
বাংলার লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যের ইতিহাসে পল্লীকবি সাধকদের ভূমিকা কেবল ভাবাবেগ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁদের সৃষ্টিতে ফুটে উঠেছিল বাংলার জীবনযাত্রার এক চিত্র। পল্লীগীতি ও বাউল-মুরশিদি গানের সহজ-সরল কথায় উঠে এসেছিল সাম্য, মৈত্রী ও মানবতাবাদী একতার শাশ্বত সুর।
মধ্যযুগের শেষে বাংলা জুড়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চরম অধঃপতন ঘটেছিল। সে যুগের সামাজিক ও ধর্মীয় নৈরাজ্যের সত্য চিত্র ফুটে ওঠে বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবতে–
“ব্রাহ্মণ হইয়া মদ্য গোমাংস ভক্ষণ,
ডাকা চুরি গৃহদাহ করে অনুক্ষণ।” – চৈতন্যভাগবত
উচ্চবর্ণের এই নৈতিক অবক্ষয় এবং নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর অবিরাম সামাজিক নিপীড়ন হিন্দু সমাজকাঠামোকে ভেতরে ভেতরে শিথিল করেছিল। ১৮৭২ সালে সেন্সাস রিপোর্টে বিভার্লি সাহেব উল্লেখ করেছিলেন, বাংলায় হিন্দুধর্ম সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ফলে শোষিত ও অনগ্রসর মানুষের একটা বড় অংশ সামাজিক মুক্তির আশায় ইসলামের আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল।
তবে এই সামাজিক সংকটের মুহূর্তে বাংলায় এক অভূতপূর্ব সমন্বয়ী ধারার জন্ম দেয় সহজিয়া ও বৈষ্ণব আন্দোলন। অতীতের শ্রীচৈতন্যদেব প্রবর্তিত ধারাকে বৈষ্ণবরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। জাতপাতের ওপরে উঠে নামসংকীর্তন ও লোকায়ত সাধনা হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়কেই এক ভালোবাসার সূত্রে বাঁধে।
এই সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির প্রবাহ বাংলায় এমন এক লোকজ ঐতিহ্য গড়ে তোলে, যেখানে বাহ্যিক ধর্মীয় বিভেদ মুছে গিয়ে মানবধর্মই প্রধান হয়ে উঠেছিল। বৈষ্ণব ও সুফি ভাবধারার এই মিলনপ্রয়াসই বাংলার লোকসংস্কৃতিকে দিয়েছিল এক অনন্য রূপ।
ভারতবর্ষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সমন্বয়। সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগ থেকেই ভারতের পশ্চিম উপকূলে বাণিজ্যের সূত্রে আরবি ও পারসী বণিকদের আগমন শুরু হয়। তাঁরা ওই অঞ্চলের নারীদের বিবাহ করে স্থায়ীভাবে বসবাস গড়েন। তৎকালীন স্থানীয় শাসকেরা তাঁদের সানন্দে ভূমি দান করেছিলেন। এরই সঙ্গে মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করেন।

সম্প্রীতির ধারা বাংলার শিল্প ও স্থাপত্যেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। মধ্যযুগে বাংলায় যে ইসলামী স্থাপত্যগুলো নির্মিত হয়েছিল, সেগুলির প্রধান রূপকার ছিলেন অনেক স্থানীয় বাঙালি কারিগরেরা। বীরভূমের সীমানা সংলগ্ন রাঢ় বাংলার বর্ধমানে নির্মিত মসজিদগুলোতে এই সমন্বয় স্পষ্ট। সেখানে বাংলার ঐতিহ্যবাহী চালা ঘরের গড়ন আর টেরাকোটা শিল্পের সঙ্গে ইসলামী গম্বুজ ও খিলানের অপূর্ব মিলন ঘটেছে। বর্ধমানে ‘নবাব বাড়ি’ কমপ্লেক্সে মসজিদ স্থাপত্যটি এমনই এক নিদর্শন।
মুঘল যুগে বর্ধমান ছিল এক অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। রাজা মানসিংহ যখন বাংলার সুবাদার, তখন বর্ধমানে বাস করতেন বেগম নূরজাহান। এখানেই সেনাপতি কুতুবউদ্দিন খাঁ ও নূরজাহানের প্রথম স্বামী শের আফগানের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বে দুজনেরই মৃত্যু হয়। আজও বর্ধমানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁদের সমাধি।
প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল জৈন ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল; ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর ‘বর্ধমান’ মহাবীরের নামানুসারেই এই শহরের নামকরণ। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ‘পীর বহরম’ বর্ধমানে আসেন এবং হিন্দু সাধু জয়পালের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব হয়। আজও পীর বহরমের কবর হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই পরম শ্রদ্ধার প্রতীক। এই বৈচিত্র্যময় রূপই বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের মূল চিত্র।

১৭০৭ সালে বাদশাহ আওরঙ্গজেব মৃত্যু হয়েছিল। ইংরেজরা এই সময়ে ধীরে ধীরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। দুর্গ গড়তে হবে ফলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। সম্রাট হলেন আজিম-উস-সানের ছেলে ফারুখশিয়ার। সম্রাট ইংরেজ কোম্পানির প্রতি একটু দুর্বল ছিলেন। ইংরেজরাও সম্রাটকে খুশি করতে দিল্লীতে লোক পাঠিয়ে প্রচুর উপঢৌকন দিতেন। তার জন্যে কোম্পানি নামমাত্র করে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় বাণিজ্যের ফরমান পেল। এর মধ্যে ফারুখশিয়ার অসুস্থ হলেন। সম্রাটকে কোন হাকিম সারিয়ে তুলতে পারলেন না। অবশেষে ইংরেজ কোম্পানির চিকিৎসক উইলিয়াম হ্যামিলটন সারিয়ে তুললেন। কলকাতার সেন্ট জনস গির্জায় হ্যামিলটনকে সমাধি দেওয়া হয়। জব চার্নকের সমাধির সঙ্গে আজও তাঁর ফলকটি পাওয়া যায়। তখন দিল্লিতে ফারুখশিয়ারের আমল, এমন এক সময় আফগান বিদ্রোহী রহিম খান বাংলা আক্রমণ করে বসে। তিনি চেতোয়া-বরদার জমিদার শোভা সিংয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দুই দলের বাহিনীকে নিয়ে বর্ধমান পর্যন্ত চলে আসে। সেনাদের আক্রমণের ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচারের একাধিক ভয়াবহ নজির ঘটে। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফলে বাংলার সাধারণ মানুষের ধন-সম্পদ লুট হয়।

বর্ধমানের এই স্থানীয় বিদ্রোহ দমনে সহায়তা করেন মুঘল সম্রাট। আজিম-উস-সানের সেনাপতি ও বীর যোদ্ধা খাজা সৈয়দ আনোয়ার আর খাজা সৈয়দ আবুল কাশেম মিলে আফগান বিদ্রোহীদের আক্রমণ করেন। খাজা সৈয়দ আনোয়ার ও তাঁর ভাই সৈয়দ আবুল কাশেম মিলে সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করেন। তবে ধূর্ত রহিম খানের চক্রান্তে দুই ভাই নিহত হন। দিল্লীতে সেই সংবাদ পৌঁছাবার পর সেই সময়ের সম্রাট ফারুখশিয়ার একটি সুবিশাল স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দেন। সৌধের সঙ্গে খাজা আনোয়ারের পরিবারের জন্যে পাঁচটি গ্রাম দেওয়া হয়। সম্রাট একটি পুকুর খনন করে দেন। পরিবারের জন্য বাড়ি, তিন গম্বুজ মসজিদ, হাওয়া মহল ও ইন্দো সিরিয়ার সঙ্গে বাংলা রীতির এক স্থাপত্য নির্মাণ হয়। জায়গাটি আজও কালের সাক্ষ্য বহন করছে। এখন সকলে বর্ধমানে জায়গাটিকে খাজা নবাব বেড় মকবেড়া বা নবাব বাড়ি নামেই ডাকেন। বেড় অর্থ এক গোলাকার পরিধি বা ঘের। সম্ভবত এই কারণে জায়গাটি নবাব বেড় বলে পরিচিত। গোলাকার এক জলাশয়ের মাঝে নবাবদের ব্যবহারের জন্য চাঁদনি বা সমতল ছাদ যুক্ত অপূর্ব ‘জলটুঙ্গি’ ভগ্ন অবস্থায় এখানে রয়েছে। চাঁদনি বাংলা মন্দির নির্মাণ রীতির এক বৈশিষ্ট। জলটুঙ্গিটি বছরের অধিকাংশ সময় আগাছায় ভরা থাকে।

বর্ধমান রাজারা খাজা আনোয়ারের বংশধরদের প্রতিবছর এককালীন অর্থ সাহায্য করতেন। আজও এখানে তাঁদের কিছু বংশধর বাস করে। দুপাশে দুটি বাংলার দোচালা স্থাপত্য নিয়ে খাজা আনোয়ারের সমাধিটি এককথায় অভিনব। মাথায় বিশাল গম্বুজ। চার কোণে চারটি মিনার। এমন স্থাপত্য বাংলাতে আর একটিও নেই। হাওড়া, হুগলী, বর্ধমান, বাঁকুড়া জেলায় বিভিন্ন মন্দিরে দোচালা রীতি দেখা যায়। ঐতিহাসিক নিদর্শনটিতে আঞ্চলিক শিল্পরীতির সঙ্গে ইসলামিক ঐতিহ্য মিশেছে। স্থাপত্যের মধ্যে সংস্কৃতির আদান-প্রদান শুধু নির্মাণকৌশল নয়, বরং বাংলায় সমন্বয়বাদী ঐতিহ্যের উজ্জ্বল নিদর্শন।
তথ্যসূত্রঃ বিনয় ঘোষ, বাংলার নবজাগৃতি
প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
David J. Mccutchion, Late Mediaeval Temples of Bengal
এককড়ি চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান জেলার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি

