Raja Sen

স্মৃতির আয়নায় রাজা সেন

প্রথমে নাটক তারপরে চলচ্চিত্র জগতে রাজাদা মানে রাজা সেনের প্রবেশ। নাটকে অভিনয় করতেন, কাজ করেছেন শম্ভু মিত্রর সঙ্গে।

আমার এক দাদা ফোন করে বললেন রাজা সেনের চলে যাওয়ার খবর শুনে তোমার কথা মনে পড়ল। আসলে বিগত বেশ কিছু বছর ধরে রাজাদার সঙ্গে ভীষণ সুন্দর এবং ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। রাজাদার সঙ্গে অবশ্য আমার মায়ের পরিচয় দীর্ঘদিনের কলকাতা দূরদর্শনের সূত্রে। আমার সঙ্গে রাজাদার পরিচয় তপন সিংহর একটি তথ্যচিত্রর সূত্রে।

অনেকেই জানেন যে রাজা সেন চলচ্চিত্রর পাশাপাশি একাধিক তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে আলকাপের মত আবার। আবার অন্যদিকে রয়েছে সুচিত্রা মিত্র, তপন সিংহ, সমরেশ বসু এবং শম্ভু মিত্র প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কাজ। তাই তপন সিংহর জীবদ্দশায় তপন সিংহ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করবার পরে নন্দনে যখন তপনবাবু পরিচালিত ছোটদের ছবি নিয়ে চলচ্চিত্র উৎসব করি, তখন অন্যান্য বিশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে রাজাদাকেও ডেকেছিলাম। উনি এসেছিলেন, ওঁর সঙ্গে তখন থেকেই পরিচয়। এরপর যত দিন গড়িয়েছে সেই পরিচয় ততই ঘনিষ্ট হয়েছে। ওঁর সঙ্গে মিশে দেখেছিলাম এক কাজপাগল, খাদ্যরসিক এবং আড্ডাবাজ একজন দরদী মনের মানুষকে।

raja sen and arijit sing
পরিচালক রাজা সেনের সঙ্গে প্রতিবেদক অরিজিৎ মৈত্র

চলচ্চিত্র জগতে তিনবারের জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী মানুষটার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না। ওঁর তৈরি সুচিত্রা মিত্র ও তপন সিংহ বিষয়ক তথ্যচিত্র দুটি অনেকবার দেখেছি এবং দেখিওছি কিন্তু শম্ভু মিত্র এবং সমরেশ বসুর তথ্যচিত্র দুটি এখনও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সদস্য হওয়ার সুবাদে সিনেমা পাগল রাজা সেনকে জেনেছি, যিনি সকাল থেকে নন্দন প্রাঙ্গনে এসে একদম দিনের শেষ শো’টি দেখে তারপরে বাড়ি যেতেন। আপ্রাণ চেষ্টা করতেন যত বেশি সম্ভব ছবি দেখতে। দুপুরের খাওয়াটাও নন্দনেই সারতেন। শুধু কি ছবি দেখা, ছবি নিয়ে আলোচনা করতেও ভালোবাসতেন। নতুন কোনও ছবি দেখে সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতেন। নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের তৈরি ছবি ভাল লাগলে, সেই ভাল লাগা ভাগ করে নিতে কখনও কার্পণ্য করতেন না।

সুচিত্রা মিত্র চলে যাবার পরে তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির লালবাড়ি মানে বিচিত্রায় সুচিত্রামাসির স্বরণসভার শেষে ঠিক করেছিলাম রাজাদা নির্মিত তথ্যচিত্রটি দেখবো। কিন্তু সেই সময় ওই বিশেষ তথ্যচিত্রটি এখনকার মত সহজলভ্য ছিল না। ইউটিউবে তো পাওয়া যেতোই না। রাজাদাকে আমাদের অভিপ্রায়ের কথা জানালে উনি নিজের কাছে থাকা একটা সিডি আমাকে দেন এবং একই সঙ্গে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তথ্যচিত্রের প্রিন্টের মান ভাল হয়ে সমস্যা রয়েছে সাউন্ড নিয়ে।’ তাও সেদিন জোড়াসাঁকোতে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের মন ভরে গিয়েছিল! তথ্যচিত্রের শব্দ সংক্রান্ত সমস্যাটা কারুর মনেই রেখাপাত করেনি।

ক্রমেই দেখতাম রাজাদা কখন সবার অজান্তেই তপন সিনহা ফাউন্ডেশনের একজন হয়ে উঠেছেন। সম্ভবত ২০২৪ সালে এমন বর্ষার দিনে আমি আর রাজাদা বালি সিনে গিল্ড আয়োজিত তপন সিংহ এবং অরুন্ধতি দেবীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বালিতে যাচ্ছিলাম। সেদিন আর জি কর সংক্রান্ত ঘটনার জেরে শহর কলকাতা উত্তাল। আবার অন্যদিকে ঘোর বর্ষার জন্য কলকাতার অধিকাংশ রাস্তাই জলমগ্ন ছিল। সেসব সমস্যা সত্ত্বেও আমরা বালিতে গিয়ে পৌছলাম একেবারে অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে। আমরা দুজনেই বক্তব্য রাখলাম। ফেরার পথে খাদ্যরসিক রাজাদা গাড়ি থামিয়ে অনেক খাবার কিনলেন। সারা রাস্তা আমরা সেইসব খাবারের সদব্যবহার করতে করতেই নিজেরদের বাড়ি ফিরে এলাম। বালি সিনে গিল্ডের সদস্যদের রাজাদা সেদিন কথা দিয়েছিলেন ভবিষ্যতে ওঁরা যদি আবারও এমন অনুষ্ঠান করেন এবং ওঁকে ডাকেন, তাহলে উনি আবারও যাবেন।

raja sen
পরিচালনার ফাঁকে রাজা সেন

তপন সিংহর জীবনের একদম শেষ একটি পরিকল্পনা রাজাদাই বাস্তবায়িত করেন। ‘তিনমূর্তি’ নাম দিয়ে তিন বন্ধুর অবসর জীবনের একটা গল্প নিয়ে তপনদা একটা চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। ঠিক করেছিলেন ছবি তৈরি করবেন কিন্তু ওঁর মনের ইচ্ছের সঙ্গে শরীর সঙ্গ না দেওয়ার জন্য কাজটা শেষ করতে পারেননি। ছবির জন্য পাত্র-পাত্রীও নির্বাচন করে ফেলেছিলেন। ঠিক হয়েছিল ছবিতে অভিনয় করবেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র প্রমুখ। তপনদার জীবনাবসানের পরে রাজাদা ছবিটার কাজ শেষ করেন। সেই ছবিতে অবশ্য তিনি নিজের পছন্দ অনুযায়ী কিছু পরিবর্তন করেন কিন্তু মূল কাহিনিটাকে অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। প্রযোজক ছিলেন তপনদারই বিশেষ পরিচিতি জালান সাহেব। ছবিটার সম্পর্কে অনেকে অনেক মত পোষণ করলেও ব্যক্তিগতভাবে আমার কিন্তু ছবিটা খুব একটা খারাপ লাগেনি।

একদিন রাজাদা ওঁর বাড়িতে আমাকে ডেকে তপন সিংহ সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের জন্য। ইচ্ছে করলে তিনি নিজেই ওগুলো ওঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহতে রেখে দিতে পারতেন। শেষ দেখা মাস ক’য়েক আগে একটি চিত্রপ্রদর্শনীতে। সেদিন জানতাম না যে ওটাই আমাদের শেষ সাক্ষাৎ! অনেক পরিকল্পনা, অনেক ইচ্ছে অসম্পূর্ণ রেখে চলে যেতে হল তাঁকে! ভাল লাগত যদি রাজাদা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে যে তথ্যচিত্রের কাজে হাত দিয়েছিলেন, সেটা শেষ করতে পারতেন। সেই সময়টা আর বোধহয় ওঁর সামনে ছিল না।

 

সদ্যপ্রয়াত পরিচালক রাজা সেনের প্রতি ‘শনিবারের চিঠি’র শ্রদ্ধার্ঘ্য