ট্রেন চলে যেতেই প্লাটফর্ম ফাঁকা হয়ে যায়। রায়গঞ্জ স্টেশন। সদ্য নির্মিত এসি ওয়েটিং রুমে প্রতুলের গানটা শুনে টনক নড়ল শিশিরের। কিন্তু কিছু বলল না। সারা রাত জেগে ট্রেন জার্নি। ক্লান্তি চোখেমুখে। গানটা বেশ ভালই লাগছিল। চশমার ফাঁক থেকে একবার দেখল শিশির। জীবনের শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে ফেলা একটা মানুষ। বর্তমানে কেয়ারটেকারের কাজ করছে। সারাদিনের বন্ধু বলতে গান। শিশিরের কৌতূহল হল। নিজেই এগিয়ে গেল, “দাদা,ভালো গান শোনেন তো আপনি।”
ভদ্রলোক হাসল,” গান নিয়েই তো আছি।”
” বাড়ি কোথায়?”
কথাটা শুনে ভদ্রলোকটি একটু অস্বস্তি বোধ করল।নিজেকে সামলে বলল,
“পরিবারে অশান্তি। বাড়িতে থাকি না।”
শিশির জানে এভাবে অচেনা মানুষকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করা শোভনীয় নয়। কিন্তু ওই লোকটা তাঁকে এমনই যাদু করেছে যে সভ্যতার দায় শিশির আর নেবে না। “এভাবে পরিবারকে ছেড়ে দিলেন?”
“পরিবার তো আমাকে চায় না। আমি না থাকলেই ওরা খুশি। জমানো যা ছিল সব ওদের দিয়ে এখানে চলে এসেছি।”
” তাই এই গান শুনেই দিন কাটান?”
” এক প্রকার তাই।গানটাকে ছাড়তে পারলাম না।”
“কেন?”
” কেন মানে? এই গান নিয়েই তো যত অশান্তি!আমার স্ত্রী চায় না আমি গান করি বা গান শুনি।”
“সেটাই স্বাভাবিক।”
” আমি আবার গান ছাড়া থাকতে পারব না। জীবনে গায়ক হতে চেয়েছিলাম।”
“তো কি বউ বারণ করল?”
” ও তো আমার গান শুনেই প্রেমে পড়েছিল। পরে কী যে হল । একদিন আমার সব ভেঙে দিল।”
শিশির আর কথা বাড়াল না। ভদ্রলোকের আবেগ সে বুঝতে পারল। তারপর বলল,” মানুষ যেমন করে বাঁচতে চায় তাকে তেমন করেই বাঁচতে দেওয়া উচিত।”
” আপনি বোঝেন। কিন্তু আমার স্ত্রী যদি বুঝত তাহলে বাড়ি ছাড়তে হতো না।”
আক্ষেপ ভদ্রলোকটির গলায়। “এই গান তো আমার স্ত্রীকে ভালোবেসেই।”
“স্ত্রীকে খুব ভালোবাসেন?”
উত্তর দিল না ভদ্রলোকটি।ভারী হয়ে আসা গলায় বললেন, “একটা গান শুনুন “।
মোবাইল ফোনে বেজে উঠলো রাঘবের গান,” চাঁদ কেন আসে না আমার ঘরে।”

