bengali new year

বাংলা নববর্ষে বিচিত্র বিবর্তন

যাকে চালভাজা বলা যায়, তাকে মুড়ি বলা যায় কিনা – তা সেই রসের রসিকরা বলতে পারবেন; কিন্তু যাকে বাংলা সাল বলে সাধারণ মানুষ ভেবে থাকেন, তাকে বঙ্গাব্দ বললে সম্ভবত কেউ গলা উঁচু করে কথা বলবেন না বঙ্গাব্দ শব্দে দটো শব্দ লুকিয়ে আছে— বঙ্গ আর অব্দ বঙ্গ ব্যাপারটা খানিকটা বুঝি—একটা দেশের নাম শুধু নয়, আমারই দেশ কিন্তু অব্দ শব্দের মানে কী—এই প্রশ্ন করলে জব্দ হওয়ার আশঙ্কা আছে যদি এটা সংস্কৃত অপ্ ধাতু থেকে এসে থাকে তো জলে ভেসে যাব অপ্-এর অর্থ জল আর গোটাগোটি শব্দ হলে অব্দের মানে দাঁড়াবে বছর, সাধুভাষায় বৎসর এর আগে বঙ্গ বসালেই সন্ধি নিয়ে বঙ্গাব্দ অর্থাৎ বাংলা বছর অনেকে আবার লিখি সন ১৪২০ কিংবা ১৪২০ সাল সন-সালের আগে পিছে বসা নিয়ে কলহ করব না কারণ এ-দুটির মানেই হলো বছর— তবে সন হল আরবি শব্দ আর সাল হল ফারসি এখন কী করবেন— সেটা আপনার সিদ্ধান্ত

naba barsha

কিন্তু সমস্যাটা হল এই সব অব্দ-টব্দ চালু হল কখন থেকে – তা সিদ্ধান্ত করার সূত্রে এই জানাটা খুব দরকারি হয়ে পড়েছে যে এই বঙ্গাব্দ চালু হল কবে থেকে একটা অঙ্ক কষা যাক এই যে খ্রিস্টাব্দ লিখছি ২০১৪ আর বঙ্গাব্দ লিখছি ১৪২০, এর থেকে বোঝা যাচ্ছে বাঙালিরা খ্রিস্টানদের চেয়ে অন্তত বছরের হিসেবে বেশ পিছিয়ে— কমসে-কম ৫৯৩ বা ৫৯৪ বছর পিছিয়ে সেটা কবে থেকে কেমন করে চালু হল? খ্রিস্টাব্দ যিশুর জন্মের হিসেবে চালু হয় কিন্তু যিশু জন্মালেন আর খ্রিস্টাব্দ চালু হয়ে গেল—এমনটা তো হতে পারে না যিশু আগে সমাজে একটা গণ্যি-মান্যি লোক হবেন— তবেই তো এসব ব্যাপার লোকে ভাববেন তো সেটা মোটামুটি মৃত্যুর কাছাকাছি না হলে হয় না কিন্তু বঙ্গাব্দ তো কোনও ‘বঙ্গবাবু’র জন্মের সঙ্গে যুক্ত নয় এই নিয়ে সমস্যাটা বেড়েই চলেছে পুথিপত্তর নিয়ে কারবার করেছেন যাঁরা—তাঁদের মধ্যে আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি মশায়কে বেশ নির্ভর করা যায় তিনি খড়ি পেতে, আঁক কষে একটা হদিশ দিয়েছেন বটে— তবে সবাই তো মাথা পেতে নিতে পারেননি কারণ ৫৯৩ বা ৫৯৪ বছর আগে বাংলাদেশে কী কী ঘটেছিল—তা জানার মতো ইতিহাস তো আমাদের নেই আন্দাজগুলি ছুঁড়লে কখনও কখনও বাঘ মরে বটে, তবে সব ক্ষেত্রেই মরবে— এমন হলফনামা লেখা তো গুলিখোরেও লিখে বসবে না বিদ্যানিধি মশায় একবার রাজশেখর বসু মশায়কে বলে বসেছিলেন যে, এই বাংলা নববর্ষের উৎসব—এটা নাকি পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছে পশ্চিমবাংলার মানুষরা ব্যাপারটা মাথা নীচু করে মেনে নেবেন? বরং খাঁটি ঘটি বিদ্যানিধি মশায়কে চিংড়ি ছাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে ইলিশ খাইয়ে ছেড়ে দেবেন তবে তাঁর ‘পূজাপার্বণ’ বইটিতে একটা বাড়তি এবং ভেবে দেখার মতো খবর দিয়েছেন—আমাদের বর্ষারম্ভ একসময় শুরু হয়েছিল বিজয়া দশমী থেকে সেই কোলাকুলি, সবার খবরাখবর নেওয়া এবং মিষ্টি মুখ করা নাকি অকালবোধনের মতো অকাল-নববর্ষ কিনা—তাও বিচার করতে হয়

 

মনে হতে পারে নববর্ষের কথা বলতে গিয়ে এসব কথা বলা মানেই ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া তা দেখুন শিবের গীত গাওয়ার চেয়ে শিবের গান গাওয়া নেহাত মন্দ ব্যাপার নয় নববর্ষের ঠিক আগের দিন—চৈত্রসংক্রান্তির দিনে গাজনের গান গেয়ে শিবের গীতই তো আমরা দীর্ঘকাল ধরে গাইছি ‘বিজয়া’ ব্যাপারটার সঙ্গেও তো শিব জড়িয়ে আছেন ওতপ্রোতভাবে যাঁরা ধৈর্যচ্যুত হচ্ছেন তাঁদেরকে বলি নববর্ষ’ বলে বাঙালিদের একটা ব্যাপার হয়তো মধ্যযুগে ছিল আমরা মধ্যযুগের যে-সব পুঁথিপত্তর পেয়েছি তাতে পুঁথিরচনার তারিখ-টারিখে কিন্তু বাংলা সনের উল্লেখ পাইনি, পেয়েছি শকাব্দের উল্লেখ যেমন দ্বিজমাধবের ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ কাব্যে সরাসরি লেখা হয়েছিল-

তেরশ পঁচানই শকে গ্রন্থ আরম্ভন

চতুর্দ্দশ দুই শকে হৈল সমাপন।।

বাংলা সাল-তারিখওয়ালা পুঁথি আমরা ষোলো শতকের আগে পেয়েছি কি?

 

ষোলো শতকের কথা উঠলেই ভারত সম্রাট আকবর বাদশার কথা ওঠে (১৫৪২-১৬০৫ খ্রি.) আকবর বাদশার রাজত্ব সম্বন্ধে আসল-নকল কথাগুলো লিখে গেছেন তাঁর রাজস্বমন্ত্রী তোডরমল্ল এই ল্যান্ড-রেভেনিউ মিনিস্টার মশাইয়ের শরণাপন্ন হলেই দেখা যাবে, তাঁরই পরামর্শে বাদশা প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায়ের জন্য বোশেখ মাসটাকেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন আরও সূক্ষ্ণভাবে বলতে গেলে বোশেখ মাসের পয়লা দিনটাকেই বিশেষ করে তিনি কর আদায়ের সেরা দিন বলে চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন সেকালে পাকা আমন ধান মাঠে পড়ে থাকত প্রায় চৈত্র মাস পর্যন্ত ধান ঝাড়ানো না হলে জমিদার চাষি কর দেবেন কেমন করে? অতএব বৈশাখ মাসের শুরুতেই টাকা আদায়ের দিন ধার্য করলে নগদা-নগদি আদায়টা সুবিধা হয় দেরি হলে ‘খরচা হয়ে গেছে’ বলার অজুহাত দেখিয়ে কর-না-দেওয়ার ফন্দিটা বানচাল করার আগেই টাকা আদায় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ আর সেই সুবাদেই নাকি বাংলা সনের প্রবর্তনের কাজটাও হয়ে গিয়েছিল এটাকে পাথুরে প্রমাণ বলে ধরে নেওয়ার আগে যাচাই করে নেবেন পাঠককুল কারণ তাহলে বাংলা সন ১৪০৩ না হয়ে হাজার খানেক বছর এগিয়ে আসবে

subho sobo borsho

কিন্তু সোজা কথাটা উঠে এসেছে এই তোডরমল্লীয় সিদ্ধান্ত থেকে—পাওনা-গণ্ডা বুঝে নেওয়ার সেরা মওকা হলো পয়লা বোশেখ এখনও তো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে এটাই চালু একটা নিয়ম আর এই নিয়ম মেনেই পয়লা বৈশাখ ভিন্ন চরিত্রের কারণে একটা ভিন্ন নাম পেয়ে গেছে— বাণিজ্যিক পরিভাষায় হালখাতা পাওনা-গণ্ডা জিনিসটা বড্ড পাজি— অবিশ্বাসের কালো মেঘেরা এর চারপাশে নিত্যদিনই সন্দেহ ও সংশয়ের আঠার ছায়াপাত ঘটিয়ে থাকে কাজেই যা-পাব এবং যা-পাবেন দুটোই খাতায় লেখা থাকা দরকার এবং সেটা হাল-হাল না আদায় করতে পারলে ভবিষ্যতে বেহাল অবস্থার আবির্ভাব ঘটবে অতএব সাধু সাবধান—টাকাপয়সা এখনই এখনই, হাল-হাল আদায় করে নাও আর খাতায়-কলমে তার হিসেব রাখ হয়ে গেল হালখাতা পয়লা বৈশাখ তাই নববর্ষের আবির্ভাব লগ্নকে সানন্দে উদযাপনের আড়ালে একটা মতলবি ব্যাপার নিয়ে এখন হাজির হয়ে গেছে

নইলে সত্যি কথাটা বলা ভালো, বাংলা নববর্ষ নিয়ে তেমন করে উৎসব গড়ে ওঠেনি পুরনো বইপত্তর সব দেখেছি বাংলার পালা-পার্বণ নিয়ে যাঁরা লিখেছেন—ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় ইস্তক দীনেন্দ্রকুমার রায় বা পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত কেউই নববর্ষ নিয়ে লেখালেখি করেননি বৈশাখ মাসের কোনও ব্রত-উৎসব নিয়ে তাঁরা ভাবেননি জ্যৈষ্ঠ মাসের জামাইষষ্ঠি থেকে শুরু করে পুজো, পৌষ-পার্বণ, দোল, চড়ক-গাজন পর্যন্ত বাঙালির পালাপার্বণ এঁদের কলমে উঠে এসেছে অথচ নববর্ষ নিয়ে মাতামাতি নেই— এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার মাপ করবেন আমি সাহেবদের কথা বলছি বলে বাঙালি-বিরুদ্ধ কথা বলছি—এমনটা ভেবে নেবেন না কিন্তু সাহেবদের নতুন বছর জানুয়ারির প্রথম দিনটি যাকে বলে নিউ ইয়ার্স ডে—তার তো এখন আন্তর্জাতিক রমরমা আমরা যেভাবে বড়দিন আর নিউ ইয়ার্স ডে পালন করি, এখন তাতে কেবলই মনে হয়, যাঁরা বলেন যে, সাহেবরা আমাদের দেশ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন—তাঁরা ভুল বলেন ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট থেকে কোনও এক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অথবা জিনঘটিত পরিবর্তনে (‘জিন’ শব্দের আর একটা অর্থ ভূত— অতএব পরিবর্তনটা অবশ্যই ভৌতিক) এদেশের সাহেবদের গায়ের রঙে এবং স্বভাবে বদল এসে গেছে আসলে বাঙালি মাত্রেই সাহেব—পাতি সাহেব নয়, ডাঁহা এবং ডাঁসা সাহেব সেজন্য পয়লা জানুয়ারি তাঁদের কাছে একটা অবশ্য পালনীয় দিন এবং এর সূচনা হয় বড়দিনের কেক খেয়ে, ইংরেজি নববর্ষটা তারই জের মাত্র সাহেবিয়ানায় বাঙালি এখন জেরবার পয়লা বৈশাখ এখন বিবাগী

তবে কি আমরা ফিরে যাব নববর্ষ উদযাপনের জন্যে বিজয়া দশমীতে? দশমী ব্যাপারটার সঙ্গে দুর্গাপুজোর সংস্কার মিশে গেছে পুজো কিন্তু আসলে তিন দিনেরই—সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী এর আগে ষষ্ঠী এবং পরে বিজয়াকে ব্যাকরণের উপসর্গ-অনুসর্গের মতো লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বিজয়া’ শব্দটির সঙ্গে বিদায় শব্দটির কোনও মিল আছে কিনা জানি না, কিন্তু বিজয়া আর বিসর্জন এক হয়ে গেছে বিজয়া যদি মায়ের বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার তিথি হয়—তবে সেদিন এত কোলাকুলি আর মিষ্টি খাওয়ার উৎসবটা কেন বাঙালির ঘরে বিজয়া তো দুঃখের উৎসব হওয়া উচিত আসলে বিজয়া হল যাত্রা- গমন করা-যাওয়া বিজয়া সপ্তমী বলে একটা কথাও আছে—এই তিথিতে যুদ্ধে গেলে জয় অনিবার্য হয় নাকি ‘বিজয়া’ শব্দের অর্থ মহাপ্রস্থানও বিজয়া শব্দের অর্থ আবার সিদ্ধি বা গাঁজাও হয় যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি মশায় তাঁর ‘পূজাপার্বণ’ বইতে (১৩৫৮ সংস্করণ, পৃ. ৬২) স্পষ্ট লিখে গেছেন ‘কয়েক বৎসর হইতে পূর্ববঙ্গে ও কলিকাতায় কেহ কেহ পয়লা বৈশাখ নববর্ষোৎসব করিতেছে তাহারা ভুলিয়াছে, বিজয়া দশমীই আমাদের নববর্ষারম্ভ বৎসরে দুইটা নববর্ষোৎসব হইতে পারে না’ এই বইয়ের অন্যত্র তিনি আরও লিখে গেছেন (পৃ. ১৮-১৯)—‘বিজয়া দশমীতেই শরৎ’-প্রবেশ হয়, সেই বিধি অনুসারে দশমীতে বিজয়া হয় সেদিন বিজয়োৎসব, সেই উৎসবের জন্যই নববৎসরে নবসূর্যকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য আমরা গৃহদ্বার মার্জিত ও সজ্জিত করি, নিজদেহ নববস্ত্রে শোভিত করি সুখে-দুঃখে এক বৎসর অতীত হইয়াছে, নব বৎসরে আমাদের বিজয় হউক, আমাদের মনস্কামনা সিদ্ধ হউক এই নিমিত্ত আমরা জগজ্জননীর পূজা করি …এই বিজয়কামনা হেতু এই দশমীর নাম বিজয়া দশমী হইয়াছে

subho bobo borsho

আমরা জানি—এসব কথা উচ্চারণ করামাত্রই বণিকমহল রে রে করে আমার পশ্চাদ্ধবন করবেন সারা পৃথিবী শাসন করছেন এই মহল আমার দুশো ছ’খানা হাড়ের প্রতি খুব মায়া—কিছুতেই এর সংখ্যা বৃদ্ধিতে আমি রাজি নই অতএব রায় বিদ্যানিধি মশায়ের রায় আপাতত খারিজ করে হালখাতার সুপ্রিমকোর্টে আশ্রয় নিতে চাইছি তার আগে ক্ষীণ কণ্ঠে একটা সত্যি কথা জানিয়ে রাখতে চাই এটা মানতে হবে, তবে পালন করতেই হবে—এমন ফতোয়া দেওয়ার সাধ্যি আমার নেই বাংলা পাঁজিতে অগ্রহায়ণ বলে একটা মাস আছে আমরা সবাই জানি অন্য সব বাংলা মাসের নাম নক্ষত্রের নাম থেকে এসেছে যেমন বৈশাখ মাস এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে এমনি জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, অষাঢ়া থেকে আষাঢ় ইত্যাদি কিন্তু ব্যতিক্রম এই অগ্রহায়ণ মাসটি এটি কোনও নক্ষত্রের নাম তেকে আসেনি, এই মাসটা তাই বে-তারা তবে বে-তালা নয় হায়ণ শব্দের অর্থ হল বর্ষ বা বছর তার আগে যদি অগ্র বসে, তবে হয় অগ্রহায়ণ অস্যার্থ বছর শুরু এই অগ্র মাসটি দিয়েই সত্যিই তাই, আগে বাংলা বছরের শুরু গোনা হত অগ্রহায়ণ মাস দিয়ে—ইংরেজি ডিসেম্বর-জানুয়ারি লাগোয়া এই মাসটি ইংরেজি ফিনান্সিয়াল ইয়ারটির শুরু এপ্রিল থেকে, অনেকটা বাংলার বৈশাখ মাস থেকে (১ বৈশাখ আর ১৫ এপ্রিল কাছাকাছিই) জ্যোতিষীবাবা গণেশবাবাজির কাছে হার মানলেন (আচ্ছা, গণেশবাবাই কি অর্থমন্ত্রী? জয় গণপতিবাবা মোরিয়া) পাঁজিপত্তর শুরু হল বৈশাখ মাস থেকেই কিন্তু নববর্ষ-উৎসব বলে পাঁজিতে কি কোনও বিশেষ ব্যাপার চিহ্নিত হয়েছিল পাঁজির সূচনাপর্বে আমার পোড়া চোখে ব্যাপারটা পড়েনি ইদানিং এটা সূচিত হয়ে চলেছে এতখানি হিসেব-নিকেশের পর কপালে ঘাম দেখা দিযেছে এক গেলাস কেওড়া দেওয়া শরবত পান না করলে আর প্রাণ বাঁচে না দেখছি কিন্তু অগ্রহায়ণ মাসটা আর কোনওভাবেই নববর্ষ বলে চিহ্নিত করার উপায় দেখছিনে

অতএব পয়লা বৈশাখের চরণে সেবা লাগে এক সময় এদিনেই কলকাতায় বাবুদের বৈঠকখানা সেজেগুজে উঠত রাতের মাইফেলের কথা বলছিনে, দিনের বেলাতেই অম্বুরি তামাক আর লাল গোলাপজলের সুবাসে বৈঠকখানাগুলি ম-ম করে উঠত ফিনফিনে আদ্দির গিলে করা পাঞ্জাবি আর কস্তাপেড়ে চুনোট করা ফরাসডাঙার ধুতি, কানে আতর দিয়ে বাবুরা মশগুল হয়ে উঠতেন বিলাইতি শরাব পানে সেই দিনগুলো অবশ্য বীত গয়া এখন আর ফরাস-গালিচা, ঝাড়লণ্ঠন নেই নেই পাঙ্খবরদার কিংবা হুকাবরদার এখন বাড়িতে ডিভান-কৌচ, সেখানে আর বুলবুলি নাচানো যায় না

তা বলে হালখাতা তো বিদেয় হয়ে যায়নি বরং বহাল তবিয়তেই আছে, তার তবিয়ত বে-হাল হয়নি ছাপোষা বাঙালির সারা বছর চলে আয়-ব্যয়ে সামাল দিতে দিতে নগদা-নগদি যাঁরা কেনা-কিনি করে উঠতে পারেন না, দোকানে তাঁদের খাতা খোলার ব্যবস্থা থাকে তাঁদের কাছ থেকে পাওনা উশুলের একটা বড় মওকা হল এই হালখাতার উৎসব আগে গাঁয়ে-গঞ্জে দেখেছি একটা হাতচিঠি (হাতচিঠি! তেল লেগে চিটে হয়ে যায় তো!)—একটা খেরো-বাঁধানো খাতার ধার-বাকির কড়চা—হিসেব পয়লা বৈশাখে সেইসব ধারশোধের একটা লিখিত-অলিখিত নোটিশ থাকে—পাওনাগুলো মিটিয়ে দেওয়ার আনত-নিবেদন ধার-দেনা-উশুল যতদিন থাকবে, ততদিন হালখাতা চলছেই চলবে মুর্শিদকুলি খাঁ ‘পুণ্যাহ’ (পাওনা-গণ্ডা আদায়ের চেয়ে পুণ্যকর্ম আর কীই বা আছে) চালু করুন, টোডরমল্ল মল বাজিয়ে ত্যাঁদড় খাতকদের কাছ থেকে ট্যাক্সো আদায়—যা-ই করুন, বাঙালির হালখাতায় উৎসবের একটা মেজাজ থাকবেই থাকবে 

এই কলকাতার ব্যাপারটাই ধরুন না এখানের ব্যাপারিয়া রাত বাকি থাকতেই শয্যাত্যাগ করে স্নান সেরে শুদ্ধবস্ত্র পরে কালীঘাট বা কাছাকাছি কালীবাড়ির (অন্য ঠাকুরবাড়ি হলেও চলে, তবে কালীমন্দির হল একটা আগ-মার্কা ব্যাপার) সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়ান তার পরে পুজো দিয়ে খেরোর খাতায় সিঁদুর-চন্দনের ছাপ লাগিয়ে কপালে সিঁদুর দিয়ে গদিতে আসীন হন ‘বেচারিণী’ কালীমায়ের ভোরের ঘুম হয় না, এমনকী সকালের প্রাতরাশও সারা হয় না ভক্তদের ‘মনোবাঞ্ছা’ পূরণ করতে গিয়ে তারপর যথাকালে খরিদ্দার-কাম-খাতকবর্গ’ আসতে থাকে— আসুন,বসুন, একটু মিষ্টিমুখ করুন বলে প্রকাশ্যে আপ্যায়ন করেন (ভিতরে মিষ্টিমুখে ছিষ্টি খান কি?) কেউ বসে মিষ্টি মুখ করেন, কেউ প্যাকেট নিয়ে যেতেই খুশি কিন্তু তিনি যে কথাটি শুনতে পান না তা হলো, ‘সম্বৎসরের পাওনা-গণ্ডাটি মিটিয়ে দিন তো ভালয়-ভালয়’ হালখাতা হলো— হাল আমলের একটা অন্তর—বুঝে নেওয়ার একটা নতুন পরব

এই উৎসবের জন্য মহাজনদের অনেকে কার্ড ছাপান, কেউ বা আগে থেকে ছাপানো কার্ডে শূণ্যস্থান পূরণ করে আমন্ত্রণলিপি পাঠিয়ে দেন অনেকে মিষ্টিমুখের সঙ্গে নোনতা, এমনকী ঠান্ডা পানীয় বা ডাবের জলের ব্যবস্থা রাখেন অনেকে ক্যালেন্ডারও ছাপান বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে বাংলা ক্যালেন্ডার পাঁজির কাজ করে—একাদশী-পূর্ণিমা-অমাবস্যা দুগ্গোপুজোর নির্ঘণ্ট, পনেরো আগস্টে রবিবার পড়ল কিনা, বিয়ের যোগ, অন্নপ্রাশণ—এটা-সেটার খবর দেয় 

হালখাতাটা হলো হাল আমলের নইলে নববর্ষটা অন্যভাবেও দেখা দিত একসময় কিছু কৃত্য পালন করত বাঙালি যেমন জল বা কলসি উৎসর্গ করা অনেকে ছাতু-গুড়ের সঙ্গে জলের কুঁজো বা কলসি পাঠিয়ে দিতেন কোনও ব্রাহ্মণবাড়ি অনেক বাড়িতেই এদিন তুলসীতলায় ভোর হতেই কলসি রাখার পর তালপাতার পাখা আর মিষ্টি পাঠানো হত ব্রাহ্মণবাড়িতে মিষ্টি না থাকলে নিদেন পক্ষে খান্দেশ্বরী বা মিছরি আর ছিল তুলসীতলায় ঝারা বাঁধার রেওয়াজ দুটি ছোট বাখারির থাম তৈরি করে তার ওপর আড়াআড়ি একটা বাখারি বেঁধে সেখানে তুলসীগাছের ঠিক ওপরে একটা মাটির সরা বা মালসা কাচ্চা ভাঁড় বেঁধে তার নীচে খুব ছোট একটা ছিদ্র করে পাত্রটা জলে ভর্তি করে দেওয়া হতো খুব ধীরে ধীরে টুপ টুপ করে জলের ফোঁটা সেই ছিদ্র পথে কুশের বাধা সৃষ্টি করে দিয়ে পড়ে তুলসীগাছের গোড়াটাকে সিক্ত করে গাছটাকে গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখত এখনও গ্রামে-শহরে অনেক বাড়িতে এই বৃক্ষ বাঁচানোর প্রতীককে দেখতে পাই এটা অনেকে অক্ষয় তৃতীয়া বা একাদশী ব্রত উপলক্ষেও চালু করেন এই বৈশাখ মাসেই

অন্য সব অনুষ্ঠানে খামতি দেখা দিলেও হালখাতার রমরমাটা কমে যায়নি পাওনা আদায়ের-মিষ্টি খাওয়ানোর ব্যাপারের কথা তো বলেইছি এর জন্য বড় বড় ব্যাপারিরা ভিয়েন বসাতেন, খুচরো ব্যাপারিরা খুচরো মিষ্টি কিনে এনে পরব সামলাতেন আগে মন্ডা-বাতাসা-কদমা দিয়ে কাজ সারা হত পরে এর সঙ্গে বোঁদে-নোনতা ঢুকল পানীয় বলতে শরবত ছিল, পরে এল সোডা-লেমনেড ডাব এসে গিয়েছিল এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধূমপানের আয়োজনও থাকত

তবে কলেজ স্ট্রিটে বর্ষবরণটা একটু আলাদা রকমের বাঙালির পার্বণে এটা একটা অভিজাত সংযোজন ঘটেছিল প্রথম দিকে পয়লা বৈশাখে দোকানপাতি বন্ধই থাকত বেশির ভাগ কারণ পাঠ্যপুস্তকের বাজারটাই তখন রমরমা পরে এল সাহিত্যের কারবার কলেজ স্ট্রিটে তখন প্রবূণতম প্রকাশকদের মধ্যে সুধীর সরকার মশায়দের এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স অন্যতম তিনি তখন দোকান খুলে রাখতেন কিছু ভাল সন্দেশ আনিয়ে দোকানের কোণে রাখা গণেশমূর্তির পুজো করে বিকেল হওয়ার আগেই দোকান বন্ধ করে দিতেন এরই মধ্যে লেখক-খরিদ্দারদের কেউ এলে সন্দেশ দিয়ে আপ্যায়ন করতেন তখন নতুন বছর বলে বই প্রকাশের রেওয়াজটাও গড়ে ওঠেনি তবে বৈশাখ মাসটা ছিল রবিঠাকুরের জন্মমাস তাঁকে স্মরণ করে নতুন বই প্রকাশের একটা রেওয়াজ গড়ে ওঠে বই পাড়ায় তখন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং হাউস তাদের প্রতিষ্ঠা দিবস স্মরণ করে ৭ বৈশাখে বই প্রকাশ করতেন বইয়ের টাইটেল পেজের উল্টো দিকে ছাপা হতো ‘স্মরণীয় ৭ই’ পরে পয়লা বৈশাখে বই বের করা একটা অভিজাত রেওয়াজে পরিণত হয় এখনও সেটা বহমান কিন্তু এখন বইমেলা উপলক্ষে বই প্রকাশ করাটা একটা পার্বণে পরিণত হয়ে গেছে যে-সব বইমেলাতে ছাপানো যায় না—সেগুলোকেই এখন পয়লা বৈশাখের নাম করে ছাপানো হয় এবং এই উপলক্ষে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত প্রকাশকদের আমন্ত্রণে লেখককুল এবং তাঁদের খরিদ্দারেরা এসে মিষ্টিমুখ করে যান আগে দেখতাম, অনেকে সঙ্গে বাচ্চাদেরও নিয়ে আসতেন এঁদের বিভূতি বাঁড়ুজ্যে বলতেন—ট্যামরা-টুমরি সব প্রকাশক আর বেড়ে ওঠেন না বাজারের পড়তির কারণে অভিজাত এবং সম্পদশালী প্রকাশকেরা বেশ আয়োজন করে চলেন তবে এক সময়ে এক এক প্রকাশক এক-এক ধরনের মিষ্টি-পানীয়ের যে চল করেছিলেন তা বোধ করি মেনে চলা সম্ভব হয় না অনেকে এদিন লেখকদের নতুন বইয়ের জন্য বায়না করেন অনেকে লেখকদের পাওনার কিছু অংশ নগদে দেওয়ার চেষ্টা করেন বইয়ের ব্যবসায়ীরাও নতুন বই কী বের হয়েছে সন্ধান করে নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যান একটা পুনর্মিলন উৎসব জাতীয় ব্যাপার হয় অনেকে খাতায় নানা মন্তব্য লিখে দেন তাই নিয়ে বইও ছাপানো হয় পরে 

নববর্ষের উৎসব কি শুধু বাংলাকেই ঘিরে হয় সারা ভারতবর্ষে নানা প্রদেশে নানা নামে নানা ঢঙে এর উদযাপন ঘটে কর্নাটকের ‘উগাদি’, কেরলের ‘ওনাম’ (অবশ্য তা হয় মকর সংক্রান্তিতে সরস্বতী পুজোর সময়) অথবা পাঞ্জাবের ‘বৈশাখী’ উৎসবের কথা আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছে ‘নওরোজ’ শব্দটির সঙ্গেই তো নতুন দিনের আভাস জড়িয়ে আছে নতুন বস্ত্র পরার রেওয়াজও আছে সর্বত্র একসময় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন নববর্ষ স্বদেশের দীক্ষাগ্রহণের দিন জানি না, আর কতদিন আমরা স্বদেশী থাকতে পারব