saanibarer-chithi-food-receipe-and story

ফিশ মুনিয়া, ফ্রেঞ্চ টোস্ট আর ছানার পায়েস

সুখ খুঁজে বেড়াই যতই, আসলে তো বন্ধ মুঠোয় হাওয়াই থাকে। মন ডুবিয়ে তার নামেতে, চোখ বুজলে পাবে দুঃখ ভোলা জল বাতাসা।

“প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা হয়ে এসেছে। রাতুলের মতো ট্রেন মিস করা লোকজন বোধহয় নেই আর কেউ। থাকার কথাও নয়। এই ২০২৬ -এও যে এমন এক স্টেশন থাকতে পারে, যেখানে দিনমানে সাকুল্যে দুবার ট্রেন থামে, এটা ইনস্টায় দিলে অবাক হওয়ার ইমোজি আসবে গুচ্ছ গুচ্ছ। ওই বাউল আর রাতুল ছাড়া স্টেশন চত্বর খালি হয়ে গেল। নেহাৎ শীতের সকাল নয়টা। নাহলে তো রোদে পুড়ে ছাই হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। মনে পড়তেই খুব ক্ষিদে পেয়ে গেল। ভোর পাঁচটায় আলতাফের বাইকে চেপে প্রায় দেড় ঘণ্টা। তারপর ট্রেকার। দু ঘণ্টার পথ তিন ঘন্টা। দোষ দেওয়া যাবে না। এখানে সময় গড়িয়ে গড়িয়ে চলে।

দিনাজপুরের মানুষজন বড় গপ্পে। যেখানে যেমন চলে। ওটাই ওই হদিশের চলন। তাতে তোমার কী এলো গেল, তাতে সবার বয়েই গেল।

রুকস্যাকের অর্ধেকের বেশি জায়গা নিয়েছে ক্যামেরা। পিঠে তুলে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আসে। পরের ট্রেন রাত আটটায়। কিম কর্তব্য? টিকিট কাটে। কোনও হোটেল? খাবার জায়গা? মাফলার জড়ানো রেলবাবু হেসেই খুন। এখানে? খাওয়ার জায়গা ওই মাকিনা। টোটোতে আধা ঘণ্টা। হপ্তায় দু’দিন হাট বসে। সব কেনাকাটি ওতেই। কাল ছিল।
হতাশ হয়ে একটা বেঞ্চে বসে পড়ে। পাখির ছবি তুলতে গিয়ে এমন বিপত্তি রাতুলের প্রথম নয়। সিঙ্গলিলাতে একবার পথ হারিয়ে সারা দিন উদভ্রান্ত। এক নেপালী পরিবারের দয়ায় সেবার বাঁচোয়া। একটা ছোট অ্যাম্বুলেন্সে এসে দাঁড়াল। সালোয়ার কামিজে এক তরুণী। চশমা। স্নিকার। ক্লিপে আটকানো হাতখোঁপা। টিকিট কাউন্টারে। ওর দিকে তাকিয়ে কিছু কথাবার্তা চলছে মনে হয়। ঝিমুনি লাগছে।

হ্যালো। ঘুমিয়ে পড়লেন? ওই তরুণী। বেশ সুন্দরী তো! আপনার কথা কমলবাবু বললেন। উঠুন। চলুন আমার সঙ্গে। বাধ্য মানুষের মতো এগোয় রাতুল। অ্যাম্বুলেন্সে উঠে বসে। আমি মনীষা। উঠে বসে নেভিগেটর সিটে। গাড়ী চলতে থাকে। ভয় পাবেন না। আপনাকে অপহরণ করা হচ্ছে না। মনীষা বেশ সপ্রতিভ। এই গোবিন্দপুরে কি কাজে? আমি পাখির ছবি তুলি। নেশা। আঞ্জিনা পাখিরালয়, কুমারগঞ্জ। ওখানেই এসেছিলাম। আলতাফের সঙ্গে দেখা। ঢেপা নদীর পাড়ে পাড়ে দুদিন। আজ দশটার ট্রেন ধরার ছিলো। রাতুল চুপ করে। সময় নেয়।

Every thing is pre fixed in Life। মনীষা হাসে। মিনিট কুড়ি পার। একটা PHC। মনীষা নেমে পড়ে। আসুন। একজন মাঝবয়সী লোক এগিয়ে আসেন। হাসিমুখ। ট্রেনের টিকিট নিতে গিয়ে কি নিয়ে এলে? ইনি রাতুল। কুড়িয়ে পেলাম। হাসিটা কি সুন্দর। ঝকঝকে। খুউব তাজা। ডানদিকের টা আমার কোয়ার্টার। মানে, আমার ট্রেন আটটায়। জানি। কমলবাবু বলেছেন। আমিও দিন তিনেকের জন্যে বাড়ি যাবো। ওই ট্রেনেই। ভাববেন না। বিজলিদি, ওনাকে একটু চা করে দাও। আমাকেও।

চায়ের টেবিলে কথা হয়। ডাক্তার। এক বছর এসেছেন। প্রথম পোস্টিং। বাড়ি কল্যাণী। একাই? একা কোথায়? সবাই আছে। এক্সট্রা লার্জ ফ্যামিলি। মনীষার হাসিটা খুব সংক্রামক। অকারণেই। শুনুন, আপনাকে কিন্তু ভালো মন্দ খাওয়াতে পারবো না। থাকবো না কদিন তাই রিসোর্স লিমিটেড। আরে, ম্যাডাম, কিচ্ছু লাগবে না। এই তো, চা বিস্কুট খেয়ে নিলাম। আমার অভ্যেস আছে। অতিথি নারায়ণ। পাপে ডুবে মরবো তো। তাই চাইছেন? আবার হাসে।

রাতুলের তোলা ছবি ক্যামেরা থেকে দেখায়। গল্পে কথায় কোথা দিয়ে ঘণ্টা চারেক পার হয়ে যায়। সঙ্গী পেলে মানুষ বকবক করে। পাখির মতো। বিজলী চটজলদি যা বানিয়েছিল খাবার কিন্তু বেশ চমৎকার। বানালেই হয়।

french-toast

দুটো ডিম একটা কানা উঁচু পাত্রে ফাটিয়ে নিন। এক চামচ চিনি, দু চিমটে নুন, চাট মসলা আর টাটকা গুঁড়ো করা গোলমরিচ কিছুটা দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। ওতে দু হাতা ঠাণ্ডা দুধ মিশিয়ে নিন। এবার একটা ফ্রাইং প্যান মৃদু আঁচে বসিয়ে ওতে কিছুটা সাদা তেল গরম হতে দিন। টাটকা পাঁউরুটি এবার ওই ব্যাটারে ভালো করে ডুবিয়ে নিয়ে ধীরে সুস্থে সোনালি বাদামী করে ভেজে তুলে ব্লটিং পেপারে অতিরিক্ত তেল শুষে নিন। দিব্যি গেলে বলতে পারি, এমন কোমল ও সুস্বাদু ফ্রেঞ্চ টোস্ট ফরাসীরাও খেতে পেলে বর্তে যাবে।

fish-munia

শুধু ফ্রেঞ্চ টোস্ট কি আর লোককে দেওয়া যায়? দু ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চি মাপে খুব উন্নতমানের বাংলা ভেটকির ফিলে নিতে হবে। চারশো গ্রাম। একটা পাতিলেবুর রস, এক চামচ তাজা গুঁড়ো গোলমরিচ, এক চামচ নুন, এক চামচ আদা রসুন বাটা আর ধনিয়া পুদিনা পেস্ট এক চামচ। প্লিজ , আদা রসুন টাটকা বেটে নিন। রেডি পেস্টের সঙ্গে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই মিশ্রণটা মাছের ফিলেগুলোর সঙ্গে যাতে খুউব ভালো করে মাখো মাখো আলাপ পরিচয় করতে পারে, সে দায়িত্ব আপনার। এয়ার টাইট বক্সে আধ ঘন্টা সময় দিন। গোবিন্দভোগ চাল বড় দেড় চামচ গুঁড়ো করে নিন। ওর সাথে এক চামচ কর্ন ফ্লাওয়ার, দেড় চামচ ময়দা, এক চিমটে বেকিং সোডা, আধ চামচ নুন দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। এবার একটা ডিম ভেঙে ওতে মেশাতে হবে। অল্প অল্প জল যোগ করুন। ব্যাটারটা পায়েসের ঘনত্ব হবে। ফ্ল্যাট কড়া। কিপটেমো না করে তেল দিন। এক ভাগ সর্ষে তেল, ভালো করে গরম হলে দু ভাগ সাদা তেল। গরম তেলে ব্যাটার চুপচুপে মাছের ফিলেগুলো সোনালি রঙের এপিঠ ওপিঠ ভেজে নিন। ও হ্যাঁ, ব্যাটার মাখানোর আগে মাছের টুকরো থেকে জলীয় ভাব শুষে নিতে হবে শুকনো কাপড় বা ব্লটিং পেপারে।

এই বাংলা স্টাইল ফিশ মুনিয়া আর কোথাও পাবেন না। বাংলার বাইরে। গ্যারান্টি। আসলে ফিশ মুনিয়ের একটা ফ্রেঞ্চ ডিশ। অল্প তেলে নন স্টিক প্যানে সেঁকে নেওয়া মাছের ওপর মাখন, লেবুর রস, নুন আর পার্সলে কুঁচি দিয়ে তৈরি মুনিয়ের সস আর আলুভাজা ( ফ্রেঞ্চ ফ্রাই) এর সহযোগিতায় একটা কমপ্লিট ডিশ। তাতে কি? আমাদের রসনা উল্লসিত হলেই হল।

সে বলতে গেলে আসল ফ্রেঞ্চ টোস্ট তো সামান্য কুসুমছাড়া ডিমের সঙ্গে বেশ খানিক দুধ আর চিনির মিশ্রণে ডোবানো পাঁউরুটি মাখনে ভেজে তোলা। কিন্তু আমাদের এই প্রণালিটাই পছন্দ। বলে না, আপ রুচি খানা। খাদ্য সংস্কৃতির বিপ্লব তো এমন করেই আসে। এর জন্যে যুদ্ধ করে দেশ জয়ের দরকার নেই। স্বাদের ভিতর দিয়া হৃদয়ে পশিল রে/ আকুল করিল মোর প্রাণ। নাহলে কি আর কলকাতায় বিরিয়ানির জন্ম হত?

খ্রিস্টাব্দের প্রথম শতকে রোমান লেখালেখিতে ফ্রেঞ্চ টোস্ট ধরনের এক খাদ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে তাতে ডিমের যোগদান ছিল না। দুধে পাঁউরুটি ভিজিয়ে তাকে ভেজে মধূ মাখিয়ে খাওয়ার চল ছিল। দুধে ডিম, চিনি, দারচিনি ইত্যাদি মিশিয়ে ব্যাটার তৈরির কথা ত্রয়োদশ শতকে পাওয়া যায়। ফ্রেঞ্চ শেফ গুলিয়ামে তেলিভেন্ট তার নাম দেন তস্তিস ডোরিস। ওটাই বর্তমান ফ্রেঞ্চ টোস্টের বাপ ঠাকুর্দা। ফ্রেঞ্চরা কিন্তু একে ডাকে পেন পার্দু নামে, যার মানে লস্ট ব্রেড। কানাডিয়ানরা ডাকে পেন ডোরে মানে সোনালি রুটি। আবার হাঙ্গেরিয়ানরা ডাকে ফারি ব্রেড। জিপসি টোস্ট কিংবা মুম্বইয়ের বম্বে টোস্ট সবই ফ্রেঞ্চ টোস্টের রকমফের। হংকং -এ আবার হরেক রকমের পুর দিয়ে স্যান্ডউইচ করে বিক্রি হয় দেখেছি।

chhanar payes

ফিশ মুনিয়া নিয়ে এতরকম ইতিহাসের কচকচি নেই। আগেই বলেছি এটা একান্তভাবেই ফরাসি রন্ধনশৈলীর আবিষ্কার। শেষ পাতের মিষ্টিমুখ নিয়ে একটু চর্চা হোক। টাটকা ছানা কাটিয়ে নিন ৩০০ গ্রাম আন্দাজ। এবার ৫০০ মিলি দুধে জ্বাল দিয়ে একটু ঘন। দু চামচ কনডেন্সড মিল্ক। ফ্রেশ ক্রিম বড় দু চামচ, এক ইঞ্চি দারচিনি, গোটা দুই তিন ছোট এলাচ। কম আঁচে অবশ্যই। ভালো করে ফুটতে থাকলে কুঁচিয়ে রাখা কটা পেস্তা আর ছানাটা ওর মধ্যে দিয়ে হালকা হাতে নাড়াচাড়া। মিনিট পাঁচ। মিস্টি একটু বেশি চাইলে চার পাঁচটা বাতাসা। দু মিনিটে ওটা মিশিয়ে নিতে হবে। ব্যস। ছানার পায়েস তৈরি। বলেছিলাম না, খুউব সহজ।

আসলে ভালোবাসলেই কঠিনও সহজ হয়ে যায়। যারা গণিতের পূজারী তারা জানে। আমি অবশ্য তাদের দূর থেকে নমো করে বিশ ফুট দূরত্ব রেখে চলে যাই। আরে বাবা, নিজের সম্মানের দায়িত্ব তো নিজেরই। তাই তো!

মনীষা রাতুলকে ট্রেন ধরিয়ে দিয়েছিল ঠিকঠাক। তার পরের কথা আমি জানিনা। আমার এত্তগুলো কাহিনীর এত্তো জন কুশীলব। সবার ঠিকুজি কুষ্ঠি রাখা কি সম্ভব? আপনারাই বলুন!