প্রথম পর্ব
রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনসায়াহ্নে উপনীত হয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর জীবন ও দেশমাতৃকার মনোবৃত্তির পরিণতি অনিবার্য কারণে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছে৷ এদেশে বৈচিত্র্যের মধ্যে যে ঐক্যসাধনা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে তার বিচ্যূতি লক্ষ করে তিনি মর্মবেদনা অনুভব করেছিলেন এবং সেই বিচ্যূতির মধ্যে যে গভীর যন্ত্রণা ক্রিয়াশীল ছিল, তা তিনি অকুণ্ঠচিত্তে ব্যক্ত করেছিলেন৷ ভারতীয় অধিবাসী হিসেবে সমগ্র বিশ্বের কাছে আমরা কার্যত পৌঁছেছি সাম্প্রতিক ইংরেজ আমলে৷ আমরা ইংরেজ জাতির পরিচয় লাভ করেছি একটি মহৎ সাহিত্যের ইতিহাস থেকে৷ ইংরেজি সাহিত্যের কালজয়ী সাহিত্যকার বার্ক ও মেকলের ভাষা-ভঙ্গিমার রূপবৈচিত্র্য, শেক্সপিয়রের নাটক ও বায়রনের কাব্য পাঠককুলকে অতিশয় মুগ্ধ ও পরিতৃপ্ত করেছিল৷
পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে সেই মুহূর্তে ভারতের লোকসাধারণ সেই ইংরেজ জাতির কাছে স্বাধীনতার সাধনায় মগ্ন হয়েছিল৷ তাদের মহানুভবতার প্রতি এদেশের নরনারীর এমনই বিশ্বাস জন্মেছিল যে, আমাদের মতো একটি বিজিত জাতির প্রতি নিশ্চয়ই সেই মহান জাতির দাক্ষিণ্য প্রদর্শিত হবে৷ একদা সেই ইংরেজ জাতির আদর্শ ও ঐতিহ্য অতি গৌরবদীপ্ত ছিল৷ প্রকৃতপক্ষে তাঁরা দুর্বল ও পীড়িত জনগণের আশ্রয়স্থল ছিল৷ শান্তি ও মৈত্রীর জন্য একদা তাদের পরিচয় সুবিদিত ছিল৷ স্বভাবত, বিশ্বের নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে তাঁদের স্থান অনেক শীর্ষে ছিল৷ তখনও পর্যন্ত তাঁদের চরিত্রের দাম্ভিকতা, হিংসা ও স্বার্থপরতার মলিনতা৷ তাঁদের মনুষ্যত্বকে দীর্ণ করতে পারেনি৷
রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের সূচনালগ্নে ইংল্যান্ডে গিয়ে সেদেশের একজন বিশিষ্ট মনীষী জন রাইটের বক্তৃতা শুনে অতিশয় মুগ্ধ হয়েছিলেন৷ তাঁর বক্তৃতায় বিশ্বে ইংরেজ জাতির শাশ্বতকালের বাণী উচ্চারিত হয়েছিল৷ তাতে তিনি জাতিগত সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববাসীর কল্যাণের কথা সগৌরবে ব্যক্ত করেছিলেন৷ তাঁর সেই বক্তৃতার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ মনুষ্যত্বের চিরকালের একটি মহৎ রূপকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন৷ একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে সেদিন তাঁর বক্তৃতার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ যে সত্যকে আবিষ্কার করেছিলেন তা শুধু একটি বিশেষ জাতির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না, তা সর্বব্যাপী মনুষ্যত্বের মহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল৷ বলা বাহুল্য, ইংরেজি সাহিত্যের দীপ্ত মহিমায় রবীন্দ্রমানস বহুকাল আপ্লুত হয়েছিল৷
আমাদের দেশ সভ্যতার যে রূপ প্রত্যক্ষ করে এসেছে মনু তাকে সদাচার নামে অভিহিত করেছিলেন৷ আর ইংরেজ জাতি তাকে সিভিলাইজেশন বলে ভূষিত করেছিল৷ এদেশের মানুষ সেই সিভিলাইজেশন বা সভ্যতাকে কতকগুলি সামাজিক নিয়মের বন্ধন বলে মনে করেছিলেন৷ প্রাচীনকালে সেই নিয়মের বন্ধনগুলি একটি সংকীর্ণ ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ ছিল৷
দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যসূত্রে বলা হয়েছে যে, সরস্বতী ও দৃশদ্বতী নদীর মধ্যবর্তী যে দেশ তা ব্রহ্মাবর্ত নামে খ্যাতি লাভ করেছিল৷ সেই দেশের মানুষের আচার-আচরণকে একদা সদাচার বলা হত৷ আর সেই আচার-আচরণের ভিত্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পন্থা-পদ্ধতির ওপর নির্ভর করত৷ সেই পন্থা-পদ্ধতির মধ্যে একসময় অবিচার বা নিষ্ঠুরতা বিদ্যমান থাকায় মানুষের মনের স্বাধীনতাকে তা খর্ব করত৷ কালের নিয়মে দেশের সদাচার তো ক্রমান্বয়ে লোকাচারে পরিণতি লাভ করে৷ পরবর্তীকালে ইংরেজ রাজত্বে এই বাহ্যিক আচার-আচরণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে৷ মূলত ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবেই মানুষ এই বাহ্যিক আচরণের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল৷ সমকালীন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের এই আচরণ সম্পর্কে মনীষী রাজনারায়ণ বসু তো অনেক কথাই বলেছিলেন৷ আর এইসব আচরণের পরিবর্তে মানুষের সততার আদর্শকে এদেশের মানুষেরা ইংরেজ জাতির চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে তা গ্রহণ করেছিলেন৷ এই সদাচারের পরিবর্তে মানুষের সভ্যতার আদর্শের মাধ্যমে আমাদের দেশে তখন যে পরিবর্তন ঘটেছিল, তাতে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও নীতি-নৈতিকতার পন্থা-পদ্ধতিকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করা হয়েছিল৷
রবীন্দ্রনাথ এই প্রসঙ্গে তাঁর অভিব্যক্তি জানিয়ে বলেছিলেন, “আমি সেই ভাবের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলুম এবং সেই সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক সাহিত্যানুরাগ ইংরেজকে উচ্চাসনে বসিয়েছিল৷’ এরপর একদা যে ইংরেজ-জাতি মানব-সভ্যতাকে মানুষের চারিত্রিক গুণ থেকে সৃষ্ট বলে অভিহিত করেছিল পরবর্তীকালে তারাই ক্ষমতার মদমত্ততার কারণে মানুষের সকল মানবিক গুণগুলি ভূলুণ্ঠিত করেছে৷ এরই পরিপ্রেক্ষিতে কবিকে একটা মুহূর্তে সকল প্রকার রসসাহিত্যের অঙ্গন থেকে অতি দ্রুত নির্গমণ করতে হয়েছিল৷
এদেশের মানুষের অন্তহীন দারিদ্র্য কবিকে নিদারুণ ব্যথিত করেছিল৷ শাসক ইংরেজ ভারতবর্ষের লোকসাধারণের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সমস্যার কোনওটাই সুষ্ঠু সমাধান করতে পারেনি বলে রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছিলেন৷ অথচ এই দেশের মানুষের সকল সম্পদ নির্দ্বিধায় তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে৷ তাদের জন্য ভোগ্য উপকরণ তো এদেশই সরবরাহ করেছে৷ একটি বিপুল শক্তিসম্পন্ন রাজশক্তির উদ্দেশ্যে সর্বস্ব তুলে দেওয়ার এমন দৃষ্টান্ত বোধ হয় বিশ্বে বিরল!
সমকালীন বিশ্বে সভ্য দেশগুলির মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল ইংল্যান্ড৷ তাদের মাহাত্ম্য গুণে সেই সময় এদেশের সাধারণ মানুষেরা প্রকৃতপক্ষে মগ্ন ছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথ এই প্রসঙ্গে তাঁর মনোভঙ্গি ব্যক্ত করে বলেছিলেন, “যখন সভ্যজগতের মহিমাধ্যানে একান্ত মনে নিবিষ্ট ছিলেন তখন কোনওদিন সভ্যনামধারী মানব-আদর্শের এত বড় করে নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই পারিনি; অবশেষে দেখছি, একদিন এই বিকারের ভিতর দিয়ে বহু কোটি জনসাধারণের প্রতি সভ্যজাতির অপরিসীম অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদাসীন্য উগ্র হয়ে উঠল৷’
ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের প্রতি ইংরেজদের সীমাহীন শোষণ, পীড়ন ও বঞ্চনায় রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে বেদনা অনুভব করেছিলেন৷ তারা যে যন্ত্রশক্তির দ্বারা জগতের ওপর কর্তৃত্ব করতেন তা থেকে এই হতভাগ্য দেশবাসী বরাবর বঞ্চিত হয়েছে৷ অথচ সেই যন্ত্রশক্তির প্রকৌশল অবলম্বন করে জাপান কীবাবে অগ্রগতির লক্ষ্যে এগিয়ে গিয়েছে৷ সেই দেশে স্বজাতির মধ্যে সভ্যশাসনের রূপ প্রত্যক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ অভিভূত হয়েছিলেন৷
ক্রমশ

