আশ্বিনের শারদপ্রাতে আলোকমঞ্জীর বেজে উঠলেও, প্রকৃতির বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা — মহিষাসুরমর্দিনীর এই রূপকল্প সবসময় সত্যি হয় না। শরত এলেও বর্ষা সবসময় বিদায় নেয় না। কিন্তু সেই বর্ষাভেজা শরতেরও অন্য আখ্যান রয়েছে। তারই ব্যাখ্যা দিলেন মধুছন্দা চক্রবর্তী
মাস দু’য়েক ধরেই ওর মুখের ওপর থেকে আকাশের কালো ঘোমটাখানা সরানোই যাচ্ছে না। মাঝেমাঝেই তার অশ্রুজল ঝরেই চলেছে।
ও মেয়ে, কীসের এতো দুঃখ তোমার? তোমার অঝোর ক্রন্দনজলে যে ডুবে গেল নদী-নালা, মাঠ -ঘাট। ভেসে গেল কত মানুষের ঘর-দোর। ভেঙে গেল সেতু। হড়পা বানে তছনছ হয়ে গেল নেপালের মতো একটা সুন্দর দেশ।
তবু তার মধ্যে ভেজা প্রকৃতিতে শরৎ এল। ওই চেয়ে দ্যাখো, উঁচু ওই ফলন্ত তালগাছের ফাঁক দিয়ে আসা আশ্বিনের রোদ্দুরটায় কেমন সোনা রং লেগেছে। ওই রোদই তো মুছে দেবে স্যাতাপড়া বৃষ্টিদাগ। ওই দ্যাখো, মেঘাবরণ খসিয়ে ফেলেছে রাতের আকাশ। জ্যোৎস্নার সূক্ষ্ম আঁচলে জড়িয়ে ধরতে চাইছে।
জলভারাতুর নদীর ধারে হাঁসের দল বসে রয়েছে। তটভূমিকে যেন সাজিয়ে তুলেছে মুক্তোর মালায়। ফলন্ত মাঠে ধানের শীষে খেলে যাওয়া মন্দমধুর হাওয়ায় কীসের শিহরণ। প্রেমিকের হাত প্রথম ছুঁয়ে ফেলা অনুভূতির মতো। ভ্রমর ঘুরে বেড়াচ্ছে বিবাগী হয়ে। নিভৃত নীল পদ্মের বনে। ছাতিমের ডালে ফুটে থাকা থোকা থোকা সাদা ফুল তীব্র কামগন্ধ ছড়াচ্ছে। যা তীব্র আশ্লেষে অস্থির করে দেয়। শরৎ এখন ঝরা শিউলির সৌরভকে ছাপিয়ে বর্ষণসিক্ত ছাতিমের সুবাসেই বেশি প্রকট। বিশেষত এই ভেজা শরতে।
শরতের আকাশ, বাতাস, জল, জঙ্গল সব যেন সেজে উঠেছে নববধূর সাজে। অপেক্ষা করছে দয়িতের জন্য। কখন আসবে নয়নভুলানো মানুষটি। ‘…
শিউলিতলার পাশে পাশে, ঝরাফুলের রাশে রাশে, শিশিরভেজা ঘাসে ঘাসে ‘ সাবধানী চরণ ফেলে। এসেই বুঝি গেয়ে উঠবে গান — হৃদয়ে ছিলে জেগে,/ দেখি আজ শরত মেঘে।/ কেমনে আজকে ভোরে,/ গেল গো গেল সরে / তোমার ওই আঁচলখানি /শিশিরের ছোঁয়া লেগে।…
তাই বলি, ও মেয়ে এবার অবগুণ্ঠন খোল। মুছে ফেলো ওই অশ্রুবারির দাগ। হৃদয়ের বোঝা নামিয়ে শরতের মেঘের মতো লঘুভার হয়ে ওঠো। আকাশের পেঁজা তুলো মেঘ তোমার প্রেমপত্রের ছেঁড়া পাতা হয়ে উড়ে যাক কৈলাসে। তোমার চোখের অবিরাম জলধারা জমাট বাঁধুক শরতের শিশিরকণায়। ভুলে যাও বর্ষাদিনের সজল ভৈরবী। জলে ভাসা রাজহংসীর ডানার ঝাপটানে বেজে উঠুক হংসধ্বনির সুর। ‘বিষাদের অশ্রুজলে মিলুক শরমরাশি,/ মাধবীবিতানতলে বাজুক বঁধুর বাঁশি।’ ওই তো বৃষ্টিভেজা ঝরা শিউলির বৃন্তে আবছা হয়ে গিয়েছে তোমার ব্যথার রক্তক্ষরণের দাগ। তবু এখনও কেন মালতির কম্পমান শাখায় তোমার ভীরু হৃদয়ের দোলাচল?
কী ভাবছো তুমি? ভাবছো পারবে কিনা, বিগতদিনের ভাঙনের সব স্মৃতি ভুলে যেতে? ভাবছো, পারবে কিনা ফেলে আসা দিনের ক্ষতদাগ ভুলে, নব পরিণয় সাজে রঙিন হয়ে উঠতে?
থাক না, নাই বা হল তোমার রঙিন সাজ। বরং তোমার বধূসাজ হোক শরতের শ্বেত শুভ্রে। কাশের গুচ্ছই শোভা পাক তোমার কবরীতে। শেফালী মালায় রচনা হোক তোমার কণ্ঠহার। তোমার সাজহীন মুখে ফোটা শ্বেতপদ্মের প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ুক। ওষ্ঠখানি অরঞ্জিত থাকুক বকফুলের দ্বিমুখী পাপড়িতে। ঘাসের আগায় শিশিরের রেখায় আঁকা হোক তোমার পদরঞ্জনী। নীলাম্বরের সাদা মেঘের শুভ্র বসন থাক তোমার পরিধানে। শুকতারার নরম আলোটি আঁকা হোক তোমার কপালে। শরৎ আকাশের স্নিগ্ধ তারার আলোয় সারা হোক তোমার অনুজ্জ্বল অলংকারসাজ।
তুমি যে তপক্লিষ্ট উমার মতো। যে তপস্যায় তুষ্ট করেছিল যোগীশ্বর শিবকে। সেই শিবের পরিণীতা হতে তার যে এমন শরতশুভ্র সাজই সাজে। কালিদাসের কুমারসম্ভবম-এ তারই বর্ণনা।
‘সা মঙ্গলস্নান বিশুদ্ধাত্রী গৃহীতপত্যুৎগমনীয়বস্ত্রা।
নিবৃত্ত-পর্জন্যজলাভিষেষকা
প্রফুল্লকাশা বসুধেব রেজে।’
অর্থাৎ মঙ্গল স্নানের পর নির্মল দেবী উমা যখন পতির সমীপে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত বস্ত্র পরিধান করল, তখন তার শোভা হল মেঘবর্ষণের পর প্রফুল্ল কাশফুলে সজ্জিতা পৃথিবীর মতো।
ও শারদলক্ষী মেয়ে তোমার জীবনে প্রেম আসে পূজা মূর্তি ধরি। তাইতো এমন যোগিনী সাজে তোমার বধুসাজ রচনা করে প্রকৃতি। তোমার এই পরিণয়ের জন্য সবাই মিলে উৎসব সাজায়। কুমোর পাড়ায় কাদামাটি ছেনে তোমারি আদলে মূর্তি রচনা হয়। তোমার বিবাহ বাসরে তার-সানাইয়ের সুর খেলে যায় আগমনীর গানে। শারদীয়ার অর্ঘ্য থালাতে সাজানো হয় তোমার বিবাহের বরণডালা। ও মেয়ে, এভাবেই তো তোমার শারদবরণে মেতে ওঠে সবাই।
তারপর একসময় শেষ হয়ে যায় উৎসব। এবার তো তোমার ঘরে ফেরার পালা। পিতৃগৃহ থেকে পতীগৃহের দিকে পা বাড়ানো। ততক্ষণে তোমার সাদা শারদ সাজ রাঙা হয়ে উঠেছে বিজয়ার সিঁদুর খেলায়। কনে বিদায়ের কালে ভাসানজলে সকলের চোখ ছল ছল।
এই বিসর্জন দিনে তোমার মনের মধ্যে জমানো বর্ষা দিনের সব সজল স্মৃতি ডুবে যায়। সব ব্যথা শিউলি ফুলের মরণ সাথে ঝরে শেষ হয়ে যায়। শুধু তোমার প্রাণের ভেতর যে কথা থাকে অগোচরে, গানে গানে বাঁশি তাকে চুরি করে নিয়ে যায়। সেই বাঁশিই তো তুমি দিয়ে যাও আমাদের হাতে। রাত পোহালে শারদপ্রাতে।

