বাবু কলকাতার কবুতর কালচার ও স্বাস্থ্যবিধি

খিড়কি থেকে সিংহ দুয়ার, এই তোমাদের পৃথিবী, এর বাইরে জগৎ আছে তোমরা মানো না, তোমরা পায়রা ওড়াও বাজি পোড়াও, কপালে আগুন দিয়ে মনও পোড়াও …

বনেদি ধনী জমিদার মাধব দত্তের বাড়িতে আশ্রিত যুবক সীতাপতির মনের আয়নায় সেকেলে বাবু কালচারের ভোগ লালসা আর বিলাস-ব্যসনের চালচিত্রে ধরা পড়েছিল পায়রা ওড়ানোর সখের ছবিটি। “বাবুদিগের” দৈনন্দিন ঘর বসতের অন্যতম অঙ্গ ছিল নামিদামি সব পায়রা। বাইজি বিলাসের চেয়ে কিছুমাত্র কম ব্যয়সাপেক্ষ ছিল না পায়রা ঘিরে বাবুদের আহ্লাদ। শহরের মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত সমাজে পায়রা তথা কবুতরবাজির ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ১৮০০ শতক থেকেই, মূলত বাবু-সংস্কৃতি আর নবাবী ঘরানার হাত ধরে। বনেদি বাড়ির ছাদ থেকে টালিখোলার চালের মাথায় পায়রার ব্যোম— উত্তর কলকাতার পুরনো পাড়া আর সংখ্যালঘু মহল্লার সিম্বল ছিল বহুকাল ধরেই। আর এই চাহিদা পূরণ করতেই গজিয়ে উঠেছিল হাতিবাগান হাট। প্রাথমিক স্তরে মূলত পায়রার হাট হিসেবে পরিচিত ছিল সেটি। হাল আমলেও অপেক্ষাকৃত সুলভ মূল্যে গৃহপালিত পশু পাখি জোগাড় করতে রবিবারের সাত সকাল থেকেই ওই হাটে ভিড় জমাতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে।

কিন্তু সময় বদলে গিয়েছে। প্রথমত, বড় অংশের বাঙালির ঠিকানা এখন দেশলাইয়ের বাক্সের মতো দুই বা খুব বেশি হলে তিন কামরার ফ্ল্যাট বাড়ি। যদিও বাসার আসল ঠিকানা সত্যিই দশ ফুট বাই দশ ফুট। একটুকরো ব্যালকনি পাওয়াই যেখানে স্বপ্নপূরণের সামিল, সেখানে চিরাচরিত বসতবাড়ির ছাদেরও বালাই নেই। ফলে গড় বাঙালির সাকিনই যেখানে “পায়রার খোপের” মতো, সেখানে পায়রা পোষার বা নীল আকাশে কবুতর ওড়ানোর মত সখ আহ্লাদ প্রায় নিষিদ্ধ বিলাসিতার সামিল। জেট-সেট গতির নগরায়ন বাজ পাখির মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়েছে একদা কল্লোলিনী কলকাতার কবুতর বিলাস।

কিন্তু এরই মধ্যে আবার জুড়েছে রোগ ব্যাধির ভয়। পায়রা পোষা তো দূরের কথা পায়রাকে চারটি চানা ছোলা খাওয়ালেও আপনি আক্রান্ত হতে পারেন কালব্যাধিতে। ফলে সাধু সাবধান। ফলে যুগ-ধর্ম মেনে পায়রা থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকাটাই শ্রেয়। কথায় বলে না, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।

একটু উদাহরণ দিই। উত্তর কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা বিবেকানন্দ রোডে ফুটপাথের ওপর একটি প্রমাণ মাপের পোস্টার পথ চলতি মানুষের নজর কাড়ে। সেই বিজ্ঞাপনে তাতে রীতিমত সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে: “এখানে পায়রাকে খাওয়াবেন না। তা ফুসফুসের অপুরনীয় ক্ষতি করে।” শুধু অবশ্য বাংলায় নয়, তার সঙ্গে হিন্দি ও ইংরাজিতেও ‘জনস্বার্থে’ জারি করা হয়েছে। এহেন সতর্কীকরণ। বিষয়টি দেখে একটু খোঁজখবর নিতেই হল। এখানে রয়েছে একটি রেশনের দোকানসহ কিছু ছোটখাট বিপণিও। স্থানীয় মানুষজন জানালেন, এই চত্বরে রাস্তার উপর পায়রাকে খাওয়ানো বহু দিনের চল। কিন্তু হালে তাতে বাদ সেধেছে কিছু স্বাস্থ্যবিধি।

স্থানীয় মানুষরা জানিয়েছেন, কিছু কাল আগে পর্যন্ত এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে পায়রাদের জন্য নানা ধরনের শস্য দানা ছড়িয়ে দিতেন। জলের পাত্রও রাখা থাকত। দফায় দফায় কাতারে কাতারে পায়রা ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এসব শস্য দানা খেয়ে যেত। এরপর স্থানীয় কোনো কোনো বাসিন্দা ফুসফুসের সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। কাছেই একটি বাড়ি, যে পরিবারের কলকাতার এই সাবেক এলাকায় বলতে গেলে বন কেটে বসত বানিয়েছিলেন, সেই পরিবারের এক সদস্যের এই রোগ জটিল আকার ধারণ করেন। এই পরিবারের কবুতর বিলাসের ধারা অব্যাহত ছিল। চিকিৎসকরা বাদ সাধতে অবশ্য এখন সেই ট্র্যাডিশনে ইতি পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পায়রা খাওয়ানো বন্ধ করতে ‘বিধি সম্মত সতর্কী করণ’ও।

লরি থেকে নামানো বস্তার ফাঁকফোকর গলে পড়ে যাওয়া শস্যদানা খুঁটে খাচ্ছে পায়রার দল

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও এটা নিয়ে মানুষকে সাবধানে থাকতে বলেন। তাঁরা এই ব্যাপারে একাধিক উদাহরণও দিয়েছেন। যেমন, দিল্লিতে ১১ বছরের এক শিশুর শরীরে ছত্রাক সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছিল। তার অন্যতম উপসর্গ ছিল শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। চিকিৎসকেরা খোজ পান যে শিশুটি পায়রার সংস্পর্শে এসেছিল। এর ফলে পায়রার ডানা থেকে ছত্রাক উড়ে গিয়ে তার নাকের ভিতর ঢুকেছে। তারপর সেটি বুক থেকে ফুসফুসে ছড়িয়ে গিয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, পায়রা থেকে ফুসফুসে ছত্রাক সংক্রমণে যে রোগ হয়, সেটি ‘হাইপারসেনসিটিভ নিউমোনাইটিস(HP)’ নামে পরিচিত। মূল কারণ পায়রার পালক ও বর্জ্য থেকে ছড়ানো ছত্রাক। তাকে সুস্থ করতে স্টেরয়েডও দেওয়া হয়। এক কথায়, সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এমনকী পায়রা যখন ডানা ঝাপটায়, তখন তাদের পাখায় থাকা ছত্রাক কারও নাকের মধ্য দিয়ে ফুসফুসে সংক্রমিত হতে পারে। অনেকের এই সংক্রমণ মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং তা থেকে মেনিনজাইটিসও হতে পারে।

মুম্বইয়ের মত দেশের অন্যতম জনবহুল শহরে এলএলএল ডাক্তার তথা লোয়ার লোব অফ লাং –এর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের একাংশের পর্যবেক্ষণ– গত কয়েক বছরে যেসব নিউমোনাইটিস আক্রান্তদের ফুসফুসের তীব্র প্রদাহের মাত্রা পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, মুম্বইয়ের ক্রমবর্ধমান কবুতরের সংখ্যার সঙ্গে এই তীব্র সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পাখির বিষ্ঠায় ছত্রাক থাকে যার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস নেওয়া হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাজনিত ব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে। তারা জানাচ্ছেন, নিউমোনাইটিস ফুসফুসে যে ক্ষতি করে, তার মোকাবিলায় রোগীকে অপিবিরাম অক্সিজেন সরবরাহ করতে হতে পারে, এমনকী ফুসফুস প্রতিস্থাপনেরও প্রয়োজন হতে পারে।

তাহলে সেই “চিত্রগ্রীব” এর আখ্যান এর ভবিতব্য কি? ইতিহাস ভুলে যাওয়ার আপন মুদ্রাদোষে যে বঙ্গসমাজ এখন একা ও আলাদা, জীবনের নানা মূলস্রোত থেকে বিছিন্ন থেকে আত্মতুষ্টিই যার প্রাপ্তি, সেই বাঙালিকে একটু মনে করিয়ে দিতে হয় বিখ্যাত লেখক ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের ধ্রুপদী উপন্যাস “gay neck” বা “দ্য স্টোরি অফ আ পিজিয়ন” এর কথা। ১৯২৮ সালে আমেরিকান শিশুসাহিত্যে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যা নিউবেরি পদক জিতেছিল। এই আখ্যান একটি ভারতীয় কবুতর গে-নেকের জীবন নিয়ে। এই বইয়ের মূখ্য চরিত্র হল এক পায়রা চিত্রগ্রীব। যে তার সঙ্গী হীরার সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র পক্ষের তরফে বার্তাবাহকের কাজ সুসম্পন্ন করেছিল। এই উপন্যাসের মাধ্যমে লেখক মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে আত্মিক ও নিবিড় সম্পর্ক তথা বিধ্বংসী যুদ্ধের অসারতার কথা তাঁর লেখনীর আঁচড়ে মানবজমিনের এক ভিন্ন ক্যানভাসে এপিক অধ্যায় হিসেবে বিধৃত করেছেন। আসলে বইটির বেশিরভাগ অংশ চল্লিশটি কবুতরের একটি দল ঘিরে একটি ছেলের নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা কাহিনি। আর একটা কথা হল, বইটিতে এই ছেলেটি ধনগোপাল নিজেই!

বিবেকানন্দ রোড এলাকার এক পুরোনো বাসিন্দা সুবীর সাহা জানিয়েছেন, বাবু কালচাররের নস্ট্যালজিয়াতে তিনি ভোগেন না। এখান থেকে দু পা এগিয়েই ডি এল রায়ের বসত বাড়ি। সে বাড়ির কী হাল, ক’জন বাঙালি আর খবর রাখে। ফলে নস্ট্যালজিয়া বিলাসিতা মাত্র। কারণ,  বাঙালির বনেদিয়ানার সিংহদূয়ার আজ প্রায় রুদ্ধ। ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়। ছোট বেলায় বাড়ির ছাদে পায়রা ওড়ানোর মজার স্মৃতি তাঁর প্রবীণ জীবনের সম্বল। সাদা কালো ছবির অস্পষ্ট রিলের মতোই। তবুও স্মৃতি তো সততই সুখের। সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে থেকে তিনিও বিদায় জানাচ্ছেন পুরোনো কলকাতার কবুতর কালচারকে। স্বাস্থ্যের কারণেই, রোগ বালাই-এর সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে।