বিশ্বকাপ ফুটবলে পাঁচবারের খেতাব জয়ী ব্রাজিল ও দু’বারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে দলকে নিয়ে সম্প্রতি উৎসবে মেতে উঠেছিল কলকাতা। বিশ্ব ফুটবলে স্বপ্নের দেশ ব্রাজিল। সেই দেশকে একেবারে সামনে বসে প্রত্যক্ষ করা একেবারে অন্য অনুভূতি। তারপরে ভারতের সঙ্গে লড়াই। ফুটবল সম্রাট পেলে থেকে শুরু করে গারিঞ্চা-ভাভাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তারপরে নেইমারের মতো ফুটবলার ব্রাজিলকে সমৃদ্ধ করেছেন। এখন ব্রাজিল দলে তারকা ফুটবলার বলতেই ভিনিসিয়াস জুনিয়র। সেই ভিনিসিয়াসকে খেলতে দেখা গেল ভারতের বিপক্ষে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে।
হোক না প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। দেশটার নাম ব্রাজিল। তাদের শিল্পসত্তা ও ঘরানা একেবারে আলাদা। ফিফা ক্রমতালিকায় ব্রাজিল এখন ষষ্ঠ স্থানে। তারপরে গত বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রাক-কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের কাছে হেরে গিয়ে ছিটকে যেতে হয়েছে ব্রাজিলকে। তবুও ব্রাজিলের বিপক্ষে ভারতের খেলা একটা গৌরবের। এটাই সবচেয়ে প্রাপ্তি। ভারত ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৩৮তম স্থানে অবস্থান করছে। পিছিয়ে রয়েছে ১৩২-এ। ব্রাজিলের সঙ্গে লড়াই করাটা ভারতের ফুটবলারদের কাছে বড় প্রেরণা। তাঁদের নিপুণতা এবং স্টাইল সব সময় অন্য মাত্রায় গিয়ে পৌঁছায়। তাই কোচ খালিদ জামিল ভারতীয় দল গঠনে তরুণ প্রতিভাবান ফুটবলারদের উপর নির্ভর করেছেন।

ব্রাজিলের কাছে ০-৪ গোলে হার স্বীকার করেছে ভারত। কিন্তু ভারতের ফুটবলারদের মধ্যে একটা লড়াকু মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে, যা আগামীদিনে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করবে। প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপ খেলা পানামাকে আটকে (১-১ গোল) দেওয়ার পরে ভারতীয় দল আরও বেশি সংগ্রামী চেতনায় ব্রাজিলের বিপক্ষে লড়াইটা গড়ে তুলেছিল।
ব্রাজিলের বিপক্ষে ভারতের লড়াইটা বেশ প্রাণবন্ত ছিল। এমন কী প্রথম কুড়ি মিনিট ভারত যেভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল, তা প্রশংসা করার মতো। এমনকী গোল করার মতন পরিস্থিতি গড়ে তুলেছিলেন ফুটবলাররা। গোল হলেও, কোনও কিছু বলার ছিল না। সেই অর্থে বলতে দ্বিধা নেই ব্রাজিলের ভিনিসিয়াসের হঠাৎ হঠাৎ ঝলক ভারতীয় শিবিরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ব্রাজিলের তরুণ ফুটবলারদের চোখে পড়েছে সাম্বার ছন্দ। তাদের খেলবার ইচ্ছাকে কদর করতেই হবে। নিঃসন্দেহে বলা যায় ভিনিসিয়াস ছাড়া অন্য ফুটবলারদের খেলা মন ভরাতে পারেনি। ব্রাজিলের তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে ভারতের ফুটবলারদের খেলায় সেই পার্থক্য খুব একটা ফারাক নয়। তাই রায়ান উইলিয়াস, মনবীর সিং, এডমুন্ড লালরিনডিকা ও অনিরুদ্ধ থাপারা যে আশার ঝলক দেখিয়েছে, তাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন উজ্জ্বল হতে পারে।

সুনীল ছেত্রীর পরে ভারতীয় দলের বড় দায়িত্ব বলতেই গোলরক্ষক গুরপ্রীত সিং সান্ধু। কিন্তু গুরপ্রীত ভারতের চলমান নৌকাটা ডুবিয়ে দিলেন। গোলরক্ষকের ভুলে ভারতকে দুটো গোল হজম করতে হয়েছে। আর অন্য দুটো গোল এসেছে ব্রাজিলের পরিকল্পিত আক্রমণের মধ্যে দিয়ে। এস্তেভাওয়ের প্রথম গোলটা অবশ্যই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। আর দ্বিতীয় গোলটা করার ক্ষেত্রে এস্তেভাওয়ারের সক্রিয় ভূমিকা। তিনি এমনভাবে বলটি সাজিয়ে দিয়েছিলেন, যা পেদ্রো গোল করা ছাড়া অন্য কোনও পথ দেখেননি।
খেলার দ্বিতীয় পর্বে গুরপ্রীতের জায়গায় গোলরক্ষক প্রভুসুখন সিং গিলকে নামাতে বাধ্য হল। ভারতের রায়ান দুরন্ত শট নিলেও ব্রাজিলের গোলরক্ষক কোনওক্রমে গোললাইন থেকে বাঁচিয়ে বিপদমুক্ত করেন। তারপরে ঝটকা আক্রমণে স্যামুয়েল দিয়াগোর গোলটা (৩-০) সবার মনে থাকবে। খেলার শেষ মুহূর্তে পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে স্যামুয়েল গোল করে ব্রাজিলের জয়কে (৪-০) নিশ্চিত করে দেন। তবে ব্রাজিলের কোচ কার্ল আনচেলোত্তি ভারতীয় দলকে প্রশংসা করলেও কলকাতার সমর্থকরা ভিনিসিয়াসের গোল দেখতে পারলেন না, এই আক্ষেপ থেকে যাবে।

অন্যদিকে ভারত বড় ব্যবধানে হার স্বীকার করে উরুগুয়ের কাছে। উরুগুয়ে জিতেছে ৬-১ গোলের ব্যবধানে ভারতের সঙ্গে লড়াই করে। ১৯৮২ প্রথম নেহরু কাপে উরুগুয়ে খেলতে এসেছিল কলকাতায়। সেই সময় ফ্রান্সিসকোলি ও ভেনাসিয়ো র্যামোসের খেলা দেখে সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই ফ্রান্সিসকোলি ও র্যামোসের খেলা দেখতে না পাওয়া গেলেও, ভারতীয় দলের ফুটবলারদের লড়াই করার প্রবণতাকে সাহস দিয়েছে। অনিরুদ্ধ থাপার দুরন্ত গোলটা সবার মনকে ভরিয়ে দিয়েছে। তবে উরুগুয়ের বিপক্ষে ভারতীয় দলের কোচ খালিদ জামিল বেশকিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিয়েছেন। এটা একটা ভালো দিক। একজন স্ট্রাইকার প্রতিপক্ষ , দলের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া গেল এডমুন্ড লালরিনদিকার খেলার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু সেই এডমুন্ডকে তুলে নিয়ে কোচ খালিদ ভুল করেছিলেন। তাই উরুগুয়ের রক্ষণভাগের ফুটবলাররা নিশ্চিন্তে খেলেছেন। ভারত এই ম্যাচের বেশ কয়েকটা গোল করার সুযোগ তৈরি করেছিল, কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন ফুটবলাররা। উরুগুয়ের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবলার আরাউজো জালাজার বা নুসেমদের জোনাল মার্কিং করে আটকিয়ে দেওয়া হল না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর ভারতীয় দলের কোচ খালিদ জামিল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

উরুগুয়ের কাছে ১-৬ গোলের হারটা ভারতের ফুটবলপ্রেমীরা মেনে নিতে পারছেন না। আসলে মনে রাখতে হবে সুয়ারেজদের উরুগুয়ে দল বিশ্বকাপ খেলে এসেছে। ভারতীয় দলের ফুটবলারদের পাশে কোচ খালিদও বেশ হতাশ। তবে বলতে দ্বিধা নেই বিশ্বমানের ব্রাজিল এবং উরুগুয়ের ফুটবলারদের সঙ্গে লড়াই করার একটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেন। সারা ভারত ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবের এই প্রয়াসকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। অগামী দিনে এই মাপের দেশগুলির বিরুদ্ধে ভারত আরও খেলতে পারে তাহলে মান বারবে বলে বিশ্বাস।
ভালো প্রয়াস ফেডারেশনের। কিন্তু এই দুই দেশের ফুটবলারদের খেলা দেখানোর জন্যে যদি প্রথম থেকেই বাংলার বিভিন্ন অ্যাকাদেমির কিশোর ফুটবলারদের ব্যবস্থা করত, তাহলে তারা উৎসাহিত হত। ভারত অতীতে এশিয়ার নূচের সারির দলগুলির সঙ্গে খেলে উন্নত ভাবনায় পৌঁছতে পারেনি। সেই ভাবনা থেকে সরে এসে ফেডারেশনের নতুন বার্তা দিয়েছে। শুধু খেললেই হবে না, সমীক্ষা করতে হবে।

