তখন আমি চব্বিশে পা / তখন শহর চিরে/ দু চাকাতে শাসন করি / রাত্রি দ্বিপ্রহরে।
যোধপুর পার্ক ঝকমকে নার্সিং হোম। আই সি ইউতে আর.এম. ও। ঝকঝকে উচ্ছল তরুণীরা নার্সিং স্টাফ আর ফ্রন্ট অফিস সামলায়। গুড মর্নিং আর গুড নাইট ছাড়াও একটু আধটু চোখের কথা কিংবা ক্যাফেটেরিয়ায় চা কফির আমন্ত্রণ। ওতে দোষ নেই। ওরকম কিছুমিছু না হলে ওপরওয়ালা বয়সটা তেরো চোদ্দর পর একদম চৌত্রিশ করে দিত। মিথ্যে বলবো না। এমন করে দু চারটে সম্পর্ক পেকেও গেছে।
সবার মাঝখানে নজর কেড়ে নেয় ভিন্সি। ভিন্সি কার্ডিলো। কেরালাইট। গমরঙা ত্বক, কাটা কাটা চোখমুখ, সাড়ে পাঁচ। একটু রোগার দিকেই। হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট। ফ্লোর ম্যানেজার। যে কোনও পরিস্থিতি সামলে দিত ওই দক্ষিণী উচ্চারণের হিন্দি ইংরেজি আর বাঙলার মিশেলে। রিসেপশন হোক বা আই সি ইউ। ঝামেলা দেখলেই ভিনসিকো বুলাও।
সামনেই একটা বাড়িতে পাঁচ ছয় জন মিলে পেয়িং গেস্ট থাকত। ওদের কফি চাষ আছে। দু’তিন বার বাড়ি থেকে ফিরে খাইয়েছিল। সে স্বাদ ভোলার নয়। যেমন ভোলা যাবে না ভিন্সিকে। আমি হসপিটাল ছেড়ে দেওয়ার ফেয়ারওয়েল পার্টিতে এক টুকরো কাগজে ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিল, আগর কভি কেরলা যাতে হো, ডোন্ট ফরগেট মি। সে চিরকুট আমার কাছে এখনও আছে। চলার পথে কুড়িয়ে পাওয়া মণি মুক্তা। ফেলবো কি করে? দাগ মুছে গেলে জেব্রা তো অশ্বতর হয়ে যাবে।
বিশ বছর পর সময় হল। গত নভেম্বরে একটা কাজে যেতে হল ত্রিভান্দ্রম । ওখান থেকে মাদুরাই হয়ে ফেরা। দিন চারেকের ট্যুর। মনে ছিল। নাম্বার ফোনে ছিল। বার তিনেকের চেষ্টায় ধরা গেল। বিশ সাল বাদ। কিন্তু গলায় সেই উচ্ছলতা এখনও তেমনই। তবে ভাষার মধ্যে বাংলাটা খুব কমের দিকে।
বেঙ্গলি ভুল গয়ি ক্যা?
কাম ওন। পরখ লেনা। ডেটস হোয়াটস অ্যাপ কর দো। আই উইল কন্ট্যাক্ট ইউ।
নভেম্বরে এক দুপুরে মধ্যাহ্নভোজ সেরে উঠে পড়লাম অনন্তপুরম এক্সপ্রেস। 1এসি। টিকিট ভিন্সি পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাইরের দৃশ্য বাঙলার মতোই। গ্রাম যেমন হয়। শুধু অনেক চার্চ। অন্ত্যজ আর গরিব মানুষের বঞ্চনার শোধ ধর্মান্তরের মধ্যে দিয়ে। ঠিক ভুল বিচারের সাধ বা সাধ্য আমার নেই। ঘণ্টাখানেক পরেই নাগের কোল স্টেশন। কন্যাকুমারী স্টেশনের আগে নাগের কইল নামেই একটা স্টেশন আছে। রক্তকরবী গাছের ঝরা ফুলে সেই প্ল্যাটফর্ম ঢেকে থাকতে দেখেছি। প্ল্যাটফর্মে জানালার শার্সির বাইরে চেনা মুখ। একগাল আপন হাসি নিয়ে ভিন্সি এসে দাঁড়াল। অবিকল একই। শুধু কিছু রূপালী চুল। আরও স্মার্ট। তুমি মডুরাই নেমে যাবে, আম্মি আগিয়ে যাব। চেন্নাই। এখন আপোলোতে আছি।
হাততালি দিয়ে হেসে উঠি। কত কষ্টের বাঙলা বলা।
নাউ ওকে? ইউ গ্রাজুয়েটেড উইথ ডিস্টিংশন ভিন্সি ।
দুজনেই হাসতে থাকি। বিশ বছরের চাপা হাসি।
দুবার কফি। অনেক গল্প। রাত আটটা নাগাদ ওর জুটের হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা প্লেট বেরলো। একটা কৌটো থেকে সুগন্ধী পোলাও এর মতো কিছু একটা। ছোট্ট হটপট থেকে মাটন।
দিস ইজ আওয়ার ডেলিকেসি। লেমন রাইস। হামনে বানায়া। ফর ইউ।
দারুণ খেয়েছিলাম সেদিন। মনে রাখার মতো। আমি বলতে থাকি। বানিয়ে ফেলুন।

লেমন রাইস ভুলেও কখনও সুগন্ধী চাল দিয়ে করতে যাবেন না। মাঠে মারা যাবে। এমনিতেই বেশ চটপট তৈরি করা যায়। কোলাম বা ছোট মসুরি ধরনের ছোট দানার চাল। ভালো করে ধুয়ে ৯০শতাংশ সেদ্ধ করে নিন। একটা নন স্টিক কড়াইতে হাল্কা আঁচে তিল তেল দিয়ে দিন দু/ তিন টেবলস্পুন। তিল তেল কখনোই চড়া আঁচে দিতে নেই। তেল একটু গরম হলে রাই সর্ষে দু চিমটি। গোটা বিউলির ডাল আর ছোলার ডাল মিলিয়ে আধ চামচ। শুকনো লঙ্কা দু তিনটে। লম্বালম্বি চিরে রাখা কাঁচা লঙ্কা দু তিনটে। খানিকটা তাজা কারী পাতা। সব মিলিয়ে নাড়তে থাকুন। মিহি আঁচে অবশ্যই। কয়েকটা কাজু বাদাম আর কিছু চিনে বাদাম। পরিমাপে নুন। আমি এক চিমটে চিনি দিই। কেউ কেউ ঘিয়ে ভাজা মেথি গুঁড়ো দেয়, কেউ বা দেয় একটু হিং। দিতেই পারেন। আপ রুচি খানা। আমার না পসন্দ । আসলে ভিন্সির রান্নায় এগুলো মোটেও ছিল না। কড়াইটা একটু নামিয়ে রাখুন। গরমটা সামান্য কমে এলে নামমাত্র হলুদ। রঙের জন্যে। আবার আঁচে বসিয়ে একটা প্রমাণ সাইজের পাতিলেবু মনের সুখে নিঙড়ে দিন ওর মধ্যে।
লেবু নিংড়ানোর বহু পরিচিত গল্পটা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। ফুটপাথে মাদারির খেলা চলছে। এক বিশালদেহী পালোয়ান নানান রকমের শক্তি প্রদর্শন করেছে। মেলা ভিড়। একটা পাতিলেবু মাঝখান থেকে কেটে বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝে টিপে রস বের করে একটা ছোট্ট বাটিতে রাখলো। সবাই অবাক। ওইটুকু লেবু থেকে এতোটা রস? এইবার পালোয়ান বললো, কেউ যদি এই লেবুর টুকরো থেকে আর এক ফোঁটা রস বের করতে পারে, তাকে পাঁচ হাজার টাকা নগদ দেব। কেউ এগোয় না। হঠাৎ পিছন দিকে একটা শোরগোল। এক খর্বকায় শীর্ণ বৃদ্ধ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন।
সবাই ভাবল হাসির খোরাক। তিনি এগিয়ে গিয়ে লেবুর টুকরো দু আঙুলে চাপ দিলেন। কয়েক ডজন অবাক দৃষ্টির সামনে এক, দুই, তিন ফোঁটা রস পড়লো লেবু থেকে। পালোয়ান বৃদ্ধের দু পা জড়িয়ে ধরলো। ক্যায়সে কিয়া? আপকা আখাড়া কিধার হ্যায় গুরুজী। ‘ আরে না না। আমি কোনও পালোয়ান নই। ইনকাম ট্যাক্স বিভাগে কাজ করতাম।’
এই সব বাজে কথা মাথায় এলেই মুশকিল। সময় নষ্ট। আপনি কড়ায় ওই মিশ্রণে ভাতটা দিয়ে দিয়েছেন তো? একটুক্ষন নাড়াচাড়া করে আরও চার পাঁচটা কারিপাতা দিয়ে নামিয়ে নিন। ইচ্ছে হলে ফ্রেশ ধনেপাতা দিতেও পারেন। তবে আমার পছন্দ এই লেমন রাইসে সর্ষে, কারিপাতা, শুকনো আর কাঁচা লঙ্কার ফ্লেভার। আসলে ওই যে, ভিন্সি ।
এর সঙ্গে তরিবৎ করে খাওয়ার জন্য একটা দোমালা নারকেলের শাঁস, সামান্য টক দই আর ফ্রেশ ক্রিম দিয়ে মিক্সিতে পেষ্ট। ফ্রাই প্যানে আধ চামচ সাদা তেল, একটু চিলি ফ্লেক্স আর চার পাঁচটা কালো সর্ষে তড়কা করে এই পেষ্টটাতে মিশিয়ে নিন। একটু সাদা তিলবাটা ও দিতে পারেন। দারুণ লাগে খেতে।
মাঝারি পিস করে কেটে নেওয়া মাংস। আধ কেজি। প্রথমে মসলা তৈরি। শুকনো খোলায় এক চামচ গোলমরিচ, এক চামচ জিরে, দু চামচ ধনে। সঙ্গে দুটো শুকনো লঙ্কা। ভালো করে নেড়েচেড়ে গ্রাইন্ডারে মিহি গুঁড়ো করে নিন। এবার কড়ায় দু চামচ সাদা তেল আর দু চামচ সর্ষে তেল। গরম হলে মাংস। সামান্য ভাজা হয়ে রঙ বদলালে একটুখানি হলুদ, এক চামচ আদা রসুন বাটা, পরিমাপে নুন। একটু কষিয়ে নিন। প্রেসার কুকারে একটা সিটি আর তারপর মৃদু আঁচে বারো মিনিট। জল বেশি দেবেন না প্লিজ। কচি পাঁঠার ঝোল নয়। এই রান্নার নাম মাটন সূক্কা বা চুক্কা। এইবার কড়ায় দু চামচ সাদা তেল। লম্বা করে চিরে রাখা তিনটে কাঁচা লঙ্কা, বড় এক চামচ কারিপাতা। দুটো বড় পিঁয়াজ কুচি। পিঁয়াজের রঙ হাল্কা সোনালি হলে দু চামচ আদা রসুন বাটা। এক চিমটে দারচিনি আর ছোট এলাচ গুঁড়ো। ভালো করে মসলা তৈরি হলে মাংস। ওটা নব্বই শতাংশ সেদ্ধ হয়ে গেছে। একটু স্পিডে খুন্তি চালান। এটা হাফ ফ্রাই করতে হবে। শেষে একটু ধনেপাতা কুঁচি দিয়ে নামিয়ে নিন। খাঁটি দক্ষিণী ডিস। দেখবেন, দারুণ লাগবে ভিন্সির রেসিপি।

মাদুরাই নেমে যাওয়ার আগে কত কথা। আরও কত বাকি রয়ে গেল। হয়তো পরে কখনও। হয়তো নয়। সব পেলে নষ্ট জীবন। ফিরে এলাম আমার গণ্ডীবাঁধা দুনিয়ায়। না। ভিন্সিকে আর কোনওদিন ফোন করিনি। কী করে সম্ভব? চোখের কোণে জল টলটল দেখেছিলাম যে! নাকি আমার মনের ভুল। যাকগে।

