ঘু্মের মধ্যে কেমন একটা নরম হিমেল স্পর্শ পেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসল মহাশ্বেতাl টাটকা গাঁদা ফুলের গন্ধটা যেন নাকে এসে লাগল!
ঘুম চোখে মনে হল, ‘মা’ ডাকল কি? প্রত্যেকবার সরস্বতী পুজোর দিনে ছাদের বাগান থেকে সাজি ভরে বিভিন্ন রঙের গাঁদা-গোলাপ তুলে এনে যেভাবে কাকভোরে ডেকে দিত মা! হিমে ভেজা ফুলের স্পর্শমাখা হাত কপালে রেখে বলত,“মুনাই ওঠ, আজ সরস্বতী পুজো না, অঞ্জলি দিতে হবে যে”|
কিন্তু না, মায়ের স্পর্শ কী করে হবে? গত বছর এই সরস্বতী পুজোর দিনটাতেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে| সেকথা মনে পড়তে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল মহাশ্বেতার| স্মৃতি ভিড় করে এল|
ছোটবেলা থেকে মহাশ্বেতা দেখে আসছে, সরস্বতীকে নিয়ে একটু বেশিই আবেগপ্রবণ মা| তার মহাশ্বেতা নামটাও মায়েরই রাখা| মহাশ্বেতা যে সরস্বতীর আরেক নাম! মোটের ওপর সরস্বতী পুজো নিয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়ত মা| ওদিকে কট্টর বামপন্থী বাবা অবিনাশ গাঙ্গুলি, সরস্বতী পুজোর কোনও কাজেই সেভাবে হাত লাগান না| এমনকী বাবাকে সরস্বতী পুজোতে অঞ্জলিও কোনওদিন দিতে দেখেনি মহাশ্বেতা| যদিও বাড়িতে সরস্বতী পুজোতে বাধাও দেয়নি কখনও| আর পুজোতে মায়ের সহকারী ছিল ছোটকা|
মহাশ্বেতার মেয়েবেলার তখন| যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত ছোটকা| তবে সরস্বতী পুজোর দিনটায় বাড়িতে আসাটা একদম মাস্ট ছিল| মায়ের হুকুমে পুজোর দিন দুয়েক আগেই বাড়ি আসত ছোটকা| তারপর সরস্বতী প্রতিমা পছন্দের পর্বটা ছিল বিরাট ঝক্কির কাজ| কোনও প্রতিমার নাকটা টিকালো তো ঠোঁটটা সামান্য বাঁকা| কোনওটায় আবার সরস্বতীর বাহন ঠিক জায়গায় নেই| কিংবা সরস্বতীর বীণা ধরার ফিংগারিংটা ঠিকঠাক নয়| এই নিয়ে মা আর ছোটকার মধ্যে তর্কটা যখন কোনও মীমাংসাতেই পৌঁছত না, তখন ভেটো দিতে মহাশ্বেতার ডাক পড়ত| সে যে সরস্বতী পছন্দ করত, তিনিই হংসবাহিনী হয়ে ঘরে এসে পোঁছতেন| তারপর তো রাত জেগে রঙিন কাগজ কেটে শেকল-পতাকা বানানো, চাঁদমালা লাগানো, শোলার মোটিফ সাজানো – এসব কাজে মহাশ্বেতা ছিল ছোটকার সহকারী| মায়ের দায়িত্ব ছিল আলপনা দেওয়া| বীণার সঙ্গে হংসপাখায় পাক লাগিয়ে কী সুন্দর সরস্বতীর আলপনা-আসন এঁকে ফেলত মা! এছাড়া পুজোর উপাচার কেনা থেকে পুজোর আয়োজন, নৈবেদ্য সাজানো, ভোগ রান্না মা প্রায় একা হাতেই করত|
মহাশ্বেতা শুনেছে, মা নাকি একসময় ভালো সেতার বাজাত| কিন্তু মাকে তেমনভাবে রেওয়াজ করতে কখনও শোনেনি মহাশ্বেতা| বাবারও ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের প্রতি ঝোঁক ছিল| মা চাইলেই সেতার বাজানোটা চালিয়ে যেতে পারত| অথচ কেন যে মা চর্চাটা করত না, সেকথা জানা হয়নি কখনও| তবে সরস্বতী পুজোর দিনে সন্ধেয় মহাশ্বেতাদের বাড়িতে যে গানের জলসা বসত, সেখানে মা অনায়াসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গেয়ে দিত| তবলায় সঙ্গত করত ছোটকা|
ছোটবেলায় সরস্বতী পুজোর দিনে প্রতিমার সামনে য়েমন মহাশ্বেতার বই-রুলটানা হাতের লেখার খাতা, ছোটকার ইঞ্জিনিয়ারিং বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে থাকা বাদ্যযন্ত্রগুলোও রাখা হত| তা নিয়ে খুব হাসি ঠাট্টা করা হত|মহাশ্বেতার বাবা বলত, এ বাড়িতে যন্ত্রের চর্চা হয় না, পুজো হয়| সরস্বতীর অঞ্জলির গাঁদা ফুলের পাপড়ি আটকে থাকত মায়ের তানপুরার খরজের তারের ফাঁকে, সেতারের তরফে তারের ওপরে|শান্তি জলের ছিটে এসে পড়ত বইপত্র, ছোটকার ল্যাপটপ, বাদ্যযন্ত্রগুলোর গায়ে|
পুজো শেষ হতেই প্রসাদের থালায় থাকা কুলটার ওপরই নজর থাকত মহাশ্বেতার| প্রথমেই সেটা গলাঃকরণ করা হত| আসলে সরস্বতী পুজোর আগে কুলভক্ষণ নিষিদ্ধ ছিল তো| বলা হত সরস্বতীপুজোর আগে কুল খেলেই নাকি পরীক্ষায় গাড্ডু| আসলে ছোটবেলায় এমন কিছু অন্ধ বিশ্বাস থাকে| একটু বড় হলে তার মধ্যে কোনও সত্যি নেই জেনেও মিথ্যেটাকে শুধরে নিতে ইচ্ছে করে না| সেইসব মিথ্যের সঙ্গে তখন অনেক মিখ, নস্ট্যালজিয়ার সুতো জড়িয়ে গিয়েছে যে! আজও ওই সরস্বতী পুজোর আগে কুল না খাওয়ার মধ্যে সকলের এক টুকরো ছোটবেলার মিথ বোধহয় আটকে রয়ে গিয়েছে|
মহাশ্বেতার বাবার গল্পটা অবশ্য একটু অন্যরকম ছিল| বাবার ছোটবেলাটা কেটেছে ভাগলপুরে| সেখানে ঠাকুরদা গাছপালায় ভরা বাংলো টাইপের বাড়ি বানিয়েছিলেন| তার চারপাশে উঁচু পাঁচিলঘেরা বাগানে অনেক ফুলফলের গাছগাছালি ছিল| একটা মস্ত বড় কুল গাছ ছিল| সরস্বতী পুজোর আগে সেই কুল পেকে নাকি সোনালী হয়ে থাকত| কতগুলো মাটিতে পড়ে যেত| কিন্তু কুল খাওয়ার উপায় ছিল না| বাগানটার দেখাশুনো করত যে মালি, তার বউ ফুলমতি আর তাদের মেয়ে ওই বাড়িতেই থাকত| ফুলমতির মেয়ে সরস্বতী বাবারই সমবয়সী ছিল| ছোটবেলায় তার সঙ্গে আগানে বাগানে ঘুরে বেড়াত বাবা| নাওয়া খাওয়ার সময় হলে ফুলমতি মেয়েকে ডাক দিত – ‘সরসতিয়া… এ সরসতিয়া …কাঁহা গয়ি তুমলোক’|
একবার নাকি ফুলমতির মেয়ে সরস্বতী বেশ কয়েকটা পাকা কুল বাবাকে এনে দিয়েছিল| তখনও সরস্বতী পুজোর তিথিটা পড়েনি| কিন্তু সরসতিয়ার হাতের মুঠোয় সোনালী আভা ধরা গাছপাকা কুল! বাবাও লোভ সামলাতে না পেরে কয়েকটা টপাটপ মুখে চালান করে দিয়েছিল| জানাজানি হতে ঠাকুমার কাছে বেশ কয়েক ঘা উত্তম মধ্যম পড়ল বাবার পিঠে| সেই সঙ্গে আশঙ্কার বাণী, দ্যাখ্, এবার তোর পরীক্ষার রেজাল্ট কেমন হয়| আজন্ম মূর্খ হয়ে থাকতে হবে| বাবার অবশ্য তাতে খুব একটা চিন্তা ছিল না| কারণ একে তো তাহলে পড়াশুনো থেকে রেহাই পাওয়া যাবে| আর তাছাড়া বাবা শুনেছিল একটা গল্প| কালীদাস মূর্খ হলেও সরস্বতীর বরেই নাকি তিনি কবি হয়ে উঠেছিলেন| কাজেই কুল খাওয়ার জন্য মূর্খ হলেও সরস্বতী মায়ের জন্য যে কবি হওয়া আটকাবে না, এমনটাই ধারণা ছিল মহাশ্বেতার বাবার| তবে সকলের সামনে মারের হাত থেকে বাঁচতে বাবা জানিয়ে দিয়েছিল, ওই সরসতিয়াই তাকে কুল এনে দিয়েছিল|
মহাশ্বেতার বাবার তখন বছর আষ্টেক বয়স| সরসতিয়া আরেকটু ছোট| কিন্তু সে তো স্কুলে যায় না| তাই তার পরীক্ষায় গাড্ডু পাওয়ার চিন্তাটা নেই| কিন্তু কুল খাওয়ার দোসর হওয়ার শাস্তি হিসেবে সরসতিয়াকে আর বাবার ধারেকাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না| এমনকী সরস্বতী পুজোর দিনেও সরসতিয়াকে দেখা গেল না| বিকেলের দিকে তার দেখতে পাওয়া গেল বাগানের কলতলার কাছে| বাবাকে দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না সরসতিয়ার| তার কোঁকড়া কোঁকড়া কালো চুল, টানা টানা চোখ, ছোট ছোট নিটোল পা| গায়ের রংটা চাপা হলেও সরস্বতী ঠাকুরের মতোই নাকি দেখতে ছিল সে| তো সেই সরসতিয়ার অভিমান ভোলাতে বাবা একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিল| ঠাকুর ঘরে রাখা আলতার শিশি এনে তা পরিয়ে দিয়েছিল সরসতিয়ার পায়ে| সেই আলতা পরে সরসতিয়ার তো রাগ গলে জল| কিন্তু বাবার হাতের আলতার দাগ! তা কি অত সহজে মোছা যায়? ধরা পরার পরে আরও উত্তম মধ্যম জুটল বাবার কপালে| ঠাকুরদা বুঝলেন, ভাগলপুরে রেখে ছেলেকে মানুষ করা বেশ শক্ত| কিছুদিনের মধ্যে বাবাকে ভর্তি করে দেওয়া নরেন্দ্রপুরের বোর্ডিং স্কুলে|
জীবন গড়িয়ে গেল আপন ছন্দে|অবিনাশ গাঙ্গুলি একে একে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হলেন কেমিস্ট্রি অনার্স প্রেসিডন্সিতে| চরমপন্থী রাজনীতি নিয়ে তুখোড় ডিবেট করেন কলেজে| তার ফাঁকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জলসাও শুনতে যান| চাকরি পাওয়ার পরে এক ঘরোয়া পরিবারের মেয়ের সঙ্গে বাবার বিয়ের সম্বন্ধ করলেন ঠাকুরদা| পাত্রীর নাম বাণী মজুমদার| চমৎকার সেতার বাজায়| মহাশ্বেতা শুনেছে, বাবা যেদিন পাত্রী পছন্দ করতে গিয়েছিলেন সেদিন নাকি মা গান করেছিল – “আমারে করো তোমার বীণা, লহ গো লহ তুলে”| ওই গানের সুরেই বোধহয় বাবা আর মায়ের জীবনের যুগলবন্দি ঘটে গিয়েছিল|
সেদিন সুনন্দা কাকিমা ঘূর্ণি থেকে আনা ন্যুড সরস্বতীর মূর্তিটা নিয়ে কৌতূহল দেখাল| সুনির্মল কাকু বলল, লোকে সরস্বতীর ন্যুড ছবির জন্য মকবুল ফিদা হুসেনকে নিন্দে করে| অথচ জাপানের সরস্বতী বেনতেন সম্পূর্ণ নগ্ন|তিব্বতের কুমবুম মঠে ষোড়শ শতাব্দীর যে বীণারঞ্জিত সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া যায়, তিনি রত্নবিভূষিতা হলেও নগ্নবক্ষা| কুষাণ য়ুগের ব্রাহ্মীলিপিতে উত্কীর্ণ কংকালীটিলার জৈন সরস্বতীর মূর্তিটিও অনাবৃতবক্ষা|শুধু ভাস্কর্যেই নয়,বৈদিক ঋষি থেকে সকলেরই সরস্বতীর শরীরী বর্ণনায় যেভাবে স্তনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তেমন আর কোনও দেবীর বর্ণনাতে দেওয়া হয়নি|
মহাশ্বেতার বাবা খুব সৌখিন মানুষ| মহাশ্বেতাদের বাড়ির ড্রয়িং রুমে বাবার অনেকগুলো সরস্বতীর কালেকশন রয়েছে| কোনওটা পেন্টিং, কোনওটা আবার পাথরের| ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম থেকে কেনা ফাইবারের সরস্বতী মূর্তি – এরকম আরও অনেক| নদীয়ার ঘূর্ণি থেকে কেনা ন্যুড সরস্বতীর মূর্তিটা তো খুব ইন্টারেস্টিং| যার নগ্ন অবয়বের সঙ্গে বীণাটিকে এমন করে রাখা যে কোনওভাবেই মূর্তিটিকে অশ্লীলতার দায়ে দুষ্ট করা যায় না|
তবে মহাশ্বেতা জানে, তার বাবার কাছে সরস্বতী মানে শিল্পই| কোনও ধর্মীয় আইকন নয়| তাই বাবা বাড়িতে থাকলেও অঞ্জলির সময়ে মুখ আড়াল করে কাগজ পড়ে| কান খাড়া করে পুজোর মন্ত্র শোনে, তাই উচ্চারণের ভুলও শ্রুতি এড়ায় না বাবার| এদিকে ছোটকা মিষ্টি কাকিমারা বিদেশে চলে থাকলেও ভিডিও কল করে অঞ্জলি দিত সরস্বতী পুজোর সকালে| অবশ্য আইডিয়াটা ছিল মায়ের| অন্যদিকে বাড়ির সরস্বতী পুজোতে বাবার অংশগ্রহণ বলতে ওই সন্ধের পরে, গানবাজনার আসর| যেখানে বাবার বন্ধুদেরও নিমন্ত্রণ থাকত| এর মধ্যে সুনির্মল কাকু আর সুনন্দা কাকিমা এলে তো জমে যেত আসরটা| গান বাজনার ফাঁকে আড্ডার মধ্যে পুরনো স্মৃতি রোমন্থনও চলত| চলত ইতিহাস, পুরাণ চর্চাও| রাতে মায়ের হাতে রান্না করা খিঁচুড়ি, বেগুনি, লাবড়া, কুলের চাটনি, পায়েস খেয়ে বাড়ি ফিরত সুনির্মলকাকুরা| ওদের ছেলে সমন্ত্যক মাধ্যমিকে মহাশ্বেতারই ব্যাচমেট ছিল| এখন ইঞ্জিনিয়ারিং –এর পরে এমবিএ করছে| তো ছেলেমেয়েরা এখন সকলেই অ্যাডাল্ট|
সেদিন সুনন্দা কাকিমা ঘূর্ণি থেকে আনা ন্যুড সরস্বতীর মূর্তিটা নিয়ে কৌতূহল দেখাল| সুনির্মল কাকু বলল, লোকে সরস্বতীর ন্যুড ছবির জন্য মকবুল ফিদা হুসেনকে নিন্দে করে| অথচ জাপানের সরস্বতী বেনতেন সম্পূর্ণ নগ্ন| তিব্বতের কুমবুম মঠে ষোড়শ শতাব্দীর যে বীণারঞ্জিত সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া যায়, তিনি রত্নবিভূষিতা হলেও নগ্নবক্ষা| কুষাণ য়ুগের ব্রাহ্মীলিপিতে উৎকীর্ণ কংকালীটিলার জৈন সরস্বতীর মূর্তিটিও অনাবৃতবক্ষা| শুধু ভাস্কর্যেই নয়,বৈদিক ঋষি থেকে সকলেরই সরস্বতীর শরীরী বর্ণনায় যেভাবে স্তনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তেমন আর কোনও দেবীর বর্ণনাতে দেওয়া হয়নি| সুনির্মল কাকুর কথার সূত্র ধরে মহাশ্বেতার কানে বাজতে লাগল – “কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে…”|
সমন্ত্যক বলল, সরস্বতী তো আমাদের জেনারেশনর কাছে পুজোর নয়, প্রেমের দেবী|
সুনির্মল কাকু রে রে করে উঠল, শুধু তোদের নয়, সব জেনারেশনেই সরস্বতী প্রেমের আরাধ্যা| বসন্ত পঞ্চমীতে প্রেমের পঞ্চমশর বেঁধে কাউকে না কাউকেই| আরে শ্বেতপদ্মাসনা দেবী সরস্বতী যে পদ্মে বসেছেন সেই পদ্মের পাপড়িটা ভালো লক্ষ কর, প্রতিটা পাপড়িই তো উল্টে দিলে এক একটা লাভ কিউপিডের মতো|
মুখ দেখে মনে হল, ব্যাখ্যাটা মনে ধরেছে সমন্ত্যকের| সুনির্মলকাকু বলল, আসলে আমাদের কালে তো তোদের মতো উচ্চকিত প্রেম ছিল না|তবে এই দিনটাই ছিল সিগারেটে প্রথম সুখটান দেওয়ার, রোমান্টিক সিনেমা দেখতে যাওয়ার ছাড়পত্র পাওয়ার দিন| অঞ্জলি দেওযার সময়ে ওই য়ে পাড়ার দোলা বউদি কিংবা অরুণা বউদির দিকে তাকিয়েই সরস্বতীর মন্ত্র উচ্চারণ— জয় জয় দেবী, চরাচরসারে…| তারপর কার মুখচ্ছবি কল্পনা করে যে মা সরস্বতীকে অঞ্জলি নিবেদন করা হল, সেকথা কে-ই বা সাহস করে বলতে পারবে! তবে সরস্বতী পুজোর দিন, কোকিলের কুহুতান, চারপাশে বাসন্তী ভুবনমোহিনীরদের ভিড়, অকারণ হাসিতে উচ্ছ্বল হয়ে ওঠা, পরিবেশনের সময়ে কারও চোখের ইশারাতে দুটো গরম বেগুনি বা পায়েস বেশি দিয়ে দেওয়া – এসবই ছিল আমাদের কালে প্রেমের অভিজ্ঞান| ভ্যালেন্টাইন কার্ড বা গোলাপের কোনও দরকারই হত না| প্রেম তখন ভার্চুয়াল মিডিয়াতেই সপ্রাণ হত|
এইসব কথায়-গল্পে সেবার সরস্বতীর সন্ধে আরতির পরে আসরটা জমে উঠেছিল| মা এমনিতে গান গাইতে চায় না| কিন্তু সেদিন অল্প অনুরোধেই গেয়ে উঠল – ‘ভরা থাক স্মৃতি সুধায় বিদায়ের পাত্রখানি’… ‘বিষাদের অশ্রুজলে, মিলনের মর্মতলে, গোপনে উঠুক বেজে বিরহের বীণাখানি…’|
মহাশ্বেতা জিজ্ঞেস করল, আজ পুজোর দিনে এমন বিরহের গান কেন গাইলে মা?
মা বলল, সে কী রে! সরস্বতী যে চির বিরহবতী| শিব এবং পার্বতীর অনূঢ়া কন্যা হিসেবেই তার পরিচিতি| অথচ বিভিন্ন পুরাণে সরস্বতীকে কখনও কশ্যপ ঋষির পত্মী, কখনও ইন্দ্র বা সূর্যের শয্যাসঙ্গিনী বলা হয়েছে| ভাগবত পুরাণে ব্রহ্মার, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বিষ্ণু এবং স্কন্দপুরাণে মহেশ্বর – এই তিন দেবতার সঙ্গেই তাঁর বিয়ের কথা বলা আছে| এমনকী সরস্বতীর জন্মদাতা ব্রহ্মা নিজেই তো আত্মজার রূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন| ব্রহ্মা কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে সরস্বতী পূব থেকে দক্ষিণ, পশ্চিম থেকে উত্তর – যেদিকেই পালিয়েছেন সেদিকে ব্রহ্মার একটি করে মুখের সৃষ্টি হয়েছে| এভাবেই তো ব্রহ্মার চতুরানন রূপের সৃষ্টি| বিদ্যার দেবী সরস্বতীকে প্রেমের দেবী বলা হলেও তাঁর প্রেম পূর্ণতা পায়নি কোনওদিনই| পলাশের রক্তরং সরস্বতীর প্রিয় হলেও তিনি যে আজীবন রয়ে গেল শ্বেতশুভ্রা হয়ে| বেদনার, বিরহের গান তো তাঁরই জন্য|
মহাশ্বেতার বাবা অবিনাশবাবু বলে উঠলেন, সরস্বতীর প্রেম যে গুপ্তস্রোতা নদীর মতো| নদী যেমন যুগ যুগ ধরে বয়ে বারবার বাঁক বদল করেও চিরবহমানা| সরস্বতী তো নদীও|
মহাশ্বেতার মনে আছে রবীন্দ্রনাথের ‘ব্রাহ্মণ’ কবিতাটা বাবা সেদিন গমগমে গলায় আবৃ্ত্তি করেছিলেন| “অন্ধকারে বনচ্ছায়ে সরস্বতী তীরে, অস্ত গেছে সন্ধ্যাসূর্য…|” এই সরস্বতীর তীরেই আর্যদের প্রথম বসতি গড়ে উঠেছিল| বেদে তার উল্লেখ রয়েছে| কিন্তু মহাভারত যখন রচনা করা হচ্ছে, তখন সরস্বতী ‘বিনশন’ নামে জায়গায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে|
অবিনাশবাবু শোনাচ্ছিলেন, বছর কুড়ি আগে ইসরোর গবেষণা জানাচ্ছে, হরিয়ানা, পাঞ্জাব এবং রাজস্থানের মধ্যে দিয়ে এখনও ভূগর্ভে সরস্বতী প্রবাহিত হয়| বর্তমানে ভারত-চিন সীমান্তে উত্তরাখণ্ডের শেষ গ্রাম ‘মানা’তে, যেখানে ব্যাসদেব আর গণেশের গুহা রয়েছে, সেখানে গেলে সরস্বতী নদী দেখতে পাওয়া যায়| যা মিশে যাচ্ছে অলকানন্দায়| অবিনাশবাবু বলছিলেন, একটা মিথ আছে, একসময় এই সরস্বতীর তীরে বসেই ব্যাসদেব গণেশকে মহাভারত শোনাচ্ছিলেন| শ্রবণে অসুবিধে হচ্ছিল বলে সেইসময় গণেশ সরস্বতীর বেগকে সংবরণ করতে বলেন| কিন্তু সরস্বতী নদী তাতে কর্ণপাত না করে খরস্রোতা হয়ে বইতে থাকে| তখন গণেশ সরস্বতীকে অভিশাপ দিয়ে বলে, একদিন তোমার স্রোত বিলীন হয়ে যাবে| সেই অভিশাপেই সরস্বতী নদীর স্রোত হারিয়ে গিয়েছে| তবে এসব জনশ্রুতিই| আসলে ভূতাত্ত্বিক কারণেই সরস্বতীর স্রোত শুকিয়ে গিয়েছিল|
অবিনাশবাবুর কথাগুলো সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল| মোটের ওপর গল্পে, কবিতায়, গানে, পুরাণে, সেবার সরস্বতীর পুজোর গোটা দিনটা ভালোই কেটেছিল মহাশ্বেতাদের| রাতে ভোগ খাওয়ার পরে সুনির্মল কাকুরাও বাড়ি ফিরে গেল| বেশ একটু রাতের দিকে মা অসুস্থ বোধ করছিল| সারাদিন খাটাখাটনির ধকল গিয়েছে| বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে মনে করে ওষুধ দেওয়া হল| মা ঘুমিয়েও পড়ল| কিন্তু পরের দিন আর ঘুম ভাঙল না মায়ের| ঘুমের মধ্যেই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক| সুনির্মল কাকুরা খবর পেয়ে চলে এসেছিল ডাক্তার নিয়ে| কিন্তু কিছুই করা যায়নি| পড়ে রইল রাতের ভোগের উদ্বৃত্ত খিঁচুড়ি, দধিকর্মার উপাচার, সলতে পাকানো জাগপ্রদীপ, না খোলা তীরকাঠি| সরস্বতীর বিসর্জনের আগেই মা বিদায় নিল চিরদিনের মতো| মহাশ্বেতার চোখের সামনে সবকিছু রং হারিয়ে সাদা হয়ে গেল| ঢেকে গেল সরস্বতীর শুভ্রতায়| বাবা কেমন পাথরের মূর্তির মতো হয়ে গেল|
শেষযাত্রার আগে মাকে সবাই সিঁদুর-চন্দনে সাজিয়ে দিচ্ছিল| মহাশ্বেতা দেখল, বাবা হঠাৎ কোথা থেকে এক টুকরো কাপড় নিয়ে এল| সরস্বতীর পুজোর আলতার শিশি নিয়ে এসে মায়ের পায়ে ঢেলে দিয়ে পায়ের ছাপ নিল| সবাই একটু অবাক হল| আদ্যন্ত সংস্কারমুক্ত বাবাকে এই আচরণে সবার কাছেই কীরকম ঠেকল| শোকের মধ্যেও মহাশ্বেতার মনে পড়ে গেল কোন ছোটবেলায় বাবার মুখে শোনা সরসিতয়ার গল্পটা| এই নিয়ে বোধহয় জীবনে দ্বিতীয়বার, বাবার হাত রেঙে উঠল, নারীর পায়ে আলতা ছুঁইয়ে|
ইউনিভার্সিটি খুলে গিয়েছিল| পড়ার চাপে মহাশ্বেতা ফিরে গেল হোস্টেলে| শোক আসতে আসতে থিতিয়ে আসে| বছর ঘুরে আবার সরস্বতী পুজোর দিনটা এসে গেল| এবার আর বাড়ি আসতে পীড়াপীড়ি করার জন্য মা নেই| বাড়িতে সরস্বতী পুজোও হবে না| তাও মহাশ্বেতা সরস্বতী পুজোর আগের দিনটায় বাড়ি এল|
এসে দেখল, বাবা মায়ের একটা ছবি বাঁধিয়ে রেখেছে নিজের ঘরে| সেতার বাজাচ্ছে মা| একঢাল খোলা চুল মায়ের| এই ছবিটা তো কখনও দেখেনি মহাশ্বেতা|
ছবিটা কোথায় ছিল বাবা?
জিজ্ঞাসা করতে বাবা বলল- ওই ছিল|
মা চলে যাওয়ার পর বাবা য়েন বড্ড কম কথা বলে| দিনরাত সিডি প্লেয়ার চালিয়ে ক্ল্যাসিক্যাল শোনে| বাইরেও বেরোয় না তেমন|
এবার শুক্লা পঞ্চমীর তিথিটা মায়ের অভাবে কেমন শ্রীহীন| আকাশে ঘোলাটে আতুর চাঁদ| আমের বোলের মন উদাস গন্ধ| দূরে কোথাও প্যাঁচা ডেকে উঠল খ্যা খ্যা করে| বাড়িটা যেন খাঁ খাঁ করছে| মায়ের কথা মনে পড়ছিল মহাশ্বেতার| ক্লান্তিতে চোখটা সবে লেগেছে| ঘুমের মধ্যে মহাশ্বেতা শুনল, কোথায় যেন তানপুরার সুর ভেসে আসছে|
দরজা খুলে বাইরে এসে আলগা করে ভেজানো বাবার ঘরের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল মহাশ্বেতা| মায়ের ছবিটার সামনে তানপুরা বাজিয়ে বাবা গেয়ে চলেছেন ‘মোরে মন বায়ে, তুম বিনা সুনা সব সমসার’| রাশিদ খানের গাওয়া বন্দিশ, সরস্বতী রাগে| বছরখানেক আগে রাশিদ খানের প্রয়াণের পরে রাগটা সিডিতে শুনেছে ও|
মহাশ্বেতা শুনতে পেল গাইতে গাইতে বাবার গলাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে| কয়েক জায়গায় সুরটা পর্দায় ঠিক লাগছে না| প্রবল আক্ষেপে বাবা সাদা মাথাটা বারবার নাড়ছেন| আবার শুরু করছেন মুখড়া থেকে| বন্ধ চোখ দিয়ে দরদর ধারায় জল ঝরে ভিজে যাচ্ছে বাবার সাদা পাঞ্জাবি|এভাবেই যেন মায়ের ছবি সরস্বতীর রূপে স্থাপন করে সুরের অঞ্জলি দিচ্ছে বাবা|
সুরের তান-তোড়া যেন অনভ্যাসের কঠিন পথ কেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে| যেন মরুভূমির বালি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে গুপ্তস্রোতা সরস্বতী| নদী হয়ে সুর হয়ে, প্রেম হয়ে| দেবী আর মানবী মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে| সুরের স্রোতের সেই উজানিয়ায় সরস্বতী তখন যেন হয়ে উঠছে বাবার একান্ত সরসতিয়া…|
অঙ্কন দেবাশীষ দেব