uttam kumar

গানে ভুবন ভরিয়ে দেব, বলেছিলেন উত্তমকুমার

গানে ভুবন ভরিয়ে দেব– উত্তমকুমারের লিপে এটা বোধহয় নিছক গানই ছিল না, এটা বোধহয় তার একটা স্বপ্নও ছিল।

সত্যি বলতে কী, উত্তমকুমার শুধু যে একজন ভাল অভিনেতা ছিলেন তা-ই নয়, তিনি একজন ভাল গায়কও ছিলেন। নিজে ভাল গান গাইতেন আর অন্য বিখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে তাঁর লিপ দেওয়ার বিষয়টা তো সবাই জানেন। এমনই মুন্সীয়নার সঙ্গে তিনি অন্যান্য সংগীতশিল্পীদের গানে ঠোঁট মেলাতেন যে বোঝাই যেত না গানটা কে গাইছেন, উত্তমকুমার নিজে না ছবির নেপথ্যে কণ্ঠদান যিনি করেছেন, তিনি! এই ব্যাপারটা বেশি ঘটত যখন হেমন্ত-উত্তমের মেলবন্ধনে যখন গানগুলো ছবির জন্য তৈরি হত। উত্তমকুমারের ঠোঁটে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে কোনও প্রশ্নই থাকা উচিত নয়। উত্তমকুমার অভিনীত ছায়াছবিতে একেবারে প্রথম দিকে মহানায়কের লিপে গান গেয়েছিলেন তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তাঁর বেশিরভাগ ছবিতে উত্তমকুমারের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান একটা মিথ হয়ে দাঁড়িয়েছিল!

মহানায়কের মৃত্যুর পরে গ্রামাফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত একটা রেকর্ডে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্বয়ং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘না দেখলে গান শুনে ধরা যেত না কে গাইছে, যেন একই মায়ের দুই ছেলে। হারানো সুর ছবির শেষ দৃশ্যতে “রমা রমা” বলে নায়কের গলায় একটা ডাক ছিল কিন্তু পরিচালক অজয় কর চিন্তিত হলেন। সেই মুহূর্তে উত্তমকুমারকে পাবেন কোথায়! শেষ পর্যন্ত সেই সংলাপটা আমিই বললাম।’

Uttam Kumar Hemanta Mukherjee

কী অদ্ভুত মিল ছিল দুজনের কণ্ঠস্বরে! পরে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে উত্তমকুমারের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিবর্তে গান গাইতেন শ্যামল মিত্র, মান্না দে, কিশোরকুমার প্রমুখ। ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে যখন উত্তমকুমার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন তখন আবার তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে গিয়েছিলেন, ‘যাই চলে যাই’ গানটা। দেবকী কুমার বসুর পরিচালনায়, ‘নবজন্ম’ ছবিতে উত্তমকুমার অভিনয়ের পাশাপাশি একাধিক গানও করেছিলেন। শুধু ফিল্মের গান বা আধুনিক গান নয়, অনেকগুলো রবীন্দ্রসংগীতও গেয়েছেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি কেন জানিনা!

ইউটিউবে উত্তমকণ্ঠে দুটো গান প্রায়ই শোনা যায়। একটা হল ‘অনেক কথা বলেছিলেম কবে তোমার কানে কানে’ আর অন্যটা হল ‘তোমারও প্রেমে ধন্য করো যারে’। দ্বিতীয় গানটার সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। আরও একটা গান সিডিতে শোনা যায়, সেটা হল ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’। মনে পড়ে উত্তমকুমারের জীবনবসানের কিছুদিন পরে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয় প্রায় আট কী ন’টা গান। পরে কিন্তু সেইসব গানগুলো আর কোনওদিন শুনিনি! জানিনা আকাশবানী কতৃপক্ষ সেগুলো আদৌ সংরক্ষণ করে রেখেছেন কিনা!

মেগাফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল উত্তমকুমারের গাওয়া, ‘আজ মোম জোছনায়’ গানটা। এই গানটা সম্ভবত উত্তমকুমার কোনও অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন, সেটাই রেকর্ড করে পরবর্তীকালে ইপি রেকর্ডে প্রকাশিত হয়।

প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে বসুশ্রী পেক্ষাগৃহে সকালের অনুষ্ঠানে উত্তমকুমার যেতেন এবং সেখানে মাঝে-মধ্যে গানও গাইতেন। দর্শকদের অনুরোধ কিছুতেই এড়াতে পারতেন না। সেরকমই এক অনুষ্ঠানে সপ্তপদী ছায়াছবির, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানটি একবার গেয়েছিলেন। এছাড়াও ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জী রোডের পৈতৃকবাড়িতে যখনই কোনও অনুষ্ঠান হত, সেখানে উত্তমকুমার গান গাইতেন। রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম।

Uttam Kumar Hemanta Mukherjee suchitra sen

একটা ছোট্ট ঘটনার কথা বলে এই লেখাটা শেষ করব। ঘটনাটা উত্তমপুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের কাছেই শোনা। একবার গৌতমবাবু রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কলি শিস দিতে দিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলেন, তিনতলায় ওঠার পরে তিনি দেখেন তাঁর বাবি মানে উত্তমকুমার বসবার ঘরে একটা চেয়ারের ওপর বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। কাগজ থেকে মুখ না তুলেই তিনি ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ভবিষ্যতে আর কোনওদিনও যেন রবীন্দ্রনাথের গান শিস দিতে না শুনি।’

শান্তিনিকেতনের গোরা সর্বাধিকারীর কাছে শুনেছিলাম উত্তমকুমার তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে যেতে অনুরোধ করেন কারণ গান শেখার আগ্রহ। অভিনয়ের পাশাপাশি গানের প্রতিও বাংলা চলচ্চিত্র জগতের তারকা উত্তমকুমারের গভীর অনুরাগ ছিল লক্ষ করার মতো।

উত্তমকুমারের শতবর্ষে নিবন্ধটি ‘শনিবারের চিঠি’র শ্রদ্ধাঞ্জলি