mahasweta devi

শতবর্ষে মহাশ্বেতা দেবী

গত পর্বের পরে

(গত পর্ব পড়ুন)

ইতিহাস মহাশ্বেতা দেবীর লেখালিখির জগতের প্রিয় বিষয়। বঞ্চনার ইতিহাস, শোষণের ইতিহাস অনুসন্ধানে তিনি সদা জাগ্রত ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখায় ইতিহাস অনুসন্ধান আলাদা মাত্রা পায়। এ ব্যাপারে তিনি তন্নিষ্ঠ। তিনি ঘেঁটেছেন গেজেট, রেকর্ডস, সেন্সাস রিপোর্ট, দলিল ও ভূমিসংস্কারের আইনের বহু বিচিত্র নথিপত্র। কারণ লেখক মহাশ্বেতা মনে করেন: ‘কোনো লেখাই সহজ নয়, প্রত্যেকটি লেখাই আমার কাছে সমান সিরিয়াস। এইসব লেখা লিখতে লিখতেই লেখক হয়ে গেলাম। চলে এলাম পুরোপুরি লেখার মধ্যে। খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক যেভাবে তৈরি হয়ে যান, সেভাবেই।’

অতীত ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতেই লিখে ফেলেন ১৮৫৭-৫৮-র সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে লেখা ‘চম্পা’, ‘দেওয়ানি খইমালা’ ও ‘ঠাকুর বটের কাহিনী’ নামে তিনটি গল্প। অবিচার আর শোষণের বিরুদ্দে ‘চম্পা’, ‘নটী’ ও ‘অমৃতসঞ্চয়’ উপন্যাস ও গল্পের নারী চরিত্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। চলমান সমাজ ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতে লিখেছেন ‘ধীবর’, ‘পিণ্ডদান’, ‘জল’, ‘রং-নাম্বার’, ‘কানাই বৈরাগীর মা’, ‘যশোবতী’ প্রভৃতি গল্প, উপন্যাস।
১৯৫৬-তে মহাশ্বেতা দেবী লেখেন ‘ঝাঁসির রানী’।

বম্বেতে বাসকালে পড়েছিলেন সাভারকারের লেখা ‘১৮৫৭’, সেখান থেকেই ম্যাগো ঝাঁসি নাম দেখে একা একাই চলে গেলেন বুন্দেলখণ্ডে। রানির কথা লিখতে গিয়ে সেই প্রথম তিনি ব্যবহার করলেন সাধারণ মানুষের মুখে শোনা রানির কথা। সেখানকার সাধারণ মানুষ, পথের ধারে বসে থাকা মানুষের লোকগান থেকে জানলেন রানি বেঁচে আছেন— ‘বাঈসাহেব জরুর জিন্দা হোউ নী’। ওই মানুষগুলির কণ্ঠে স্বাধীনতার সুর— রানির মৃত্যু নেই। তারা স্বপ্ন দেখে রানির হাতের স্পর্শে কাঠ হয় তরবারি, মাটি হয় ফৌজ। ব্রিটিশ শাসক সিপাহী বিদ্রোহের সব চিহ্ন মুছে দিলেও গণমানুষের হৃদয়ে রানি চিরজীবী। লেখক নিজে বলেন:
‘এই বই লেখার সময় আমি প্রমাণ রেখেছি, আমি গণবৃত্তের ইতিহাসে বিশ্বাসী। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ইতিহাসের উপাদান হিসাবে লোককৃত্তির গান গাথা এসব মূল্যবান সম্পদ।’

সেই লোকগানে আছে গণবৃত্তের ইতিহাস ও তার সঙ্গে মিশেছে পুরাকথা। ‘তারা বলবে, রানিকে লুকিয়ে রেখেছে বুন্দেলখণ্ডের পাথর আর মাটি। অভিমানী রানির পরাজয়ের লজ্জা ঢেকে রেখেছে জমিন— আমাদের মা।’ এভাবেই মহাশ্বেতার হাতে রচিত হল দেশজ-ইতিহাস সন্ধানের নতুন পাঠ।

হাজার চুরাশির মা
হাজার চুরাশির মা

ইতিহাসের সত্যকে সাহিত্যে যথার্থ ও যথাযথ নিরাবেগ নিরাসক্তভাবে দলিলকরণ করাই তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য। একটি বড় সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাসকে রোমান্টিক আবেগ দিয়ে অলীক কাহিননিরূপে পরিবেশনে তাঁর আপত্তি। প্রকৃতবিপ্লবী ও বিপ্লবের প্রকৃত ইতিহাসকে তিনি আবার উপস্থিত করলেন নিজস্ব চেতনার আলোকে গত শতকের সত্তর দশকের পটে লেখা কয়েকটি উপন্যাস ও গল্পে। তাঁকে লিখতে হল ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাস এবং প্রায় একডজন গল্প ‘দ্রৌপদী’, ‘স্তনদায়িনী’, ‘মাদার ইন্ডিয়া’, ‘এইচ.এম’, ‘বেহুলা’, ‘যমুনাবতীর মা’, ‘জল’, ‘বিছন’, ‘ঊর্বশী ও জানি’-র মতো উল্লেখযোগ্য গল্প। উত্তাল সত্তর দশক ‘মুক্তির দশক’ করতে গিয়ে যে রক্তক্ষরণ ঘটেছিল তা দেখে তিনি বিচলিত—
‘দেশ ও মানুষ যেখানে প্রত্যহ রক্তাক্ত অভিজ্ঞতায় দীর্ণ বিদীর্ণ হচ্ছিল, সেখানে বাংলা সাহিত্য এত বড় যন্ত্রণা শিক্ষাকে অভিজ্ঞতা করে পরীর দেশের অলীক স্বপ্নাশ্রয়ী বাগানে মিথ্যে ফুল ফোটাবার ব্যর্থ আত্মঘাতী খেলায় ব্যস্ত রয়ে গেল। কেন এমন হল, তার বিশ্লেষণ করল না কেউ সামগ্রিকভাবে, খুব কম লেখাই সময়ের দলিল হয়ে রইল। আমরা ভুলে গেলাম আমরা বাঁচি সন্তানদের, উত্তর পুরুষের মধ্যে। এই সততা ও সাহসিকতার অভাব কি উত্তর পুরুষ ক্ষমা করবে? শুধু শরীর বাঁচলে কি আমি বাঁচব?’
এই আলোকেই পড়তে হয় তাঁর লেখা ‘হাজার চুরাশির মা’। সেখানে তিনি তরুণ তাজা ব্রতী ও তার সহযোগী প্রকৃত বিপ্লবীদের বিশেষ অনুপুঙক্ষ বিশ্লেষণের আলোকে উপস্থাপিত করেছেন। ব্রতীর মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়েই সত্তরের মুক্তির দশক গড়ার আন্দোলনের প্রকৃত সত্যকে খুঁজে পেলেন ব্রতীর মা শিক্ষিতা সুজাতা। সুজাতার অনুসন্ধানের পথ ধরেই আন্দোলনের সততা, বিশ্বস্ততা, আত্মত্যাগের গৌরবকে মহাকালের দরবারে স্থায়ী করে রাখলেন লেখক মহাশ্বেতা। সমকালেই লেখা হল ‘চোট্টি মুণ্ডার তীর’, ‘অপারেশন বসাই টুডু’, ‘অগ্নিগর্ভ সংকলন’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘নৈঋত মেঘ’, ‘গণেশ মহিমা’র মতো বিশিষ্ট রচনাগুলি।

ধুলো মেখে পথ চলা, মানুষকে দেখা, গণ মানুষের সুখ-দুঃখে, সংকটে-সংগ্রামে সাহসী সমর্থন— এভাবেই বাহিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও লেখালিখির জগৎ। বয়স তাঁকে ক্লান্ত করেনি, শারীরিক কষ্ট, রোগব্যাধি তাঁকে হতদ্যোম করেনি। আদিবাসী, জনজাতির জন্য লড়াই, খেড়িয়া-শবরদের জন্য সার্বিক সহায়তায় অগ্রণী ভূমিকা—এভাবেই তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। আবার গুজরাট দাঙ্গার মতো ঘটনায় সোচ্চার তিনি। একুশ শতকের প্রথম দশকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম, লালগড়, রিজুয়ানুর রহমানের ন্যায় মৃত্যুরও তিনি একইভাবে প্রতিবাদে মুখর। চলতে চলতেই পেয়ে যান তাঁর লেখবার বিষয়।

সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় আন্দোলন নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর নিয়ে তিনি লিখলেন ‘তিন কন্যা ও অধরা’ (২০১১), ‘মেয়ের নাম ফেলি’ (২০১০)। তার আগে বিকল্প প্রকাশনী থেকে বেরলো ‘প্রতিবাদের উৎসমুখ’ (২০০৮)। সরস্বতী, কন্ননী, বাসনাবালারা নন্দীগ্রামে, লালগড়ে ধর্ষিতা নারী। তঁদের হাসপাতালে দেওয়া বয়ানকে সমকালীন বাস্তবতার নিরিখে সাহিত্যিক সততায় লিপিবদ্ধ করলেন। মহাশ্বেতা নিঃসন্দেহে এক সাহসী প্রতিবাদের নাম। সৎসাহসী প্রতিবাদের মৃত্যু নেই। তিনি চিরজীবী। বসাই টুডুর জননী মহাশ্বেতাই তো শিখিয়েছেন ‘মরণ বোলায়ে কিছু নাই হে কমরেট, বাঁচাটা নিয়েই যত গোলমাল।’….কতবার এনকাউন্টারে মরেছে বসাই। আবার মজুরির লড়াই নিয়ে অন্য জায়গায় বেঁচে উঠেছে। ধামসা মাদলে সে খবরটা ফিরে ফিরে এসেছে।

আমরাও বিশ্বাস করি মহাশ্বেতা দেবী ও তাঁর সৃষ্টিসম্ভার তেমনই শক্তিশালী ‘ধামসা মাদলের বোল’। আমাদের অস্থির-অসহায় জীবনে তা উজ্জীবনের প্রেরণা, তিনি তাঁর প্রখর প্রাণনা নিয়ে আমাদের অন্তরে তাঁর বিশ্বাস, অদর্শ সঞ্চারিত করে চলেছেন— উলগুলানের শেষ নাই, বিরসার মরণ নাই’।
শতায়ু মহাশ্বেতা দেবী আপনাকে প্রণাম। অক্লান্ত কর্মধারা নিয়ে সংগ্রামী সাধারণ মানুষের চিরসাথী আপনি এগিয়ে চলেছেন এক শতাব্দী থেকে অন্য শতাব্দীতে। এক প্রজন্ম থেকে উত্তর-আগামী প্রজন্মের কাছে আপনার সৃষ্টি-কর্মধারা জীবনযাপনের আদর্শ ও আত্মত্যাগ পরম পাথেয়। আপনি অপরাজেয় প্রেরণা ও প্রতিবাদ।

(গত পর্ব পড়ুন)