সাবিত্রী বাঈ ফুলে—প্রথম দলিত শিক্ষয়িত্রী ও নারীশিক্ষা আন্দোলনের অগ্রদূত

সাবিত্রী বাঈ ফুলে : প্রথম দলিত শিক্ষয়িত্রী

উনিশ শতকের মহারাষ্ট্র কেমন ছিল ? সংক্ষেপে বলা যায়, বৃহত্তর ভারতের মূল ধারার যে সংস্কার আন্দোলন, মহারাষ্ট্রও তার বাইরে ছিল না। পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে ভারতে একদিকে যেমন যুক্তিবাদী সমাজ ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের বিকাশ ঘটে, মহারাষ্ট্রেও তেমনি প্রায় একই পথ ধরে সমাজ পরিবর্তনের হাওয়া বইতে থাকে। ভারতে যেমন প্রচলিত বাল্যবিবাহ ও জাতি – বর্ণ প্রথাবিরোধী আন্দোলন চলছিল, স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে সওয়াল করছিল একপক্ষ, মহারাষ্ট্রও তেমনি বাকী ভারতের সঙ্গে পা মিলিয়ে সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলন গড়ে তুলছিল। এর পেছনে ছিল বিদেশি শিক্ষা, খ্রিস্টীয় ধর্মান্তকরণ আর প্রযুক্তির অগ্রগতি। এইসব আলোচনায় জাতপাতের বিচার ও নারীজাতির অধোগতির প্রশ্নও মাঝেমধ্যে মাথা তুলে উঁকি দিচ্ছিল। মহারাষ্ট্রের যে সব চিন্তাবিদ এসব কথা নিয়ে ভাবছিলেন তাঁদের মধ্যে উঠে আসছিল, বিশেষ কয়েকজনের নাম। এঁরা হলেন বালাশাস্ত্রী জাম্বেকর, ভাউ মহারাজ এবং দাদোবা পাণ্ডুরং। ইনি ‘দর্পণ ‘ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এই পত্রিকার পাতায় গোঁড়া হিন্দুত্বের তীব্র সমালোচনা করা হত। মহারাষ্ট্রে উনিশ শতকীয় সমাজ সংগঠন ছিল অনেক। পরমহংস সভা, প্রার্থনা সমাজ, আর্য সমাজ তাদের অন্যতম। কিন্ত এদের সকলের মুখের উপর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন জোতিরাও ফুলে। তিনি যখন সামাজিক আন্দোলনে যোগ দেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র একুশ । দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রথম সামিল হলেন ফুলে দম্পতি। বিদ্রোহ আর প্রতিবাদ ছিল তাঁদের রক্তে। জন্মলগ্ন থেকেই সেই বিদ্রোহের সূত্রপাত। তাঁদের জেহাদ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে । পিতৃদত্ত নামেও তাঁর আপত্তি ছিল। ‘জ্যোতিরাও’ নয় জোতি । সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী , জ্যোতির’য’ ফলা বাদ দিলেন তিনি। তাঁর নাম হল জোতিরাও ফুলে ।

সম্ভবত ১৮২৭ সালে জোতিরাও -এর জন্ম , আর ১৮৪৭ সালে তিনি পড়ে ফেললেন টমাস পেইনের ‘রাইটস অফ ম্যান’। ফরাসী বিপ্লবের চিন্তাবিদ জন লক , মন্তেস্ক্যু, রুশো, ভলটেয়ার ছিলেন পেইনের চেতনার উৎস । টমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিঙ্কন ছিলেন তাঁর প্রেরণার মূলে । পরবর্তী কালে মার্টিন লুথার ও নেলসন ম্যাণ্ডেলা আন্দোলন আমাদের ফুলের কথা মনে করিয়ে দেয়। সামাজিক সমতা ছিল ফুলের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

জোতিরাও -এর পারিবারিক পদবী ছিল গওঢ়হে । তাঁদের এক পূর্বপুরুষ কোন অত্যাচারী ব্রাহ্মণ কুসিদজীবীকে হত্যা করার পর থেকে তাঁরা কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী হয়ে ওঠেন। তাঁরা তাঁদের আদি বাসস্থান লালগুন ত্যাগ করে পুনের কাছে একটি জায়গায় বসতি স্থাপন করে তাঁদের পেশাগত ব্যবসায়ে লিপ্ত হন। তাঁরা ফুলের চাষ শুরু করেন। তাঁরা ছিলেন নিচু ক্ষত্রিয় মালি সম্প্রদায়ভুক্ত, কুনবি উপজাতি পরিবার। এঁরা ছিলেন শূদ্রাতিশূদ্র। যদিও জোতিরাও-এর লেখাপড়ায় আগ্রহ ছিল গভীর। তবু তাঁর ছাত্র জীবনে একাধিকবার ছেদ পড়ে। ব্রাহ্মণরা জোতির লেখাপড়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করলে। জোতির বাবা বাধ্য হয়ে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ করে দেন। পরে আবার জনৈক ফারসী ও উর্দু শিক্ষক গফফর বেগ মুন্সী ও একজন পাদ্রীর চেষ্টায় জোতির লেখাপড়া আবার শুরু হয়। জোতি হাইস্কুল অবধি লেখাপড়া করতে পেরেছিলেন। সমাজের নিয়মরক্ষার তাগিদে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সে ন’ দশ বছরের সাবিত্রীকে বিবাহ করেন। সাবিত্রী এক নিম্ন বিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। এবং বিবাহের সময়ে নিরক্ষর ছিলেন। তাঁরাও ছিলেন মালি সম্প্রদায় ভুক্ত।

সাবিত্রীর বিবাহোত্তর জীবন চেনা পথে পা বাড়ায়নি। জোতিরাও -এর সংস্পর্শে এসে তাঁর চলার পথটাই পালটে গেল। জোতিরাও সাবিত্রীকে তাঁর চলার পথের সঙ্গী করে নিলেন। এখানেও সাবিত্রীর স্কুলে পড়ার বাধা হলেন ব্রাহ্মণরা । জোতিরাও সাবিত্রীকে তাঁর শিক্ষাদর্শে উদ্বুদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। তিনি শুধু সাবিত্রীর স্বামী রইলেন না । তিনে নিজে স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখাতে শুরু করলেন। একাধারে স্বামী ও গৃহশিক্ষকের ভূমিকা পালন করলেন তিনি । এর ফলে জোতিরাও তাঁর আন্দোলনে একজন সক্রিয় সঙ্গীকে পাশে পেলেন। সাবিত্রীকে লেখাপড়া শেখানোর অপরাধে জোতিরাওকে সস্ত্রীক বাড়ি ছাড়তে হল। জোতিরাও আশ্রয় নিলেন তাঁর এক বন্ধুর বাড়িতে। উসমান শেখ। উসমানের স্ত্রী ফতিমা ছিলেন যথেষ্ট শিক্ষিত ও প্রগতিশীল। এঁদের সংস্পর্শে এসে সাবিত্রীর চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন ঘটল। ফতিমা সাবিত্রীর সহযোদ্ধায় পরিণত হলেন।

এরপর সাবিত্রীকে নিজে কিছুদিন পড়ানোর পর জোতিরাও তাঁর দুই বন্ধুকে এই দায়িত্ব দিলেন। এখানে ছ’ বছর কাটানোর পর সাবিত্রী আর ফতিমাকে পাঠানো হল মিশনারীদের স্কুলে । সেখানেই সাবিত্রী প্রশিক্ষণ পেলেন শিক্ষিকা হওয়ার। প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষিকা। কারণ জোতিরাও জানতেন মেয়েদের লেখাপড়া না শেখালে কোন জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। ১৮৪৮ সালে জোতিরাও পুণায় একজনের বাড়িতে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন। এটিই হল ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। নারীশিক্ষার ইতিহাসে এটি রীতিমত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অতএব স্বচ্ছন্দে বলা যায়, বাংলার বিদ্যাসাগরেরও আগে ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মহারাষ্ট্রের এক দলিত দম্পতি। এবং প্রথম শিক্ষিকা সাবিত্রী বাঈ ফুলে। বিদ্যাসাগরও মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য অনেক লড়াই করেছিলেন। কিন্ত জোতিরাও-এর লড়াইটা ছিল আরও কঠিন। বিদ্যাসাগরের
লড়াই ছিল তখনকার ভদ্র শ্রেণীর মেয়েদের জন্য। কিন্ত জোতিরাও কে লড়তে হয়েছিল দলিতদের মতো অনগ্রসর এক সমাজের জন্য। ‘শিক্ষা’ শব্দটির সঙ্গেই যাদের পরিচয় ছিলনা বংশানুক্রমে ।

অনেকে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ঈশ্বর চন্দ্র নিম্নবর্গের মানুষদের জন্য কিছু করেননি। তবে জোতিরাও যা করেছিলেন নিম্নবর্গের মানুষের জন্যই। কিন্ত এ প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্ক তুলে লাভ নেই। কারণ, এ ক্ষেত্রে স্থান – কাল – পাত্রের কথা অবশ্য বিচার্য। বিদ্যাসাগর আর জোতিরাও -এর লড়াইয়ের ক্ষেত্রটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। হয়তো জৈবনিক কর্মকাণ্ডে উভয়ের অনেক জায়গাতেই মিল ছিল। আবার চলার পথটা অনেক জায়গাতেই আলাদা। তাই জোতিরাও বা বিদ্যাসাগরকে আলাদা করে ‘মহান’ বলে চিহ্নিত করা অর্থহীন। এঁরা দু’জনেই যার যার নিজের মতো করে ধর্ম নিরপেক্ষ, মানবতাবাদী ও যুক্তিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন একথা অস্বীকার করে লাভ নেই।