কোচবিহারের চিলাখানা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীসরা শিল্প

কোচবিহারের লক্ষ্মীসরা শিল্প

অক্টোবরের একদম শেষ দিকে কোচবিহারের ভোরবেলাগুলো শীতের আমেজ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে থাকে। সেই প্রকাশের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় গ্রাম বাংলার স্নিগ্ধতা জড়িয়ে থাকে। হাল্কা কুয়াশার আস্তরণে সবুজ হয়ে যাওয়া ধান ক্ষেতগুলো ঢেকে থাকে। আরো দূর থেকে লক্ষ করা যায় বিশালাকায় হিমালয় পর্বতমালার হাল্কা রেখা। এর মধ্যেই ঠান্ডা হওয়ার স্রোত শরীরজুড়ে শীতের রোমাঞ্চকে জন্ম দিয়ে যায়। আর সেই বহু জন্ম জন্মান্তর পেরিয়ে বাংলার আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লক্ষ্মীসরার খোঁজে পৌঁছে গিয়েছিলাম কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত চিলাখানা গ্রামে।

কোচবিহার বাসস্ট্যান্ড থেকে যখন বাস ছাড়ল তখন সূর্যের হাল্কা সোনালী বিভা ঐতিহ্যের এই শহরের ওপর বর্ষিত হতে শুরু করেছে। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে যখন বাস ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে চলতে শুরু করল তখনই যেন প্রকৃতিকে দেখে মনের অন্তরে প্রকৃত ভালো লাগা আন্দোলিত হতে লাগলো। সবুজ হয়ে যাওয়া ধানক্ষেত। আর ধানক্ষেতের সীমানা যেখানে শেষ সেখানে জন্ম নেওয়া অজস্র বিশালাকায় গাছ কোনও এক আদিম সৌন্দর্যের কথা বলে যাচ্ছিল। দূরে সেই পাহাড়ের ঝাপসা রেখা নতুনকে ভালো করে জানার ও চেনার আহ্বান করে যাচ্ছিল। মরা তোর্সা ও কালজানি নদী পেরিয়ে বাস যখন চিলাখানা বাজারে পৌছল, তখনই মনে করতে লাগলাম যে এবার হয়তো কোচবিহারের অন্যতম পুরনো লক্ষ্মীসরা তৈরীর কেন্দ্রের সেই ঐতিহ্যকে দেখতে পাবো।

Cooch Behar Laxmisara

চিলাখানায় মোট তিনটি পালপাড়া রয়েছে। উত্তর পালপাড়া, পূর্ব পালপাড়া, পশ্চিম পালপাড়া। প্রথম দুটি পালপাড়ায় অর্থাৎ উত্তর ও পূর্ব পালপাড়ায় গিয়ে হতাশ হতে হল। এখন এখানে সবাই লক্ষ্মীসরা তৈরির শিল্প থেকে সরে এসেছেন। তারা মূলত বড় কাঠামোর প্রতিমা এবং মধ্যম উচ্চতার ছাঁচের প্রতিমা, পোড়ামাটির বাসন তৈরিতেই বেশি মনোননিবেশ করেছেন। এর পাশাপাশি যে সব নামকরা মৃৎশিল্পীরা লক্ষ্মীসরা আঁকতেন, তাঁদের মধ্যে একাংশ কাজ ছেড়ে দিয়েছেন ও আরেক অংশ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। মনের মধ্যে একরাশ হতাশা যখন একটু একটু করে জমাট বাঁধছে ঠিক তখনই শেষ ভরসার মতো উদয় হলেন পশ্চিম পালপাড়ার মৃৎশিল্পী অমূল্য পাল ও তার সহধর্মিনী অঞ্জলি পাল। চিলাখানার মৃতপ্রায় লক্ষ্মীসরা শিল্পকে কার্যত নিজেদের কাঁধেই যত্ন সহকারে আগলে রেখেছেন এই দম্পতি।

মৃৎশিল্পী অমূল্য পাল হলেন কুম্ভকার পাল। তার পূর্বপুরুষ মূলত মাটির হাড়ি কলসি সহ অন্যান্য ব্যবহারিক মাটির দ্রব্য তৈরি করতেন। তাদের পরিবারের কেউ মা লক্ষ্মীসরা আঁকতেন না। তবে ছোটবেলা থেকে চিলাখানার ঐতিহ্যশালী লক্ষ্মী সরার প্রতি আগ্রহ ছিল অমূল্য পালের। এমনকি তাদের বাড়িতেও লক্ষ্মীসরায় পুজো হত। যদিও সেই সরা অন্য পটুয়ারা এঁকে দিতেন। মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে লক্ষ্মী সরা অঙ্কনের প্রচেষ্টা শুরু করেন তিনি। নতুন কিছুকে শেখা ও জানার আগ্রহ এবং সদিচ্ছা বর্তমানে তাকে এক অনন্য লক্ষ্মীসরা শিল্পীতে পরিণত করেছে। বর্তমানে তার বয়স ৪৭, একাধিক দশকের সাধনা তার অঙ্কনশৈলীকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

Cooch Behar Laxmisara

মৃৎশিল্পী অমূল্য পালের কথায়, মা লক্ষ্মীর সরা তৈরির কাজ পৌষ মাস থেকে শুরু হয়ে যায়। তখন মূলত মাটির কাজ হয়। অর্থাৎ মাটিকে ভালো করে ছেনে নিয়ে বা পরিশোধিত করে তার থেকে ছোট ছোট পাথরগুলোকে বার করে একেবারে নরম করে গোলাকার মন্ড তৈরি করা হয়। এরপর বিট দিয়ে সেই মাটিকে হাল্কা করে পিটিয়ে সরার আকৃতি দেওয়া হয়। এরপর দুই মাস সেগুলোকে শুকানোর কাজ শুরু হয়। তারপর আগুনে পোড়ানোর পর সেগুলোকে রেখে দেওয়া হয়। আষাঢ় মাস থেকে শুরু হয় রঙের কাজ। আগে খড়িমাটির প্রলেপ দেওয়া হলেও বর্তমানে তার জায়গায় প্রাইমার দেওয়া হয়। এরপর তুলির দ্রুত লয়ে ভগবানের শরীর অঙ্কন করতে শুরু করে। ভগবানের বস্ত্রাদি অঙ্কনের পর সরার পটভূমি অঙ্কিত করা হয়। এরপর সরার মধ্যে থাকা চরিত্রগুলির চক্ষুদান করা হয়। একটি সরায় প্রতিটা চরিত্রকে একটি পুতুল হিসেবে ধরা হয়।

Cooch Behar Laxmisara

ধরা যাক একটি সরার মাঝখানে রয়েছেন মা লক্ষ্মী ও তার দুই পাশে জয়া বিজয়া। সরাটির একেবারেই ওপরে রয়েছে রাধা কৃষ্ণ। অর্থাৎ গোটা সরার মধ্যে মোট পাঁচটি চরিত্র রয়েছে। এক্ষেত্রে এই সরাকে পাঁচ পুতুলি সরা নামে অভিহিত করা হবে। আবার কোনও সরায় যদি জোড়া লক্ষ্মী থাকে, তাহলে সেটি দুই পুতুলি সরা। এই ভাবে তিন পুতুল, চার পুতুল, সাত পুতুলের সরাও হয়।

অমূল্য পালের তৈরি সরাগুলির অঙ্কনশৈলীর মধ্যে তার নিজস্বতার ছাপ রয়েছে। সরার মধ্যে তার অঙ্কিত মা লক্ষ্মী স্নেহশীল মাতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ভরাট শরীরের মাঝবয়সী রমণীর সন্তান বৎসল ভাব প্রস্ফুটিত হয়েছে। মুখের মধ্যে চিরকালীন বঙ্গবধূর লালিত লক্ষ করা যায়। মা লক্ষ্মীর লাল রঙের কাপড়ের ওপর আলপনার মতো অলংকরণ করা হয়েছে। এই অলংকরণে সাদা রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। মায়ের দুই দিকে থাকা সহচরীদের কাপড়ের ওপরও একই রীতিতে অলংকরণ করা হয়েছে। রেখাঙ্কনের দ্রুতলয়তা সরার মধ্যে থাকা চরিত্রগুলোকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

Cooch Behar Laxmisara

অমূল্য পালের অপর একটি সরার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় যে বিশালাকায় কদম গাছের তলায় রাধা কৃষ্ণ রয়েছেন। আর একজন করে সহচরী বা সখী দুই দিকে রয়েছে। রাধাকৃষ্ণের ঠিক নিচের তলায় বিরাজ করছেন মা লক্ষ্মী। আবার রাধাকৃষ্ণের ঠিক মাথার ওপর কদম গাছে আকৃতি অঙ্কন করা হয়েছে। অমূল্য পালের তৈরি লক্ষ্মী সরার মূল আকর্ষণ হচ্ছে সেগুলির চোখ। শিল্পীর কথায় সহধর্মিনী অঞ্জলি পাল এই চোখগুলি আঁকেন। চোখের অভিব্যক্তির বাঙ্ময়তা মনকে আকৃষ্ট করে।

Cooch Behar Laxmisara

শিল্পীর তৈরি দুর্গা সরার মধ্যে আমরা দেখতে পাই যে মা দুর্গা তার পরিবারকে নিয়ে বিরাজ করছেন। এখানে মা দুর্গার শারীরিক গঠনের মধ্যেও বঙ্গ জীবনের মাতৃত্বকেই শিল্পী প্রস্ফুটিত করেছেন। পাশাপাশি লক্ষী, গণেশ, সরস্বতী, কার্তিক মুখের গঠন প্রোফাইল পোট্রেটের মতো। অর্থাৎ মুখের গঠনের একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। এই শৈলীকে সাইড ভিউ পোর্ট্রেটও বলা হয়ে থাকে। গণেশের গোটা শরীর লাল রঙের। আর মস্তক সাদা রঙের। মা দুর্গার ও তার পরিবারের ঠিক নিচে কালো রঙের প্রয়োগের মাধ্যমে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। তার নিচে তলে বিরাজ করছেন মা লক্ষ্মী। অমূল্য পালের তৈরি লক্ষ্মী সরার পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ড রঙ সাদা। সরার একদম কোনায় লাল রঙ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট এই সরার মধ্যে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশের মুখের গঠন প্রফাইল পোর্ট্রেট হলেও মা দুর্গার মুখ সোজাসুজি ভাবে রয়েছে। অর্থাৎ প্রোফাইল পোর্ট্রেট নয়।

অমূল্য পালের অপর একটি দুর্গাসরার মধ্যে লক্ষ করা যায় যে সেখানে মা দুর্গা সহ তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মুখের গঠন প্রোফাইল পোর্ট্রেট। তলার প্যানেলে থাকা মা লক্ষ্মীর আবার মুখোমুখি তাকিয়ে রয়েছে। শিল্পীর কথায় এই ধরনের সরাকে এক চোখা দুর্গা সরা বলা হয়ে থাকে। তার তৈরি এক পুতুলি লক্ষ্মীসরার মধ্যে দেখা যায় যে মা লক্ষ্মীর একদিকে লাল রঙ দিয়ে ধানের শীষ আঁকা হয়েছে। মা লক্ষ্মীর হাতের মধ্যে ধানের শীষ। অন্য হাতে ঝাঁপি। তার তৈরি এক লক্ষ্মী ও জোড়া লক্ষ্মী সরায় ধামা কুলো ও ঝাঁপি দেখা যায়। জোড়া লক্ষী সরা বা দুই পুতুল মধ্যে দুই লক্ষ্মীর মধ্যেবর্তী স্থানে ধানের শীষ আঁকা হয়েছে। দুই লক্ষীর চারিদিকে গোলাকৃতি ভাবে ধানের শীষ লাল রঙ দিয়ে অঙ্কিত করা হয়েছে। মা লক্ষ্মীর মুখ এবং শরীরের গঠন চওড়া বা সমৃদ্ধশালী স্বাস্থ্যবতী নারীর মতো। জোড়া লক্ষ্মী সরার মধ্যে তাকালে আরো একটা জিনিস লক্ষ, করা যায় সেটি হচ্ছে দুই লক্ষ্মী যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বসার ভঙ্গিমা নেই।

কথায় ক্থায় সময় যেতে মৃৎশিল্পী অমূল্য পাল আমাদেরকে নিয়ে গেলেন এসবেস্টসে ঘেরা একটি ছোট্ট ঘরে। সেখানে জানালা দিয়ে সদ্য সকালের মিষ্টি রোদ পড়েছে। আর যেগুলোর ওপর পড়েছে সেগুলি হচ্ছে রিলিফের সরা। এই সরা গোটা শরীরটাই সাদা রঙের। এই সরার গোলাকার কোণগুলো উঁচু। সরার পটভূমি সমতল বা চ্যাপ্টা। অনেকটা ভাতের থালার মতো দেখতে। কোণের মাথাগুলিতে লাল রঙকরা হয়েছে। আর সরার মধ্যভাগে উঁচু হয়ে রয়েছে লক্ষ্মীনারায়ণ, আবার কখনো জোড়ালক্ষ্মী। আবার এক লক্ষ্মী সরাও দেখতে পাওয়া যায়। এই এক লক্ষ্মী সরায় দুই দিকে লাল রঙ ধানের শীষ আঁকা হয়েছে। এই রিলিফের সরাগুলোতে সরু তুলি দিয়ে ধামা, কুলো আঁকা হয়েছে। পুজোর পর এই সরাগুলোকে যেহেতু দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখে গৃহস্থেরা। তাই সরার ওপরে কোথায় সুতো হবে সেটাও অঙ্কিত করা হয়েছে।

Cooch Behar Laxmisara

লক্ষ্মী-নারায়ণ সরার মধ্যে দেখা যায় যে ডানা মেলা প্যাঁচার ওপর পা দিয়ে বসে রয়েছেন লক্ষ্মী-নারায়ণ। প্যাঁচাটি ছাঁচের হলেও তার ওপর সরু তুলি দিয়ে রেখাঙ্কন করা হয়েছে। শিল্পীর কথায় সরার মধ্যে উঁচু হয়ে থাকা মূর্তিগুলি ছাঁচের কাঁচামাটির তৈরি। আলাদা করে এগুলিকে সরার মধ্যে স্থাপন করা হয়। মৃৎশিল্পী পূর্বপুরুষ যেহেতু ঢাকার জেলার মানুষ তাই তার বাড়িতেও এই সরায় পুজো হয়ে থাকে। এই সরার পটভূমি রঙ বা ব্যাকগ্রাউন্ড কালার হচ্ছে সাদা।

শিল্পী জানালেন চলতি বছরে সব মিলিয়ে অর্থাৎ উত্তল চিত্রিত সরা এবং রিলিফ মিলিয়ে প্রায় পনেরশো তিনি তৈরি করেছেন। এই কাজে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে তার সহধর্মিনী। তার তৈরি লক্ষ্মী সরার উচ্চতা হচ্ছে ১২ ইঞ্চি। লক্ষ্মী সরার বিপণনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক উদ্যোগ একান্তভাবে প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এককালে এই চিলাখানা অঞ্চলের লক্ষ্মীসরা শিল্পী ধীরেন পাল, শ্রীদাম পালের মতো শিল্পীদের খ্যাতি গোটা কোচবিহারে ছিল। আজ সবই অতীত শুধু ভরসা অমূল্য পাল।

চিলাখানা অঞ্চল থেকে কিছুটা গেলেই পরে মারুগঞ্জ বাজার। সেখানকার প্রয়াত মৃৎশিল্পী সুকুমার পালের খ্যাতি ছিল গোটা জেলায়। তার প্রয়াণের পর পুত্র কৃষ্ণ পাল পরিবারের লক্ষ্মী সরা তৈরীর ধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বর্তমানে তার বয়স পঞ্চান্ন। মাধ্যমিক দেওয়ার পর থেকে তিনি লক্ষ্মীসরা তৈরিতে মনোনিবেশ করেছিলেন। এবছর প্রায় পাঁচ হাজারের মতো মা লক্ষ্মী সরা তিনি তৈরি করেছেন।

কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, দিনহাটায় তার তৈরি সরার চাহিদা রয়েছে। প্রতিবেশী রাজ্য অসমেও তার তৈরি সরার জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। এক পুতুল, দুই পুতুল, তিন পুতুল, পাঁচ পুতুল, ছয় ও সাত পুতুল সরা তিনি তৈরি করে থাকেন। এক বিশেষ ধরনের সরা তিনি তৈরি করে থাকেন। এই সরার নাম হচ্ছে গজলক্ষ্মী সরা। হাতির পিঠে বসে রয়েছেন মা লক্ষ্মী। তার ঠিক দুই পাশে বিরাজ করছেন দুই সহচরী। শিল্পী এই সহচরীদের জয়া ও বিজয়া নামে অভিহিত করেছেন। সরার মধ্যেই রয়েছে প্যাঁচা। এ বছর মাত্র তিনটি গজলক্ষ্মী সরা তিনি তৈরি করেছেন। শিল্পীর কথায় অসমের দিকের দুর্গা সরার চাহিদা সর্বাধিক বেশি। আবার কোচবিহার এর মধ্যে পাঁচ ও তিন পুতুলের লক্ষ্মীনারায়ণ সরার চাহিদা রয়েছে। শিল্পীর পূর্বপুরুষরা ফরিদপুরের। শিল্পীর কথায় তার দাদু সারদা পাল, জেঠু নারায়ণ পালও সরা আঁকতেন। তারা জাতিতে হলেন কুম্ভকার পাল।

সরা নির্মাণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, সরার তৈরীর দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে হয় মাটির কাজ। সেখানে মাটিকে ভালো করে ছেনে নিয়ে ডলতে হয়। হাত দিয়ে ডলার পর সেটিকে দলা পাকিয়ে নিতে হয়। দলা পাকানোর পর ফরমার ওপর বসিয়ে ঘাই দিয়ে হাল্কা অথচ দ্রুতভাবে পেটাতে হয়। এরপরে এক থেকে দেড় মাস ঘরে এবং বাইরে এগুলোকে শুকোতে দেওয়া হয়। তারপর পোণে পোড়ানো হয়। এর দ্বিতীয় ধাপে হয় রঙের কাজ। সেখানে নারকোলের ছোবড়া দিয়ে ভালো করে সরার যে পিঠে রঙ করা হবে সেদিকে ঘষে নেওয়া হয়। তারপর খড়িমাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। তুলির টানে সরার পুতুলগুলিকে এঁকে নেওয়া হয়। চরিত্র বা পুতুলগুলির অঙ্কনের পর পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ড রঙ করা হয়। সবার শেষে সরার কোণগুলোকে লাল রঙয়ের প্রলেপ দেওয়া হয়। শিল্পীর কথায় রঙের ক্ষেত্রে গুঁড়ো রঙ ব্যবহার করা হয়। সরার ওপরে যে বার্নিশ করা হয় সেটি শিল্পী নিজেই বাড়িতে তৈরি করে নেন। বাজার চলতি বার্নিশ তিনি কেনেন না। আক্ষেপের সুরে শিল্পী জানালেন যে তার পরবর্তী প্রজন্ম এই শিল্পরীতি শেখেনি। পরিশ্রম সাধ্য ও অল্প মজুরির কারণে এই শিল্পের প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সরার থেকে প্রতিমার দিকে সাধারণ মানুষ বেশি ঝুকে পড়েছে। ফলে আগের মতো খুব চাহিদাও তেমন নেই।

Cooch Behar Laxmisara

কৃষ্ণ পালের তৈরি সরার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সরাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাধা- কৃষ্ণ সরা। পাঁচ পুতুল এই সরার মধ্যে প্রতিটা চরিত্রের মুখমণ্ডল প্রোফাইল পোর্ট্রেটে অঙ্কিত হয়েছে। এখানে রাধা কৃষ্ণ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আর তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দুই সখী। শিল্পী এই সখীদের জয়া বিজয়া নামে অভিহিত করেছেন। সরার ঠিক নিজের প্যানেলে মা লক্ষ্মী অঙ্কিত হয়েছে। মা লক্ষ্মীর মুখমণ্ডল প্রোফাইল পোর্ট্রেট। তার তৈরি পাঁচ পুতুলের সরার মধ্যে লক্ষ করা যায় যে ছড়ার মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মা লক্ষ্মী। আর দুই দিকে দুজন করে নারীর ছবি অঙ্কিত হয়েছে। সরার প্যানেলের ঠিক নিচে লাল এবং হলুদ রঙের বিভাজন করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে প্যাঁচা ও দুই দিকে একটি করে ময়ূর। মা লক্ষ্মীর মাথা ঠিক ওপরে অর্ধ গোলাকৃতি ভাবে ধানের শীষ অঙ্কিত করা হয়েছে। মা লক্ষ্মীর এক হাতে ধানের শীষ ও অন্য হাতে ঝাঁপি দেওয়া হয়েছে। তার অপর একটি সরায় দেখা যায় মা দুর্গা তার পরিবারবর্গকে নিয়ে বিরাজ করছেন। সরার প্যানেলের একেবারে নিচে বসে রয়েছেন মা লক্ষ্মী। মা দুর্গার মুকুটে ঠিক উপরে রয়েছে মহাদেব। সরার পটভূমির রঙ টকটকে লাল। এই ধরনের সরাকে গণকা সরা নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যদিও প্রথাগত গণকা সরার মধ্যে চালচিত্র অঙ্কিত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে তেমনটা নেই।

চিলাখানা এবং মারুগঞ্জ বাজারের লক্ষ্মী সরা শিল্প দেখে মনে পড়ে গেল তৃতীয়ার চাঁদের কথা। কোচবিহারের উদ্দেশ্যে আসার পথে তিস্তা তোর্ষা এক্সপ্রেসে বসে জানালা দিয়ে ধানক্ষেতের ওপর অন্ধকার আকাশে কাস্তের মতো সরু বাঁকা চাঁদ যেমন ভাবে বেঁচে ছিল। ঠিক সেই ভাবে বেঁচে রয়েছে কোচবিহারের লক্ষ্মী সরা শিল্প। তার জন্য একান্তভাবে দরকার কোজাগরি পূর্ণিমার মতো ভরাট চাঁদের মতো পরিসরের। যেখানে তার লক্ষ্মী সরা শিল্প বিশ্বজনীন হয়ে উঠবে।