egg-chicken-noodles-chili-fish-recipe

এগ চিকেন নুডলস ও চিলি ফিস

আজ খুব আনন্দ। ভালোলাগার ক্লান্তিটাও অনেকটা। এই গরমে ভেতরে টি শার্ট ঘামে ভিজে জবজবে। হোমস্টেতে আজ চতুর্থ দিনে ল্যাঞ্জা সিবিল তার বাহারি লেজ নিয়ে দেখা দিয়েছে। রীতিমত পোজ দিয়ে ছবিও তুলতে দিয়েছে। আর ওয়ার্ডস ট্রগণ তো অসাধারণ সুন্দরী। লাল রঙ যে এমন অন্যরকম শেড এর সুন্দর হয়, কোনও আন্দাজ ছিলো না। রঙ তো প্রকৃতির। আমরা এটা সেটা নাম দিয়ে বিজ্ঞের মতো খবরদারি করি। পাখি দেখা, ঠিকঠাক ছবি তোলা, সবই রোশনের কামাল। এই বারবেট হোমস্টে ওরই। এই হিন্দি আর ইংরেজিতে চোস্ত, অর্নিথোলজিতে প্রচুর জ্ঞান। এই সিকিম এলাকার পক্ষিকুল তো নখদর্পণে। আরও প্রায় বিশ বাইশ রকমের পাখিও ফ্রেমবন্দি হয়েছে। অজস্র প্রজাপতি তো উপরি।

টি শার্টটা খুলে মেলে দেয় বাইরের রেলিংয়ে। ছোট্ট দোতলা বাড়ি। ওপর নিচে মিলিয়ে গোটা আট ঘর। কাল অবধি রাতুল একাই ছিল গেষ্ট। এখন চোখে পড়ল রেলিংয়ের বাম পাশে একটা আধভিজে তোয়ালে মেলা। তার মানেই ওর একাধিপত্য শেষ। আনমনে ঠোঁটের কোণে হাসি। ‘ তুই আর পাল্টাবিনা ইনকরিজিবল।’
শ্বেতা বলত।

এই পাখির নেশা ওই ধরিয়েছিল। ড্যাং ড্যাং করে সুমনের হাত ধরে ডুসেলডর্ফ চলে গেল। একটা সিগারেট চায় মনটা এই সময়। কিন্তু রাতুল জঙ্গলে এলে ধূমপান একদমই করে না। অগত্যা।
নিচে ছোট্ট ডাইনিং। এই কিতাম বার্ড স্যানচুয়ারি নামচে আর মেল্লির মাঝখানে।

দিশারী সোলো বাইকার। হলদিয়ায় থাকে। ওর থান্ডারবার্ড এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে দেড় দিনে। অজান্তেই মনে মনে হ্যাটস অফ। পোর্ট হাসপাতালে রেডিওলজিস্ট। স্বনির্ভর। আত্মবিশ্বাস। বিন্দাস। দুটো ব্ল্যাক কফি নিয়ে বিকেল গড়িয়ে গেল ক্যামেরায় পাখি প্রজাপতি দেখে।

‘ রোশন , আজ ডিনারে আমি শেফ। ওয়ার্ডস্ ট্রগণের খাতিরে। চলো দেখি তোমার ভাঁড়ারে কী আছে । ‘

‘জ্যয়সে আপকি মর্জি। হাম তো ফুর্তি করেঙ্গে ।’

রোশন আন্তরিক। দিশারী বলে ‘ আমি তো চা টোস্ট ছাড়া কিছু বানাতেই পারি না। আমিও শিখতে চাই।’ হেসে ওঠে সবাই।

‘ এত ভালো ভেটকি এখানে কোথায় পেলে? চিলি ফিস বানালেই হয়।’ রোশনের সবকটা দাঁত দেখা যাচ্ছে।’

শিলিগুড়ির কলেজপাড়া বাজার থেকে। বউ পরশু গিয়েছিল।’ মাছের ফিলে করতে করতে রাতুল বলতে থাকে। ‘ চিলি ফিস কিন্তু ফিউশন কুইজিন। ইন্দো – চাইনিজ। ঐতিহাসিক ভাবে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়ী ফিস কারী সাম্বল ফিসের কাছাকাছি। তবে ক্যালকেশিয়ান চাইনিজদের হাতে পড়ে আমূল পরিবর্তন।

‘ মাছের আধ ইঞ্চি পুরু মাঝারি আকারের ফিলেগুলোতে লেবুর রস আর গোলমরিচের গুঁড়ো মাখিয়ে একপাশে রাখা। প্রায় ত্রিশ পিস হবে। ‘ আটশো গ্রাম ‘ রোশন বলে। আরেকটা বড় বাটিতে আধ চামচ পিপলী (লং পিপার) গুঁড়ো, এক চামচ গুঁড়ো গোলমরিচ , তিনটে ডিম, পরিমাণমত নুন, স্টক পাউডার বড় এক চামচ, দু চামচ সাদা তেল আর বড় চার চামচ কর্ন ফ্লাওয়ার। সব কিছু ভালো করে মিশিয়ে নিতে নিতে রাতুল বলে ‘ এই ব্যাটার তৈরিটা ভীষণ জরুরি। চিলি ফিসের স্বাদ এর হাতে। এবার মাছের ফিলেগুলো ব্যাটারে মাখিয়ে আধ ঘন্টা। এই সময় সস তৈরি আর কাটাকুটি। দুটো ক্যাপসিকাম, কিছুটা পেঁয়াজশাক, দুটো গাজর, দুটো বড় পেঁয়াজ। সবগুলোই একটু লম্বাটে গড়নে সমান মাপে কেটে নিতে হবে। ‘ হাতের ছুরি চলছে নাকি ক্যানভাসে তুলির আঁচড় বোঝা মুশকিল। দিশারীর চোখে রীতিমত বিস্ময়।

‘গাজর আর ক্যাপসিকাম তিন চার মিনিট গরম জলে। এবার আরেকটা পাত্রে এক চামচ কুচি কুচি করে কাটা আদা আর রসুন, বড় এক চামচ সয়া সস, দু চামচ অয়েস্টার সস, দু চামচ মধু আর এক চামচ চিলি পেষ্ট। সবটা ভালো করে মিলিয়ে নিতে হবে। ‘ বাটিটা এগিয়ে দেয় দিশারীর দিকে। রোশনও একটা ছোট ছুরি নিয়ে কাটাকুটিতে হাত লাগিয়েছে। একটা ছোট বাটিতে বড় এক চামচ কর্ন ফ্লাওয়ার জলে গুলে একটু স্টক পাউডার মিশিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখে।’ এটা হলো কর্ন স্লার। খুউব জরুরি কিছু নয়। গ্লেজিং এর জন্যে। এবার একটা ওক প্যান আগুনে। তাতে খানিকটা সাদা তেল। মাঝারি আঁচ। ব্যাটার মাখানো ফিলেগুলো সাবধানে তেলে ছেড়ে খানিক ভাজা। ব্যাটারে তেল দেওয়ার জন্যে এগুলো আলাদা হয়েই আছে। তিন মিনিট পর মাছগুলো তুলে নেওয়া। এবার আঁচ বাড়িয়ে আবার তিন মিনিট ভাজা। ‘

‘এক বারেই ভেজে নিলে কী হত? ‘ দিশারী জিজ্ঞাসু।

‘ এই যে সোনালী রঙ এসেছে আর মচমচে ভাব, এটা হতো না।’ কফি এগিয়ে দেয় সবাইকে রোশনের বউ। রাতুলের ফর্সা মুখটা লালচে। আগুন থেকে একটু সরে আসে। “ স্কাউটিং জীবনে সব শিখিয়ে দেয়। সব কিছু।’

এবার ওক আবার আগুনে। চড়া আঁচ। সাদা তেল তিন চামচ। পেঁয়াজ। কটা কাঁচা লঙ্কা লম্বা লম্বা ফালি। দু মিনিট পর ওই সসটা। এক মিনিট। আধসেদ্ধ গাজর ক্যাপসিকাম আর পেঁয়াজ শাক। ‘ এই ওক থাকলে চাইনিজ রান্না বেশ সহজ হয়ে যায়। চাইনিজ রান্না মানেই রঙ আর আকার যেমনটি তেমন। রসনার উৎসব। এবার দু মিনিট পর ভাজা মাছ। টস করা চলতে থাকে। ঘন ঘন। নিয়ন্ত্রিত। শেষে কর্ন স্লার দিয়ে গ্লেজিং। ব্যাস। চিলি ফিস রেডি।’

কিচেনের হাল্কা আলো আর আগুনের আলোতে একটা অপার্থিব পরিবেশ। রোশন একটা গিটার নিয়ে অভ্যস্ত হাতে বাজাতে শুরু করলো। এমন এক রাত্রি দিশারী চিরটাকাল মনে রাখবে। কিছু মানুষকে , কিছু মুহূর্তকে ভোলা যায় না।

‘ নুডলস্ এর ইতিহাস অনেক পুরনো। একান্তই চাইনিজ। অনেকে বলে চার হাজার বছর। খ্রীষ্টপূর্ব দু হাজার বছর আগে পীত নদীতীরে মিলেট দিয়ে তৈরি নুডলস্ এর সন্ধান পাওয়া গেছে। হান ডাইনেষ্টিতে ট্যাং বিং লিপিবদ্ধ। যা আসলে নুডলস্ স্যুপ। এরপর চাউ মিন হয়ে দেশে বিদেশে। ভাজা মুচমুচে আমেরিকান চপসি কিংবা চিলির টেলিরান সালতাডো আসলে সবই চাউমিন। তা ভাজা, সেদ্ধ, ফিকে স্বাদ মশলাদার যাই হোক না কেন। ‘ দিশারী অবাক। এই লোকটা আসলে করেটা কি? চুম্বকের মত একটা গভীর টান।

“ রোশনের কিচেনে পেলাম এগ নুডলস্। এই বড় গামলায় জল দু চামচ নুন, কিছুটা সাদা তেল দিয়ে দিলাম। জলে যথেষ্ট উত্তেজনা সৃষ্টি হলে মানে ফুটে উঠলে নুডলস্। প্যাকেটের গায়ে লেখা আছে সেদ্ধ হতে কত সময় লাগে। আমরা একটু আগেই নামিয়ে নিলাম। জল ঝরিয়ে সামান্য তেল দিয়ে নাড়াচাড়া। ওই ছাঁকনির মধ্যে রেখে দিলেই সর্বনাশ। এই দুটো ট্রে তে সমান ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে রেফ্রিজারেটর। নর্মাল তাকে।

একটু থামে রাতুল। একটু ঝুরিভাজা চামচে নিয়ে মুখে দেয়। পুদিনার গন্ধ ওর মুখের আশপাশে লোভনীয় ভাবে ভেসে থাকে। ‘গরম জিনিষ রান্নায় যোগ করা হয় ফ্রেঞ্চ ইতালিয়ান আর মোগলাই খাবারে। চাইনিজ রান্নায় আকার আকৃতি বজায় রাখাটা দস্তুর।’

চিকেন লম্বা আর পাতলা টুকরো করে নেয়। ওর মধ্যে একটা ডিম, এক চামচ আদা রসুন লঙ্কা বাটা, সয়া সস আর গোলমরিচ গুঁড়ো, আধ চামচ কর্ন ফ্লাওয়ার। পুরোটা ভালো করে মিশিয়ে নেওয়া জলদি হাতে। দু ইঞ্চি লম্বা আর সরু সরু করে কেটে নিচ্ছে রোশন একটা গাজর, আধখানা করে লাল সবুজ হলুদ ক্যাপসিকাম। একই মাপে তিনটে বড় পেঁয়াজ আর অর্ধেক ছোট বাঁধাকপি। ‘

এবার সস তৈরি। এক চামচ খুউব ছোট ছোট টুকরো করে কাটা আদা আর রসুন, বড় চামচের দু চামচ লাইট সয়া সস, এক চামচ রেড চিলি সস , গ্রিন চিলি সস এক চামচ, অয়েস্টার সস এক চামচ আর আধ কাপ টম্যাটো কেচাপ। এক চামচ গোলমরিচ গুঁড়ো দিতেও পারো, নাও পারো।’

ওক এ সাদা তেল দিয়ে চিকেন স্ট্রিপগুলো ভেজে নেয় রাতুল। হাতা গোটানো ব্লু ডেনিম, চওড়া কব্জিতে সবজে কালো মেটাল ব্যান্ডের স্মার্ট ওয়াচ। কি একটা ভেবে অজান্তেই শিউরে ওঠে দিশারী।

‘ চারটে ডিম , আধ চামচ নুন, খানিক জল। ভালো করে ফেটিয়ে পাতলা করে ডিমের কটা ওমলেট। সবকটা একসাথে রোল করে সরু সরু করে কেটে নিলেই দেখো, ডিমের স্ট্রাইপ তৈরি। ‘ কথা আর হাত সমানতালে। যেন রণবীর ব্রার কোনও ইউ টিউব রেসিপি দেখছে। রোশনও অবাক। ‘ পানিকে সাথ ওমলেট বানানা ইয়ে পহলি বার দেখা। মান গয়ে
সাব।’
‘এবার ফিনিশিং। ওক চড়া আঁচে। এক হাতা সাদা তেল। পিঁয়াজ আর সবজি দিয়ে নাড়াচাড়া তারপর টস। টস করার সময় একটু কম উত্তেজনা থাকলেই ভালো। অতঃপর ওই সস মিক্সচার। এরপর চিকেন ভাজা। সসটা ঠিকঠাক মাখামাখি হয়ে গেলে একটু একটু করে নুডলস্ টা মেলাতে হবে। এই পর্যায়ে চাইনিজ স্টিক হলে মেশানটা ফ্যান্টাস্টিক হয় ।’

‘ হ্যায় তো সাব। ইয়ে লিজিয়ে।’

‘ উফ্ ফাটাফাটি। আয় ভাই তোকে একটা চুমু খাই। এই পর্যায়ে এক হাতে ওক নিয়ে টস করতে হবে আর অন্য হাতে পুরো ব্যাপারটা শারীরিক প্রেমের মত উত্তুঙ্গ করে তুলতে হবে। উদাহরণের জন্য সরি ম্যাডাম।’ আর সরি ! কানের ভেতর থেকে পায়ের বুড়ো আঙুল পর্য্যন্ত শিরশির করে উঠল যে !

‘এবার ডিমের স্ট্রাইপগুলো সামান্য মিলিয়ে দেব। রোশন, প্লেট লাগা দো ভাই। বহত ভুখ লাগ গয়া ।’

দারুণ জমেছিল খাওয়া দাওয়া। ডিনারের পর দোতলার বারান্দায় গ্লাসে একটু ওল্ড মঙ্কের সাথে রাতুল আর দিশারী গল্প করেছিলো অনেক অনেক রাত অবধি। আর পরদিন সকালে ব্রেড বাটার ফ্রুটস ব্রেকফাস্ট সেরে চেক আউট। দিশারীর। বাইকের পিছনে রুকস্যাক পিঠে রাতুল। কোথায় গেল দুজনে তার খবর রোশন রাখে না। সরাইখানা, রাতের আড্ডা অনেক গল্প জানে। পারলে শুনবেন কান মন পেতে। অনেক কাহিনি। অনেক…।