃহহারা ও বন্ধুহীন হতে হয়| নিজে জন্মভূমি ত্যাগের বেদনা এবং স্বদেশে পরবাসী হয়ে বেঁচে থাকার নির্মম যে বাস্তব আখ্যান তসলিমা লিখেছিলেন, পরবর্তীকালে সেই বেদনাই বহন করতে হয়েছে তসলিমাকেই।

বাংলাদেশ ছেড়ে আসার পর এই দেশকে বিশেষ করে এই কলকাতাকে ভালোবেসে ফেলল তসলিমা। এই শহরের অনেক প্রথিতযশা সাহিত্যিক তসলিমার মেধা ও প্রতিভার সম্মান দিল। দিল ‘আনন্দ পুরস্কার’। এই শহরের বইমেলায় তসলিমার বই উদ্বোধন হয়। সেখানে তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি আমি । অটোগ্রাফ নিই। তসলিমার বেশ ক’খানা বই কিনে পড়ে ফেলি। শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তসলিমার নাম দেখলেই ছুটে যাই।

ওদিকে তসলিমা তখন সারা পৃথিবী ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইউরোপের উতল হাওয়ায় ভাসছে। তবে ইউরোপ নাগরিকত্ব দিলেও বাংলার মতো আপনত্ব দিতে পারল কি? হয়তো না। তাই আবার কলকাতায় ফিরল তসলিমা। ২০০৪ সালে কলকাতার ৭ নম্বর রডন স্ট্রিটের বাড়িটা ভাড়া নিয়ে সেখানেই থিতু হল তসলিমা। এক বাংলাকে ছেড়ে এসে আরেক বাংলায় ঘর বাঁধল।

Taslima Nasrin

আমি ততদিনে একটা হেরিটেজ হাউসের বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক। পেশার সূত্রেই তসলিমার সেই বাড়িতে যাতায়াত শুরু আমার। দেখতাম প্রতি জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কত বিদগ্ধ মানুষের ভিড়। তাঁদের অনেকেই সাহিত্যিক। আবার অনেকে উঠতি কবি। কেউ আবার শুধুই বন্ধু। আবার কেউ বাংলাদেশী টানে কথা বলা আত্মীয় স্থানীয়। সবাইকে নিয়ে সাত নম্বর রডন স্ট্রিটের বাড়িটা ভরে ওঠে। মস্ত ডাইনিং স্পেসের সামনের কাচঢাকা ব্যালকনির সামনে মস্ত আমগাছটা ছায়া ফেলে। ছায়া ছায়া কত ব্যথা ঘুরে ধরাধামে।

রান্নাঘর থেকে ইলিশ মাছের সুঘ্রাণ ভেসে আসে। পায়ে পায়ে ঘুরতে থাকে তসলিমার আদুরে বেড়াল ‘মিনু’। একদিন গড়িয়াহাটের মাছের বাজারে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা এই বেড়ালছানাকে রডন স্ট্রিটের বাড়িতে কোলে করে এনেছিল তসলিমা। তারপর সে ওই বাড়িতে থাকত রানির মতো। কাঁটা বেছে দিলে তবে মাছ খেত। বাড়ির লোকজন, অতিথি অভ্যাগত এমনকি পরবর্তী সময়ে তসলিমার ফ্ল্যাটের বাইরে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা পর্যন্ত মিনুকে খাতির করত। আসলে নিজের দেশে ঘরছাড়া তসলিমার বিশ্বঘরে ঠাঁই পায় সবাই। সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ মানুষ। মনুষ্য থেকে মনুষ্যেতর প্রাণী সকলেই। মেধার সঙ্গে মমতার এক চমৎকার মিশেল তসলিমার মধ্যে। তসলিমার জীবনের সলতের মুখে আগুন জ্বললে কী হবে, মোমের মতো মায়াবী মনও আছে তার ।

cat minu of Taslima Nasrin

প্রমাণ দিতে একটি গল্প বলি। আসলে তা গল্প হলেও সত্যি। তখন আমি ওই হেরিটেজ হাউসের দৈনিক সংবাদপত্রেই কর্মরত। একটা অফ ডে’র দিনে অ্যসাইনমেন্ট দেওয়া হল তসলিমা নাসরিন কোনও এক পুরনো দিনের অভিনেত্রীর বাড়ি যাবেন। ফটোগ্রাফারকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে যেতে হবে। ততদিনে তসলিমা নাসরিনের বাংলাদেশে দ্বিখণ্ডিত (যা পশ্চিমবঙ্গে ‘ক’ নামে প্রকাশ পায়) উপন্যাস নিয়ে হইচই হয়ে গিয়েছে। রডন স্ট্রিটে তসলিমার ফ্ল্যাটের সামনে চব্বিশ ঘন্টার সশত্র প্রহরা। ২০০৭ সালের এক গ্রীষ্মের দুপুরে এক মস্ত কালো গাড়িতে সামনের আর পেছনের সিটে নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়েই সওয়ার হলাম। মাঝখানের সিটে আমি তসলিমা ছাড়াও ছিলেন এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার ( স্কিন স্পেশালিস্ট)। রিজেন্ট পার্কের দিকে সেই পুরনো দিনের অভিনেত্রীর বাড়ি আমাদের গন্তব্য। রডন স্ট্রিট থেকে গাড়িটা কিছুদূর যেতেই জানা গেল গোলমালটা। যার বাড়ি যাওয়া হবে তাঁর নামটুকু জানা থাকলেও ঠিকানা আমরা কেউই জানি না। তসলিমা ভেবেছে আমাকে সম্পাদক ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়েছেন। অথচ সম্পাদক জানেন তসলিমার কাছেই অভিনেত্রী বাড়ির ঠিকানা আছে। একে তাকে ফোন করেও কোনও হদিশ মিলল না। প্রায় গোয়েন্দা অভিযানের মতো অলিগলি পাক খেয়ে, বারবার গাড়ি থেকে নেমে গরমে ঘেমে নেয়ে প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার দশা। ঠিক সেই সময় লুঙ্গি আর ফতুয়া পরা এক প্রবীণ মানুষকে দেখলাম মুদির দোকানে বাজার করতে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল এঁর কাছে হদিস মিলতেও পারে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ‘উদয়ের পথে’ সিনেমার মহিলা চিত্রাভিনেত্রী রেখা মিত্রর বাড়িটা চেনেন? তাঁর বাড়িটা কীভাবে যাবো একটু বলে দেবেন।

প্রবীণ মানুষটির সটান জবাব, কেন বলবো? তাঁর সঙ্গে কী দরকার? হাজারো প্রশ্ন। এমনকি সাংবাদিক পরিচয়েও যখন ঠিকানা আদায় হল না, অগত্যা বাধ্য হয়েই খুলে বলতে হল। বললাম, ওই কালো গাড়িটায় তসলিমা নাসরিন বসে আছেন । ঠিকানাটা তাঁরই দরকার। প্রায় লাফ দিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ। কোথায় তসলিমা নাসরিন? আমাকে আলাপ করিয়ে দিন। আমি নিজে নিয়ে যাবো। তসলিমাকে এসে সব ঘটনা জানালাম। প্রবীণ মানুষটির তর সয় না। ফতুয়ার ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া পৈতেটা স্বস্থানে রেখে গাড়ির সামনের সিটে নিরাপত্তারক্ষীর পাশে বসে পথনির্দেশ দিলেন। আমরা পৌঁছে গেলাম উদয়ের পথে’র রেখা মিত্রর বাড়ি। ফোন নম্বর চাইতে তসলিমা ড্রাইভারকে বলে দিল নম্বর দিতে। নম্বরটা কাগজে লিখে নিয়ে সেখানে আর কালক্ষেপ না করে উৎফুল্ল হয়ে বিদায় নিলেন তিনি। তসলিমার মতো বিতর্কিত লেখকের প্রতি একজন প্রায় অশীতিপর বৃদ্ধর এই সমীহ দেখে এই শহরটার জন্য গর্ব হচ্ছিল সেদিন।

অন্ধকার ঘুপচি ঘরটার চারপাশে মলিনতার ছাপ। একটা চৌকির ওপর দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। সঙ্গে থাকা মহিলাটি কোনোরকমে উঠে বসিয়ে দিলেন রেখা মিত্রকে। ১৯৪৪ সালে বিমল রায় পরিচালিত উদয়ের পথে সিনেমার অভিনেত্রী রেখা মিত্র। পরে তিনি রেখা মল্লিক নামে গানও প্লে-ব্যাকও করেছেন। উদয়ের পথে ছাড়া আরও বেশ কয়েকটা সিনেমায় অভিনয় করেছেন।আজ আর্থিক অনটনের মধ্যে কোনোরকমে বেঁচে রয়েছেন অস্তাচলের দিকে পা বাড়িয়ে। আত্মীয় স্বজন থাকলেও কেউ খোঁজও রাখে না।

বাংলাদেশের এক মহিলা লেখক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, তাঁকে অর্থ সাহায্য করতে চান শুনে চোখের জলে ভাসতে লাগলেন অভিনেত্রী রেখা মিত্র। তসলিমাকে বিছানায় বসিয়ে অনেক আদরে ভরিয়ে দিলেন। তসলিমা সঙ্গে থাকা ডাক্তার বন্ধুটি একটা খাম রেখা মিত্রর হাতে তুলে দিলেন। নিঃশব্দে মানবিকতার আলো ফুটে উঠেছিল সেই অন্ধকার ঘরে। তসলিমার ভেজা চোখের তারায়। সেদিন এই খবরটা অন্য কোনও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। তসলিমার নির্দেশে আমাদের দৈনিক সংবাদপত্রে হিউমান ইন্টারেস্টেড স্টোরি হিসেবে খবরটা প্রকাশিত হয়েছিল তসলিমার ভূমিকা যথাসম্ভব টোন ডাউন করে। আসলে তসলিমা নিজে এমন অনেকজনের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে এমনই নীরবে।

কিন্তু এই শহরের সঙ্গে তসলিমার আপনত্বের তাল কাটল কিছুদিনের মধ্যেই। আসলে ষড়যন্ত্রের অস্ত্রে শান দেওয়া হচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। ২০০৭ সালেই ইসলামী মৌলবাদীরা মেদিনীপুর শহরে কবিতা পড়তে দিল না তাসলিমাকে। শিলিগুড়ি বইমেলাতেও যেতে বাধা দিল তারা। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর কলকাতার একটি অংশ পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটানো হল । মৌলবাদীরা তসলিমাকে কলকাতা ছাড়া করতে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে| শেষ পর্যন্ত আসে সেই কালো দিন| ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর কৌশলে, রাতের অন্ধকারে সকলের অগোচরে তসলিমাকে এই শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করে তৎকালীন প্রশাসন। তসলিমার এই নির্বাসন দণ্ডে সায় দিয়েছিলেন কলকাতার তথাকথিত সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা। যাঁরা একদিন তসলিমাকে প্রশংসায় ভরিয়েছেন, সম্মানের শিরোপা পরিয়েছেন। তাঁরাই পরে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এই শহর থেকে বিতাড়িত করলেন।

তসলিমার গাঢ় অভিমান ঝরে পড়ল তার কবিতার কলমে|”…নিজের দেশই যদি তোমাকে দেশ না দেয়,/ তবে পৃথিবীতে কোন দেশ আছে তোমাকে দেশ দেবে,বলো!/ঘুরে ফিরে দেশগুলো তো অনেকটা একইরকম,/ শাসকের চেহারা চরিত্র একইরকম|”

Taslima Nasrin

তসলিমাকে কলকাতা থেকে নির্বাসিত করার পরে দিল্লিতে সেফ হাউসে তাকে রাখা হয়েছিল নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। সেই সেফ হাউস তসলিমা নামকরণে ‘নিরাপদ বাড়ি’ নিয়েও কবিতা লিখলেন। এইখানে জনান্তিকে বলে রাখা ভালো কলকাতা ছেড়ে গেলেও আমাদের দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি তসলিমার। প্রায় নিয়মিত ওই সেফ হাউস -এ বসে যেসব কবিতা লিখত তসলিমা তা আমাদের পত্রিকায় ছাপা হত। আমার ওপর ভার ছিল সন্ধেবেলা তাসলিমার ফোন এলে সেই কবিতার ডিকটেশন নেওয়া।

টেলিফোনের ওপারে তসলিমা এপারে আমি। মধ্যিখানে যোজন দূরত্ব। কিন্তু হৃদয়ের তরঙ্গ মিলে গেলে সে দূরত্ব অতিক্রম করতে কয়েক পল সময় মাত্র। তসলিমা বলে চলে, আমি ডিকটেশন নিই। তার কবিতার নাম ‘নিরাপদ বাড়ি ‘–
“…এমন একটা নিরাপদ বাড়িতে আমাকে বাস করতে হচ্ছে/যেখানে ভালো না লাগলে বলতে পারার আমার কোনও অধিকার নেই যে, ভালো লাগছে না/ এমন একটা নিরাপদ বাড়ি যেখানে কষ্ট পেতে থাকবো আমি/ কিন্তু কাঁদতে পারবো না।.. এমন একটা বাড়ি যেখানে ইচ্ছেগুলোকে প্রতিদিন ভোরবেলা খুন হয়ে যেতে হয়/ আর সন্ধের আগেই বাড়ির উঠোনে পুঁতে দিতে হয় ইচ্ছের মলিন মৃতদেহ|…. বন্ধুরা প্রার্থনা করো এই নিরাপদ বাড়ি থেকে কোনো একদিন যেন নিরাপদে বেরোতে পারি বেঁচে /প্রার্থনা করো যেন কোনো একদিন একটা অ-নিরাপদ বাড়িতে বাস করার সৌভাগ্য আমার হয়।…”
আরেকদিনের কবিতার নাম ‘মানুষ’
“….জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে যেটুকু/ ছিটেফোঁটা মেঘ বা রোদ্দুর /দেখা যায়, তা দেখেই বাঁচতে হবে,/ মানুষ, ওঁরা বলে দিয়েছেন হবে না/ আমার মানবজীবন এভাবেই পার হতে হবে মানুষবিহীন।…”

Taslima Nasrin and suvendu adhikary

তসলিমার কাছ থেকে এইসব কবিতা শোনার ফাঁকে দীর্ঘ যতি চিহ্নতে তসলিমার বেদনার নৈঃশব্দ অনুভব করেছি। তার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বরে তার চাপা কান্না মেপেছি। হাতে থাকা কবিতার পাতার খসখস শব্দে প্রতিধ্বনি করেছে ওই সেফ হাউসে থাকা তসলিমার দীর্ঘশ্বাস। তসলিমার সৃষ্টির অক্ষরগুলো স্পর্শ করতে পেরে আমি ধন্য হয়ে গিয়েছি। কখনও তসলিমা আমাদের পত্রিকার সম্পাদককে বলেছে বাইরের আলো দেখতে না পাওয়া ঘরটায় থেকে থেকে আমার চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। একদিন আমি অন্ধ হয়ে যাবো। মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে না পেয়ে আমি শ্রবণ হারিয়ে যাবে। আমি বধির হয়ে যাবো।
একদিন ‘প্রশ্ন’ কবিতায় তসলিমা লিখল
“… মরে গেলে লাশখানা রেখে এসে ওখানে/ মেডিক্যালের শবব্যবচ্ছেদ কক্ষে,/ মরণোত্তর দেহদান ওখানেই করেছি, /…রেখে এসো কলকাতা শহরে লাশ।/…জীবিত নেবে না আমাকে ও শহর।/ মরলে নেবে তো? প্রিয় কলকাতা?… ”

তসলিমার কবিতাগুলো টাইপ করার সময় রোজই চোখ ঝাপসা হয়ে আসতো। সেদিন ঝুপ্পুস বৃষ্টি এলো। ভাগ্যিস তসলিমার এইসব কবিতায় এতো বৃষ্টি ছিল। তা না হলে বেদনার এত রক্তক্ষরণ ধুয়ে ফেলা যেত না!

সেফ হাউসে তসলিমার লেখা যে কবিতাগুলি আমাদের ওই দৈনিক পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল তৎকালীন সরকারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে, সেগুলোই পরে ‘বন্দিনী’ নামে কবিতা সংকলন গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।

তারপর একসময় মৌলবাদের রূদ্ররূপ থিতিয়ে এলে তসলিমা সেফ হাউস থেকে মুক্তি পেয়েছে। গিয়েছে ভিন দেশে। অম্লান দত্তের মতো কলকাতার কিছু মানুষকে সামনে রেখে আমরা প্রতি বছর ২২ নভেম্বর ‘লজ্জা দিবস’ পালন করেছি। তসলিমাকে নির্বাসনের পাপে ডুবে গিয়েছি। পরস্পরকে বলেছি এ তোমার পাপ, এ আমার পাপ । কালো ব্যাজ পড়েছি। তসলিমাকে নিয়ে কথা বলেছি, তার কবিতা পড়েছি। মনে মনে দিন গুনেছি তার ফিরে আসার। এর মধ্যে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, সরকার বদল হয়। রাজা আসে, রাজা যায়, দিন বদলায় না। উনিশটা বছর কেটে যায়, তসলিমা তিলোত্তমার ঘরে ফেরে না। বছর বছর ভিসা রিনিউ করিয়ে তসলিমা রাজধানীতে থাকে। এই শহর থেকে বন্ধুনিরা দিল্লি গিয়ে আগস্ট মাসে তার জন্মদিন পালন করে। কিন্তু এই শহরে তার ‘ফেরা’ হয় না।

অথচ এই শহরের আনাচ-কানাচকে তিনি যে কত ভালোবাসেন তার জবানীতে আবেগঘন লেখা কবিতা ‘কলকাতা, প্রিয় কলকাতা’। যেখানে তসলিমা প্রশ্ন রাখে, “…কবে আমাদের দেখা হবে কলকাতা? সামনের শীতে, বসন্তে? নাকি বসন্ত যাবে….”। আমরা লজ্জায় অধোবদন হই। উত্তর দিতে পারি না। এই শহরের বইমেলার জন্য তসলিমার কী আকুলতা, যে বইমেলা তাকে “…শৈশব দেয়, কৈশোর দেয়, ব্রহ্মপুত্র পাড়ের সেইসব এটেল মাটির আনন্দ…” দেয়। বইমেলাতে তাসলিমাকে আমন্ত্রণ তো দূরস্থান, তার বই উদ্বোধন পর্যন্ত হতে পারে না।

Taslima Nasrin

তারপর পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের সরকার আসার পরে এই শহরে তসলিমার প্রত্যাবর্তন হল। এয়ারপোর্টে পা রাখতেই শঙ্খ বাজিয়ে, উলু দিয়ে, ফুলের মালা পরিয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানালো হল। তসলিমাকে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হল সরকারের প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে এবং সেক্যুলার মিশন ও হিউমান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ারস ফাউন্ডেশন – এর আয়োজনে। সেদিন গুণীজনদের সম্মাননা ও বক্তব্যের পরে ভরা রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহে বলতে এলেন তসলিমা। তার আগে অবশ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি জয় গোস্বামীকে কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডাকতেই দর্শকরা প্রবল আপত্তি জানায়। তসলিমার হয়তো জানা ছিল না ‘কবিতা নয়, পতাকাই এখন সবচেয়ে বড় সাহিত্য।’ এ সত্য জানা থাকলে হয়তো তিনি হয়তো কবিকে মঞ্চে ডাকতেন না। জনতার দাবি মেনে সেদিন জয় গোস্বামী সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন মাথা নীচু করে। কবিতার ভাষায় বললে “…যেভাবে মেয়েটির চোখ থেকে গড়িয়ে যায় এক ফোঁটা জল, ঠিক সেভাবেই মঞ্চের কোণা থেকে নেমে এলেন জয় গোস্বামী।…”

এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার পরে অনুষ্ঠানের তাল ভঙ্গ হলেও তসলিমা সেই সুর বেঁধে দিলেন খরজের তারে, মন্দ্র স্বরে। বললেন, “…আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি। এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার প্রায় ১৯ বছর লেগেছে। নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়। প্রতিটি বছর একটা বন্ধ দরজা। প্রতিটি মাস একটা অপেক্ষা। প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ।… আমার চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝখানের উনিশ বছর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু আজকের এই খোলা দরজা প্রমাণ করে, অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়।… ইতিহাস যেমন মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, ইতিহাস তেমনি মনে রাখে কারা দরজা খুলেছিল… নির্বাসন আমার ঠিকানা কেড়ে নিয়েছে, ভাষা কেড়ে নেয়নি। আমার ঘর কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কেড়ে নিতে পারেনি। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, লিখব, যা সত্য বলে বিশ্বাস করি তা বলবো…।”

শেষ কবে কারো বক্তৃতার শব্দচয়নে এমন সম্মোহিত হয়েছে এই শহর, জানা নেই। কিন্তু সেদিন তসলিমার সত্যিকথনে, সততার ভাষণে আমরা ফিরে পেলাম সেই সত্যি বলার সেই সাহস। সত্যিই কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই ঠিক। “অন্ধকারের সীমা পেরোলেই তসলিমা।”

সেদিন রবীন্দ্র সদনে কথার পরে গানের অনুষ্ঠান। সেখানে তসলিমার লেখা গানে মৌসুমী হোসেনের সুরে ও পরিববেশনায় কয়েকটি গানের মধ্যে একটা গান কানে লেগে রইলো। কারণটা অবশ্য ভিন্ন।

গানটার কথাগুলো ছিল — “…চলো চুম্বন করি ঠোঁটে/ কোনো ভয়াবহ মারনাস্ত্র চুম্বনের চেয়ে শক্তিশালী নয় /সন্তান জন্ম নিক আমাদের /সে সন্তানের নাম দেবো পৃথিবী…।” এই গানের সূত্র ধরেই আমার এক কনিষ্ঠা সহকর্মীর কথা মনে পড়ল। রবীন্দ্র সদনের এই অনুষ্ঠানের জন্য বহুদিন পরে লাইন দিয়ে দুটো আমন্ত্রণ পত্র সংগ্রহ করেছিলাম। একটা আমার নিজের আরেকটা আমার সেই কনিষ্ঠা সহকর্মীর জন্য। সন্তানসম্ভবা সেই মেয়েটি শারীরিক কারণে সেদিনের অনুষ্ঠানে আসতে পারেনি রবীন্দ্রসদনে। ফোনে আক্ষেপ করেছিল কতদিন ধরে অপেক্ষা করেছি এই দিনটার জন্য। যাওয়া হল না।

তাকে বললাম, তাতে কী, তসলিমাও তো কতদিন ধরে অপেক্ষা করে ছিল, আছেও। তাই তো লিখেছে,”…আমার জন্য অপেক্ষা করো মধুপুর, নেত্রকোনা, অপেক্ষা করো, জয়দেবপুরের চৌরাস্তা, আমি ফিরব।…” তসলিমাও কথা দিয়েছে আগামী বইমেলায় আসবে। ততদিনে নিশ্চয়ই ‘পৃথিবী’কে জন্ম দিয়ে ফেলবে আমার সেই একদা সহকর্মীটি। তসলিমা জানিয়েছে, এই শহর ডাকলেই চলে আসবে সে।

Taslima Nasrin

এই শহরটাকে যে সে বড়ো আপন করে নিয়েছিল। নির্বাসনের পরে দেশ খুঁজতে খুঁজতে কলকাতায় একটি ঘর পেয়েছিল তসলিমা। সেখানে বড়ো সুখে ছিল, স্বস্তিতে ছিল, সৃষ্টিশীল ছিল সে। এবার কলকাতায় পা রেখে নাগরিক সংবর্ধনা, বাংলা একাডেমির সংবাদিক বৈঠক, কফি হাউসের আড্ডা, খোলা হাওয়া সংস্থার গেট টুগেদার, সোদপুরে বেগম রোকেয়াকে শ্রদ্ধা জানানোর ব্যস্ত সিডিউলের ফাঁকে ৭ নম্বর রডন স্ট্রিটের বাড়িটাকেও একবার দেখতে এল তসলিমা। ছুঁয়ে দেখতে এল জীবনের ফেলে যাওয়া এক অধ্যায়কে। এই বাড়িটার ইট কাঠ পাথরে কত সুখের- দুখের স্মৃতি স্থানু হয়ে আছে। সেগুলোই এক ঝলক ঘুরে দেখতে এসেছিলেন তসলিমা।

সৌভাগ্যক্রমে সেই সময় আমি ওই বাড়িটার কাছেই ছিলাম। তসলিমা তার ফ্ল্যাটে গিয়েছে। ৭ নম্বর রডন স্ট্রিটের বাড়িটার সামনে আমি ঠায় দাঁড়িয়েই রইলাম নিরাপত্তারক্ষীদের বারণ না মেনে। ভরসা ছিল তসলিমা, সংশয়ও ছিল। প্রায় কুড়ি বছর পর আবার দেখা। চিনতে পারবে তো তসলিমা?

প্রথমটায় না পারলেও আমার কর্মভূমির নাম বলতেই চিনতে পেরে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল তসলিমা। তার নরম উষ্ণ হাতে হাত রেখে সেদিন মনে হল আমার হাতের মুঠোয় থোকা থোকা দেশ ধরা দিল। বাংলাদেশ, ভারত, ইউরোপ… যেখানে যেখানে তসলিমা ঘর খুঁজেছে। আসলে এই মুহূর্তে তসলিমার স্থায়ী কোনো ঘর নেই। তসলিমা সে-ই, যে নারীর কোনো দেশ নেই। না থাক, তসলিমা যে বিশ্বাস করে, শেষ পর্যন্ত কোনো মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।