পুতুল শুধু শিশুমনের চাহিদা মেটানোর খেলনা নয়। নয় শুধু ঘর সাজাবার উপকরণ। শিল্পের অপরূপ প্রকাশ দেখা যায় নানা স্থানে এবং নানান উপাদানে সমৃদ্ধ পুতুলের মধ্যে। জাদু বিশ্বাস ও বিভিন্ন সামাজিক ক্রিয়াকর্মের সঙ্গে পুতুলের সম্পর্ক সেই প্রাচীন কাল থেকে। কোন লৌকিক বা সামাজিক বিশ্বাস কিংবা কোথায় প্রথম পুতুল গড়া হয়েছিল তা আজও অনুমান করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মাটির পুতুলের বহু নমুনা বিশ্বের বহু স্থানে উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
ইতিহাসে পুতুল গড়ার নমুনা পাওয়া যায় নতুন প্রস্তর যুগে। যখন কৃষিভিত্তিক সভ্যতার বিকাশ ঘটল। যখন অরণ্যবাসী মানুষ কৃষিকাজ করে স্থায়ী বসতি গড়া শুরু করল। তখনই নরম কাদামাটির তাল থেকে পুতুল গড়া শুরু হল। পুতুল গড়ার নিদর্শন মেলে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে।
বাংলার মাটির লৌকিক পুতুল সুপ্রাচীন কাল থেকে তৈরি হয়ে আসছে। সমগ্র বাংলা পলল ভূমির হওয়ায় মাটি দিয়ে নানারকম ব্যবহারিক দ্রব্য তৈরির সঙ্গে সঙ্গে মাটির খেলনা পুতুলও নির্মাণ করেছেন মৃৎশিল্পীরা। পুতুল বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চার উপকরন। বিহার, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশের বেনারসেও নানা উপাদানের পুতুল পাওয়া যায় বটে, তবে বাংলার পুতুলের বৈচিত্র অন্য সব রাজ্যকে পেছনে ফেলে দেয়। আর কত রকমের নাম রয়েছে বাংলার পুতুলের। টেপা পুতুল, ছাঁচের পুতুল, কাঁচা মাটি ও পোড়া মাটির পুতুল, দীপাবলী পুতুল, চাকা লাগানো পুতুল, ঘাড় নাড়া বা অঙ্গ সঞ্চালক পুতুল, এবং মুণ্ড পুতুলের মতো কত পুতুল বাংলার ঐতিহ্যকে গৌরবান্বিত করেছে। মাটি, পিটুলি গোলা, গোবর, কাঠ, গালা, ধাতু, শোলা, শিং, পাট, ঝিনুক, হাতির দাঁত ইত্যাদি নানা বিচিত্র উপাদানে তৈরি পুতুল বাঙালির সামাজিক চেতনার অনন্য প্রকাশ।
বাংলা ছাড়াও বিহার, ওড়িশা এবং বেনারস-এর পুতুলের সম্ভার নিয়ে উত্তরপাড়ার জীবনস্মৃতি আর্কাইভের নতুন উদ্যোগে একটি স্থায়ী প্রদর্শনী জায়গা করে নিল ‘হরেক পুতুলের ঘর’ শিরোনামে। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বাংলার বিভিন্ন জেলা যেমন, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া, উত্তর দিনাজপুর-এর প্রাকৃতিক উপাদান, মাটি (কাঁচা ও পোড়া), কাঠ, পাট, বাঁশ, কাগজ, ধাতু ও গালা দিয়ে তৈরি পুতুল।
এই প্রদর্শনী সৌজন্যেই শোনা যাক পুতুলের ইতিকথা। শোনা যাক কীভাবে স্থানীয় লোক কাহিনী স্থানু হয়েছে নানারকমের পুতুলের আঙ্গিকে।
কলকাতার ঘোড়সওয়ারি পুতুল
ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা তখন ঘোড়ায় চড়ছেন। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গড়ের মাঠে মাথায় টুপি পায়ে জুতো পড়ে হাওয়া খেতেও যাচ্ছেন। সেদিনের সেই দাপুটে নারীরা শহরের অন্দরমহলে ঝড় তুলেছিলেন। যে ঝড়ের আভাস গিয়ে পৌঁছেছিল কালীঘাটের পোটোপাড়ায়। সে পাড়ায় তখন দখিন অঞ্চল থেকে ঢুকেছে ঘোতন পটুয়ার মাটির পুতুল। সেই পুতুল দেখে কালীঘাটের পুটে, তেলি, মেনকারা অবাক। এ কি ইসলামিক বই থেকে উঠে আসা কোনো দেবী? আবার কেউ বলে , না, ও তো ঠাকুর জমিদারদের বাড়ির বউ, ঘোড়ায় চড়ে গড়ের মাঠে বাতাস খায়। তো তাঁদের আদলেই কালীঘাটের পোটোপাড়ায় গড়া হল ঘোড়সওয়ারি পুতুল। ঘোড়ায় চড়া মেয়েদের সেই পুতুল আঙ্গিকে অন্দরবাসিনী মেয়েদের বাইরের আলো দেখার ইতিহাস অক্ষয় হয়ে রইল।
মুর্শিদাবাদের কাঁঠালিয়া পুতুল
আজিমগঞ্জ কাটোয়া লাইনের রেলপথে কাঁঠালিয়া গ্রাম। এখানেই পাওয়া যায় বিখ্যাত পুলিশ পুতুল। কাঠালিয়ার পুতুল শিল্পী সাধন পাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যারা বলেন, এগুলো আসলে দারোগা পুতুল।
সেই সময় মুর্শিদাবাদের গ্রামের রাস্তায় লাল টুপি মাথায় দিয়ে টগবগিয়ে ঘোড়ার পিঠে বা হাতির পিঠে চড়ে টহল দেয় পুলিশরা। সেকালের নাথিতে পাওয়া যায় বাংলার পুলিশের বীর কাহিনি। তেমনি এক দারোগা বাঁকাউলা ইংরেজ সরকারের নথিতে বরকতউলা। ঠগী কমিশনের রিপোর্টে এই চতুর দারোগার নানা কীর্তি। ততদিনে লর্ড কর্ণওয়ালিশ জমিদারদের হাত থেকে পুলিশি ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। কারণ ব্রিটিশের কাছে খবর ছিল বাংলার জমিদাররা ঠগী- ডাকাতদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছেন। তাই ঠগী দমনে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীতে ইংরেজ ছাড়াও বাঙালিদেরও ভিড় ছিল। কাঁঠালিয়ার পুলিশ পুতুল সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য ।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মজিলপুরের পুতুল
যশোরের দত্ত জমিদাররা একসময় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মজিলপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের পেয়াদা কালিচরণের মাটির পুতুল আর দেবদেবীর মূর্তি বাননোর দক্ষতা ছিল। কলিচরণের ছেলে জানকীনাথের ছেলে হরিনাথ মজিলপুরে পুতুলের আলাদা ঘরানা তৈরি করেন, যা মজিলপুরের পুতুল হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
মজিলপুরের এক খোল বা দুই খোলের ছাঁচের পুতুলের মধ্যে গ্রামীণ নারী, পশুপাখি , সাহেব-মেম তো ছিলই। এছাড়া দক্ষিনরায়, বনবিবি, বারাঠাকুরের মতো আঞ্চলিক লৌকিক দেবদেবীও পুতুলও মজিলপুরের বৈশিষ্ট্য। হরিনাথের বংশধর মন্মথনাথ এবং তাঁর উত্তরসুরিরা রাধাকৃষ্ণ, জগদ্ধাত্রী, কালীয়দমন, গণেশজননী, দুর্গা-কালী এসব দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করেছেন। তবে মন্মথনাথেরা মজিলপুরের বাবু পুতুলের খ্যাতিকে নিয়ে গিয়েছেন বহু দূরে। বাংলার বাবুদের কৃত্রিমতা ও অহংকারকে নিয়ে বানানো বাবু পুতুলের জনপ্রিয়তা আজও রয়েছে।
মজিলপুরের অন্তর্গত জয়নগরের ছাঁচের পুতুল বা হাতে টেপা পুতুলের মধ্যে যে সরলতা থাকে তা কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের থেকে আলাদা। আবার এই পুতুলের রং, গোলাকার আকৃতির সঙ্গে কালীঘাটের পুতুলের গায়ের রেখাকর্ম নিয়ে এই পুতুল স্বতন্ত্র। জয়নগরের পাঁচুগোপাল দাসের নাম পুতুল গড়ার কারিগর হিসেবে বিখ্যাত হয়ে রয়েছে।
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের হিঙ্গুল পুতুল
পুতুলকে উজ্জ্বল করে তুলতে সিনাবার বা লালচে রঙের খনিজ পদার্থ পুরুলিয়া, বাঁকুড়া অঞ্চলে পাওয়া যায়। যা পুতুল রঙের কাজে লাগে, তাকে বাঁকুড়া অঞ্চলের লোকজন হিঙ্গুল নামে চেনে। এই পদার্থ দিয়ে রাঙানো উজ্জ্বল হিঙ্গুল বা হিম পুতুল বলে। ইওরোপিয় সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে এই হিঙ্গুল পুতুলের সজ্জায়। পরনে ফ্রক, মাথায় পশ্চিমী টুপি পরা পুতুলগুলির উচ্চতা হয় এক আঙুলের মতো। বাচ্চাদের খেলনা ছাড়াও ষষ্ঠীপুজোর মতো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে এই পুতুল লাগে। মলরাজা বীর হাম্বীরের জন্য প্রথম দশাবতার তাস বানিয়েছিলেন যে কার্তিক ফৌজদার তাঁরই বংশধর শীতল ফৌজদারের পরিবার এই হিঙ্গুল পুতুলের এই ধরনের পুতুল বানান।
বাঁকুড়ার রেল পুতুল- বিকিনার ডোকরা পুতুল
মিটারগেজ লাইনের উপর দিয়ে সেদিন ছুটে চলেছে কয়লার ইঞ্জিনে টানা বাঁকুড়া -দামোদর রেল কোম্পানির রেলগাড়ি । নওবান্দা, বেলিয়াতোড়, পাত্রসায়ের, ইন্দাস, গোপীনাথপুর, শ্যামসুন্দরপুর হয়ে রেল চলেছে রায়নগর পর্যন্ত দামোদরের কুলে। এই রেল গাড়ির জন্যই গ্রামের মেয়েদের জীবনের ঘটে গেল এক বিরাট পরিবর্তন। সারা দিনের রাঁধা খাওয়া নিয়ে নিজেদের গ্রামের মধ্যেই আবদ্ধ থাকত যারা, তারাও রেল গাড়িতে চেপে চিনতে শিখল নতুন নতুন গ্রাম। ফলে তাদের কাজের গণ্ডিও বাড়তে থাকল তাদের । কিন্তু রেলগাড়িতে তারা উঠবে কী করে ? নাচের ছন্দে পরস্পরের কাঁধে হাত দিয়ে লাইন করে ঠিক রেলগাড়ির মতোই ছন্দে পা ফেলে রেলে উঠত সেই গ্রামীণ মহিলারা, যাতে রেলের ঝাকুনিতে না পড়ে যায় । তাদেরই জীবনের সেই আখ্যান নিয়ে তৈরি হল বাঁকুড়ার পুতুল শিল্পীদের হাতে রেল পুতুল। যা নাগরিক চেতনার এক অমর অভিজ্ঞান হয়ে রইল।
বাঁকুড়ার বিকিনার ঘরে ঘরে তৈরি হয় ডোকরার পুতুল। যা অভিজাত ড্রয়িং রুমের সম্পদ।
বর্ধমানের নতুন গ্রামের কাঠের পুতুল
বর্ধমান জেলার স্বল্প পরিচিত নতুন গ্রামের সূত্রধর সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্মাণের ভাবনা পুতুল শিল্পে এক নয়া জোয়ার আনল। কাঠ দিয়ে তৈরি গরুর গাড়ির চাকা, খাট -পালঙ্ক কিংবা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের আকৃতির খেলার পুতুল, রাজা -রানী, মমি পুতুল তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে তারা মেতে উঠলেন রামায়ণের চরিত্রের পুতুল গড়তে। গৌর- নিতাই , রাবণ রাজা ইত্যাদি নির্মাণে সঙ্গে রইল লক্ষ্মী ঠাকুরের
প্যাচাও । নতুন গ্রামের কারিগরদের এমন শিল্প সম্ভার নবদ্বীপ অগ্রদ্বীপের নানা হাটে বিকোতে লাগল। তেকোনা কাঠের টুকরো দিয়ে মঙ্গলকাব্যের উপাখ্যান লেখা হতে লাগল।
বীরভূম -পূর্ব মেদিনীপুরের গালার পুতুল
বীরভূমের ইলামবাজারের গালার পুতুলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের নাম। গুরুদেব জাপানে গেলে তাঁকে গালার পুতুল উপহার দেওয়া হয়। তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে এই শিল্প শিক্ষা চালু করতে চাইলে খোঁজ পেলেন ইলামবাজারের নেপাল ও গোপাল গুই নামে দুই ভাইয়ের। তাঁরা এবং পরবর্তীকালে তাঁদের ভাইপো অজিত গুই শ্রীনিকেতনে এই গালার পুতুলের প্রশিক্ষন দিতে থাকেন। কিন্তু বেতন কম থাকায় নেপাল ও গোপাল দুই ভাই শান্তিনিকেতনের চাকরি ছেড়ে ইলামবাজারে ফিরে আসেন। অজিত গুই অবশ্য শ্রীনিকেতনে থেকে ছাত্রছাত্রীদের এই গালার পুতুল তৈরির প্রশিক্ষন দিয়েছিলেন জীবনের শেষ পর্যন্ত।
সেই সময় ইলামবাজারের এই শিল্পীদের শেখানো গালার পুতুলের এতো কদর ছিল, দিল্লির মোঘল বাদশাহ বেগমদের জন্যও এখানকার গালার পুতুল পাঠানো হত। এমনকি বিদেশেও গিয়েছে ইলামবাজারের বিখ্যাত গালার পুতুল ফ্রান্সেও সমাদৃত হয়েছে। আজ অবশ্য ইলামবাজারের গালার পুতুল শিল্প অবক্ষয়ের শেষ চিহ্ন হিসেবে রয়েছে।
তবে গালার পুতুল এখনো আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায়। পূর্ব মেদিনীপুরের শিল্পী বৃন্দাবন চন্দ্র বহু বছর ধরে পরিশ্রম করে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। উজ্জ্বল রং এবং তাক লাগানো সাজের পুতুলগুলিকে পরিবেশবান্ধব বলা যায়। দেব দেবী জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদি নানা ধরনের গালার পুতুল পাওয়া যায়। সব পুতুলগুলোকেই হাতে বানাতে হয় অত্যন্ত জটিল পদ্ধতিতে। শুধু আমাদের রাজ্য নয় পূর্ব মেদিনীপুর সংলগ্ন উড়িষ্যা জেলাতেও গালার পুতুল দেখতে খুবই আকর্ষণীয়।
পশ্চিম মেদিনীপুরের নায়াগ্রামের যো পুতুল
পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়াগ্রামে যে ঘর পটুয়া বাস বাস করে তারা যে শুধু পট আঁকেন তা-ই নয়, তার সঙ্গে তাঁরা পুতুলও বানান। যে পুতুল চাকের পুতুল নয়, আবার ছাঁচে গড়া পুতুলও নয়। নয়াগ্রামের মেয়েরা হাতের আঙুলে টিপে টিপে বা হাতুর তালুতে বেলে মনের মত করে পুতুলকে গড়ন দেন। সেই পুতুলের মধ্যে ফুটে ওঠে মা সন্তানকে কোলে রেখে তেল মাখাচ্ছে, মায়ের কোলে শিশু বসে আছে, ঘোড়া -পাখি ইত্যাদি গৃহস্থের রোজকথা। এই পুতুলকেই যো পুতুল বলে থাকেন স্থানীয়রা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের দেওয়ালি পুতুল
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সঙ্গে মৃৎ শিল্পের জন্য একটা মাইকেল এঞ্জেলো আঁকা ক্রিয়েশন অফ আদমের মতোই নিবিড়। এই জেলাকে বলা যায় মৃৎশিল্পের গর্ভগৃহ। তার নেপথ্যে রয়েছে বিভিন্ন নদীর প্রভাব।
মূলত দীপাবলী তথা কালীপুজোর মরসুমে পশ্চিম মেদিনীপুরে মির্জাবাজার অঞ্চলে দেখা যায় রাস্তার দুধারে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ১/২/৩/৪/৫ প্রদীপ যুক্ত বাতি পুতুল। পুতুলের হাতে প্রদীপের পরিবর্তে লম্পের মতো ঝাড়বাতি। তাই এদের ঝাড়পুতুলও বলা হয়।পুতুলের অবয়ব একটি নারীর। নানা ধরনের দীপাবলি পুতুলের মধ্যে অন্যতম ঘোড়ায় বসা নানা রঙের পুতুল। যার পরনে ঘাঘরা। অমানিশার বিনাস ঘটিয়ে বহতা জীবনকে প্রদীপের নব আলোয় সাজিয়ে তোলার জীওনকাঠি তো নারীর হাতেই। সেই সত্যকেই রূপকে ফুটিয়ে তোলা হয় পশ্চিম মেদিনীপুরের এই দেওয়ালি পুতুলের মাধ্যমে।
হাওড়ার রানি পুতুল
কলকাতার পাশেই হাওড়া । মাঝে এক নদীর ফারাক। হাওড়া একসময় পশ্চিমবঙ্গের শিল্প তালুক হিসেবে পরিচিত ছিল। হাওড়ার অনেকগুলি অঞ্চলে তৈরি হয় বিশেষ ধরনের পুতুল। যাকে গড়নে গঠনে ষষ্ঠী পুতুল বলে বলা হয়। তবে এগুলি ঠিক ষষ্ঠী পুতুলের মত নয়। দক্ষিণ পাতিল, জগৎবল্লভপুর অঞ্চলের মানুষেরা এই পুতুলকে আদর করে বলে রানী পুতুল। হাওড়া জেলার শিল্পীরা, বহুদিন ধরে দুখোল ছাঁচে বানিয়ে চলেছে এমন রানীপুতুল। পুতুলটি পোড়ামাটির। অবশ্য তারপর শুধু গোলাপি রঙ করা হয়। কখনো কখনো অভ্র মিশিয়ে দেয়া হয়। পুতুলের পরনে থাকে ঘাগরা। তনশ্রুতি আছে রক্তমাংসের এক রানী ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়ার গোলগাল মুখের অনুকরণেই এই পুতুলকে রানি করে রেখেছেন হাওড়ার পুতুল শিল্পীরা।
মুর্শিদাবাদের পাটের পুতুল
মুর্শিদাবাদের পাটের পুতুলের কদর এখন সারা বাংলায়। খ্যাদা,বোচা, চ্যাপ্টা যেমন নাকই হোক না কেন বাজারে পাটের তৈরি অন্য জিনিসের তুলনায় এই পাটের পুতুল গুলি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। প্রথমে সাবেকি পাট দিয়ে তৈরি হল এখন পাটগুলিকে রং করে নানা রকম কালারফুল পাটের পুতুল তৈরি হয় বর্তমানে পাটকে ব্লিচ করো নানাভাবে পুতুল বানানো হচ্ছে ক্রেতাদের চাহিদা মেনে কারণ এই ব্লিচ করা পাটের পুতুল অনেক বেশি চকচকে হয়।
জীবনস্মৃতির সংগ্রহশালায় এই যে বিশেষ ধরনের পুতুলগুলি সূত্র ধরে বাংলার লোকশিল্পের পুতুল ঘরে উঁকি দেওয়া গেল। যাতে সময়ের খেলার প্রলয় ঝড়েতে লোকশিল্পের স্মারক এই পুতুলগুলি হারিয়ে না যায়, সেই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল একটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে। যে প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করা হল সম্প্রতি 15 মার্চ জীবনস্মৃতি সভাগৃহে। এই উদ্যোগটি উৎসর্গ করা হয়েছে বিখ্যাত চিত্রকর, অলংকরণ এবং পুতুলনাচশিল্পী রঘুনাথ গোস্বামী-র স্মৃতিতে। প্রদর্শনীতে রঘুনাথ গোস্বামী-র পুতুলের সংগ্রহ থেকে বহু দুষ্প্রাপ্য বাংলা, ওড়িশা ও বেনারসের পুতুল দান করেছেন তাঁর পুত্র মঙ্গল গোস্বামী ও ভাগ্নি গোপা ভৌমিক। এছাড়া স্বপ্না সেন, হিরণ মিত্র, ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী, বিধান বিশ্বাস, সুখময় বন্দ্যোপাধ্যায় ও রত্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগ্রহের বহু। দুষ্প্রাপ্য বাংলার বিভিন্ন জেলার পুতুল এবং পুতুল সংক্রান্ত বই ও ক্যাটালগে সমৃদ্ধ হয়েছে এই প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর দেওয়ালের একটি অংশ সেজে উঠেছে প্রখ্যাত আলপনাশিল্পী শ্রী বিধান বিশ্বাসের আঁকা সুবচনী ব্রত আলপনায়।
হেনরিক ইবসনের ডলস হাউস ছিল। জীবনস্মৃতির এই হরেক পুতুল ঘর এক আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসা শিল্পজীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে পারল তার প্রত্নশালায়।