self art painting of Jogen Chowdhury

বিষাদময় আলো-ছায়ায় জীবনের সত্যকে চিনেছিলেন

 

যোগেন চৌধুরীকে নিয়ে লিখলেন আশিস পাঠক

লাল-নীল পেন্সিলে জীবনের প্রথম ছবিটি এঁকেছিলেন, একটি ময়ূর। আট বছর বয়স তখন। দেশভাগের পরে সবে এসে উঠেছেন পুলিশকর্মী কাকার কোয়ার্টারে। সে ঘরেরই এক দেওয়ালে যোগেন চৌধুরী (১৯৩৯–২০২৬)-র প্রথম ছবি আঁকা, একটি ময়ূর।

তার পরে এই আট দশকের জীবনে সে ময়ূর পেখম মেলেছে বিচিত্র বিস্তারে। হয়ে উঠেছে বিশ শতকের ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ক্যানভাসে এক স্বকীয় ও প্রথাবিরোধী অধ্যায়। যে সময়ে দেশের চারুকলা প্রাঙ্গণ ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক শিক্ষার নিখুঁত অনুকরণে ব্যস্ত, কিংবা অতীতের প্রাচ্যরীতির অন্ধ পুনরাবৃত্তিতে মগ্ন, ঠিক তখনই তিনি কোনও গণ্ডিতেই আটকে না-থেকে তৈরি করলেন এক সম্পূর্ণ নিজস্ব চিত্রভাষা। তাঁর কাজ দর্শককে শুধু চাক্ষুষ সৌন্দর্য উপহার দেয় না বরং টেনে নিয়ে যায় মানবমনস্তত্ত্বের গহনে—যেখানে জমে থাকে ক্ষত, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর সামাজিক অবক্ষয়।

শিল্পবোদ্ধাদের কাছে তিনি ‘মাস্টার অব দ্য আনব্রোকেন লাইন’ বা অবিচ্ছিন্ন রেখার জাদুকর। লোকশিল্পের স্বাভাবিক সারল্য এবং ইউরোপীয় অভিব্যক্তিবাদকে এক সুতোয় বেঁধে তৈরি হয়েছে তাঁর এই কালজয়ী চিত্রভুবন।

Jogen Chowdhury painting

যোগেন চৌধুরীর শিল্পসত্তাকে বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে তাঁর শৈশব ও ইতিহাসের এক করুণ সন্ধিক্ষণে। ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী পৌরাণিক চিত্রানুরাগী জমিদার এবং মা ইন্দুদেবী ছিলেন আলপনা ও কারুশিল্পে সিদ্ধহস্ত। আত্মস্মৃতিতে যোগেন লিখেছেন, ‘আমাদের গ্রামে আটচালায় প্রতিবছর থিয়েটার হত। বাবা শখ করে সেই থিয়েটারের কয়েকটি ‘সিন’ এঁকেছিলেন। ড্রপসিনটি ছিল বাবার হাতে আঁকা শ্রীকৃষ্ণের কালীয়দমনের ছবি। সহস্রনাগের মাথায় দাঁড়িয়ে বালক শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন। চারিদিকে সমুদ্রের ঢেউ এবং ফেনা, সমস্ত ‘সিন’টিতে ছিল নীলরঙের আধিক্য। আকাশ, জল, শ্রীকৃষ্ণ – সবই নীল বা নীলাভ। শখ করে বাবা দুর্গাপ্রতিমা বা অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তিও গড়তেন। অত্যন্ত সুন্দর শিল্পময় হত তার কাজ। মাঝেমধ্যে জমিদারির কাগজপত্রের ওপরই ছবি আঁকতেন, নারীমূর্তি কি অন্য কিছু। অথচ বাবা কখনোই গতানুগতিক শিল্পচর্চা করেননি, তেমন আবহাওয়াও সে সময়ে ছিল না। মা-র আলপনা দেবার হাত ছিল অত্যন্ত নিপুণ। শাদা কাপড়ের বালিশের ওপর সবুজ সুতোয় বকুল ফুল তুলতেন অনবদ্য।’

গ্রাম বাংলার এই রূপ ও কারুকাজ শৈশবেই তাঁর চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু ১৯৪৭-এর দেশভাগ মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন করে দিল সেই স্বপ্নময় শৈশবকে। ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো পরিবারটি। কলোনি জীবনের কঠিন বাস্তবতা, বাঁচার আকুল সংগ্রাম, ঘুপচি ঘর আর অগণিত মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তরুণ যোগেনের সংবেদনশীল মনে এক গভীর ছাপ ফেলেছিল। ক্যানভাসে মানুষের মেদবহুল ও কুঞ্চিত অবয়বের যে অনন্য প্রকাশ আমরা দেখি, তা আসলে সেই সমকালীন সামাজিক পচন ও অস্তিত্বের সংকটেরই এক প্রতীকী রূপ।

painting of Jogen Chowdhury

১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সময়কালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট-এ চারুকলার প্রথাগত শিক্ষা শেষ করে, ১৯৬২ সালে টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন হ্যান্ডলুম বোর্ডে। বস্তুর অলংকরণ ও সূক্ষ্ম নকশার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর অঙ্কনরীতির এক বিশেষ সম্পদে পরিণত হয়। ১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি পেয়ে পাড়ি জমালেন প্যারিসের বিখ্যাত ‘ইকোল নাসিওনাল সুপেরিয়র দে বো-জার’-এ। সেখানে দাঁড়িয়ে বিশ্বশিল্পের দিকপাল—পল ক্লি, মাতিস কিংবা সুররিয়ালিস্টিক ঘরানার মুখোমুখি হয়েও তিনি পাশ্চাত্য শৈলীর অন্ধ অনুকরণ করেননি। বরং সুদূর ফ্রান্সে বসে আরও গভীরভাবে অনুভব করলেন নিজের দেশজ শিকড়কে।

প্রাচ্যের রৈখিক মেলোডি আর পাশ্চাত্যের আধুনিক ভাবনার মেলবন্ধনে প্রস্ফুটিত হল তাঁর নিজস্ব স্বকীয়তা। যোগেন চৌধুরীর চিত্রকলায় ‘রেখা’ কেবল কোনো অবয়বের সীমানা নির্ধারণ করে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক স্বায়ত্তশাসিত, শ্বসনশীল প্রাণ। তাঁর তুলি কিংবা নিবের এক একটি টানে প্রকাশ পায় জীবনের জটিল স্পন্দন।

art painting of Jogen Chowdhury

সর্পিল গতিতে চলা তাঁর দীর্ঘ ও মসৃণ রেখা একই সাথে যেমন নমনীয়, তেমনই শাণিত। মানবদেহের বক্রতা ও ভাঁজগুলোতে এই রেখার ছন্দ দর্শককে এক অদ্ভুত মোহাবিষ্টতায় আটকে রাখে। পেন ও কালির সাহায্যে আড়াআড়ি সূক্ষ্ম রেখার জাল বুনে আলো-ছায়ার এক অভূতপূর্ব নাটকীয়তা সৃষ্টি করেছেন তিনি। এই ক্রস-হ্যাচিং মানবদেহের ত্বকের স্পর্শগ্রাহ্য অভিজ্ঞতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।

কাগজ, প্যাস্টেল, জলরং এবং কালির ব্যবহারে তিনি বেশি সাচ্ছন্দ্য প্রকাশ করেছেন। তেলরঙে কাজ করার সময়ও ব্যবহার করেছেন ‘ড্রাই-ব্রাশ’ পদ্ধতি, যা ছবিতে এক ধরণের রুক্ষ ও প্রাচীন রূপ এনে দেয়। মাটির কাছাকাছি রঙের সংযত ব্যবহারে তাঁর ছবিগুলোতে ফুটে ওঠে এক মহীয়সী বিষাদ।

Jogen Chowdhury art painting

মানুষের বাহ্যিক রূপের পেছনে লুকিয়ে থাকা মনস্তাত্ত্বিক জগতকে খোলামেলা ভাবে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর শিল্পভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর ক্যানভাসের চরিত্রগুলো প্রচলিত অর্থে ‘সুন্দর’ নয়; বরং মেদবহুল, বিকৃত এবং বিষণ্ণ। বুর্জোয়া সমাজের ভণ্ডামি, নৈতিক অবক্ষয় ও অন্তরের শূন্যতাকে আঘাত করতেই তিনি ধারণ করেছিলেন এই তীক্ষ্ণ শৈল্পিক ভাষা।

নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্কের দৃশ্যায়নে তিনি রোমান্টিকতার বদলে বেছে নিয়েছেন জৈবিক টান ও দূরত্বের আখ্যান। বিখ্যাত ‘Couple’ সিরিজে স্বামী-স্ত্রী বা দম্পতি পাশাপাশি বসে থাকলেও যেন দুজন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করছে—যা আধুনিক সম্পর্কের চরম অবসাদকে নির্দেশ করে। দিল্লির রাষ্ট্রপতির ভবনে কিপার অব আর্ট (১৯৭২–১৯৮৭) থাকার সুবাদে রাজনীতির শীর্ষবিন্দুকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এঁকেছেন সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চরিত্রদের মুখোশ-খোলা বিদ্রূপাত্মক অবয়ব।

Art of Jogen Chowdhury

১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর কলাভবনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে শুরু করেন জীবনের নতুন অধ্যায়। সেখানে তিনি তরুণ শিল্পীদের প্রথা ভাঙার স্বাধীনতা শিখিয়েছিলেন। সে যেন আর এক ঘরে ফেরার গান। জীবনের প্রথম রেট্রোস্পেকটিভ বা পূবার্পর প্রদর্শনীটির জন্য যোগেন চৌধুরী তাই বেছে নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনকেই।

Jogen Chowdhury Art

১৯৬৩-তে কলকাতার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে শিল্পীর প্রথম একক প্রদর্শনী হয়। তার পরে চেন্নাই, দিল্লি, আমদাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং দেশ ছাড়িয়ে প্যারিস, জাপান, লন্ডনে বহু একক প্রদর্শনী হয়েছে৷ কিন্তু ‘রেট্রোস্পেকটিভ’ কখনও হয়নি। পঞ্চাশের দশকে, যোগেন যখন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের সদ্য-ছাত্র তখন থেকে শুরু করে তাঁর কাজের বিবর্তন চাক্ষুষ করার সুযোগ শিল্পরসিকদের প্রথম হল শান্তিনিকেতনে। ঐতিহাসিক সেই পূর্বাপরে ছিল ছাত্রাবস্থার কলকাতা, তার পরে প্যারিস, চেন্নাই (তখন মাদ্রাজ), দিল্লি ও শান্তিনিকেতন—শিল্পজীবনের এই পাঁচ পর্যায়ের কাজ। শিল্পী যোগেন চৌধুরী তাঁর কালো কালির টান আর বিষাদময় আলো-ছায়ায় জীবনের সত্যকে চিনেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন নিজেকেও। তাঁর শিল্পযাত্রায় সেই অফুরান জানার আনন্দ অমর হয়ে রইল।