মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কলকাতা ফুটবল লিগ জয় ও ট্রফি উদযাপন

অভিনব লিগ জয়ের পতাকা ওড়াল মোহনবাগান

অভিনব কলকাতা ফুটবল লিগ৷ ভারতে কেন, সারা বিশ্বে এমন ফুটবল লিগ প্রত্যক্ষ করা যায় না৷ সেই ফুটবল লিগ পরিচালনা করে অইএফএ নজির গড়েছে৷ আইএফএ-এর দূরদর্শিতায় অভিনব কলকাতা ফুটবল লিগে খেতাব জিতল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট৷ আট বছর বাদে মোহনবাগানের ঘরে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি শোভা পেল মহামেডান স্পোর্টিংকে হারিয়ে৷ দীর্ঘ বছরের প্রত্যাশা পূরণ হল সবুজ-মেরুন ব্রিগেডের৷ দশ হাজারি বারাসত স্টেডিয়ামে লিগ খেতাব নির্ণায়ক ম্যাচে মোহনবাগান ৩-২ গোলে মহামেডান স্পোর্টিংকে হারিয়ে এই কৃতিত্ব দেখাল৷ এমনকি পিছিয়ে থেকে রুদ্ধশ্বাস জয়ের মুখ দেখল মোহনবাগান৷

আর সেই সময় দশজনে খেলছিল সবুজ-মেরুন ব্রিগেড৷ এই জয় মোহনবাগানের ফুটবলারদের উজ্জীবিত করেছে৷ আর তাই তো খেলা শেষ হতেই এক সমর্থকের হাত থেকে সবুজ-মেরুন পতাকা নিয়ে সারা মাঠে ছুটতে থাকেন রাজ বাসফোর৷ তাঁর সঙ্গে জুটি বাঁধেন জয়ের নায়ক সায়ন ব্যানার্জি৷ আনন্দের জোয়ারে ভাসলেন কোচ বাস্তব রায়৷ অনেক সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে‍ মোহনবাগানকে লিগ খেতাব তুলে দেওয়ার জন্য কাঁদতে থাকেন কোচ৷ তারই মাঝে কোচ বাস্তব রায়কে টেনে নিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে উৎসবে সামিল হলেন সাহাল আব্দুল সামাদ, রবিলাল মাণ্ডি, মনবীর সং ও দীপ্রভাত ঘোষরা৷ সারা স্টেডিয়াম জুড়ে মোহনবাগানের জয়ধ্বনিতে সমর্থকরা উত্তাল৷ সবুজ-মেরুন জয়ের নৌকো সেই জয়ের স্রোতে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভেসে চলেএছ৷ এই সাফল্য শুধু প্রাপ্তি নয়, অনেক সমালোচনার জবাব৷

কলকাতা ফুটবল লিগে গোলের পর মোহনবাগান ফুটবলারের উচ্ছ্বাস ও সমর্থকদের উদযাপন

আসলে ডুরান্ড কাপ ফুটবলের ফাইনালে যেভাবে ইস্টবেঙ্গলের কাছে হার স্বীকার করেছিল, তা নিয়ে কটাক্ষের তীরে বিদ্ধ হয়েছিল মোহনবাগান৷ তারপরে কলকাতা ফুটবল লিগে কয়েকটা ম্যাচ হতাশ করেছিল সমর্থকদের মোহনবাগান৷ তাই সংশয় দেখা দিয়েছিল সবুজ-মেরুন ব্রিগেড সুপার সিক্সে খেলতে পারবে কিনা? তারপরে সেই সংশয়কে পিছনে ফেলে সুপার সিক্সে খেলার ছাড়পত্র পেয়ে যায় মোহনবাগান৷ ছয় দলের খেলায় গ্রুপ লিগের কোনও পয়েন্ট যোগ হবে না৷ তারপরেও অদ্ভুত নিয়ম ছয় দলের মধ্যে একে অপরের বিপক্ষে খেলবে না৷ গ্রুপ থেকে উঠে আসা তিনটি করে দল একে অন্য গ্রুপের দলগুলির সঙ্গে খেলবে৷ অর্থাৎ তিনটি ম্যাচের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে লিগ খেতাব নির্ণয় করা হবে৷ এক অদ্ভুত নিয়মের প্রবর্তক আইএফএ৷ অবশ্য লিগে অংশগ্রহণকারী ক্লাবগুলো চোখ বুজে এই নিয়মের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাল৷ ক্লাবের কর্মকর্তারা উপলব্ধি করলেন না কলকাতা ফুটবল লিগ একেবারে ছেলেখেলায় পরিণত হবে৷ এই নিয়ম যে ফুটবলারদের কাছে সর্বনাশ ডেকে আনছে তা ভ্রূক্ষেপ করলেন না কর্মকর্তারা৷ ছোট দলের অনেক ফুটবলাররা তিনপ্রধান মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল এবং মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে লড়াই করার সুযোগই পেলেন না৷ তাঁদের দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ হারিয়ে গেল৷ সেইসব ফুটবলাররা আগ্রহ প্রকাশের ইচ্ছা অন্ধকারে ডুবে গেল৷ যেখানে কলকাতা ফুটবল লিগ থেকে সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের তুলে আনা, সেখানে হারিয়ে যাওয়ার বাস্তব ছবিটা স্পষ্ট হল৷ তরুণ ফুটবলারদের স্বপ্ন অঙ্কুরেই ঝরে গেল৷
তারপরে ছয় দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জটিল অঙ্কটা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিল৷ পাঁচটা দলের কাছে লিগ খেতাব হাতছানি দিতে থাকে৷

এমন পরিস্থিতিতে গোল পার্থক্যটা ভাইটাল রূপ নেয়৷ মোহনবাগান ও মহামেডান স্পোর্টিংয়ের সামনে জয় ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না লিগ জয়ের লক্ষ্যে৷ যদি ড্র হত, তাহলে ইস্টবেঙ্গল সেই লক্ষ্যে শেষ ম্যাচে বড় গোলের ব্যবধান প্রয়োজন ছিল কোল ইন্ডিয়ার বিপক্ষে৷ অন্য দিকে ভবানীপুর ও ইউনাইটেড স্পোর্টসের খেলায় যে দল জিতবে তারাও লিগ খেতাবের দাবিদার হয়ে উঠবে৷ এই পরিস্থিতিতে তিনটি ম্যাচেই একদিনে আয়োজন করা হল৷
বারাসতে মোহনবাগান খেলল মহামেডান স্পোর্টিংয়ের বিপক্ষে৷ ইস্টবেঙ্গল নিজেদের মাঠে মুখোমুখি হল কোল ইন্ডিয়ার সঙ্গে৷ বারাকপুর স্টেডিয়ামে লড়াই করল ভবানীপুর ও ইউনাইটেড স্পোর্টস ক্লাব৷ একই সময়ে তিনটি ম্যাচ রাখা হয়েছিল৷ হয়তো গটআপের গন্ধ থেকে দূরে থাকতে এই ব্যবস্থা আইএফএ আয়োজন করে৷ সবার লক্ষ্য ছিল বারাসত স্টেডিয়ামে মিনি ডার্বি ম্যাচে মোহনবাগান ও মহামেডান স্পোর্টিংয়ের দিকে৷

কলকাতা ফুটবল লিগে গোলের পর মোহনবাগান ফুটবলারের উচ্ছ্বাস ও সমর্থকদের উদযাপন

খেলার শুরু থেকে মিনি ডার্বি ম্যাচের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে৷ সেই অর্থে ঘরের ছেলে বলতে সবুজ-মেরুন শিবির থেকে সাদা-কালো ব্রিগেডে বেশি ছিল৷ প্রথম পর্বে মোহনবাগানের সাহাল আর মহামেডানের লালরেমসাহ্গা ফ্রানাইয়ের গোলে খেলার চরিত্র ১-১ হয়ে যায়৷

দ্বিতীয় পর্বে মোহনবাগানের গোলরক্ষক দীপ্রভাত ঘোষ মহামেডানের রেলসাঙ্গাকে বক্সের মধ্যে কোমর জড়িয়ে ফেলে দিলে রেফারি পেনাল্টি দিতে ভুল করেননি৷ পেনাল্টি থেকে মহামেডানের মহিতোষ রায় গোল করে দলকে (২-১) এগিয়ে দেন৷ তাহলে কি মোহনবাগানের তরী কুলে এসে ডুবে যাবে? তারপরে গোলরক্ষক

দীপ্রভাতের লাল কার্ড৷ দশজনের মোহনবাগানকে লড়াই করতে হবে টানা তিরিশ মিনিট প্রতিপক্ষ মহামেডানের বিপক্ষে৷কঠিন যুদ্ধের মাঝে মোহনবাগানের সাহাল গোল করে খেলায় সমতা (২-২) ফেরান৷ তবুও সমর্থকদের হৃদস্পন্দন উচ্চমার্গে পৌঁছে‍ যেতে থাকে৷ তার মাঝে সায়ন ব্যানার্জি যেন ঝলসে উঠলেন৷ সাহালের পাস থেকে সায়ন বাঁ পায়ের জোরালো শটে মহামেডানের গোলের জালে বল জড়িয়ে দিতেই (৩-২) জয়ের উল্লাসে মোহনবাগানের সমর্থকরা মেতে ওঠেন৷ ইস্টবেঙ্গল ৭-০ গোলে কোল ইন্ডিয়াকে হারিয়ে রানার্স হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হল৷ ইউনাইটেড স্পোর্টস ক্লাব ও ভবানীপুরের খেলায় কোনও গোল না হওয়ায় মোহনবাগানের শাপমুক্তি হল আট বছর বাদে কলকাতা ফুটবল লিগ খেতাব জয়ের মধ্যে দিয়ে৷ লিগ জয়ের পতাকা উড়ল মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে৷