শ্রীঅরবিন্দের দেশপ্রেম, বিপ্লব ও আধ্যাত্মিক যাত্রা

দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা থেকে দিব্যচেতনা: মহাতপস্বী শ্রীঅরবিন্দ

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ এক মহাপুরুষ। তিনি এমন এক জন ছিলেন, যাঁর জীবন বিপ্লব, দেশপ্রেম এবং আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে গঠিত। শ্রীঅরবিন্দের প্রজ্ঞা ও ত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের বহু বিপ্লবীকে অনুপ্রাণিত করেছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছাত্রজীবনের অন্যতম প্রিয় নেতা ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। অন্যদিকে শ্রীঅরবিন্দও নেতাজীকে বলতেন ‘একজন নির্ভীক নেতা’। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতমাতার এক স্বাধীন ও দিব্য আত্মা নিয়ে সুভাষের আগমন ঘটেছে। শ্রীঅরবিন্দ স্বামী বিবেকানন্দকে আধ্যাত্মিক দিকদর্শন, জাতীয় জাগরণ এবং মানবমুক্তির এক মহান পথপ্রদর্শক হিসেবে মানতেন। ফরাসি মণীষী রোমাঁ রলাঁ শ্রীঅরবিন্দকে “বিবেকানন্দের বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত উত্তরাধিকারী” হিসেবে ঘোষণা করেন।

শ্রীঅরবিন্দ একসময় বরোদার মহারাজার সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেই সময় ভগিনী নিবেদিতাকে প্রথম দেখেন। তাঁর আগুন ঝরানো বক্তৃতা শুনে অরবিন্দ নাম দিয়েছিলেন ‘শিখাময়ী’। শ্রীঅরবিন্দ ও তাঁর ভাই বারীন ঘোষের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিতা ছিলেন অন্যতম প্রধান পরামর্শদাতা ও সহায়ক। অনুশীলন সমিতি ও সশস্ত্র বিপ্লবকে আরো শক্তিশালী ভাবে গড়ে তোলেন। আলিপুর বোমা মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর শ্রীঅরবিন্দ ‘কর্মযোগীন’ নামে একটি সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকা শুরু করেন। যার প্রচ্ছদে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে রথে আসীন শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের ছবি ছিল। উপরে দুটি মূলমন্ত্র ছিল: ‘আমাকে স্মরণ করে যুদ্ধ কর’এবং ‘যোগই কর্মের কৌশল’।
১৯০৮ সালের মুরারিপুকুর ষড়যন্ত্র মামলা (আলিপুর বোমা মামলা) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টার পর ব্রিটিশ পুলিশ কলকাতার মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে হানা দেয়। অরবিন্দ ঘোষ ও তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষসহ বহু বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে মামলা লড়েছিলেন সেদিন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। প্রমাণের অভাবে অরবিন্দ ঘোষকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অরবিন্দ ঘোষের ঘর থেকে তল্লাশি করে পুলিশ পেয়েছিল দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির মায়ের ফুল ও গঙ্গার মাটি। আনাড়ি ব্রিটিশ পুলিশের মনে হয়েছিল সেগুলো বোমা তৈরির সরঞ্জাম।

Sri Aurobindo – দেশপ্রেম থেকে দিব্যচেতনার আধ্যাত্মিক যাত্রা
যে বাড়ি থেকে চন্দননগর হয়ে আধ্যাত্মিকতার পথে পাড়ি দেবেন শ্রীঅরবিন্দ। যে বাড়িতে পালিত হয়েছিল তাঁর শেষ জন্মদিন।

জেল মুক্তির পর অরবিন্দ আসলেন ৬, কলেজ স্কোয়ারে কৃষ্ণকুমার মিত্রের বাড়িতে। এরপর এখানেই তিনি থাকা শুরু করেন। সঞ্জীবনী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণকুমার মিত্র। ১৮৮৩ সালে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ পণ্যের বর্জনে এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ব্রাহ্মসমাজ নেতা কৃষ্ণকুমার নিজের বাড়িতে শ্রী অরবিন্দকে রেখেছিলেন। ১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস অবধি অরবিন্দ এই বাড়িতেই ছিলেন। কলেজ স্কোয়ারের পাশে আজো এই বাড়িটি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এক ফলকে সেই স্মৃতি লেখা আছে। এরপর এই বাড়ি থেকেই তিনি শ্যামপুকুরে একটি বাড়িতে মাত্র কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। তারপর ব্রিটিশ সরকারের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এড়াতে অরবিন্দ স্থির করলেন কলকাতা ছেড়ে চন্দননগরে যাবেন। কলকাতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন খুব দ্রুত। নিবেদিতা চেয়েছিলেন শ্রীঅরবিন্দের সমস্ত জাতীয়তাবাদী লেখাগুলো নিয়ে বই করবেন। ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ মহলে নিবেদিতার বেশ কিছু পরিচিত লোকজন ছিল। তারা খবর দেয় পুলিশ অরবিন্দকে পুনরায় গ্রেপ্তার করার পরিকল্পনা করছে। শ্রীঅরবিন্দের বিপ্লব ভাবনায় অন্যতম সহায়ক ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। এরপরে তিনি নিবেদিতাকে কর্মযোগিন পত্রিকার দায়িত্ব দিয়ে কলকাতা ছেড়ে চন্দননগর চলে যান। ১৫ই আগস্ট কলেজ স্কোয়ারের বাড়িতেই কলকাতায় তাঁর শেষ জন্মদিন পালিত হয়েছিল।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক সৃষ্টি ‘বন্দেমাতরম’ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের মূল ‘বন্দেমাতরম’ গানটিকে শ্রীঅরবিন্দ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তাঁর এই অনুবাদটি ১৯০৯ সালের ২০শে নভেম্বর ‘কর্মযোগিন’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। গানের মাধুর্য, অনন্য সুর ও সুগভীর আবেগকে অন্য কোনো ভাষায় হুবহু ফুটিয়ে তোলা যে কতখানি শক্ত কাজ, তা তিনি সোজাসুজি স্বীকার করে এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ‘বন্দেমাতরম’ কেবল একটি দেশাত্মবোধক গান নয়, বরং এটি পরাধীন ভারতের মুক্তি সংগ্রামের এক মহাজাগরণী ‘মন্ত্র’। অন্যদিকে, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশনেতা বিপিনচন্দ্র পাল ‘বন্দেমাতরম’ নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯০৬ সালের আগস্ট মাসে শ্রীঅরবিন্দ এই পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকায় শ্রীঅরবিন্দের তীব্র জাতীয়তাবাদী নিবন্ধগুলো পাঠ করে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকমহল চরম ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

শ্রীঅরবিন্দ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ‘নমস্কার’ কবিতায় লিখেছিলেন,

“অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহো নমস্কার।
হে বন্ধু, হে দেশবন্ধু, স্বদেশ-আত্মার
বাণীমূর্তি তুমি। তোমা লাগি নহে মান,
নহে ধন, নহে সুখ; কোনো ক্ষুদ্র দান
চাহ নাই কোনো ক্ষুদ্র কৃপা; ভিক্ষা লাগি
বাড়াওনি আতুর অঞ্জলি। আছ জাগি
পরিপূর্ণতার তরে সর্ববাধাহীন–
যার লাগি নরদেব চিররাত্রিদিন
তপোমগ্ন, যার লাগি কবি বজ্ররবে
গেয়েছেন মহাগীত, মহাবীর সবে
গিয়েছেন সংকটযাত্রায়, যার কাছে
আরাম লজ্জিত শির নত করিয়াছে,
মৃত্যু ভুলিয়াছে ভয়–সেই বিধাতার
শ্রেষ্ঠ দান আপনার পূর্ণ অধিকার
চেয়েছ দেশের হয়ে অকুন্ঠ আশায়
সত‍্যের গৌরবদৃপ্ত প্রদীপ্ত ভাষায়
অখণ্ড বিশ্বাসে।..”

দূর্গার রূপে ভারতমাতা
দূর্গার রূপে ভারতমাতা

শ্রীঅরবিন্দের বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক ছিল না, তা ছিল গভীর আধ্যাত্মিক। তাঁর কাছে ভারত কোন ভূখণ্ড মাত্র ছিল না, ভারত ছিল এক ‘মহাশক্তি’ । তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতমাতা স্বয়ং দেবী দুর্গারই এক রূপ। দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হলে সর্বাগ্রে এই মাতৃসেবায় নিজেকে সঁপে দিতে হবে। ভারতমাতা, দেবী দুর্গার সত্তা। ঠিক যেমন শিব এক দেবতা, তেমন ভারত হল, ‘ভারত মাতা’। এই মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার টান হলো দেশপ্রেম। স্বামীজি বিশ্বাস করতেন, শক্তির মাধ্যমে ব্রহ্মে উপনীত হওয়া যায়। ভারত মাতার রূপ যেন দেবী দুর্গা। তাঁর এক হাতে জাতীয় পতাকা ও অন্য হাতে ত্রিশূল। বাহন সিংহ। ভুবনেশ্বরের কেদার গৌরী মন্দিরে গর্ভগৃহের ভেতর চার হাত বিশিষ্ট দেবী গৌরীর শান্ত, সৌম্য ও তপস্বিনী মূর্তিতে যেন ভারত মাতার রূপ ফুটে ওঠে। তিনি কোন নতুন এক দেবী নন, বরং তিনি গৌরী বা দুর্গাই। শ্রীঅরবিন্দ বিশ্বাস করেছেন, ভারতকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হলে মাতৃসেবা করতে হবে। বিপ্লবের অগ্নিগর্ভ দিনগুলো পেরিয়ে শ্রীঅরবিন্দের এই মাতৃআরাধনা ও দিব্যচেতনা পরবর্তীকালে পন্ডিচেরিতে এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনায় রূপ নেয়, যা যুগ যুগ ধরে ভারতীয়দের পথ দেখিয়ে চলেছে।

তথ্যসূত্র;
বন্দেমাতরম, শ্রীঅরবিন্দ
নীরদবরণ
বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।