লাল-হলুদ ব্রিগেডের আক্রমণে ছত্রখান মোহনবাগান
সে এক স্বপ্ন সার্থক হওয়ার দিন৷ রাতের আকাশে জ্বলে উঠল লাল-হলুদ মশাল৷ আলোর রোশনাইয়ে শাপমুক্তির আনন্দ উচ্ছ্বাস৷ দীর্ঘ বাইশটা বছরের প্রতীক্ষার অবসান৷ ডুরান্ড কাপ ফুটবলের ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের বাজিমাত৷ চির-প্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের নৌকোর ভরাডুবি৷ লাল-হলুদ ব্রিগেডের সংগ্রামী ফুটবলাররা ৪-১ গোলে মোহনবাগানকে হারিয়ে সেরা খেতাব তুলে নেওয়ার আহ্লাদে ডুরান্ড কাপে চুম্বনে ভরিয়ে দিলেন৷ এ অন্য এক অনুভূতি৷ অন্য লড়াই৷ শুধু বড় ব্যবধানে সবুজ-মেরুনকে হারানো নয়৷ এবারের ডুরান্ডে প্রথম সাক্ষাৎকারে হারের প্রতিশোধ নেওয়ার তৃপ্তি৷ তারপরে ডার্বি ম্যাচে এডমুন্ড লালরিনদিকার হ্যাটট্রিক৷ বাইচুং ভুটিয়ার পাশে নাম লেখালেন এডমুন্ড ডার্বি ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার সুবাদে৷
আসলে ইস্টবেঙ্গলের কোচ লোপেস হাবাসের মগজাস্ত্র আর গোপন রণকৌশলে প্রতিপক্ষ মোহনবাগানের দর্পচূর্ণ হয়ে গেল খেলার প্রথম পর্বেই৷ সেখানেই খেলার ফয়সালা হয়ে যায় ৪-১ গোলের ব্যবধানের৷ এই যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ১৯৯৭ সালে ফেডারেশন কাপ ফুটবলের শেষ চারের খেলায় ইস্টবেঙ্গল ৪-১ গোলে জয় পেয়েছিল মোহনবাগনের বিরুদ্ধে৷ আর ওই ম্যাচে বাইচুং ভুটিয়া হ্যাটট্রিক গড়ে নজির গড়েছিলেন৷ সেই ছবি দেখতে পাওয়া গেল ডুরান্ড কাপ ফুটবলের ফাইনালে৷ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সেদিন কয়েক হাজার দর্শক অবাক চোখে উপভোগ করলেন ইস্টবেঙ্গলের ভয়ঙ্কর রূপ৷ ইস্টবেঙ্গলের গর্জনে দিশেহারা হয়ে গেল সমুজ-মেরুন ব্রিগেড৷ সমুদ্রের বুকে হারিয়ে যাওয়া নাবিকের মতো এলোমেলো হয়ে মোহনবাগানের ফুটবলাররা শুধুই ছোটাছুটি করলেন৷

ডুরান্ডের প্রথম সাক্ষাৎকারে হেরে যাওয়ার বেদনা কোচ হাবাসকে অন্য চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল৷ তখন থেকে কোচ হাবাস গোপন ভাবনার অস্ত্রকে শান দিতে শুরু করেছিলেন৷ চূড়ান্ত পরীক্ষার একদিন আগে ফুটবল যোদ্ধাদের অনুশীলনে মাঠে ডাকেননি কোচ হাবাস৷ হাবাসের মতে, যদি ঠিকমতো অধ্যবসায় থাকা যায় তাহলে পরীক্ষায় পাশ করাটা কঠিন নয়৷ মনে রাখতে হবে, ফুটবলারদের মানসিক প্রস্তুতি ও আন্তরিকতা শেষ কথা বলবে৷ জেদ বলে একটা শব্দ আছে৷ সেই জেদকে সচল করার জন্যে মাঠের যুদ্ধে সেই কথা বলবে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে৷
হয়তো কোচ বুঝতে পেরেছিলেন প্রতিপক্ষ দলের ক্লান্তিকে টার্গেট করে এগিয়ে যেতে পারলে জয়ের পথে কোনও সমস্যা তৈরি হবে না৷ সেই ভাবনা অক্ষরে অক্ষরে প্রকাশ পেল৷ আর মোহনবাগান দলের কোচ পানাইয়োটিস দিলেমপেরিস ভুল করলেন ক্লান্তি নিয়ে ফুটবলারদের অনুশীলনে ব্যস্ত রাখলেন৷ হয়তো তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন ফাইনালের একদিন আগে কলকাতায় ফিরতে সমস্যা তৈরি হয়েছিল৷ কেন তিনি ক্লান্ত শরীরে থাকা ফুটবলারদের নিয়ে অনুশীলনে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন? যার ফলে ফুটবলাররা আরও বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন৷ হয়তো কোচের জানা ছিল না ডার্বি ম্যাচের রং একেবারে অন্য৷ আবেগ ও উৎসাহ খেলার চরিত্র বদলে দেয়৷ সেখানে কোনও আপোস নয়৷ যুদ্ধ আর যুদ্ধ৷ কোনও সময়ের জন্যে জমি ছাড়া নয়৷ লড়াইটা চরম জায়গায় পৌঁছে যায়৷ তারপরে মোহনবাগান
দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফুটবলার সাহাল আবদুল সামাদকে প্রথম একাদশে পাওয়া যাবে না চোটের কারণে৷ কেন মোহনবাগান কোচ সতর্ক হলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেল৷ যেখানে ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলাররা তিনদিনের বিশ্রামে থেকে ফুরফুরে মেজাজে লড়াই করতে নেমেছিলেন ফুটবল মাঠে৷ পাশাপাশি কোচ হাবাসের রণকৌশলে প্রথম থেকেই পিছিয়ে পড়েছিল মোহনবাগান৷ ইস্টবেঙ্গলের কোচ এমনভাবে দল সাজালেন, তা দেখে প্রতিপক্ষ দল প্রথমেই অবাক হয়ে যায়৷ নিয়মিত পজিসনের লাল-হলুদ ফুটবলারদের তুলে নিয়ে, তাঁদের এমনভাবে পজিশনে দাঁড় করিয়ে দিলেন, তা অভাবনীয়৷ মোহনবাগানের রক্ষণভাগের ফুটবলাররা বুঝে উঠতে পারলেন না বিপক্ষ দলের আক্রমণভাগের সেরা অস্ত্রটা কে?

প্রথম কয়েকটা মিনিট মোহনবাগান চাপ সৃষ্টি করলেও তারপরে তাদের ছন্দ হারিয়ে যায়৷ খেলার ১০ মিনিটে মহম্মদ রশিদের বাড়ানো পাস থেকে পাওয়া বল নিয়ে বিপিন সিং যেভাবে ছুটতে শুরু করলেন, তা সামাল দিতে শুভাশিস বসুরা হিমসিম খেয়ে গেলেন৷ বিপিন গোল করে ইস্টবেঙ্গলকে এগিয়ে দেন৷ ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণে হিমসিম খেতে হয় মোহনবাগানের ডিফেন্ডারদের৷ তারই মাঝে এডমুন্ডের গোল৷ দুই গোলে এগিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গলের দাপটে প্রতিপক্ষ দলের রক্ষণবাগের ফুটবলাররা কোনও ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলেন না৷ এডমুন্ড বল পেয়েই শুভাশিস বসুকে চোখের নিমেষে পিছনে ফেলে গোলরক্ষক বিশাল কাইথকে পরাস্ত করতে কোনও দ্বিধা প্রকাশ করলেন না এডমুন্ড৷ খেলার ৩৩ মিনিটে মোহনবাগানের মনবীর সিং গোল করে ব্যবধান কমালেও অদপে লাভ হল না৷ অপুইয়ার পা থেকে ছিটকে আসা বলটি নিজের আয়ত্বে নিয়ে এডমুন্ড আবার গোল করে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব দেখান৷
প্রথমার্ধের খেলার ফলাফল কোনও পরিবর্তন হয়নি দ্বিতীয় পর্বে৷ খেলা শেষ হতেই মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন৷ ইস্টবেঙ্গলের গতির কাছে যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল মোহনবাগান, তা বড় যন্ত্রণার৷ এইভাবে মোহনবাগানের নৌকার ভরাডুবি হবে, কেউই ভাবনার মধ্যে জায়গা দেননি৷ আর ইস্টবেঙ্গলের মশালের দ্যুতিতে ডুরান্ড কাপ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷

