বিকানেরের বিজুরী মুর্গ মুসল্লম ও চুরচুর পরোটা

বিকানিরের বিজুরী মুর্গ মুসল্লম আর চুরচুর পরোটা

আজ বরং প্রথমে একটা মশলা বানিয়ে ফেলা যাক। একটু এটা সেটা মিশিয়ে নিলেই সব রকমের মাংসের জন্য একদম পারফেক্ট। আস্টেরিক্স পড়েছেন নিশ্চয়ই। সেই আশ্চর্য গলদের নিয়ে চিরকালীন কার্টুন ! ওখানে বৈজ্ঞানিকের নামটা বাঙলা অনুবাদে ভারী চমৎকার। এটা সেটা মিক্স। তো এখন নিজেকে তা-ই ভাবুন।

একটা তাওয়া নিন। ওতে দু ইঞ্চি মাপের দারচিনি চারটে। জায়ফল একটা। জৈত্রী এক চা চামচ। সা জিরে আর সা মরিচ এক চামচ করে। লবঙ্গ আর কাবাবচিনি এক টেবিল চামচ করে। পিপুল গোটা পাঁচ, বড় এলাচ সমপরিমাণ। গোলমরিচ এক চা চামচ। ওই চামচের মাপে দু চামচ করে ধনে আর জিরে। স্টার অ্যানিশ তিনটে। তিনটে ফ্রেশ তেজপাতা ছোট টুকরো করে নিন। আদাশুট ( শুকনো আদা) দেড় ইঞ্চি। তাজা মৌরি এক চামচ। জোয়ান আধ চামচ আর ( ভ্রূ কুঞ্চিত করবেন না প্লিজ) কালো সর্ষে চা চামচের চার ভাগের এক ভাগ। এইবার ওভেন জ্বালুন। একদম কম আঁচে তাওয়া বসিয়ে কাঠের খুন্তি দিয়ে খানিক নাড়াচাড়া। মশলার গন্ধ বেরোচ্ছে? আগুন বন্ধ করে দিন। গরম তাওয়ায় মশলা নাড়তে থাকুন আরও মিনিট পাঁচ। ঠাণ্ডা হলে গুঁড়িয়ে নিন। এয়ারটাইট কন্টেইনারে দুটো আস্ত স্টার অ্যানিস দিয়ে ফ্রিজে রাখুন। ব্যাস। আপনার ম্যাজিক গরম মশলা তৈরি।

আসলে এটা এই কাহিনির অংশই নয়। বিকানীর স্টেশনে নেমে রাতুল দেখে জিন্স টপ আর বেসবল ক্যাপ পরা সুন্দরী। হাতের প্ল্যাকার্ডে ওর নাম। খামাগানি, ম্যায় হুঁ বিজুরী সোলাঙ্কি। আপকা ট্যুর গাইড কাম পাইলট। রাতুলের মুখে মাছি ঢুকে পড়ার অবস্থা। যাকগে। নভেম্বরের এই সন্ধেয় অবাক হওয়ার জন্যে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। জিমনি। নাভিগেটর সিট। গাড়ী চললো হুস্। লক্ষ্মী নিবাস প্যালেস হোটেল। ট্রাভেল এজেন্সির বুকিং। ওকে স্যার, কাল সুভা ন বাজে মিলতে হ্যায়। চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেলো। বিজুরিই বটে। উফফফ। একটু সুইমিং পুল। হাল্কা ডিনার সেরে ঘুম।

ঠিক সকাল নয়টা। বুফেতে জলখাবার সেরে ক্যামেরা নিয়ে রিসেপশন। কোণের একটা চেয়ারে পাইলট ম্যাডাম বসে আছে। ওকে স্যারজি। পাক্কা টাইমিং। সকালের আলোয় কৃতি শ্যানন লাগছে।
‘আপ নাস্তা কর লিয়া?’ হামারা ঘরমে সবলোগ আট বাজে সারে দিন কে লিয়ে ঠুস লেতে হ্যায়। চলিয়ে। আপকো মশালা ট্যুর করনা হ্যায় তো?’

সুবোধ বালকের মতো ঘাড় নাড়ে রাতুল। শহর ছাড়িয়ে গাড়ি চলল। ড্রাইভিং সেন্স দারুণ। মানতেই হবে। চলিয়ে , ইঁহা পহলে মাথা টিক লেতে হ্যায়। কর্নি মাতাকা মন্দির। চুহাকে লিয়ে ফেমাস। রাতুল কিছুতেই যাবে না। একরকম জোর করেই ওকে ধরে নিয়ে গেলো বিজুরি। সে এক অভিজ্ঞতা। হাজার হাজার ইঁদুর চতুর্দিকে। মেঝেতে, দেওয়ালে, সর্বত্র। পায়ের ওপর দিয়ে, গায়ের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। লোকজন নির্বিকার।’ কাটতা হ্যায়? ‘ ক্যা পাতা? জি –সায়েদ নেহি। বেরিয়ে এসে ধড়ে প্রাণ এলো। কেউ যদি ইঁদুর মেরে ফেলে তাকে সোনার ইঁদুর গড়ে দিতে হবে। কেউ মারেনি নিশ্চয়ই। পাগল নাকি?

এখানে আমাকে নিয়ে এলে কেন? আরে স্যারজি, এহি তো দেশনক গাওঁ। ফেমাস মশালা ভিলেজ। পায়ে পায়ে গ্রামের ভেতর। এক কিমি আগে থেকেই মশলার গন্ধ মাতোয়ারা। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই নানান রকমের মশলা। দাওয়াতে ধনে, জিরে, শুকনো লঙ্কা রোদে দেওয়া, নরম আঁচে লোহার কড়াইতে সেসব ভাজা হচ্ছে আর পেষাই হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের হামানদিস্তে , কোনোটা কাঠের, কোনোটা পাথরের আর জাঁতাকলে। ক্যামেরা চলছে ক্লিক ক্লিক। মুগ্ধ রাতুলের চোখের সামনে মির্চ মশালা। এখানে বিখ্যাত লঙ্গি মির্চ। যেমন যোধপুরে মাথানিয়া মির্চ। আভি অপকো লে চলুঙ্গি বাজারমে। ভিখারাম চাঁদমল অর ছোটু মোটু যোশী। খিলায়েঙ্গে পিঁয়াজ কি কোচৌরি। ইয়াদ করোগে লাইফ লঙ।

মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকেই সময় কেটে যায়। একটু লজ্জা পায় রাতুল। লজ্জায় কি নারীজাতির একচেটিয়া অধিকার নাকি? বললেই হল? ইসস।‘ কোই প্রবলেম না হো তো, আপ আজ হামারা সাথ ডিনার কর লিজিয়ে না ‘। নো ইস্যু। চলিয়ে। এয়সি ভি লছমি নিবাস কা খানা পুরি বিকানের মে মস্যুর হ্যায়।’

চলুন, আজ আমরা সেই ডিনার প্লেট বানিয়ে ফেলি। শুরুতে ওরা যে লোকাল ফ্রেশ বাসা মাছের ফিশ এন্ড চিপস্ আর শেষ পাতে রোজ ফালুদা নিয়েছিলো ওগুলো বাদ। বাকি রইলো মুর্গ মুসল্লম আর চুরচুর পরোটা।

একটা কিলোটাক সাইজের কচি মুরগী নিন। বাংলা ড্রেসিং। মানে ছাল ছাড়ানো। গলা বাদ দিয়ে গোটা মুরগিটাই চাই। ধারালো সরু ছুরি দিয়ে সারা শরীরে হাল্কা হাতে চিরে দিন। একটা পাত্রে দেড়শো গ্রাম জল ঝরানো দই নিন। ওতে পরিমাণ মত নুন, আধখানা পাতিলেবুর রস, এক চিমটে হলুদ, আদা রসুন বাটা এক চামচ, জিরে, ধনে, কাশ্মিরী লংকা গুঁড়ো আধ চামচ করে । ভালো ভাবে সবগুলো মিশিয়ে নিন। এইবার মুরগিকে আগাপাশতলা এই মিশ্রণ মাখিয়ে দিন। বাচ্চাকে যেমন করে ঠাকুমা দিদিমা তেল মাখায়, ওই রকম ভাবে। ভেতর বাইরে, সবটুকু। এইবার দুশো গ্রাম চিকেন কিমা ( একটু মিহি) নিতে হবে। ওতে এক চামচ সর্ষে তেল, এক চামচ আদা রসুন কাঁচা লঙ্কা কুঁচি, এক চিমটে গোলমরিচ গুঁড়ো আর একটু নুন দিয়ে ভালো করে মেখে নিন। একটা হাঁসের ডিম সেদ্ধকরে গোটা ডিমটাকে ওই কিমার জামা পরিয়ে দিন। এই ডিমের কাঁচা চপ ( অন্য আর কি বলা যায়!) মারিনেটেড মুরগির পেটে ঢুকিয়ে দিন। এইবার একটা সুতো দিয়ে পা দুটোকে একসাথে বেঁধে দিন।

মুসল্লম মানে হল গোটা বস্তুটা রান্না করা। শব্দটার অর্থ হল সম্পূর্ণ বা অক্ষত। আওয়াধি মুঘল রান্নার এক সম্মানীয় পদ। ইবন বতুতার বক্তব্য, মুহাম্মদ বিন তুঘলক নাকি এই পদটি ভীষণ পছন্দ করতেন। আওয়াধি রান্নার মূল মন্ত্র লম্বা সময় ধরে কম আঁচে দমে রান্না। অনেকে কিমার সঙ্গে ছোট টুকরো করা শুকনো ফল ও দিয়ে থাকেন। দিব্যি লাগে খেতে। বলে না, আপ রুচি খানা!

এইবার গ্রেভি তৈরির পালা। তার আগে একটা ছোট হাঁড়িতে দু চামচ ঘি গরম করে ওতে এক চামচ জৈত্রি আর পাঁচ ছয়টা ছোট এলাচ দিয়ে দিন। অল্প নুন। এবার মুরগির চল্লিশ শতাংশ ডুবে থাকার মত জল। ফুটতে থাকলে ওর মধ্যে মুরগিটা দিয়ে কম আঁচে ঢাকা দিয়ে রাখুন কুড়ি পঁচিশ মিনিট। একটা কড়ায় দু চামচ ঘি আর বড় এক চামচ সর্ষে তেল। দুটো বড় পিঁয়াজ মিহি কুচনো, একটা তেজপাতা আর এক ইঞ্চি দারচিনি। কম আঁচে হতে দিন। ওই জল ঝরানো দই দুই বড় চামচ, এক চামচ লঙ্কা গুঁড়ো, হলুদ, জিরে, ধনে গুঁড়ো, ওই প্রথমে তৈরি করা গরম মশলা এক চামচ আর এক চামচ মধু। পুরোটা সুন্দর করে মিশিয়ে নিন। কড়ায় পিঁয়াজের সঙ্গে এক চামচ আদা রসুন বাটা। দু মিনিট পর দইয়ের মিশ্রণটা যোগ করুন। অল্প আঁচে হাল্কা হাতে নাড়তে থাকুন। তেল ছাড়লে ওতে আরও একটু ঘি আর জৈত্রী ছোট এলাচ গুঁড়ো দিয়ে দিন। মুঘলাই খানা। নো কঞ্জুষী । পঁচিশ মিনিট হয়ে গেছে। হাঁড়ি থেকে মুরগিটা তুলে নিন। স্টকটা কড়ায় দিয়ে দিন। এইবার ওই হাঁড়িতে এক চামচ ঘি গরম করে ওর মধ্যে মুরগিটা রাখুন। ওপর থেকে গ্রেভিটা ঢেলে ভালো করে মিশিয়ে দমে দিন। পুরো রান্নাটাই মৃদু আঁচে। দশ পনেরো মিনিট পরই আপনার মুর্গ মুসল্লম তৈরি। বেশ ঝামেলার রান্না। হাজার হোক, বাদশাভোগ্য বলে কথা। সাত মণ তেল পুড়লে তবে তো রাধা নাচবে!

এর সঙ্গে একটা চুরচুর পরোটা হলে জমে ক্ষীর। ময়দা, একটু নুন, কিছুটা চিনি, ঈষদুষ্ণ জল। হাতে অল্প ঘি মেখে মাখতে থাকুন। ময়দা মাখতে হবে টেনে টেনে। জানেন তো? তবেই গ্লুটেনের বাঁধুনি মোলায়েম হয়। আর আটা ঠিক উল্টো। ঠেলে, ঘুষি মেরে ডলতে হয়। নাহলে জলকণাগুলো আটায় মিশবে কি করে? ইচ্ছে হলে একটু ইস্ট বা দই দিতে পারেন মাখার সময়। মিনিট কুড়ি রেষ্ট। এবার কয়েকটা মন্ড করে নিন। একটু তেল দিয়ে পাতলা আর বড় করে বেলে উদার ভাবে ওতে তেল / ঘি মাখান। চোখ বুজে ভাবুন, টেন্ডার পাওয়া বা পেমেন্ট পাওয়ার জন্যে সরকারি অফিসের বড়বাবুকে পটাচ্ছেন। এবার পরতে পরতে ভাঁজ করে সাপের কুণ্ডলী পাকিয়ে রাখুন। ওপর থেকে আরও একটু তেল। তাওয়া গরম হলে মন্ডটা বেলে নিন। উল্টে পাল্টে মাঝারি আঁচে সেঁকে নিন। নামানোর পর দু হাত দিয়ে পরোটাকে বার কয়েক থাবড়ালেই তৈরি আপনার ঝুরঝুর পরোটা। আর দেরি কেন? ঝাঁপিয়ে পড়ুন লজ্জা না পেয়ে। খাদ্য তো খাইয়েদের জন্যেই। তাই তো!

না না। রাতুল আর বিজুরির গল্প এখানেই শেষ। সব কিছুতে অমন মধুরেন সমাপয়েৎ হয় না সত্যিকারের জীবনে। তবে পরে কখনও রাতুল ওহিও ইউনিভার্সিটি গিয়েছিল কিনা আর বিজুরীর সঙ্গে ইয়ে হয়েছিল কিনা এসব খবর আমার কাছে নেই। নেই মানে নেই।