‘ফাগুনের পূর্ণিমা এল কার… লিপি হাতে’

দোল ও দুর্গোৎসব একদিন ছিল সম্ভ্রান্ত বঙ্গজীবনের অঙ্গ৷ হয়তো এই দুটি তখন ছিল নিতান্তভাবেই ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক, কিন্তু আসলে চরিত্রে এগুলি ছিল সর্বজনীন৷ কেননা কবি বলেছেন, উৎসব হল সকলের সঙ্গে মিলনের দিন৷ সকলের সঙ্গে মিলন না হলে উৎসব হয় না৷ তাই এই দিনই ব্যক্তি বা পরিবার সকলকে আমন্ত্রণ জানায় মিলনের মহাযজ্ঞে৷

দুর্গোৎসব কথাটি যদিও এখনও সুপ্রচলিত কিন্তু দোলোৎসব কথাটি কালানুক্রমে হারিয়ে গিয়ে এখন Happy Holi-তে এসে ঠেকেছে৷ কিন্তু হোলির সঙ্গে দোলপূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদে‍র মায়ার পার্থক্য সুপ্রকট৷ হোলিতে আছে দহন, জ্বলন কিন্তু দোলের মধ্যে আছে রাঙিয়ে দেওয়ার মধুর আহ্বান৷ এই রঙের খেলা আজ Festival of Colours রূপে সারা বিশ্বে‍ ছড়িয়ে পড়েছে৷ এই রঙের খেলার আদি বৃত্তান্তের সন্ধান করতে গেলে অনেক ধর্মীয় বা লৌকিক কথা এসে পড়ে৷

প্রাচীনকালেই চৈত্র মাসের শুক্লা চতুর্দশীর দিন মদনদেবতার পূজা উপল‍ক্ষে মদনোৎসবের প্রচলন ছিল৷ পরে এই উৎসব শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হোলি খেলায় পরিণত হয়৷ এবং রাধাকৃষ্ণের হোলিখেলার উৎসব সারা দেশে পালিত হতে থাকে৷ তার সঙ্গে যুক্ত সুগন্ধি যবচূর্ণ আদানপ্রদান করা হতো৷ সেটিও এখন ফাগ বা আবীর গুলালরূপে দোলোৎসবের সময়ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷

হিন্দু জীবনভাবনায় জীবনের উল্লাসকে এক মহৎ স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে৷ হিন্দু শাস্ত্র উপনিষদ ও ভগবদ্গীতা জীবনের জয়গানে মুখর৷ উপনিষদ যদি বলে যে, আনন্দরূপমমৃতৎ যদ্বিভাতি‍– যা কিছু প্রকাশিত তা তাঁর প্রকাশরূপ, আনন্দরূপ৷ আর গীতা প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে বলে, অহিংস নিষ্ক্রিয়তা নয় অর্জুন তুমি যুদ্ধ কর ও জীবনের শ্রেয়ধর্মকে প্রতিষ্ঠা কর৷ উপনিষদে আরও একটি পরম বাণী আছে তা হলো আনন্দমন্ত্র৷ আনন্দাদ্বেব খল্বিমানি ভুতানি, আনন্দেন জাতানি জীবন্তি, আনন্দং প্রয়ন্ত্যসং বিশন্তি৷ অর্থাৎ আনন্দ থেকেই সব কিছুর জন্ম, আনন্দেই তারা জীবিত এবং আনন্দের মধ্যেই তার লয়৷ সুতরাং আনন্দই এই জগতের সৃষ্টি, স্তিতি লযের মূলীভূত কারণ৷ আনন্দের প্রেরণাতেই আমাদের জীবন সমৃদ্ধ৷

ভারতীয় জীবনযাপনের যে চারটি পুরুষার্থ নির্দেশ করা হয়েছে, সেগুলি হলো ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ৷ প্রথমটি ধর্ম, অর্থাৎ সবকর্মের মূলে থাকবে ন্যায়পরতা৷ তার পরে জীবনধারণের জন্যে প্রয়োজন অর্থ, জীবনধারণের পর জীবনযাপনের জন্য চাই কাম, আনন্দের উল্লাস৷ এবং এই সবকটি পুরুষার্থ ভালোভাবে পালন করতে পারলেই অধিগত হতে পারে পরমার্থ মোক্ষ বা মহানন্দলাভ৷ জীবনকে গ্রহণ ও জীবনের উল্লাসময় যাপনই আমাদের জীবনবেদের নির্দেশ৷ মাঝে নেতিবাচক বৌদ্ধধর্মের প্রভাবেই একসময় হিন্দু সমাজে জীবন অস্বীকারি সন্ন্যাসের প্রভাব প্রবল হয়ে ওঠে৷ ফলে সব দিক দিয়ে ভারতীয় জীবন পঙ্গু, অসহায় ও পরাধীন হয়ে ওঠে৷

জীবনে ‘কাম’-এর ভূমিকাকে অত্যাজ্য অঙ্গ বলে স্বীকার করার জন্যই’ ‘কামশাস্ত্রের’ আলোচনা বারতে অত্যন্তে সুপ্রাচীন৷ অবশেষে ঋষি বাৎস্যায়ন সমস্ত কাম সম্বন্ধীয় আলোচনাগুলিকে সুগ্রথিত করে ‘কামশাস্ত্র’ রচনা করলেন৷ সেই কামশাস্ত্রে আছে জীবনকে উপভোগ করার জন্য চৌষট্টি কলার উল্লেখ, রূপচর্চা থেকে আরম্ভ করা বিভিন্ন শিল্পকলাচর্চা অবধি বিস্তৃত এবং কামকলাকে তার অঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করা৷

কালিদাসের আমলের ‘ঋতু সংহার’-এর বসন্তোৎসবে নায়কনায়িকা বিরহমিলনের ধারা, বৈষ্ণব কবিদের গাথায় কৃষ্ণলীলার অঙ্গরূপে বহুল কীর্তিত৷ কালের আবর্তনে নবযুগের কবি রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় সেই বসন্তোৎসবের উল্লাস নৃত্যগীতের সমন্বয়ে এক অপূর্ব গণসম্মিলনের উৎসবে নন্দিত হয়ে উঠেছে৷

সেই সূত্রেই আসে মদনোৎসবের কথা৷ প্রাচীনকালেই চৈত্র মাসের শুক্লা চতুর্দশীর দিন মদনদেবতার পূজা উপল‍ক্ষে মদনোৎসবের প্রচলন ছিল৷ পরে এই উৎসব শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হোলি খেলায় পরিণত হয়৷ এবং রাধাকৃষ্ণের হোলিখেলার উৎসব সারা দেশে পালিত হতে থাকে৷ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি পুরনো উৎসব, যব চতুর্থী, বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্থীতে পরস্পরের গায়ে সুগন্ধি যবচূর্ণ আদানপ্রদান করা হতো৷ সেটিও এখন ফাগ বা আবীর গুলালরূপে দোলোৎসবের সময় ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷

একদিনের সামাজিক মদনোৎসব, কালান্তরে রাধাকৃষ্ণ লীলার সংস্পর্শে এসে দোলোৎসব তথা বসন্তোৎসবে পরিণত হয়ে বিচিত্রমুখী ধারায় সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছে৷ বিশে, করে নরনারীর মলিনোৎসবের উল্লাসে সঙ্গীতের ধারায় এটি বহুমুখী প্রবাহের সৃষ্টি করেছে৷

কালিদাসের আমলের ‘ঋতু সংহার’-এর বসন্তোৎসবে নায়কনায়িকা বিরহমিলনের ধারা, বৈষ্ণব কবিদের গাথায় কৃষ্ণলীলার অঙ্গরূপে বহুল কীর্তিত৷ কালের আবর্তনে নবযুগের কবি রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় সেই বসন্তোৎসবের উল্লাস নৃত্যগীতের সমন্বয়ে এক অপূর্ব গণসম্মিলনের উৎসবে নন্দিত হয়ে উঠেছে৷ তারই রেশ ধরে কলকাতা শহরের মধ্যেও দিকে দিকে নৃত্যগীতের সেই বসন্তোৎসবের উল্লাস প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে‍–“আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে, তব অবগুণ্ঠিত জীবনে কোরো না বিড়ম্বিত তারে৷”

বসন্তপঞ্চমীতে যার আবাহন বাসন্তী পূর্ণিমায় তার পূর্ণতা, রূপে, রঙে, রসের ধারায় আমাদের রাঙিয়ে দিয়ে যায় উল্লাসময় নবজীবনের আহ্বানে৷