পালামপুর থেকে বেরোতেই যথেষ্ট দেরি হয়ে গেল। দোষটা আমারই। ওই যে, টাটকা ঘরে তৈরি কুকিজ-এর লোভ। আমার ধারণা এই ব্যপারে আমাদের কালিম্পং আর পালামপুর বাদবাকি সব জায়গাকে গুনে গুনে দশ গোল দিতে পারে। ঝগড়া করবেন না প্লিজ। আমার বক্তব্য একান্তই আমার । রেখা, শ্রীদেবী, সুচিস্মিতা এবং পালামপুরের কুকিজকে আমি একই ব্রাকেটে রাখি। আপনার মন্তব্য নিজের মতো সাজিয়ে নিন।
তো ঘড়িতে চারটে বাজল চা বাগানগুলো পেরোতে। মনোরম পরিবেশ। গুরদীপজি, জারা আরামসে চলিয়ে। বছর ষাটের হাসমুখ শিখ মিষ্টি হেসে ইনোভার গতি ষাটের নিচে নামিয়ে আনলেন। দিব্য চলছিল ঘণ্টাখানেক। পিছনের সিটে প্রিয়াঙ্কু, ঝুলন আর আমার অর্ধাঙ্গিনী সুচিস্মিতা বেশ পিএনপিসি করছে আর আমি জানলার কাচ একটু নামিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ার মৌতাতে আবিল। এই পথ যদি না শেষ হয়।
হঠাৎই গাড়ি টলমল। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক। কী হল? সামনের বামদিকের টায়ার পাংচার। গুরদীপের মাথায় হাত। সামনের কোনও ট্রাকের থেকে ফিনফিনে লোহার পাত রাস্তায় পড়ে ছিল। স্পিড কম ছিল তাই রক্ষে। কোই বাত নেহি। স্টেপনি লাগানেমে আধা ঘণ্টা। আরাম আরামসে পৌহুচ জায়েঙ্গে। এবার গুরদীপের বোমা। স্টেপনিকা রিম টুট গয়া থা। মালিকনে বোলা থা কাল ভেজ দেঙ্গে লেকিন উধারসে কোই গাড়ি আয়া নেহি। থোরা ইন্তেজার কিজিয়ে, আভি বানাকে লাতা হুঁ। চাকা খুলে এক বাইকওয়ালাকে পাকড়ে গেল তো গেল। সন্ধে গড়িয়ে রাত। রাস্তার ডানদিক বামদিকে শুধু কালো মোলায়েম পিচ ঢালা রাস্তা আর অন্ধকার ক্ষেত। গুরদীপজী একটা ব্যাটারি লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। ঝুরিভাজা, বিস্কুট, জল, চকলেট। প্রিয়াংকু ঝুলনের নাট্যাংশ। গান, অন্তাক্ষরী, বিরক্তি, রাগ। ছোট-বাইরে, অপেক্ষা, অপেক্ষা। ঘণ্টা দুই। একটা ফিরতি বাস এসে দাঁড়াল। বিজয়ীর ভঙ্গিতে টায়ার নিয়ে গুরদীপ। হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছি না। রাগ করতেও ইচ্ছে করছে না।
গাড়ি যখন আবার চলতে শুরু করল, ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে আটটা। শরীর আর মন বলছে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এখান থেকে চণ্ডীগড় গুগল বাবাজি জানাচ্ছে একশো আশি কিমি। চার ঘন্টা। পিংকু আমার মুখের কথা কেড়ে বললো, রাত দেড়টায় চণ্ডীগড় ঢোকার কোনও মানেই হয় না। ঘণ্টাখানেক পর কোথাও একটা মোটামুটি হোটেল দেখে রাতটা থেকে যাওয়া ভালো। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লেই হবে। ফ্লাইট তো বিকেল ছটায়। গুরদীপ একটু গলা খাঁখার দেয়। সাহাবজী, মেরি বাজে আপকা তকলিফ হুয়া। মেরা দামাতকা ঘর দশ বারা কিমি আগে হ্যায়। গাওঁমে। সরপঞ্চ হ্যায় উসকা বাবজী। কোই পরেশানি নেহী হোগি। ঠাহর যাতে আজ রাত কে লিয়ে। তানা নানা করে শেষমেশ রাজি হয়ে গেলাম। একটু আশঙ্কা ছিল তো বটেই। অজানা অচেনার ভয়। বাঙালির মধ্যবিত্ত ভয়।
হাইওয়ে থেকে ডানদিকে ছোট রাস্তা ধরে মিনিট কুড়ি। অন্ধকারে স্ট্রিট লাইটের ঝাপসা ঘুমিয়ে পড়া গ্রাম। গুরদীপ ফোন করে দিয়েছিল। ওর জামাই চওড়া গেটের সামনে। বিরাট উঠোন। বামদিকে গোরু মোষের থাকার ব্যবস্থা। অসময়ের অতিথিতে বিরক্ত। হাম্বা হাম্বা। দোতলা বাড়ি। জলের ট্যাঙ্ক প্যাটন ট্যাঙ্কের আদলে। পাঞ্জাবের বহু গ্রামের বাড়িতে এইরকম। এরোপ্লেন , হেলিকপ্টারও দেখেছি। এক অলিখিত বক্তব্য। ছাদে উড়োজাহাজ মানে সে বাড়ির ছেলে কানাডায় থাকে। এই বাড়ির কেউ নিশ্চয়ই আর্মিতে ছিল। দোতলায় একটা বিরাট ঘর ঢালা বিছানা পাতা। আমাদের রাতের আস্তানা।
আমাদের এখানে আসাটা এদের কাছে যেন এক উৎসব। আসলে পাঞ্জাবিরা ফুর্তিবাজ জাত। আনন্দের একটা অজুহাত পেলেই হল। খোলা মনের মানুষ। মুখের হাসিটা লেগেই থাকে। আমার তো মনে পড়ে না আজ অবধি কোনও পাঞ্জাবি ভিখারী দেখেছি। আপনি দেখেছেন নাকি?
হাল্কা ঠান্ডার আমেজ। উঠোনের এক কোণে মাটিতে বসানো চুলা। নাকি তন্দুর! ডাল মাখানি আর মাওয়া রোটি। অসাধারণ স্বাদু লস্যি। ক্ষেতের কচি শসার একটা অদ্ভুত স্যালাড। এই তো জীবন, কালীদা ! চেটেপুটে নাও জীবনের শেষ নির্যাসটুকু।
এক বাটি মাষকলাই। রাতভর ভিজিয়ে রাখা। আধ বাটি বিউলির ডাল নাকি আপনারা কলাইয়ের ডাল বলেন ? যাই হোক, ঘণ্টা চারেক ভিজানো আর এক মুঠো ছোলার ডাল। দু ঘণ্টা একটা জলের পাত্রে ডুবসাঁতার। খোসাসমেত মুগ যাকে কিনা মাষকলাই বলা হয়, ধোয়ার একটা পদ্ধতি আছে। দুহাতে রগড়ে ধুয়ে মিনিট দশ ভিজিয়ে রাখা। তারপর আরও একবার ওই রগড়ানি। ভেজা ডালগুলো জল ঝরিয়ে একটা পাত্রে।
প্রেসার কুকার। আগুন। দু চামচ গাওয়া ঘি। শুকনো লঙ্কা দু তিনটে। লঙ্কা ভাজা ধোঁয়ার গন্ধে কাশি এলে ডাল। সবটা। একচামচ লঙ্কা গুঁড়ো। একচামচ গুঁড়ো হলুদ। টাটকা কচি পালং শাক এক কাপ মতো । তিন কাপ জল। পরিমাণমতো নুন। ঢাকনা বন্ধ করে হাল্কা আঁচে । এবার ওদের ওদের মতো থাকতে দিন। দুটো বড় পিঁয়াজ কুচি। একটা বড় কড়া। আধা কাপ সাদা তেল। ইচ্ছে হলে ঘিও দিতে পারেন। তেল গরম হলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে সোনালি রঙে ভেজে তুলতে হবে। ওই যাকে বেরেস্তা বলে ডাকা হয় আর কী ।
দুটো কথা। একমাত্র সরষে তেল দিয়ে রান্নাতে তেলের ধোঁয়া উঠলে তবে তা ভাজার/রান্নার উপযুক্ত। অন্য সব তেল মাঝারি আঁচে কিঞ্চিৎ বুদবুদ উঠলেই তৈরি। দ্বিতীয়তঃ, বেরেস্তা কখনওই চড়া আঁচে নয়। মৃদু থেকে মাঝারী আগুনে সময় নিয়ে। প্রেমসে। মুঘলাই খানা। চাইনিজ নয়। ধর তক্তা মার পেরেক মোটেই চলবে না। তেল বাড়তি থাকলে অন্য রান্নায় দিব্যি লাগবে। না হলে মাথার চুলে লাগান। অনিয়ন অয়েল।
একটা বাটিতে একশো গ্রাম দই, আধ কাপ টম্যাটো পিউরি, দু চামচ আদা রসুন বাটা আর বেরেস্তাটা দিয়ে চমৎকার ভাবে মিশিয়ে নিন। ওরা যেন একটা সুখী একান্নবর্তী পরিবারের মতো থাকে।
এবার ওই পেঁয়াজ ভাজা তেল খানিক গরম হলে
একটা মাঝারি তেজপাতা, পাঁচ ছয়টা লবঙ্গ, গোটা গোলমরিচ , ইঞ্চিটাক দারচিনি ওর মধ্যে। লবঙ্গ ছিটকে উঠলে এক চামচ গোটা জিরে। ওই দই টম্যাটো বেরেস্তার মিশ্রণটা এবার। হালকা হাতে নাড়াচাড়া। মৃদু থেকে মাঝারি আঁচ। আস্তে আস্তে সুগন্ধ। তেল ছাড়ছে মশলা। এক চামচ কাশ্মিরী লংকা গুঁড়ো, হলুদ আর ধনে গুঁড়ো এক চামচ করে। নাড়তে থাকুন। কোনও তাড়াহুড়ো নয়। দু চামচ ধনেপাতা ডান্ডির মিহি কুচি। পরিমাপে নুন। এরমধ্যে কিন্তু মিনিট কুড়ি পার। ডাল সেদ্ধ হয়ে পরবর্তী অভিযানের জন্য তৈরি। ঢেলে দিন কড়াতে। দু কাপ উষ্ণ জল। মাঝে মাঝে খুন্তি বা হাতা চালাবেন প্লিজ। নিচটা ধরে যেতে পারে।
রান্না হল ছবির মতো। উপন্যাসের মতো। পরতে পরতে। রঙ, রূপ, রস, ঘ্রাণ, স্বাদ। জীবনটা তো দৌড়ে কেটে যায়। রাঁধুন সময় নিয়ে। আপনার মন, বুদ্ধি, কৌশল, ঋদ্ধতা আর ভালোবাসা মিশে যাক ব্যঞ্জনে। দেখবেন, রোজকার চেনা একঘেয়ে পদও বদলে যাবে অবাক। হৃদয়ের একটু নিচেই তো উদর। তাই না!
একটা তড়কা প্যান মাঝারি আগুনে। এক চামচ আখের গুড় । একটু ক্যারেমলাইজড হলেই বড় এক চামচ ঘি। এক চিমটে কসুরী মেথি দুহাতে রগড়ে। দু চামচ জল। ফুটে উঠলে মিলিয়ে দিন ডালে। ম্যাজিক। দু তিন মিনিট ফুটিয়ে এবার নামিয়ে নিন। ডাল মাখানি তৈরি। এক চামচ চিলি অয়েল আর ধনেপাতা দিয়ে সাজিয়ে নিলেই ফাইভ স্টার।
দুটো কচি শসা এক আঙুল মাপে সরু সরু করে কেটে নিন। বড় এক চামচ শুকনো খোলায় ভাজা বাদাম হামানদিস্তায় ভেঙে নিন। একটা বাটিতে এক চামচ রসুন কুঁচি, চিলি ফ্লেক্স, সুন্দরবনের টাটকা মধু, সামান্য নুন আর গরম অলিভ অয়েল। এক চামচ সাদা তিল শুকনো খোলায় নেড়েচেড়ে নেওয়া। একটুখানি সয়া সস। পুরোটা মিশিয়ে নিন। বাজি ধরতে পারি, এমন শসার স্যালাড কক্ষনও খান নি।
মাওয়া মানে হল ক্ষীর। অল্প নুন, ঘি আর ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে আটা মেখে নিতে হবে। জানেন তো, আটা মাখতে হয় কিলিয়ে আর ময়দা টানাহেঁচড়া করে! একটা ভিজে রুমাল ঢেকে আধ ঘন্টা বিশ্রামে রাখুন মন্ডটা। আটার প্রতি কণায় পৌঁছে যাবে জলের ছোঁয়া। শুকনো খোলায় নেড়েচেড়ে নিন কয়েকটা পেস্তা, আমন্ড, কাজু বাদাম। খুব মিহি না করে গুঁড়িয়ে নিতে হবে। ওই যে, বাঙলায় বালি বালি করে বলে না, ওই রকম। পরিমাণমত খোয়া ক্ষীর একটা ফ্রাই প্যানে নরম আঁচে নাড়তে থাকুন। এক চামচ গাওয়া ঘি ওতে দিলে অতি উত্তম। আর দু চামচ ব্রাউন সুগার। আর শুকনো আখের গুড়। বিলেতে গিয়ে মাখনলাল হল মেকন সায়েব। ওই আর কী । অল্প গোলমরিচ গুঁড়ো, কিঞ্চিৎ নুন, বাদামগুঁড়ো আর এই খোয়া ক্ষীরের মিশ্রণ চমৎকার ভাবে মিশিয়ে নিন। রাজনৈতিক দলের মত আর কি? মিলেমিশে গেলে কে লাল কে নীল আর কে ডিপ স্টেট বোঝে কার সাধ্য?
লেচি কেটে, বাটি গড়ে ওই মিশ্রণটা পুর হিসেবে পুরে দিন। এরপর হালকা হাতে বেলে নেওয়া। তাওয়াতে ঘি ব্রাশ করে সোনালি বাদামী রঙে ভেজে নিলেই হলো। খাওয়া শুরু করে দিন। এইসব সুখাদ্যকে অপেক্ষাতে রাখা পাপ।
সেইরাতে জম্পেশ খাওয়াদাওয়ার পর একটু ঢোলক বাজিয়ে লোহরির গান আর অফুরন্ত আড্ডায় শুতে শুতে প্রায় তিনটে। পেশা আর অবস্থান দিয়ে আমরা মানুষকে ভাগ করি। দূরত্ব তৈরি করে রাখি। আসলে নিজেরাই মূল স্রোত থেকে দূরে, আরও দূরে সরে যাই। একটু ভাবুন। ভাবতে তো আর পয়সা লাগে না!
একটা কথা। এই ডাল মাখানির উৎস কিন্তু লখনউ। গুরদীপের মেয়ের শাশুড়ি ওখানকার কিনা! তো ওরা এটাকে বলে ফলকনামা ডাল মাখানি। যা কিনা পেশোয়ার থেকে আসা কুন্দন লাল জাগ্গি আর কুন্দন লাল গুজরালের পেটেন্ট নেওয়া রন্ধন শৈলীর থেকে আলাদা। দরিয়াগঞ্জের মোতি মহল রেস্টুরেন্টে বাটার চিকেনের নিরামিষ ভাই বেরাদর খুঁজতে গিয়ে ডাল মাখনির জন্ম ১৯৫০ এ। মাখন দেওয়া ডাল হল ডাল মখানি। তবে এটা আমার ইউনিক লেগেছিল। তাই এটাই লিখলাম। খেয়ে দেখবেন, ভালো লাগার গ্যারান্টি। না হলে আমার নামে কুত্তা পুষবেন। ও হ্যাঁ, আমার নামটা জানেন তো? আর প্লিজ, ভালো জাতের কুকুর। পেডিগ্রী দেখে শুনে।

