প্রাচীন রাঢ়দেশের গ্রাম দেবতা দ্বারিকাচন্ডীর নামে দ্বারহাট্টা। মূর্তিরূপী দেওথানে গ্রামবাসীদের সংস্কৃতি জড়িয়ে। পদ্মফুলের উপর বসে আছেন চতুর্ভুজা চন্ডী। সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। নিরিবিলি গ্রাম্য পরিবেশে সিংহ রায়দের নির্মিত দ্বারিকাচণ্ডী মন্দির ও টেরাকোটার রাজ-রাজেশ্বর মন্দির পাওয়া যায়। এককালে দ্বারহাট্টার পাশ দিয়ে বয়ে যেত দামোদর। বর্তমানে কিছুটা সরে গিয়ে এগারো কিলোমিটার দূরে চাঁপাডাঙ্গার কাছ দিয়ে বইছে। আদিতে সিংহ রায় পরিবারের সঙ্গে ছিল চাঁদ বণিকদের সম্পর্ক। দামোদরের প্রবাহপথে চলত বাণিজ্য।

প্রাচীন সময়ে রাঢ় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বণিক সম্প্রদায় এই নদের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত পণ্য ও নানা ধরনের সামগ্রী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাত। চাল, রেশম, সুতি বস্ত্র, চিনি এবং বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য পরিবহণ করতেন। দামোদরের তীরবর্তী বহু এলাকা ছোট-বড় নৌবন্দরে রূপান্তরিত হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা নৌকায় পণ্য বোঝাই করে মোহনার দিকে যেতেন।
লোকশ্রুতি বলে, সমুদ্র বণিক চাঁদ সওদাগরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী সিংহ রায় পরিবার প্রতিষ্ঠা করেন দেবী চণ্ডীর এক পুণ্যপীঠ। কালের নিয়মে মূল দেবীবিগ্রহটি বিনষ্ট হলে স্তব্ধ হয়ে যায়নি আরাধনা। প্রায় বহু বছর ধরে কোনো প্রতিমা ছাড়াই, কেবল ঘট স্থাপন করেই নিষ্ঠাভরে সম্পন্ন হয়েছে নিত্য পুজো। অবশেষে, দেড় দশক আগে দেবীর স্বপ্নাদেশে দেবীমূর্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। সিংহ রায় পরিবার নবরূপে প্রতিমা গড়ে তোলেন। আজও দুর্গোৎসবের দিনগুলোতে মন্দির প্রাঙ্গণ দীপশিখায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

দ্বারহাট্টায় ঐতিহ্যের পাতা উল্টোলেই যে স্থাপত্যটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হল রাজ-রাজেশ্বর মন্দির। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও মন্দিরটি আজও যেন বাংলার মন্দিরস্থাপত্যের এক নীরব দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে। স্থাপত্যের গায়ে ছড়িয়ে থাকা টেরাকোটা অলংকরণে ধরা পড়েছে সময়ের শিল্পভাবনা। পূর্বমুখী আটচালা মন্দিরটির প্রবেশপথে রয়েছে তিনটি খিলান। সেই খিলান পেরিয়ে মন্দিরের সম্মুখভাগের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে টেরাকোটার অসংখ্য ফলক। টেরাকোটা চিত্রে উঠে আসে রাম-রাবণের যুদ্ধ, নৌকাবিলাস, দুর্গার চিত্র। এমনকী পর্তুগিজ সৈন্যদের চিত্র স্থান পেয়েছে মন্দিরের টেরাকোটা ফলকে।
এসকল নিদর্শন যেন বাংলার বিস্মৃত সময়ের এক পুঁথি। যার প্রতিটি ফলক খুলে দেয় অতীতের একটি করে দরজা।

