Raghu Rai

কোলাহল তো বারণ হল…

দালাই লামার ছবি তুলতে গিয়েছিলেন তিনি ভিড়ের মধ্যে অপেক্ষা করছেন দালাই লামা কখন আসবেন যেই তিনি এলেন, ভিড়ের কোলাহল নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল রঘু রাই লক্ষ করেছিলেন সেই স্তব্ধতা সারা জীবন বিশ্বাস করেছিলেন, মহান শিল্পবই, সিনেমা বা ফোটোগ্রাফযাই হোক না কেন, ভেতরে এক নীরব শান্তি তৈরি করে 

সেই স্তব্ধতার গানই রঘু রাইয়ের অসংখ্য ফ্রেমে ছবিশিকারী নন তিনি, নৈঃশব্দের মুহূর্তসন্ধানী সেই খোঁজেই তাঁর ক্লিকের পরে ক্লিক সে আকাঙ্খা জীবনেরই, জীবনের জন্য, মনে করতেন রঘু বিশ্বাস করতেন প্রিয় কবি খলিল জিব্রানের দর্শনে নিজের তোলা ছবি সম্পর্কে তাঁরই কবিতা উদ্ধৃত করেছেন বার বার, ‘ইওর চিলড্রেন আর নট ইওর চিলড্রেন দে আর দ্য সান্স অ্যান্ড ডটার্স অফ লাইফস লঙ্গিং ফর ইটসেল্ফ

জন্মেছিলেন ১৯৪২, ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝাং (এখন পাকিস্তানে) পাঁচ বছরের শৈশবস্মৃতিতে জড়িয়ে ছিল দেশভাগের ভয়াবহ অস্থিরতা ১৯৪৭ রাতারাতি ঘরছাড়া পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন দেশে ছিন্নমূল সেই মন প্রবলভাবে ছিল ১৯৭১ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় উদ্বাস্তু যন্ত্রণার ছবিতে স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে ফের সেই বিষণ্ণ ইতিহাস ফিরে আসে তাঁরবাংলাদেশ: দ্য প্রাইস অব ফ্রিডমবইয়ে বানের জলে কত কত প্রাণ, কত ঘরবসতি ভেসে গেলে স্বাদ মেলে স্বাধীনতারআবহমান সেই শাশ্বত সাদাকালো প্রশ্নটাই বইয়ের মূল সুর ফ্রেমগুলো ঢাকা পড়েছিল দীর্ঘকাল ১৯৭১এর সেই দিনগুলোয় বনগাঁ সীমান্ত থেকে আসা অগণিত উদ্বাস্তুর মিছিলে মিশে গিয়েছিলেন রঘুও, হেঁটেছিলেন অনেক দূর সে পথ মায়াভরা ছিল না মিছিলের এক জীর্ণ মুখে জীবনের সামান্য সম্বলটুকু ছাতা দিয়ে আগলে রাখার সে এক অকাল সংগ্রাম রঘুর ছবিতে অন্ধকারের নেপথ্যে কাপড়ের খুঁটে জল মোছেন এক বৃদ্ধাবলিরেখাময় কপালে একটি চোখ খোলা রেখে তাকিয়ে আছেন অনিশ্চিত আগামীর দিকে 

Raghu Rai

এইখানেই রঘুর ক্যামেরা বার বার কোলাহলের মাঝে তাঁর বিষয়ের সঙ্গে প্রাণের আলাপ করেছে, কেবল মুহূর্তটিকে শিকার করতে চায়নি ১৯৬৫তে সালে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ তাঁর সংবাদপত্রের জন্যই ছবি তুলতেন প্রথাগত নিউজ ফোটোগ্রাফার ছিলেন না, বিশ্বাস করতেন সংবাদ মূলত কাব্য দিল্লিরদ্য স্টেটসম্যান’- যখন চিফ ফোটোগ্রাফার তিনি, হৃষীকেশে মহর্ষি মহেশ যোগীর আশ্রমে এলদ্য বিটলস রঘু বিশেষভাবে তার ছবি তুলেছিলেন 

তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ১৯৭১ সালে এই বছর প্যারিসের গ্যালারি ডেলপায়ারে রঘু রাইয়ের একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় প্রদর্শনীতে তাঁর ভারত বাংলাদেশি উদ্বাস্তুদের নিয়ে তোলা ছবিগুলি দেখে কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়েব্রেসোঁ তাঁকে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ফটোগ্রাফার্স কোঅপারেটিভম্যাগনাম ফটোজ’- যোগদানের জন্য মনোনীত করেন টমসন ফেলোশিপ শেষ করে তিনি লন্ডনেরদ্য টাইমসপত্রিকায় চার সপ্তাহ কাজ করেন সে কাজে মুগ্ধ পত্রিকার বিখ্যাত সম্পাদক নরম্যান হল তাঁকে স্থায়ী চাকরির প্রস্তাব দেন কিন্তু দেশের অলিগলিপাকস্থলি টানছিল রঘুকে, নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন তিনি

Raghu Rai photographer

রঘু রাইয়ের কাজের গভীরে রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট দার্শনিক ভিত্তি, যাকে তিনিদর্শনবা মননশীলতার শিল্প হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন দর্শন কেবল কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে দেখা নয়; আসলে স্থান বা ব্যক্তির বাইরের আর ভেতরের সত্তাকে পুরোটা ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা  

ডিজিটাল যুগেরফাস্টফুড জেনারেশনএবং সামাজিক মাধ্যমের লাইকনির্ভর কৃত্রিমতার তিনি তীব্র সমালোচক ছিলেন তিনি মনে করতেন, জোর করে আলাদা হওয়ার জন্য বা বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণার বশবর্তী হয়ে ছবি তুললে তা প্রাণহীন হয় তাঁর মতে, সৃজনশীলতা কোনও পূর্বনির্ধারিত ধারণার বাইরে থাকে, থাকে আলোকচিত্রীর উন্মুখতার মধ্যে উন্মুখতা দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম সংকেতগুলোর প্রতি তাই তিনি কৃত্রিমভাবে সাজানো ছবির ঘোর বিরোধী ছিলেন স্টিভ ম্যাককারির সাজানো ছবি নিয়ে যখন বিতর্ক ওঠে, তখন রঘু রাই স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, বছরের পর বছরতপস্যাছাড়া ফটোগ্রাফিতে যে কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষাই স্রেফ বাহ্যিক এবং শক্তিহীন 

সাদাকালোতেই রঘুর অনুরাগ ছিল বেশি তাঁর পূর্বসূরি সুনীল জানা এবং কুলবন্ত রায়ের সাদাকালোতে গল্প বলার কৌশল তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল, তার সঙ্গে মিশেছিল তাঁর নিজস্ব দর্শন সেই দর্শনটাতেই তিনি অন্যদের থেকে আলাদা 

১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনাকে রঘু রাই কেবল একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখেননি, বরং তিনি একে স্পষ্টভাবেকর্পোরেট অপরাধহিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিস (Greenpeace)-এর সহযোগিতায় তিনি এই ভয়াবহ রাসায়নিক বিপর্যয় এবং পরবর্তী দশকগুলোতে এর সুদূরপ্রসারী বিষাক্ত প্রভাবের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্ট পরিচালনা করেন ২০০২ সালে রঘু রাই পুনরায় সেখানে ফিরে যান এবং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেন

রঘু রাইয়ের প্রতিকৃতি তোলার শৈলী ছিল প্রথাগত পোজনির্ভর ছবির সম্পূর্ণ বিপরীত তিনি তাঁর সাবজেক্টের সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেরপ্রকৃত সত্তাবা সারমর্মকে ফ্রেমবন্দী করতে চাইতেন তাঁর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব তাঁদের বাহ্যিক আবরণ খসিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে রাই ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮৪ সালে তাঁর শেষকৃত্য পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্যামেরাবন্দী করেছেন রাই লক্ষ করেছিলেন যে, পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির ভিড়ে ইন্দিরা গান্ধী কীভাবে নিজের স্বতন্ত্র শক্তিশালী অবস্থান বজায় রাখতেন যখন অন্যান্য পুরুষ রাজনীতিকরা ক্যামেরার উপস্থিতি সম্পর্কে অসচেতন থাকতেন, তখন ইন্দিরা গান্ধী সরাসরি ক্যামেরার দিকে এক স্থির অটল দৃষ্টিতে তাকাতেন, যা তাঁর কর্তৃত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করত ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির সময় জুবলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে হাঁটার সময় ইন্দিরা গান্ধীর কয়েক পা এগিয়ে থাকার ছবিটি তাঁর কূটনৈতিক আধিপত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে সেই সময় একটি কৌতুক প্রচলিত ছিল যে, ছবিটি হয়তোমিস্টার এবং মিসেস ভুট্টো, কিন্তু পরক্ষণেই কেউ সংশোধন করে বলত, এটি আসলেমিস্টার এবং মিসেস গান্ধী ছবি, যা ইন্দিরা গান্ধীর প্রবল কর্তৃত্বকেই নির্দেশ করত

indira gandhi

১৯৭৫১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়, যখন সংবাদমাধ্যমে তীব্র সেন্সরশিপ চলছিল, রাই তাঁর ছবির মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধীর এক অন্য রূপ তুলে ধরেনএকজন নেত্রী হিসেবে তাঁর বেপরোয়া মনোভাব এবং একইসঙ্গে একজন মা হিসেবে তাঁর দুর্বলতা জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পর তাঁর যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সঞ্জয় গান্ধীর উত্থানের ওপর তাঁর যে নির্ভরতা, তা রাইয়ের লেন্সে সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়ে তাঁর উদ্দেশ্য ছিলমিথের আড়ালে থাকা নারীকেতুলে ধরা 

মাদার টেরেসা সাধারণত ছবি তোলার প্রতি অত্যন্ত অনীহা প্রকাশ করতেন ১৯৭০এর দশকেজুনিয়র স্টেটসম্যান’- কাজ করার সময় রাই যখন তাঁর একটি ফটোবই করার প্রস্তাব দেন, রাই নিজেও কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন মাদার টেরেসা তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো ইতিমধ্যেই আমাকে নিয়ে একটি ফটো বই করেছ, তোমার কি এখনও যথেষ্ট হয়নি?’ শেষ পর্যন্ত টেরেসা বলেন, ‘আমাকে আমার প্রার্থনা করতে দাও, তারপর আমি জানাবরঘু রাই এর উত্তরে বলেছিলেন, ‘মাদার, আমি আমার প্রার্থনা সেরে ফেলেছি এবং উত্তর হল হ্যাঁএই উত্তরে মাদার টেরেসা গভীরভাবে আপ্লুত হন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন ঈশ্বরের কাছে সব প্রার্থনাই সমান

mother teresa

প্রায় তিন দশক ধরে রাই মাদার টেরেসাকে ক্যামেরাবন্দী করেছেন তাঁর সাদাকালো ছবিগুলো টেরেসার আধ্যাত্মিকতা, মাটির কাছাকাছি থাকা সরলতা এবং জাতপাত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে নিঃস্বার্থ সেবাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে রাইয়ের লেন্সে ধরা পড়েছে কীভাবে মাদার টেরেসা বিশাল অনুদান নিয়ে আসা সুইস ব্যাঙ্কারের চেয়ে একজন মুমূর্ষু রোগীকে বেশি গুরুত্ব দিতেন সুইস ব্যাঙ্কারের অহংকারী প্রস্তাবের জবাবে টেরেসা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, তাঁর নিজের দেশের মানুষই গরিবদের সেবা করার জন্য তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করে 

satyajit roy

সত্যজিৎ রায়কে (যাঁকে তিনি ভালোবেসেদাদুবলে ডাকতেন) রঘু রাই বহুবার তাঁর ক্যামেরায় ধরেছেনঘরে বাইরেসিনেমার শুটিং ফ্লোরে সত্যজিৎ যখন রাইকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি আমাকে কী করতে বলো?’, তখন রাই অস্বস্তিতে পড়েন, কারণ তিনি কৃত্রিম কোনও পোজ বা অভিনয় চাননি, চেয়েছিলেন সত্যজিতের স্বাভাবিক কাজের মুহূর্তকে ধারণ করতে রাই তাঁকে সোজাসাপ্টা বলেছিলেন, ‘না মানিক দা, ওটা যথেষ্ট নয়!’ পরে  ‘Being with Dadu: Satyajit Ray’ (২০২১) বইয়ে রাই তাঁদের এই বিশেষ সম্পর্কের এবং সত্যজিতের কাজের প্রতি তীব্র একাগ্রতার চিত্র তুলে ধরেন

Dalai Lama

হিমালয়ের কোলে আধ্যাত্মিক গুরু দালাই লামার সান্নিধ্য রঘু রাইকে গভীর শান্তি দিয়েছিল একবার ছবি তোলার প্রস্তুতির সময়, যখন দুজন সন্ন্যাসী একটি মেরুন রঙের চাদর ধরে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন দালাই লামা এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে রাইকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি আমাকে কোথায় দাঁড়াতে বলো?’ এছাড়াও তাঁর লেন্সে ধরা পড়েছে বক্সিং কিংবদন্তি মুহাম্মদ আলীর এক শান্ত, কোলাহলমুক্ত মুহূর্ত, যা স্পেকট্যাকল থেকে বহু দূরে এক স্থিরতার রূপক ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার মতো সংগীতের মহীরুহদের প্রতিকৃতিতেও তিনি তাঁদের ভেতরের সুরকে দৃশ্যমান করেছেন

রঘু রাইয়ের লেন্সের একটি অনন্য দিক হল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অসামান্য কাব্যিক রূপায়ণ তিনি ভারতের রাস্তাঘাট, অলিগলি এবং প্রান্তিক মানুষদের এমনভাবে ক্যামেরাবন্দী করেছেন যে, তা সামাজিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে ফতেহপুরি মসজিদের শীতের সকাল, চলন্ত ট্রেনের পাদানিতে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকা চাবিক্রেতা, বা একজন অন্ধ মুসলিম ভিক্ষুককে পথ দেখাতে সাহায্য করা মানসিক ভারসাম্যহীন হিন্দু মেয়েএই সব মুহূর্তগুলো তাঁর ফ্রেমে ইতিহাস হয়ে উঠেছে তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘বাস্তবতার চেয়ে ভালো কিছু আর নির্মাণ করা সম্ভব নয় দিল্লির চাউরি বাজারে পাখিদের ওড়াউড়ি থেকে শুরু করে বেনারসের ঘাটসর্বত্রই তাঁর লেন্স ভারতআত্মার সঙ্গে প্রাণের আলাপ করেছে 

তাঁর জীবনভর ফোটোগ্রাফিযাত্রাটা তাই এক অখণ্ড গানের মতো 

 নিবন্ধটি সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক রঘু রাই –এর প্রতি শনিবারের চিঠির শ্রদ্ধার্ঘ্য