Rabindranath Tagore

অশীতিবর্ষপূর্তি উৎসবের অভিভাষণ ও রবীন্দ্রবীক্ষণ – দ্বিতীয় পর্ব

(দ্বিতীয় পর্ব)
প্রথম পর্ব পড়ুন

রাশিয়ার মস্কোতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ঐকান্তিক উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন৷ সেখানকার রাষ্ট্রীয় অধিকারের অংশ নিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ ঘটেনি৷ সেখানে মানুষের স্বার্থ নিয়ে সংগঠিত শাসনব্যবস্থার মধ্যে যথার্থ সত্য যেন প্রকৃত ভূমিকা গ্রহণ করেছিল৷ রবীন্দ্রনাথের মতে, বর্তমান বিশ্বে ইংরেজ ও সোভিয়েত রাশিয়া বহু সংখ্যক রাষ্ট্রশক্তির ওপর তাদের কর্তৃত্বের প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ৷ ইংরেজরা তাদের অধীনস্থ রাষ্ট্রের যাবতীয় শক্তি নিষ্পেশন করে তাদের চিররুগ্ন করে রেখেছে৷ অন্যদিকে, সোভিয়েত রাশিয়া বিশ্বের অতি দুর্বল রাষ্ট্রগুলিকে সবল করে তোলার জন্য নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছিল৷ আর সেইসব দুর্বল জাতির অধিকাংশ ছিল মরুচর মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত৷ রবীন্দ্রনাথ বলেন, একদা পারস্য দেশও দু’টি ইউরোপীয় জাতির অসহ্য চাপে ক্লিষ্ট হয়ে পড়েছিল৷ সেই চাপ থেকে একসময় সেই পারস্য জাতি আত্মশক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করেছিল৷ বলাবাহুল্য, পরবর্তীকালে সেখানে জাতি‍-হিংসা প্রশমিত হয়েছিল৷ একদা আফগানিস্তানের মানুষেরা শিক্ষা ও সমাজনীতির ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা অর্জন করতে সমর্থ হবে বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন৷ কেননা, সভ্যতাদর্পিত কোনও ইউরোপীয় জাতি এখনও তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি৷ আর এদিকে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ ইংরেজদের সেই দুর্বিষহ কঠোর শাসনে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছিল৷

রবীন্দ্রনাথের মতে, চিনের মতো একটি প্রাচীন বৃহৎ জাাতিকেও এই ইংরেজদের প্রভাবে দুর্বল হতে হয়েছিল৷ একদা উত্তর চিনকে জাপান গিলে ফেলতে অগ্রসর হয়েছিল৷ জাপানের সেই দানবীয় কর্মকাণ্ডকে ইংরেজরা তুচ্ছ বলে অভিহিত করেছিল৷ একদা স্পেনের গণতান্ত্রিক সরকারকেও ইংরেজরা দুর্বল করার কাজে লিপ্ত হয়েছিল৷ আবার সেইসময় এও দেখা গিয়েছিল যে, ইংরেজ জাতির একটি অংশ বিপদাপন্ন স্পেনের মঙ্গল বিধানের জন্য আত্মসমর্পণ করেছিল৷ তবে ইংরেজ জাতির এই ঔদার্য চিনের সেই সংকট মুহূর্তে পরিলক্ষিত হয়নি৷
পরিশেষে, ইংরেজ জাতিকে মানবকল্যাণকামী শক্তি হিসেবে যখন দেখা গেল, তখন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শিত হয়েছিল৷

সেই ইউরোপীয় জাতির প্রতি দুর্গতি কবির সেই শ্রদ্ধা ও ভক্তি সম্পূর্ণ হ্রাস পেয়েছিল৷ এদেশের মানুষের সর্বাপেক্ষা দুর্গতি শুধুমাত্র খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ছিল না, তা অতি প্রকট হয়ে উঠেছিল দেশবাসীর মধ্যে একান্ত আত্মবিচ্ছেদের ঘটনায়৷ এজন্য হয়তো আমাদের সমাজকে অভিযুক্ত করা হবে৷ রবীন্দ্রনাথ দেশবাসীর এই দুর্গতির জন্য দেশ শাসকদের প্রতি আঙুল তুলে বলেছিলেন, “… এই দুর্গতির রূপ যে প্রত্যহই ক্রমশ উৎকট হয়ে উঠেছে, সে যদি ভারত শাসনযন্ত্রের ঊর্ধ্বস্তরে কোনো-এক গোপন কেন্দ্রে প্রশ্রয়ের দ্বারা পোষিত না হত তা হলে কখনোই ভারত-ইতিহাসের এত বড়ো অপমানকর অসভ্য পরিণাম ঘটতে পারত না৷”

এদেশের মানুষের বুদ্ধি‍ ও সামর্থ্যে কোনোমতে জাপানের চেয়ে দুর্বল নয়৷ ভারত ও জাপানের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, ইংরেজ শাসনে ভারত অধিকৃত ও অভিভূত ছিল এবং জাপান পাশ্চাত্য জাতির সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্ত বোধ করত৷ ইংরেজ এদেশের শাসক হিসেবে দণ্ডধারী হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে দারোয়ানি করেছিল বলে রবীন্দ্রনাথ অভিযোগ করেছিলেন৷ তারা এদেশের মানুষকে তাদের শক্তির রূপকে দেখাতে পেরেছিল কিন্তু কোনোভাবে তাদের মুক্তির রূপ দেখাতে পারেনি৷

রবীন্দ্রনাথ অতি বেদনার সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন, “মানুষে মানুষে যে সম্বন্ধ সবচেয়ে মূল্যবান এবং যাকে যথার্থ সভ্যতা বলা যেতে পারে তার কৃপণতা এই ভারতীয়দের উন্নতির পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে৷” তবে উচ্চ মানসিকতার কোনও কোনও ইংরেজ তাঁর মহত্ত্বের দ্বারা কবিকে আন্তরিকভাবে আকৃষ্ট করেছিলেন৷ তাঁদের মধ্যে দীনবন্ধু এন্ড্রুজের কথা বিশেষভাবে বলা যায়৷ কবির মতে, তাঁর মধ্যে একান্তভাবে একজন ইংরেজ, একজন খ্রিস্টান ও একজন মানুষকে বন্ধুভাবে পাওয়া গিয়েছিল৷ তাঁর মতো একজন স্বার্থসম্পর্কহীন নির্ভীক মহৎ মানুষের কাছে ভারতবর্ষ কৃতজ্ঞ৷ কবি নবীন বয়সে ইংরেজি সাহিত্যের মাধ্যমে সবিশেষ জ্ঞাত হয়ে ইংরেজ জাতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন৷

আর তাঁর জীবনসায়াহ্নে উপস্থিত হয়ে এন্ড্রুজ সেই জাতির কলঙ্কমোচনে সামান্য সহায়তা করেছিলেন৷ তাঁকে‍ লাভ করে সমগ্র ইংরেজ জাতির মহত্ত্বের প্রতি কবি আমৃত্যু শ্রদ্ধাশীল হয়েছিলেন৷
কবি তাঁর জীবনের প্রান্তবেলায় উপনীত হয়ে ইউরোপীয় বর্বরতার বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেছিলেন৷ তখন কবির মনে হয়েছিল, মানুষের আদিম প্রবৃত্তির সেই ঘৃণ্য রূপ পাশ্চাত্য সভ্যতার মর্ম থেকে উঠে এসে মানবাত্মার অসম্মানে অতি প্রকট আকার ধারণ করেছিল৷ কালচক্রে সেই ইংরেজ জাতি একদা যখন এদেশ ত্যাগ করে চলে যাবে তখন তারা যেদেশ রেখে যাবে তা তো মলিনতা,জীর্ণতা, দারিদ্র্য ও দীনতায় পূর্ণ হয়ে উঠবে৷
মানবসব্যতার বিকাশের আজকের এই পুণ্যলগ্নে অত্যাচারীর পরাভবকে আমরা অন্তর থেকে গ্রহণ করব৷বিশ্বের সকল দারিদ্র্যকবলিত শোষিত ও বঞ্চিত মানবাত্মার মুক্তির জন্য সভ্যতার যে দৈববাণী বিশ্ববাসীর দ্বারপ্রান্তে আজ উপস্থিত হয়েছে, তা তো ঋষি পিতামহের এই পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের তপোবনে একদিন উচ্চারিত হয়েছিল৷ কবির কথায়, “পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে” হয়তো “বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ আরম্ভ হবে৷” কবির শেষ কথা, “আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে৷”

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষ জন্মদিনে অর্থাৎ তাঁর জন্মের অশীতিবর্ষপূর্তি উৎসবে যে অভিভাষণটি সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন তাতে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের মর্মযন্ত্রণার কথা ব্যক্ত করা হয়েছিল৷ বিশ্বে সর্বশক্তির অধিকার নিয়ে যে ইংরেজ রাজশক্তি একদা অধীনস্থ এদেশীয় লোকসাধারণের প্রতি নির্বিচারে পীড়ন, অবমাননা ও হিংস্রতার পরিচয় প্রদান করেছিল, তা তো বর্ণনার অতীত! বিশ্বের অতি শক্তিধর দেশগুলি আজও যেভাবে দুর্বল জাতিগুলির ওপর প্রভূত্ব ও রক্তচক্ষু প্রদর্শন করে মনুষ্যত্বের প্রতি অসম্মান ও অবমাননা করে চলেছে, তা তো কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়! কবির সুরে সবশেষে প্রার্থনা করি, মানবসভ্যতার বিকাশের ধারায় সেই প্রমত্ত ও অতি শক্তিধর রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতার মদমত্ততার সদম্ভ আস্ফালন নিশ্চিহ্ন হোক এবং মনুষ্যত্বের মহিমার জয়ধ্বনি সর্বত্র প্রচারিত হোক৷

সমাপ্ত

প্রথম পর্ব পড়ুন