শিবনাথ প্রশ্ন করিল, রোগটা কী?
ননীবাবু প্রবীণ চিকিৎসক, চিকিৎসাবিদ্যা বংশগত বিদ্যা, তিন পুরুষ ধরিয়া এ বংশের প্রত্যেকেই চিকিৎসক হিসাবে শুধু জীবিকাই নয়, খ্যাতি এবং প্রতিপত্তিও যথেষ্ট পরিমাণে অর্জন করিয়া আসিয়াছে৷ এই বিদ্যার সঙ্গে ইহাদের একটা জন্মগত পরিচয় আছে৷ বাড়ির মেয়েরা পর্যন্ত নাড়ী দেখিতে জানে, আকস্মিক আপদে-বিপদে দু-চারিটা টোটকার ব্যবস্থা পর্যন্ত তাহারা দিয়া থাকে৷ ননী ডাক্তার কবিরাজি এবং ডাক্তারি দুই জানেন, ধীর গম্ভীর লোক, এ অঞ্চলের লোকে বলে— ধন্বন্তরি৷ অবশ্য ননী ডাক্তারের হাতে সকল রোগীই যে বাঁচে তাহা নয়, তবে ননীবাবু ভুল করেন না; ক্ষেত্রবিশেষে সসম্ভ্রমে মৃত্যুকে অভিবাদন করিয়া পথ ছাড়িয়া সরিয়া দাঁড়ান৷
ননীবাবু হাসিয়া বলিলেন, রোগটা? কালরোগ আর কি?
হ্যাঁ৷ বয়স যে অনেক৷ পঁচাশির কম নয়৷ কাল— মানে বয়সই এখন ব্যাধি৷ ননীবাবু আবার একটু হাসিলেন৷
… … … …
শিবনাথদের বাড়ির চার পুরুষের চাকর৷
শিবনাথের প্রপিতামহের আমলে এ বাড়িতে বহাল হইয়াছিল৷ দশ বছর বয়সের হাড়ীর ছেলে, মোটাসোটা চেহারা, থ্যাবড়া নাক, কুতকুতে চোখ, মাথায় একমাথা কোঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, বলিষ্ঠ গঠন, গরুর বাখালি করিবার জন্য বহাল হইয়াছিল৷ নাম সনাতন, কিন্তু মোটাসোটা চেহারার জন্য কর্তা নাম দিয়াছিলেন, কুমড়ো৷
ছোট ছোট চোখে অনেকক্ষণ কর্তার দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিয়াছিল, বাবু মশায়! কত্তাবাবু!
কি রে?
কর্তার পোশাক-পরিচ্ছদ, ভাবভঙ্গি, কথাবার্তা কুমড়োর মনে কেমন যেন ভয়ের সঞ্চার করিতেছিল; অদ্ভুত, বিস্ময়কর, দুর্বোধ্য৷ কুমড়ো বিহ্বল করুণভাবে সভয়ে প্রশ্ন করিয়াছিল, আমাকে মারবা না কত্তাবাবু?
বিরক্তিতে ভ্রূকুঞ্চিত করিয়াও সস্নেহে হাসিয়া কর্তা বলিয়াছিল, না, মারব কেন?
ঘরের ভেতর ভ’রে রাখবা না?
না, না৷ বরং ভাল ক’রে কাজ করলে বকশিস দেব৷
বকসিস দেবা? কি দেবা?
কি নিবি?— কর্তা হাসিয়া প্রশ্ন করিয়াছিলেন৷
চাপরাসীর লাল শালুর পাগড়িটা দেখাইয়া কুমড়ো বলিয়াছিল, অমুনি লাল টুপি একটো আমাকে দিও৷
ঠিক সেই সময়েই বাড়ির ঝি আসিয়া কর্তাকে দেখিযা সসম্ভ্রমে ঘোমটা টানিয়া মৃদুস্বরে জানাইয়াছিল, বাজার যাইবার জন্য লোকের প্রয়োজন, লবঙ্গের অভাব পড়িয়াছে পান সাজা বন্ধ রহিয়াছে৷
চাকরটা কার্যান্তরে গিয়াছিল, চাপরাসীরও কার্যভার লইয়া বাহিরে যাওয়ার কথা, কর্তা কুমড়োকেই পাঠাইয়াছিলেন, লবঙ্গ নিয়ে আয় চার পয়সার, বুঝলি?
কিছুক্ষণ পর প্রকাণ্ড একটা ঠোঙা হাতে কুমড়ো বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করিয়া ঠোঙাটা নামাইয়া দিয়াছিল, এই ল্যান গো৷
ঠোঙায় এক ঠোঙা নুন৷
বাড়িতে হাসির ধুম পড়িয়া গিয়াছিল৷ গিন্নী সেবার বুঝাইয়া দিয়াছিলেন, খেতে লাল-ঝাল লাগে, লবঙ্গ, লবণ নয়, বুঝলি৷ লঙ্গ, লঙ্গ৷
দ্বিতীয় বারে আরও একটা বড় ঠোঙা হাতে কুমড়ো ফিরিয়া আসিয়াছিল, এবার ঠোঙায় একঠোঙা লঙ্কা৷
সেবার আর হাসির ধ্বনি বাড়ির গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল না, কাছারি-বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছিল, কুমড়ো বিব্রত এবং বিরক্ত হইয়া বলিয়াছিল, বললা যি, ঝাল!
কর্তার খড়ম বাজিয়া উঠিয়াছিল, তিনি এত উচ্চ হাসির জন্য বিরক্ত হইয়াই আসিয়াছিলেন, কিন্তু সমস্ত শুনিয়া উচ্চ হাসিতে তিনি গোটা পাড়াখানা সচকিত করিয়া তুলিয়াছিলেন৷
দীর্ঘ পঁচাত্তর বৎসর পরেও সনাতনের সে কথা এ বাড়িতে সকলেই জানে; পরিবারের ইতিহাসের মধ্যে স্থান পাইয়াছে৷ আরও একটা কথা— সেই প্রথম দিনেরই কথা— বাঁচিয়া আছ৷ বাড়ির গরু-বাছুর গোয়ালে বন্ধ করিয়া সনাতন বাড়ি যাইতে বাহির হইয়া পথে দাঁড়াইয়া সরবে কাদিয়াছিল, ও— মা গো! ওগো—মা গো!
কর্তা নিজে বাহির হইয়া আসিয়া প্রশ্ন করিয়াছিলেন, কে মেরেছে?
হাতের মুঠোয় চোখ মুছিতে মুছিতে কুমড়ো বলিয়াছিল, ‘আনার’ হয়ে যেল যি!
কি?
আঁদার৷
আঁধার!
হ্যাঁ৷ আমি কি করে বাড়ি যাব? ‘মোলকিনী’ পুকুরের পাড়ে ভূত আছে যি! ভাগাড়ে গো-দানা আছে গো!
কর্তা হাসিয়া চাপরাসী সঙ্গে দিয়া কুমড়োকে বাড়ি পাঠাইয়া দিয়াছিলেন৷ সনাতনের সঙ্গে সে কথা আজও বাঁচিয়া আছে৷ সে তাহার দীর্ঘ জীবনে অসংখ্য ভূতের আশ্রয়স্থল আবিষ্কার করিয়াছে৷
শুধু ভূত নয়, দেবস্থান এবং দেবতাকেও তাহার ভয় ছিল বিষম, সে ভয় আজও তাহার যায় নাই৷ আর একটা নূতন ভয় তাহার মধ্যে সংক্রমিত হইল চাকরির কয়েক দিন পরেই৷
বড়বাবু অর্থাৎ কর্তাবাবুর বড় ছেলে শিবনাথের পিতামহ কাছারিতে বসিয়া একজন প্রজার সহিত কথা বলিতেছিলেন; মাতব্বর প্রজাটি কথা বলিতে বলিতে অকস্মাৎ কণ্ঠস্বর উচ্চ করিয়া ফেলিল৷ কুমড়ো কয়েক আঁটি খড় লইয়া সম্মুখ দিয়া যাইতে যাইতে থমকিয়া দাঁড়াইল৷ ব্যাপারটা না বুঝিলেও ব্যাপারটার অন্তর্নিহিত উত্তেজনা গুপ্ত বহ্নির উত্তাপের মত তাহাকে স্পর্শ করিল৷ বড়বাবুর থমথমে মুখ, মোড়ল মহাশয়ের সোজা বসবিার ভঙ্গি এবং সতেজ কণ্ঠস্বর তাহাকেও উত্তেজিত এবং কৌতূহলী করিয়া তুলিল৷ সকল কথা মনে নাই, কিন্তু ঘটনাটার শেষ দুটিা কথা সনাতনের বার্ধক্যজনিত বধির কানে আজও বাজে— পারবে না?
সমান তেজে প্রজাটি উত্তর দিল, না৷
সঙ্গে সঙ্গে বড়বাবুর এক লাথিতে এত বড় মানুষটা উল্টাইয়া দাওয়া হইতে একেবারে নীচে আসিয়া পড়িল৷
কুমড়োর সর্বাঙ্গ ভয়ে থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল৷ সে পলাইয়া আসিল৷ বড়বাবুর প্রতি দুরন্ত একটা ভয় তাহার বুকে চিরদিনের মত বাসা বাঁধিয়া বসিল৷ দীর্ঘদিন চাকরির মধ্যে সে ভয় তাহার আর যায় নাই৷
একবার বড় একটা নেকড়ে একটা বাছুর আক্রমণ করিয়াছিল৷ তখন অবশ্য কুমড়ো আর কুমড়ো নয়, সে তখন আঠারো-উনিশ বছরের কাঁচা জোয়ান; দৈর্ঘ্যে প্রায় সাধারণ মানুষের হাতের সওয়া চার হাত অর্থাৎ ছয় ফিটেরও বেশি৷ পাচনটা লইয়াই সে নেকড়েটার উপর লাফাইয়া পড়িয়াছিল৷ নেকড়েটার টুটির উপর যখন সে পা দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল, তখন তাহার সর্বাঙ্গ ক্ষতবিঙত রক্তাক্ত; সে ক্ষতচিহ্ন তাহার লোলচর্ম দেহে আজও অক্ষয় হইয়া আছে৷
এই কয়টি ভয় বাদ দিয়া কিন্তু সনাতনের দুর্দান্ত সাহস৷ বাবুদের ‘উদাসী ডাঙা’য় বিস্তীর্ণ জঙ্গলাবৃত প্রান্তরে গো-চারণের মাঠ—
সেখানে গোখরো, কেউটে, চন্দ্রবোড়া সাপ যথেষ্ট৷ গো-চারণের ছোট পাচনি লাঠি ও ঢেলার সাহায্যে কত সাপ যে সে মারিয়াছে, তাহার হিসাব নাই৷ শুধু মারাই নয় সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে করিতে সে নিজেই সাপকে বন্দী করার কৌশল আয়ত্ত করিয়াছে৷ নেকড়ে জাতীয় হিংস্র হেঁড়োলের বাসস্থান আবিষ্কার করিয়া হেঁড়োলের বাচ্চাও সে ধরিয়া আনিয়াছে৷ একবার বড় একটা নেকড়ে একটা বাছুর আক্রমণ করিয়াছিল৷ তখন অবশ্য কুমড়ো আর কুমড়ো নয়, সে তখন আঠারো-উনিশ বছরের কাঁচা জোয়ান; দৈর্ঘ্যে প্রায় সাধারণ মানুষের হাতের সওয়া চার হাত অর্থাৎ ছয় ফিটেরও বেশি৷ পাচনটা লইয়াই সে নেকড়েটার উপর লাফাইয়া পড়িয়াছিল৷ নেকড়েটার টুটির উপর যখন সে পা দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল, তখন তাহার সর্বাঙ্গ ক্ষতবিঙত রক্তাক্ত; সে ক্ষতচিহ্ন তাহার লোলচর্ম দেহে আজও অক্ষয় হইয়া আছে৷
জানোয়ারটাকে সে কাঁধে তুলিয়া লইয়া আসিল চামড়াটা ছাড়াইয়া লইবার অভিপ্রায় ছিল৷ কিন্তু মনিব-বাড়ির চাপরাসটা সেটাকে লইয়া গিয়া হাজির করিল কাছারিতে৷ সঙ্গে সঙ্গে তাহার ডাক পড়িল৷
কর্তাবাবু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া হাসিলেন, বলিলেন, বেটা অসুর৷ সঙ্গে সঙ্গে হুকুম দিলেন নায়েবকে, বেটাকে একটা পাগড়ি কিনে দাও তো৷ আমার মনে আছে, প্রথম দিনই বেটা আমার কাছে লাল পাগড়ি চেয়েছিল৷
বড়বাবু গম্ভীরভাবে হুকুম দিলেন, আগে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও, যেরকম কেটে গেছে, নেকড়ে-টেকড়ের দাঁতে বিষ আছে শুনেছি৷
সনাতন প্রতিবাদ করিতে পারিল না, কিন্তু একটু একটু করিয়া সরিয়া আসিয়া আড়াল পড়িতেই একেবারে সোজা দৌড় মারিল৷ বাপ রে! ডাক্তার ছুরি চালাইয়া দিবে, আষ্টেপৃষ্টে ন্যাকড়ার ফালি দিয়া বাঁধিয়া দিবে, বাপ রে! পলাইয়া আসিয়া সে একেবারে গোয়ালঘরের মাচায় উঠিয়া বসিয়া রহিল৷ চাপরাসীটা বার দুয়েক ডাকিয়া ফিরিয়া গেল৷ পাখির কলরবে সন্ধ্যা আসন্ন বুঝিয়া মাচা হইতে চুপি-চুপি নামিয়া গরুগুলোকে গোয়ালে পুরিয়া দিয়া বাড়ি পলাইল৷ কিন্তু কিছুদূর আসিয়াই তাহার বুক কাঁপিয়া উঠিল৷ সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হইয়া আসিয়াছে, সম্মুখে মোলকিনী পুকুরের পাড়ের বটগাছটায় ভূত আছে৷ ঝাঁকড়া অন্ধকার বটগাছটার পাশেই বাঁশের ঝাড়, ভূত বাঁশ হইয়া রাস্তার উপর পড়িয়া থাকে, কেহ সেটাকে পার হইতে গেলেই তড়াক করিয়া বাঁশটা সোজা উপরে উঠিয়া যায়; বাঁশের সঙ্গে মানুষটাও ওই উপরে উঠিয়া ঘাড় গুঁজিয়া মাটিতে পড়িয়া মরে৷ শতেক ছলনা ভূতের, ভাদ্রমাসে পাকা তাল হইয়া গাছ হইতে একেবারে নির্ঘাত ঘাড়ে আসিয়া পড়ে৷ কখনও বা হঠাৎ একেবারে তালগাছের মতো আকাশে মাথা ঠেকাইয়া পথের উপর দাঁড়ায়৷ এই তালগাছের মত মূর্তিকেই সনাতনের বেশি ভয়৷ কিন্তু উপায়ই বা কি? এ পথে তো তাহদের জাতি-জ্ঞাতি ছাড়া বড় কেহ যায় না৷ আবর্জনা-পরিপূর্ণ এই অংশটা পার হইয়া তবে তাহাদের পল্লী৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিযাও সনাতন কাহারও সঙ্গ পাইল না৷ তাহাদের অন্য সকলে এতক্ষণে বাড়ি ফিরিয়া গিয়াছে৷ ধর্মরাজতলার বটগাছটির নীচে ঢোল লইয়া গান আরম্ভ করিয়া দিয়াছে৷ বৈশাখে বোলান গান, জ্যৈষ্ঠে পাঁচালি, আষাঢ়ে পঞ্চমী হইতে নাগপঞ্চমী পর্যন্ত মনসার ভাসান, ভাদ্রে ভাদু, আশ্বিন হইতে ফাল্গুন পর্যন্ত পাঁচমিশালী, চৈত্রে ঘেঁটু৷ সনাতন নিজে গান গাহিতে পারে না৷ কর্কশ মোটা কণ্ঠস্বর, কিন্তু উৎসাহ তাহার প্রবল৷ কোনরূপে সে বুক বাঁধিয়া চলিতে আরম্ভ করিল৷ ঠিক করিল, বটগাছটার আগে হইতেই সে চোখ বন্ধ করিয়া চলিয়া যাইবে৷
মোলকিনীর পাড়ে আসিয়া সে চোখ বন্ধ করিল৷ কিন্তু চোখ সে আপনার অজ্ঞাতসারেই বার বার খুলিয়া ফেলিতেছিল৷
ও কে? বুকের ভিতরটায় যেন ঢেঁকি দিয়া কেহ হৃৎপিণ্ডটাকে কুটিতেছে! সাদা-কাপড়-পরা ছোট আকারের ও কে ওখানে ঘুরিতেছে? সে অদ্ভুত একটা বিকৃত কণ্ঠে চিৎকার করিয়া উঠিল, কে? মূর্তিটা এতক্ষণ তাহাকে বোধ হয় দেখে নাই, তাহার অদ্ভুত বিকৃত স্বরের সাড়ায় এবার সে ঘুরিয়া খানিক আগাইয়া আসিয়া খিলখিল শব্দে হাসিয়া উঠিল৷ সনাতনের চেতনা লোপ পাইতেছিল, প্রাণপণে সে চেতনাকে জাগ্রত রাখিবার চেষ্টা করিল৷
মূর্তিটা আরও খানিকটা আগাইয়া আসিয়া নাকী সুরে বলিল, আঁমি ভূঁত৷ সঙ্গে সঙ্গে আবার সে খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল৷
এবার সনাতনের সর্বাঙ্গে একটা অতি উত্তেজনাময় উষ্ণ চেতনার প্রবাহ ভয়ের হিমশীতল অন্ধকারের মধ্যে অগ্নিগর্ভ বিদ্যুৎ চমকের মতো খেলিয়া গেল৷
নন্দ! ভূত নয়, নন্দরাণী—তাহাদেরই সেই ডাকাবুকো মেয়েটা— কষ্টিমপাথরের মত কালো, শ্যাওলার মত নরম— সেই মেয়েটা! ভয় সনাতনের কোথায় চলিয়া গেল, সে বুঝিল না, বুঝিতেও চাহিল না, বিপুল উত্তেজনাময় উল্লাসে সেও হো-হো করিয়া হাসিয়া নন্দর দিকে ছুটিল৷ মুহূর্তে মেয়েটাও ছুটিল৷ সুদীর্ঘ সনাতন, আর নন্দ ছোটখাটো মেয়েটি, সে কতক্ষণ তাহার আগে আগে ছুটিবে! সনাতন লম্বা হাত বাড়াইল৷ কিন্তু অদ্ভুত কৌশল মেয়েটার— চট করিয়া পাশ কাটাইয়া এমন মোড় ফিরিল যে, সনাতন শূন্য হাত বাড়াইয়া গতির আবেগে চলিয়া গেল— নন্দ অন্যদিকে সরিয়া খিলখিল করিয়া হাসিতে লাগিল৷ এমনই একবার নয়, বার বার৷ ভাদ্রমাসের অন্ধকারে সে হাসিতে যেন শিহরিয়া উঠিতেছিল৷ অবশেষে নন্দকে সে যখন ধরিল, তখন নন্দ এলাইয়া পড়িয়াছে৷ সনাতনও হাঁপাইতেছিল৷ তবুও সে শিসুর মত নন্দর ছোট দেহখানি দুই হাতে তাহার মাথার উপরে তুলিয়া বলিল, দি, ফেলে দি আছিড়ে?
সুকৌশলে ঈষৎ ঝুঁকিয়া নন্দ তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, কই, দে দেখি!
ভাদ্র-সন্ধ্যায় নন্দ তালের খোঁজে আসিয়াছিল৷
… … … …
এই নন্দকেই সে বিবাহ করিল৷ সেও একটা কাণ্ড৷ নন্দর বাপ পণের দাবি করিল অনেক— এক কুড়ি পাঁচ টাকা৷
পরের দিন নন্দকে আর পাওয়া গেল না৷ সে এক হৈ-চৈ ব্যাপার৷ সনাতন কিন্তু নিশ্চিন্ত মনে মনিব-বাড়িতে কাজ করিতেছিল৷ ষাট-পঁয়ষট্টি বৎসর পূর্বে থানা-পুলিসকে লোকে এড়াইয়া চলিত, আইন-কানুনও জানিত না৷ নন্দর বাপ-মা বড়বাবুর কাছে আসিয়া গড়াইয়া পড়িল৷
বড়বাবু কড়া লোক, সূক্ষ্ণ বিচারক: কর্তাবাবুর সবতাতেই হাসি৷
আজ্ঞে হুজুর, ওই— ওই শালারই কাজ৷
বড়বাবু হুকুম দিলেন, ডাক তো বেটাকে৷ কিন্তু সনাতন তখন অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে৷ চাপরাসীটা ফিরিয়া আসিয়া বলিল, আজ্ঞে, কোথাও পেলাম না৷
সবিস্ময়ে বড়বাবু বলিলেন, আরে, এই তো ছিল!
একান্ত নিরুপায় ভঙ্গিতে চাপরাসীটা বলিল, আজ্ঞে, তন্নতন্ন ক’রে খুঁজলাম৷
ঠিক এই সময়ে কর্তাবাবু আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ সমস্ত শুনিয়া তিনি হাসিলেন, বলিলেন, সে বেটা অসুর গেল কোথায়?
এই ছিল, কিন্তু আর পাওয়া যাচ্ছে না৷
কর্তাবাবুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাড়ির বাগানের গাছগুলার দিকে চাহিয়া দেখিলেন৷ তারপর চলিয়া গেলেন গোয়াল-বাড়ির দিকে৷ সেখানে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিয়া, গোয়াল-ঘরে ঢুকিয়া ডাকিলেন, এই ব্যাটা অসুর!
গোয়ালের মাচার উপরে খসখস শব্দ হইতেছিল, শব্দটা থামিয়া গেল৷
এবার কর্তা ঈষৎ কঠোর স্বরে ডাকিলেন, সনাতনে!
মাচার উপর হইতে ঝুপ করিয়া লাফাইয়া পড়িয়া ভয়ে সঙ্কুচিত হইয়া সনাতন দাঁড়াইল৷
কর্তা আবার একবার উপরের দিকে চাহিয়া বলিলেন, এই হারামজাদী হাড়িনী, নাম মাচা থেকে৷
বিড়ালীর মত কড়িকাঠ আঁকড়াইয়া দুলিতে দুলিতে এবার নন্দ লাফাইয়া নামিল৷
কর্তা বলিলেন, আয়৷
নিঃশব্দে পোষা জানোয়ারের মত কর্তাবাবুর পিছনে পিছনে কাছারিতে আসিতেই নন্দর বাপ-মা দারুণ ক্রোধে উচ্চ চিৎকার আরম্ভ করিয়া দিল৷ বড়বাবুর চোখ দুইটাও রাঙা হইয়া উঠিয়াছে৷ ভয়ে সনাতন যেন অসার পঙ্গু হইয়া গেল৷ কর্তাবাবু গম্ভীর স্বরে নন্দর বাপ-মাকে বলিলেন, চেঁচাস নি৷ তারপর নায়েবকে বলিলেন, পঁচিশটা টাকা আমাকে দাও তো৷
বড়বাবু প্রশ্ন করিলেন, আজ্ঞে?
পঁচিশটা টাকা৷ কর্তাবাবু নায়েবের দিকে চাহিলেন৷ নায়েব বিনা বাক্যব্যয়ে পঁচিশটা টাকা বাহির করিয়া দিল৷ কর্তাবাবু নন্দর বাপকে ডাকিয়া বলিলেন, নে, গুনে নে৷ আজ রাত্রেই বিয়ে দিতে হবে, বুঝলি?
… … … ….
বিবাহের পর সনাতন গোল বাধাইল৷ যে সনাতন সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত মনিব-বাড়িতে পড়িয়া থাকিত, সেই সনাতন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ি পলাইতে আরম্ভ করিল৷ সনাতন এই আছে, এই নাই৷ শুধু তাই নয়, সেদিন চাপরাসীটা সনাতনকে ডাকিতে গিয়াছিল, সনাতন তাহাকে বেশ ঘা-কতক লাগাইয়া দিল৷ ইহার পর তিন-চার জন চাপরাসী গিয়া সনাতনকে বাঁধিয়া লইয়া আসিল৷ বড়বাবু তাহাকে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিতে হুকুম দিলেন৷ কিন্তু কর্তাবাবু কি সুনজরেই তাহাকে দেখিয়াছিলেন, তিনি সে দণ্ড মাপ করিয়া বলিলেন, দে, নাকে খত দে বেটা শুয়ার৷
মাটির ওপর নাক ঘষিয়া সনাতন চামড়া পর্যন্ত তুলিয়া ফেলিল৷ রক্তাক্ত নাকটা দেখিয়া এবার বড়বাবুও হাসিয়া ফেলিলেন৷ বলিলেন, খবরদার, এমন কাজ আর যেন করবি না৷
সনাতন কাঁদিয়া ফেলিল, বলিল, আমি ছেলাম না বাড়িতে, প্যায়দা কেনে উঠোনে দাঁড়িয়ে হাসছিল মাশায়?
বড়বাবু এবার কঠিন দৃষ্টিতে চাপরাসীটার দিকে চাহিলেন৷ কর্তাবাবু বিচিত্র মানুষ, তিনি এক কথায় ব্যাপারটাকে চাপা দিয়া বলিলেন, তোর বউকেও আজ থেকে কাজ করতে হবে এখানে, বুঝলি? সকালবেলা থেকে খোকাকে নিয়ে থাকবে৷ আর দুপুরবেলায় তুই গরু নিয়ে যাবি মাঠে, ঝুড়ি নিয়ে বউ যাবে তোর সঙ্গে, গোবর কুড়িয়ে মাঠে জড়ো করবে৷ বুঝলি? দু’বেলা খেতে পাবে, বছরে পুজোর সময় একখানা কাপড়৷
সনাতন উল্লাসে যে কি করিবে খুঁজিয়া পাইল না৷ গোয়াল-বাড়িতে আসিয়া বড়-মহিষটার গলা ধরিয়া দশটা চুমা খাইল, খানিকটা নাচিল, ভেড়ার পালের মেড়াটার সঙ্গে ঢুঁ খেলিয়া উপর-হাতের পেশীতে কালসিটে পড়াইয়া ফেলিল৷ আঃ, কর্তাবাবুকে কাঁধে করিয়া সে যদি নাচিতে পাইত৷ অথবা বাবুর পায়ের তলাটা যদি জিব দিয়া চাটিতে পারিত৷ সে ছুটিয়া গিয়া নন্দকে হিড়হিড় করিয়া টানিয়া আনিল৷
অতর্কিত আকর্ষণে নন্দ বিব্রত এবং বিরক্ত হইয়া গালিগালাজ আরম্ভ করিল, কিন্তু সনাতন সে গ্রাহ্যই করিল না৷
ইহার পর নন্দ সকাল হইতে বড়বাবুর খোকাকে— শিবনাথের বাপকে লইয়া বসিয়া থাকিত, খেলা দিত৷ সনাতন কাজ করি, মধ্যে মধ্যে খোকাকে কাঁধে লইয়া নাচিত, কখনও কখনও খোকার পিঠে মৃদু মৃদু কিল চড় মারিত, কান মলিয়া দিত, বলিত, দু-চার ঘা মেরে রাখি নন্দ; বড় হ’লে তখন তো চোখ লাল করবে, দেবে ক’ষে জুতোর বাড়ি৷
নন্দ হাসিত মৃদু হাসি, সনাতনের হাসি অট্টহাসি৷
নন্দ সেদিন কালকুটিকে চিনিল, ক্রমে ক্রমে আরও অনেককে চিনিল, কত নূতনকে আবিষ্কার করিল, প্রজাপতির ডিম সনাতন চিনিত না, সে জানিত সেগুলা মরা কাচপোকা, নন্দ সনাতনকে চিনাইয়া দিল৷ দুইজনে মিলিয়া গোবর কুড়াইয়া বানাইয়া তুলিল প্রায় একটি পাহাড়৷
কর্তাবাবু খুশি হইয়া গোটা একটা টাকা বকশিস দিলেন৷ সনাতন সেদিন নন্দকে আদর করিল, তু আমার আনার ঘরের আলো!
দুপুরে নির্জন উদাসীর প্রান্তরে সনাতন বটগাছতলায় বসিয়া থাকিত; নন্দ তাহার পাচনি লাঠিটা লইয়া গরু-মহিষগুলোকে আগলাইয়া ফিরিত৷ লাঠি হাতে নন্দকে এমন সুন্দর মানাইত! খাটো মোটা কাপড় পরা, মাথায় খাটো নন্দর হাতে সনাতনের লাঠি-গাছটা নন্দর মাথার উপেরও খানিকটা দুমদাম করিয়া পিটিত৷ কখনও কখনও প্রকাণ্ড কালো মহিষ দুইটাকে দুমদাম করিয়া পিটিত৷ কখনও কখনও সে সুকে্ৗশলে উঠিয়া বসিত মহিষের পিঠে, মহিষটা চলিত, নন্দ এমন দুলিত সেই চলার সঙ্গে সঙ্গে যে, সনাতনও ছুটিয়া গিয়া চড়িয়া বসিত অন্য মহিষটার পিঠে৷
মহিষের পিঠের উপর হইতেই নন্দ প্রথম দিনই চিৎকার করিয়া উঠিল, সাপ! অলান!
প্রকাণ্ড বড় এক অলান— অর্থাৎ অল কেউটে চলিয়া যাইতেছিল, নন্দর চিৎকারে সেটা অল্প মাথা তুলিয়া দাঁড়াইল৷ সনাতন দেখিয়া নির্বিকার চিত্তে হাসিয়া বলিল, ওর নাম কালকুটি, কিচ্ছু বলে না, বুড়ী৷ বুঝলি, ওকে যেন মারতে-টারতে যাস না৷ তারপর সে হাতে তালি দিয়া বলিল, যা যা বুড়ী, চলে যা৷
সাপটা আর কিছুক্ষণ স্থির থাকিয়া চলিয়া গেল৷
সনাতন এখানকার কীট-পতঙ্গটিকেও চেনে৷ ওই প্রকাণ্ড বড় কেউটেটার রীতিনীতি, গতিবিধি সব তাহার সুবিদিত, এমন কি কালকুটির গর্তটাও সে চেনে৷ কালকুটির বহু শাবককে সে হত্যা করিয়াছে৷ সেগুলার স্বভাব মায়ের মতো নয়৷ সনাতন জানে, বয়স হইলে উহারাও এমনই ধীর স্থির হইবে, কিন্তু বয়স হইতে হইতে যে কত জীবজন্তু মানুষ মারিবে তাহার কি ঠিক আছে? আষাঢ় মাসের প্রথম হইতেই সে সন্তর্পণে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে গর্তটার আশেপাশে৷ সহসা একদিন দেখা যায় কালো কালো সর্পশিশুতে চারিপাশ ভরিয়া গিয়াছে৷ সাপের ডিম, গরম-খোলায়-দেওয়া ধান হইতে খইয়ের মতো ফোটে যে! ডিম ফাটিয়া ছটকাইয়া বাহির হয় সাপের বাচ্চা৷ নাহিলে উহাদের মা ওই কালকুটিই যে খাইয়া ফেলিবে উহাদের৷ গর্তের ভিতরে উদ্যত গ্রাসে বসিয়া থাকে কালকুটি, উপরে থাকে সনাতন লাঠি লইয়া৷ তবুও যাহারা বাঁচিয়া যায়, তাহারা বড় হইয়াও প্রাণ দেয় সনাতনের হাতে৷
নন্দ সেদিন কালকুটিকে চিনিল, ক্রমে ক্রমে আরও অনেককে চিনিল, কত নূতনকে আবিষ্কার করিল, প্রজাপতির ডিম সনাতন চিনিত না, সে জানিত সেগুলা মরা কাচপোকা, নন্দ সনাতনকে চিনাইয়া দিল৷ দুইজনে মিলিয়া গোবর কুড়াইয়া বানাইয়া তুলিল প্রায় একটি পাহাড়৷
কর্তাবাবু খুশি হইয়া গোটা একটা টাকা বকশিস দিলেন৷ সনাতন সেদিন নন্দকে আদর করিল, তু আমার আনার ঘরের আলো!
নন্দ অবাক হইয়া গেল৷
সনাতন সেই দিনই কথাটা শিখিয়াছে বড়বাবুর কাছে৷ পূজার কাপড়ের প্রকাণ্ড গাঁটরি মাথায় সনাতন বড়বাবুর সঙ্গে বাড়ির ভিতর গিয়াছিল৷ বড়গিন্নী অন্ধকার বড়ঘরের দরজা খুলিয়া বলিয়াছিলেন, দাঁড়াও, আলো জ্বেলে দিই৷
বড়বাবু হাসিয়া বলিয়াছিলেন দরকার নেই, তুমি আমার আঁধার ঘরের আলো৷
কথাটা সনাতনের বড় ভাল লাগিয়াছে৷
… … … … …
বছর দশেক পর সেই নন্দ একদিন সনাতনকে ছাড়য়িা চলিয়া গেল; সন্তান প্রসব করিতে গিয়ে মারা পড়িল৷ সনাতনের সে অবস্থা বর্ণনার অতীত; কর্কশ উচ্চকণ্ঠের কুণ্ঠাহীন আর্ত চিৎকারে সমস্ত গ্রামখানাকে নিশীথরাত্রে সচকিত করিয়া তুলিয়াছিল৷
কর্তাবাবু তখন মারা গিয়াছেন, বড়বাবু তৎক্ষণাৎ লোক পাঠাইয়াছিলেন, সেই লোকের সঙ্গে শিবনাথের বাবাও গিয়াছিলেন৷ সনাতনকে তিনি বড় ভালবাসেন, সে তাঁহাকে মানুষ করিয়াছে৷ শবদেহের পাশে একটি কেরোসিনের ডিবে জ্বলিতেছিল উঠানে সে আলো বিশেষ পড়ে নাই, অন্ধকার উঠানে অসুরের মত প্রশস্ত প্রকাণ্ড বুকে বাঘের থাবার মত হাত চাপড়াইয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিতেছে সনাতন, চোখের জলে চোখ মুখ ভাসিয়া যাইতেছে৷
সৎকার করিয়া পরদিন সে যখন মনিব-বাড়িতে আসিল, তখন চোখ দুইটা তাহার কুঁচের মত রাঙা হইয়া উঠিয়াছে৷ সকলে ভাবিল, সনাতন পাগল হইয়া যাইবে৷
সেইদিন গভীর রাত্রে সে যখন ছুটিয়া আসিয়া কাছারির দাওয়ায় চাপরাসীটার পাশে আসিয়া হাঁপাইতে আরম্ভ করিল, তখন পাগল হইয়া গিয়াছে ভাবিয়া চাপরাসীটা সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল৷ সনাতন হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, নন্দ, প্যায়দা, নন্দ বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াইছে৷
মাস-খানেক পরেই একদিন সকালে চাপরাসীটা বলিল, সনাতন আসে নাই৷
বড়বাবু বলিলেন, ডেকে নিয়ে আয়৷
চাপরাসীটা বলিল, আজ্ঞে, রাত্রে উঠে সে কোথা চলে গিয়েছে৷ এইখানে আমার কাছ তো শোয় এখন, ভোররাত্রে উঠে গেল, তারপর আর আসে নাই৷
কড়া মেজাজের মানুষ বড়বাবুও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন৷ – নন্দর শোকে সনাতন দেশত্যাগ করিয়াছে৷ কিন্তু পরের দিনই সনাতন ফিরিয়া আসিল৷
চাপরাসীটা প্রশ্ন করিল, কোথায় গিয়েছিলি?
সনাতন জবাব দিল, গেয়েছিলাম যেখানে মন হলছিল৷
আবার দিন দুই পরে দেখা গেল, সনাতন নাই৷ সেদিন সন্ধ্যা হইতেই সে নিখোঁজ৷ যে সনাতন নন্দর প্রেতাত্মার ভয়ে সন্ধ্যাতেই ভয়কাতর শিশুর মতো অসহায় হইয়া পড়ে, সে রাত্রির অন্ধকারেই কোথায় চলিয়া গিয়াছে৷
চারদিন পর সে ফিরিল৷ বড়বাবু এবার রুষ্টভাবেই বলিলেন, এমন করবি তো কাজে জবাব দে৷ সন্ন্যাসী হতে চাস তো সন্ন্যাসীই হয়ে যা৷ আর নয় তো আবার বিয়ে-তা ক’রে ঘরসংসার কর, কাজকর্ম কর৷
সনাতন চুপ করিয়া দাঁৱাইয়া রহিল৷
বড়বাবু বলিলেন, কি বলছিস?
নখ দিয়া দেওয়াল খুঁটিতে খুঁটিতে সনাতন বলিল, আজ্ঞে—
বুঝলি, আমার কথা?
ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া সনাতন আরও কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া চলিয়া গেল৷ একেবারে সটান অন্দরে আসিয়া বড়গিন্নীর সম্মুখে জোড়হাত করিয়া দাঁড়াইল৷
দু-কুড়ি টাকা আপুনি দ্যান৷ লইলে বড়বাবুকে ব’লে দ্যান৷
বড়গিন্নী সবিস্ময়ে বলিলেন, দু-কুড়ি টাকা নিয়ে কি করবি তুই? তীর্থ যাবি নাকি?
সনাতন মাথা চুলকাইয়া বলিল, বড়বাবু বলছেন বিয়ে করতে৷
বিয়ে করতে?–সস্নেহে হাসিয়া বড়গিন্নী বলিলেন, ভালই বলেছেন রে৷ মরণরে ঠেকিয়ে তো সংসার করা যায় না বাবা, তার জন্যে বিবাগী হ’লে কি চলে?
পরম আগ্রহে সম্মতি জানাইয়া সনাতন বলিল, আজ্ঞে হ্যাঁ৷
খুশি হইয়াই গিন্নী বলিলেন, বেশ, কনে ঠিক কর, টাকার জন্যে বলব আমি বড়বাবুকে৷
আজ্ঞে, কনে আমি ঠিক করেছি, টাকা হ’লেই হয়৷
বাড়ির মেয়েরা বিস্ময়ে খানিকটা চুপ করিয়া থাকিয়া হাসিয়া কলরব করিয়া উঠিল, ও মাগো!
কোথায় রে, কোথায়? কবে ঠিক করলি রে এর মধ্যে?
কেমন কনে রে? কত বড়? দেখতে কেমন?
সনাতন বসিয়া মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে পুলকিত লজ্জার সহিত সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিল৷
মেয়েটির বাড়ি ক্রোশ খানেকের মধ্যেই- -যুগলপুরে৷ অনেক দিন হইতেই সনাতন চেনে৷ হাটে সে নিয়মিত আসে৷ সনাতন বলিল, কনে আজ্ঞে ভারী সোন্দর৷ আর বয়েস, তা খানিক হবে বইকি!
সনাতন বর্ণনায় অতিরঞ্জন করে নাই৷ মেয়েটি সত্যিই সুন্দর দেখিতে৷ বর্ণে সে গৌরী, মুখশ্রীতে লাবণ্যময়ী, কেবল চোখ দুইটি খয়রা রঙের; গঠনে সে দীর্ঘাঙ্গী, বয়সে বাইশ-চব্বিশ৷ সনাতন বৈরাগ্যের বশে মধ্যে মধ্যে নিখোঁজ হয় নাই, মেয়েটির প্রেমের আকর্ষণেই সেখানে ছুটিয়া গিয়া পড়িতেছিল৷ মেয়েটি সধবা৷ অনেক কাণ্ডের পর তাহার স্বামী দুই কুড়ি টাকার বিনিময়ে তাহাকে ছাড়পত্র দিতে রাজী হইয়াছে৷ সেদিন রাত্রে তাহাদের দুইজনকে একত্রে পাকড়াও করিয়া সনাতন তাহারা দুরন্ত প্রহার দিয়াছিল৷ সনাতন সে গ্রাহ্য করে নাই, মার খাইয়াও স্পষ্ট বলিয়া দিয়াছে, ছেড়ে দিস তো দে, লইলে আমি নিয়ে পালাব৷ শুধো কেনে ওকে— উ-ও থাকবে না তোর কাছ৷
মেয়েটার লজ্জার আবরণ নিঃশেসে খসিয়া গিয়াছিল, তাহার উপর মার খাইয়া সে উগ্র হইয়া উঠিয়াছিল৷ সেও বলিয়াছিল, আজই যাব আমি উয়োর সঙ্গে৷
শেষ পর্যন্ত দুই কুড়ি টাকায় সনাতন রফা করিয়া আসিয়াছে৷
আবার সনাতন ঘর বাঁধিল, সংসার পাতিল৷ নিজের ঘর ছাড়িয়া সে নূতন ঘর তৈরি করিল বাবুদের গোয়াল-বাড়ির পাশেই৷ পুরানো বাড়িতে নন্দ ঘুরিয়া বেড়ায়৷ কোন দিন রাত্রে কড়িকাঠে বসিযা সে যদি তালগাছের মত মোটা পা বাহির কিরয়া ঘুমন্ত অবস্থায় বুকে চাপাইয়া দেয়, তবে-৷ ঝাঁকড়া চুল ভর্তি মাথাটা বারবার নাড়িয়া সনাতন আতেঙ্ক অস্থির হইয়া উঠে৷ তাই সে নূতন করিয়া ঘর গড়িল— সে ঘরে নন্দর এতটুকু জিনিসও সে রাখিল না, অপনার সামগ্রীর লোভে নন্দ যে নিশ্চয় এখানে অসিয়া হাজির হইবে৷
নূতন বইয়ের নামটিও বড় ভাল, পেরভাতী, অর্থাৎ প্রভাতী৷ মেয়েটি কিন্তু বিলাসিনী৷ চলনে-বলনে, আহারে-রুচিতে, পোশাকে-প্রশাসনে সনাতনের বিপরীত৷ মেয়েটি চলে হেলিয়া দুলিয়া, কথা কহিতে হাসিয়া ভাঙিয়া পড়ে, পোড়ানো সামগ্রী তাহার মুখে রোচে না, সে পান খায়, দোক্তা খায়, কাপড় পরে পা ঢাকিয়া পরিপাটি ছাঁদে, চুল বাঁধে বাবুদের বাড়ির মেয়েদের মতো ‘আলবোট’ কাটিয়া৷ অথচ সনাতন ভালবাসে পোড়ানো জিনিস খাইতে, সে ভালবাসে খাটো মোটা কাপড়, আঁটসাঁট করিয়া পরিতে, রুক্ষ চুল টানিয়া মাথার উপর ঝুঁটি-খোঁপা তাহার সবচেয়ে ভাল লাগে৷ নন্দর মত গোবর প্রভাতী কুড়াইবে না৷ ছেলের ঝি হইতে আপত্তি ছিল না, কিন্তু বাবুদের বানিতে শিশু ছেলেও কেহ নাই৷
তবুও সনাতন অবনত মস্তকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পেরভাতীর অনুগত্য স্বীকার করিল৷ প্রভাতীর মনোরঞ্জনের জন্য এখানে ওখানে সে ঋণ করিতে আরম্ভ করিল৷ অবশেষে মনিব-বাড়ির কাজের উপর আর একটা কাজ লইল, ও-পাড়ায় হীরু চাটুজ্জে বিদেশে চাকরি করে, এবার সে মেয়েছেলে লইয়া গিয়াছে, রাত্রে তাহার বাড়িতে পাহারা দিবার কাজ লইল সনাতন৷ প্রভাতীকে সঙ্গে লইয়া সে সন্ধ্যার পর চাটুজ্জের বাড়ি যাইত৷ আবার ভোরবেলায় চলিয়া আসিত৷
মাস কয়েক পর—
সেদিন পেরভাতী কোন ভদ্রলেকের বধূ বা কন্যার পরনের শাড়ি দেখিয়া বলিল, ওই শাড়ি আমার চাই৷
সনাতন মাথায় হাত দিয়া বসিল৷ মনিব-বাড়িতে বিবাহের ঋণ জমিয়া আছে, এখানে ওখানে সে ঋণ করিয়াছে সেও শোধ হয় নাই, এখন টাকা কোথায় মিলিবে? ভাবিয়া চিন্তিয়া সে আসিল ছোটবাবুর অর্থাৎ শিবনাথের বাপের কাছে৷ ছোটবাবুকে নন্দ ও সে কোলে-পিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছে, আর ছোটবাবু এখনও পুরা বাবু হইয়া উঠে নাই, জুতা মারিবার বয়স হয় নাই, সনাতন ছোটবাবুর পায়ের কাছে বসিয়া পা টিপিতে টিপিতে সলজ্জভাবেই কথাটা ব্যক্ত করিল৷
ছোটবাবুও একটু লজ্জিত হইলেন, টাকা তো আমার কাছে নেই সনাতন৷
গিন্নীমাকে চাও৷ লয়তো বউরাণীর কাছে লাও৷ আমাকে কিন্তুক দিতে হবে ছোটবাবু৷ ছোটবাবুর তখন বিবাহ হইয়াছে, দশ-এগারো বছরের বধূ৷
আচ্ছা, কাল বলব তোকে৷
সনাতন খুশী হইয়া আসিয়া পেরভাতীকে বলিল, কাল৷
পরদিন সকালেই ছোটবাবু টাকা লইয়া গিয়া অবাক হইয়া গেলেন৷ সনাতন বসিয়া আছে, তাহার সে মূর্তি অদ্ভুত৷ চোখ দুইটা রাঙা৷ মুখখানা ভীষণ, আর প্রভাতী দাওয়ার উপর পড়িয়া আছে উপুড় হইয়া অসম্বৃত বেশে, অনাবৃত গৌরবর্ণ পিঠখানায় প্রহার-চিহ্ন রক্তমুখী হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে৷ ছোটবাবু প্রশ্ন করিলেন, কি হযেছে সনাতন?
সনাতন গর্জন করিয়া উঠিল, আজ আধ-মরা ক’রে ছেড়েছি, একদিন কিন্তুক নিদ্দম মেরে ফেলাব ছোটবাবু৷
প্রভাতীর পিঠের প্রহার-চিহ্নগুলি দেখিয়া ছোটবাবু সনাতনকেই তিরস্কার করিলেন, ছিঃ, এমন ক’রেই কি মারে রে!
প্রভাতী ফোঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল৷ সনাতন গর্জন করিয়া বলিল, রেতের বেলায় চাটুজ্জের বাড়িতে আমাকে একখানা বস্তা দিয়া বলে কি, বাখার থেকে ধান বার ক’রে লে৷ আমি চুরি করব ছোটবাবু!
ছোটবাবুর মনে পড়িল ছেলেবেলার কথা৷ তাঁহাদের বানির আমগাছটায় আম পাকিত সকল গাছের আগে৷ যতটি আম গাছ হইতে পনিত সনাতন কুড়াইয়া বাড়িতে দিয়া আসিত, কখনও তিনি সনাতনকে কুড়াইয়া লইয়া আম খাইতে দেখেন নাই৷ একবার তিনি চাহিয়াছিলেন একটা আম৷ সনাতন বলিয়াছিল, বাড়িতে লেবা৷
ছোটবাবু কাপড়ের টাকা দিতে গেলে সনাতন লইল না, বলিল, এক ছুঁচ ওকে আমি দোব না৷
প্রভাতীও সহ্য করিবার মেয়ে নয়; মাসখানেক পরে সে পলাইয়া গেল৷ বাবুদের বাড়ির চারপাসীটার সঙ্গে— সনাতনের যথাসর্বস্ব লইয়া নিরুদ্দেশ হইল৷ শুধু তাই নয়, ঘরের মধ্যে সনাতনকে পাওয়া গেল আহত রক্তাক্ত অবস্থায়৷ বঁটির একটা কোপ তাহার ঘাড়ে বসাইয়া দিয়াছিল৷ দশ দিন অচেতন অবস্থায় থাকিয়া সনাতন বাঁচিল৷ সে দশ দিন অচেতন সনাতনের কি চিৎকার!
নিশীথরাত্রে ঘুমন্ত মানুষ শিহরিয়া জাগিয়া উঠয়িা শুনিত, সনাতন যন্ত্রণায় চিৎকার করিতেছে— আঁ—আঁ—আঁ—৷
দশ দিন পর চেতনা পাইয়া সনাতন বড়বাবুকে সম্মুখে দেখিয়া হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, ওগো বড়বাবু গো! আমি আর বাঁচব না গো!
তাহার সে কাতরতায় বড়বাবুও বিচলিত হইলেন, সনাতন তাঁহাকে বাঘের মতো ভয় করে, আজ সে তাঁহাকেই আঁকড়াইয়া ধরিতে চাহিতেছে একান্ত আপন জনের মতো৷
ছোটবাবুকে সে বলিল, বাঁচি তো আর মেয়ের মুখ দেখব না ছোটবাবু৷
সনাতন বাঁচিল৷
… …. … … …
সনাতন বাঁচিল এবং মাস খানেক না যাইতেই আবার সে বিবাহ করিল৷ অত্যন্ত কুৎসিতদর্শনা একটা মেয়ে৷ অতুল স্বাস্থ্য এবং আকারে সে সনাতনেরই যোগ্যা৷ কর্তাবাবু সনাতনের নাম দিয়াছিলেন—অসুর, এবার ছোটবাবু সনাতনের নূতন বধূর নাম দিলেন—হিড়িম্বা৷
সনাতন অতি সলজ্জভাবে পুলকিত হইয়া হাসিল৷
নূতন বধূটিও হাসিল—হি-হি করিয়া হাসিল— নির্বোধের মত; সে হাসি দেখিযা ছোটবাবুর গা ঘিনঘিন করিয়া উঠিল— হাসির সঙ্গে মেয়েটির মুখ দিয়া লালা গড়াইয়া পড়ে৷ কিন্তু হিড়িম্বা অদ্ভুত, কিছুদিনর মধ্যেই সনাতনকে ঠাকুর করিয়া তুলিল৷সনাতনকে সে সকালবেলায় গোয়াল পরিষ্কার করিতে গোবর ঘাঁটিতে দেয় না, নিজেই সে গোবর পরিষ্কার করে; নন্দর মত সেও ঝুড়ি লইয়া সনাতনের সঙ্গে মাঠে যায়, সেখানে সনাতন ঘুমায়— একা হিড়িম্বা গরু মহিষ আগলায়, গোবর কুড়ায়, কুঁচিকাঠি সংগ্রহ করে, জ্বালানী কাঠ জড়ো করে৷ জ্বালানী কাঠের জন্য অবলীলাক্রমে সে তালগাছে উঠিয়া যায়৷ কুঁচিকাঠি বিক্রি করিয়া সে পয়সা আনে, বাড়িতে ঘুঁটে দিয়া—ঘুঁটে হইতেও মাসে এক টাকা দেড় টাকা হয়৷
সনাতনের অদৃষ্ট! এই হিড়িম্বাও তাহার অদৃষ্টে সহ্য হইল না; অদৃষ্টের তাড়ায় সে নিজেই একদিন দুর্দান্ত প্রহার দিয়া শেষে গলায় হাত দিয়া হিড়িম্বাকে বাহির করিয়া দিল৷
হিড়িম্বার সে কি কান্না!
ছোটবাবু মধ্যস্থতা করিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু হিতে বিপরীত হইয়া গেল৷
সনাতন বলিল, সন্দেশের রস রাক্ষুসী চুষে মেরে দিলে!
সনাতন কয়েকটা রসগোল্লা কিনিয়া আনিয়াছিল, হিড়িম্বা লোভের বশে গোপনে রসগোল্লাগুলি চুষিয়া খাইতেছিল, সনাতন সেটা দেখিয়া ফেলিয়াছে৷
ছোটবাবু হাসিয়া ফেলিলেন৷
সনাতন বলিল, ভাত ডাল যা হয় ঘরে আগে-ভাগে চুরি ক’রে খায়! মারের চোটে আজ নিজেই বলেছে৷
ছোটবাবু বলিলেন, আচ্ছা আর খাবে না৷
তবুও সনাতন অটল৷ বলিল, উত্তর এত বড় বাড়, আমাকে ‘মর’ বলে! আমি মরব! আমি মরে’ যাব ছোটবাবু!
ছোটবাবু হাসিলেন, আবার খানিকটা বিরক্তও হইলেন, ‘মর’ বললেই কি মানুষ মরে সনাতন?
বার বার ঘাড় নাড়িয়া সনাতন তবুও বলিল, আজ্ঞে না৷ আমাকে ‘মর’ বললে উ!
এবার ধমক দিয়া ছোটবাবু বলিলেন, ‘মর’ বললে তো হ’ল কি? তুই অমর নাকি? মরবি না তুই?
ছোটবাবুর মুখের দিকে চাহিয়া সনাতন বলিল, আপুনি আমাকে ‘মর’ বলছ ছোটবাবু!
সে এতদিনের মনিব-বাড়ির কাজে জবাব দিয়া সেই দিনই কোথায় চলিয়া গেল৷
… … … … …
ফিরিল সে দীর্ঘ দিন পর৷ আজ হইতে বৎসর খানেক আগে৷ তখনও সে সমর্থ, এত বড় দেহ আশির উপর বয়সেও প্রায় সোজাই আছে; অল্প একটু নমিত হইয়াছে মাত্র, আর চলিবার গতি মন্থর হইয়াছে৷
এক পাকা মাথা চুল, প্রকাণ্ড বড় পাকা গোঁফ, স্থবির অসুরের মত দেহ, সনাতন একেবারে মনিব-বাড়ির অন্দরে আসিয়া ঢুকিয়াছিল৷ কাছারিতে যাইতে সাহস হয় নাই৷ এই দীর্ঘকাল অনুপস্থিতির কি কৈফিয়ৎ দিবে বড়বাবুর কাছে! ছোটবাবুর সম্মুখে মুখ দেখাইবে কি করিয়া!
শিবনাথের বধূ, শিবনাথের ভগ্নী সকলে বিস্ময়ে ভয়ে চকিত হইয়া উঠিল৷ সনাতনও হতভম্ব হইয়া গেল৷ কাহাকেও সে চেনে না, ইহারা সব কে?
শিবনাথের মা আসিয়া, অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাহাকে দেখিয়া বলিলেন, তুমি সনাতন? বালিকা-বয়সে তিনি তাহাকে দেখিয়াছিলেন, তিনি এ বানিতে আসিবার পর, বৎসর দুয়েক সনাতন এ বাড়িতে ছিল; কিন্তু তবু তিনি তাহাকে চিনিলেন, সনাতনের আকৃতির জন্য৷
সনাতন একমুখ হাসিয়া বলিল, আজ্ঞে হ্যাঁ ঠাকরুন৷ একবার গিন্নীমাকে আর বউ-ঠাকরুনকে ডেকে দ্যান তো৷ বলেন— সনাতন আইচে৷
শিবনাথের মা অল্প হাসিয়া বলিলেন, আমিই বউ-ঠাকরুন সনাতন৷ গিন্নীমা তো নেই৷
সনাতন নির্বাক নিস্পন্দ হইয়া তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল৷ এই প্রৌঢ়া বিধবা— তাহার ছোটবাবুর কচি বউটি! গিন্নীমা নাই! তবে কি, তবে কি–! সে দ্রুত উঠিয়া কাছারি-বাড়িতে আসিল৷
সনাতনের এখনকার ইতিহাস এ বাড়ির সকলেই জানে; সনাতন এ বাড়ির কাহিনীর মানুষ৷ শিবনাথের বোন মুখে কাপড় চাপা দিয়া হাসিয়া বলিল, এইবার আবার ঘরতোর পাতাও সনাতন৷ আপন ভিটেতে ঘর কর, বিয়ে কর৷
সনাতন নির্বোধের মতো খানিক হাসিয়া বলিল, আর লয় মা৷ সে একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল৷
শিবনাথ নূতন, মায়ের নূতন, চাপরাসী নূতন, চাকর নূতন— সকলে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল, কে তুমি?
সনাতন চারিদিকে খুঁজিতেছিল৷ কোন উত্তরই সে পাইল না৷ উত্তর দিলেন শিবনাথের মা৷ তিনি তাহার পিছন পিছন আসিয়াছিলেন৷ সস্নেহে হাসিয়া বলিলেন, শিবু, এই সনাতন৷ সনাতনকে বলিলেন, সনাতন এই আমার ছেলে৷
সনাতন এতক্ষণে প্রশ্ন করিল, বড়বাবু নাই? ছোটবাবু নাই?
… … …. … …
গোয়াল-বাড়ির একখানা খালি ঘরে সনাতন আশ্রয় লইল৷ শিবনাথের বাড়িতেই অন্নের বরাদ্দ করিয়া দিলেন শিবনাথের মা৷ প্রথম দিনই পাচিকা ভাত দিয়া গালে হাত দিল৷ সনাতন ভাত লইল তিন বার৷ শিবনাথের মা হাসিলেন৷ সনাতনের আহার এখনও প্রায় সমানই আছে৷ খাইতে বসিলে শিবনাথের মা প্রশ্ন করিলেন, কোথায় ছিলে সনাতন?
প্রকাম্ড হাতে বিপুল এক গ্রাস ভাত তুলিয়া সনাতন বলিল, দু-তিন জায়গায় মা!
ছেলেপুলে কি? ঘরকন্না করেছ?
বাঁ হাতে মাথা চুলকাইয়া সনাতন বলিল, ছেলে অ্যানেকগুলান মা৷ তিনটে পরিবারের ছেলে৷
আরও তিনবার বিয়ে করেছিলে?
মেয়েরা সকৌতুকে খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল৷
সনাতন বলিল, হ্যাঁ মা৷ তা সে-সব চুকিয়ে দিয়েছি৷ ছাড়পত্ত ক’রে তাড়িয়ে দিয়েছি৷
সনাতনের এখনকার ইতিহাস এ বাড়ির সকলেই জানে; সনাতন এ বাড়ির কাহিনীর মানুষ৷ শিবনাথের বোন মুখে কাপড় চাপা দিয়া হাসিয়া বলিল, এইবার আবার ঘরতোর পাতাও সনাতন৷ আপন ভিটেতে ঘর কর, বিয়ে কর৷
সনাতন নির্বোধের মতো খানিক হাসিয়া বলিল, আর লয় মা৷ সে একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল৷
বউদের তাড়িয়ে দিলে কেন বাবা?
আর একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সনাতন বলিল, সবাই মরণ তাকায় মা৷ মর, মর, মর—ছাড়া বাকি নাই, তিনটে বউয়েরই ওই এক রা৷
সনাতন তৃতীয় বারের ভাতটা আর শেষ করিতে পারিল না৷ ভাতের অপচয়ে লজ্জিত হইয়া সে বলিল, খেতে পারি মা৷ ই ভাত কটা আমি খাই৷ আজ লারলাম৷
সনাতন বানিতে থাকিলে চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত; মধ্যে মধ্যে গ্রামপ্রান্তর ঘুরিয়া আসিত৷
উদাসীর ডাঙায় দীর্ঘদিন ঘুরিয়াও সে কালকুটিকে দেখিতে পাইল না৷
মধ্যে মধ্যে ডাক্তারখানায় গিয়া ওষুধ লইয়া আসিত৷ তাহার ক্ষুধা হয় না৷
আজ কয়েক দিন সনাতন বিছানাতেই শুইয়া আছে৷ খাবার পাঠাইয়া দিলে অল্প-স্বল্প খায়, না পাইলেও চুপ করিয়া থাকে৷ অভাবও বোধ করে না৷
শিবনাথের মা এ অঞ্চলের প্রবীণ বিচক্ষণ ডাক্তার ননীবাবুকে ডাকাইয়াছিলেন৷ ননীবাবু হাসিয়া বলিলেন, কালরোগ৷
শিবনাথ দেখিতে গেল৷
কঙ্কালসার সনাতন জীর্ণ পরিত্যক্ত ঐতিহাসিক পাষাণ-দুর্গের মত পড়িয়া আছে৷ মোটা মোটা হাড়গুলা প্রকট হইয়া উঠিয়াছে৷ সে দিগন্তের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া চাহিয়া আছে৷ শিবনাথের মা সেখানে ছিলেন, তিনি ডাকিতেছিলেন, সনাতন! সনাতন!
সনাতন যেন শুনিতে পাইতেছে না৷
শিবনাথ কাছে আসিয়া কণ্ঠস্বর উচ্চ করিয়া ডাকিল, সনাতন! সনাতন!
এবার সনাতনের দৃষ্টি ফিরিল, সে দৃষ্টি যেন কিছু খুঁজিতেছে, কিন্তু খুঁজিয়া পাইতেছে না৷
সনাতন!
এবার দৃষ্টি শিবনাথের দিকে রাখিয়া ক্ষীণস্বরে বলিল, দেখতে পেছি না৷ সে হাতের ক্ষীণ ইঙ্গিতে ডাকিল, আরও কাছে এস৷ শিবনাথ সরিয়া গেল৷
খোকাবাবু!
হ্যাঁ৷ কেমন আছ?
ভাল আছি৷
কি কষ্ট হচ্ছে তোমার?
ঘাড় নাড়িয়া সনাতন জানাইল, কিছু না৷ তারপর ক্ষীণস্বরে বলিল, দেখতে পেছি না ভাল, শুনতে পেছি না৷
শিবনাথের মা এবার বলিলেন, ভয় নেই সনাতন৷ সেখানে তোমার নন্দ আছে, কর্তাবাবু আছেন, বড়বাবু আছেন, গিন্নীমা আছেন, ছোটবাবু আছেন-
সনাতন কাহারও সন্ধানে কোনদিকে চাহিল না- শিবনাথের মুখের দিকে চাহিয়া ছিল, সেই দিকেই দৃষ্টি রাখিযা অস্ফুটস্বরে বলিল, অন্নকার!
অর্থাৎ অন্ধকার৷
(বানান অপরিবর্তিত)
অঙ্কনঃ ডি সুজা
শনিবারের চিঠি,
ডিসেম্বর ২০১৫ – জানুয়ারি ২০১৬