… পায়ে পড়ি তোমার, একটা গল্প লেখো তুমি শরৎবাবু, নিতান্তই সাধারণ মেয়ের গল্প–/ যে দুর্ভাগিনীকে দূরের থেকে পাল্লা দিতে হয়/ অন্তত পাঁচ-সাতজন অসামান্যার সঙ্গে–
… তাকে নাম দিয়ো মালতী।
… এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে,/ তারা সবাই সামান্য মেয়ে।/ তারা ফরাসি জার্মান জানে না,/ কাঁদতে জানে।
পুনশ্চ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের এই স্বীকারোক্তি বলে দেয়, যে ‘সাধারণ’ মেয়ের গল্প তিনি লিখতে পারেননি, সেই ইচ্ছে পূরণের আর্জি তিনি জানিয়েছিলেন শরৎচন্দ্রের কাছে। কারণ শরত-এর নারীরা অধিকাংশই শিক্ষায় সংস্কৃতিতে আলোকপ্রাপ্তা না হলেও অন্তরের মাধুর্যে আলোকিতা। অর্জিত শিক্ষার, মার্জিত রুচির ধার করা আলো তাদের অনেকেরই নেই, কিন্তু তারা আপন অন্তরমহলের আলোতেই আলোকিতা। শরতের প্রকৃতির মতো। শরতের পেঁজা তুলো মেঘের ফাঁক দিয়ে আকাশের আলো যেমন শিশিরে এসে পড়ে, তাদের আলোর প্রতিফলনও তেমনই। ধার করা আলোর উজ্জ্বলতা তাদের থাকে না। শরত আকাশের মতোই সে আলোতে উজ্জ্বলতার চেয়েও সোনা রোদের কোমলতাই বেশি। সে কোমলতা মায়ার, মায়ের।
তবে শরৎচন্দ্রের নারীদের মাতৃত্ব কেবল আপন নারীর জন্মডোরেই আটকে নেই। বরং তা অনেক বেশি করে অন্যের সন্তানের ‘মা’ হয়ে ওঠার কাহিনি। তার অজস্র উদাহরণ রয়েছে ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘রামের সুমতি’, ‘মেজদিদি’, ‘বড়দিদি’ ইত্যাদি সৃষ্টির মধ্যে। খুব ছেলেবেলায় সিনেমার পর্দায় দেখে যে মায়েদের ছবিগুলো মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। তারপর কতজনের মধ্যে ওই জননীরূপ সন্ধান করতাম।পরিণত বয়সে এসে অনুভূতি হল, মাতৃত্ব কেবল সন্তান জন্ম দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। সব মেয়েদের মধ্যে মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকে ‘ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম’ ঠিক তেমনই। শরৎচন্দ্রের নারীরা সে যুগে তা প্রমাণ করে দিয়েছেন।
যদিও আজকের এই সময় দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো ‘ব্যাকডেটেড’ লাগতেই পারে। কিন্তু কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না, একটা নিষ্পাপ শিশুর হাসি কিংবা তার কোমল শরীরের ছোঁয়াটুকু আমাদের সুখানুভূতি দেয় না। কিংবা সমুদ্রের তটের উপর সিরিয়ার যুদ্ধের বলি আয়লান কুর্দির লাল সোয়েটার পরা নিথর শরীরটা শরত-এর নারীরা আলোকপ্রাপ্তা নয়, আলোকিতা
মধুছন্দা চক্রবর্তী নিবন্ধ
… পায়ে পড়ি তোমার, একটা গল্প লেখো তুমি শরৎবাবু, নিতান্তই সাধারণ মেয়ের গল্প–/ যে দুর্ভাগিনীকে দূরের থেকে পাল্লা দিতে হয়/ অন্তত পাঁচ-সাতজন অসামান্যার সঙ্গে–
… তাকে নাম দিয়ো মালতী।
… এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে,/ তারা সবাই সামান্য মেয়ে।/ তারা ফরাসি জার্মান জানে না,/ কাঁদতে জানে।
পুনশ্চ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের এই স্বীকারোক্তি বলে দেয়, যে ‘সাধারণ’ মেয়ের গল্প তিনি লিখতে পারেননি, সেই ইচ্ছে পূরণের আর্জি তিনি জানিয়েছিলেন শরৎচন্দ্রের কাছে। কারণ শরত-এর নারীরা অধিকাংশই শিক্ষায় সংস্কৃতিতে আলোকপ্রাপ্তা না হলেও অন্তরের মাধুর্যে আলোকিতা। অর্জিত শিক্ষার, মার্জিত রুচির ধার করা আলো তাদের অনেকেরই নেই, কিন্তু তারা আপন অন্তরমহলের আলোতেই আলোকিতা। শরতের প্রকৃতির মতো। শরতের পেঁজা তুলো মেঘের ফাঁক দিয়ে আকাশের আলো যেমন শিশিরে এসে পড়ে, তাদের আলোর প্রতিফলনও তেমনই। ধার করা আলোর উজ্জ্বলতা তাদের থাকে না। শরত আকাশের মতোই সে আলোতে উজ্জ্বলতার চেয়েও সোনা রোদের কোমলতাই বেশি। সে কোমলতা মায়ার, মায়ের।
তবে শরৎচন্দ্রের নারীদের মাতৃত্ব কেবল আপন নারীর জন্মডোরেই আটকে নেই। বরং তা অনেক বেশি করে অন্যের সন্তানের ‘মা’ হয়ে ওঠার কাহিনি। তার অজস্র উদাহরণ রয়েছে ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘রামের সুমতি’, ‘মেজদিদি’, ‘বড়দিদি’ ইত্যাদি সৃষ্টির মধ্যে। খুব ছেলেবেলায় সিনেমার পর্দায় দেখে যে মায়েদের ছবিগুলো মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। তারপর কতজনের মধ্যে ওই জননীরূপ সন্ধান করতাম।পরিণত বয়সে এসে অনুভূতি হল, মাতৃত্ব কেবল সন্তান জন্ম দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। সব মেয়েদের মধ্যে মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকে ‘ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম’ ঠিক তেমনই। শরৎচন্দ্রের নারীরা সে যুগে তা প্রমাণ করে দিয়েছেন।
যদিও আজকের এই সময় দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো ‘ব্যাকডেটেড’ লাগতেই পারে। কিন্তু কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না, একটা নিষ্পাপ শিশুর হাসি কিংবা তার কোমল শরীরের ছোঁয়াটুকু আমাদের সুখানুভূতি দেয় না। কিংবা সমুদ্রের তটের উপর সিরিয়ার যুদ্ধের বলি আয়লান কুর্দির লাল সোয়েটার পরা নিথর শরীরটা কি আমাদের মনকে ব্যথিত করে না। শরৎচন্দ্রের নারীরা সেই অবচেতন মাতৃত্বের বীজাধার।
অনেকেই বলবেন শরৎচন্দ্রের মেয়েরা বড় বেশি ‘ক্রন্দসী’। ওই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যারা ‘কাঁদতে শুধু জানে, জানে এলিয়ে পড়তে পায়ে।’ আর শরৎচন্দ্রের নিজের রূপচিত্রণে এরা সেইসব নারী যারা ‘সংসারে শুধু দিলে, পেলে না কিছুই।’ এমন মেয়েরাও এই যুগের সঙ্গে খাপ খায় না। জেন জি তো নয়ই, জেনারেশন ওয়াই কিংবা এক্স -এর কারো মধ্যে এমন নারীত্বের সন্ধান পেলে তাকে শরৎচন্দ্রের যুগের নারী হিসেবে কটাক্ষ শুনতে হয়। শরৎচন্দ্রের নারীদের একটা যে আলাদা নির্মিতি হয়েছিল ‘সাধারণ’ মেয়ের তকমায়, তারা রবীন্দ্রনাথের ‘সাধারণ মেয়ে’ মালতীর মতো নয়। যারা কবির কলমের গুণে বিএ এমএ পাশ করে ফরাসী জার্মান জানা মেয়েদের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিতে পারে না। আসলে শরৎচন্দ্রের সাধারণ মেয়েদের অসাধারণত্বকে মাপা বড় কঠিন। তারা জ্ঞানের প্রদীপ হাতে আলো বিতরণ করতে না পারলেও জোনাকির মতো আলো ছড়ায়। তাদের আলো জ্বালাও আলো, আপন আলো। তাই শরত -এর নারীরা ক্রন্দসী হলেও মহিয়সী।
সংসারের নিপীড়িত অবলা মেয়েরা শরৎচন্দ্রের কাছ থেকে প্রতিভাদের ভাষা হয়তো পায়নি, কিন্তু মিতভাষী হওয়ার মতো মনের জোর পেয়েছে। আঘাত অপমানকে যে নীরবে উপেক্ষা করা যায়, শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রগুলি সেই সাহসকে তাদের ডানায় বহন করে। জীবনের কাছে হার তাদের ফুরিয়ে দিতে পারেনি।
শরৎচন্দ্রের বহু কাহিনিতে নারী পুরুষের সম্পর্কের রসায়ন জারিত হয়েছি নারীর প্রতি পুরুষের একতরফা বিশ্বাসটা নির্ভরশীলতার বুনোটে। তা সে শ্রীকান্তর মতো বোহেমিয়ান পুরুষই হোক বা দেবদাস এর মত একনিষ্ঠ প্রেমিকই হোক, নারীই হয়ে উঠেছে তাদের শেষ আশ্রয়। আবার শেষ প্রশ্নের যে অক্ষয় কমলকে আঘাতে অপমানে জর্জরিত করে উপন্যাসের শেষে তার সমস্ত মন প্রাণ আশ্রয় চেয়েছে সেই অসম্মানিত নারীটির কাছেই।
শুভদা, বিরাজ, ষোড়শী, ললিতাদের জীবনে পুরুষেরা ফিরে এসেছে কিন্তু সেই ফেরার পথে অনেক দহনের পোড়া দাগ, ভাঙনের কাটাচিহ্ন। যা মিলিয়ে যায়নি তাদের জীবন থেকে। বরং তা অলংকারচিহ্ন হয়ে উঠেছে।
শরত – এর নারীরা ভালোবাসার উঠোনে পিঁড়ি পেতে রাখলেও পুরুষেরা ক্ষণিকের জন্য সেই পিঁড়িতে বসে উঠে চলে গিয়েছে। তারপর নারীরা সেই পিঁড়িতে স্মৃতির আলপনা দিয়েছে। চোখের জলে ধুয়েছে, মুছেছে। কিন্তু সেই পিঁড়ি আর ছাদনাতলা পর্যন্ত পৌঁছয়নি। কিন্তু সেজন্য কখনো মনস্তাপের হাহুতাশ করতে দেখা যায়নি শরত-এর নারীদের।
জীবনে ঘর পায়নি যারা সেই সব নারীরা– অরক্ষণীয়া’র জ্ঞানদা থেকে পথের দাবী’র সুমিত্রা — এদের মতো অনেকেই পুরুষের জীবনে থেকে গিয়েছে ‘ইউ আর নট রিফিউসড বাট নট রিসিভড’ হয়ে। পুরুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত না হয়েও যারা পুরুষের কাছে অ-গৃহীত থাকে তেমন অনেক নারীকে পাওয়া যায় শরৎচন্দ্রের সৃষ্টিতে। তবে সেই সব নারীর প্রতি অনুকম্পা জাগে না বরং সেই সব পুরুষের প্রতি একটা বিরূপতার বোধ জন্ম নেয়। সত্যি বলতে কি, এইভাবে শরৎচন্দ্রের হাত ধরেই তৎকালীন সাহিত্যে আজকের তথাকথিত নারীবাদের জন্ম হয়েছিল। এক পুরুষের কলমে নারীর যন্ত্রণার কথা শরৎচন্দ্রের মতো আর কে-ই বা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন সেই সময়।
শরত-এর নারীরা কেবল অধোবদন হয়ে সংসারে তেল-কালী মাখা হেঁসেলের মধ্যে অশ্রুবাষ্পাকুল হয়ে থাকেনি। কখনো কখনো সে প্রশ্ন করেছে মাথা তুলে চোখে চোখ রেখে। যেমন শ্রীকান্ত উপন্যাসে অভয়া স্ত্রীকে ভুলে যাওয়া স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে সমুদ্র পেরিয়ে বর্মায় পৌঁছে প্রশ্ন করেন, ‘’স্বামী যখন সুদ্ধমাত্র একগাছা বেতের জোরে স্ত্রীর সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে অন্ধকারাত্রে একাকী ঘরের বার করে দেন, তারপরেও বিবাহের বৈদিক মন্ত্রের জোরে স্ত্রীর কর্তব্যের দায়িত্ব বজায় থাকে কিনা’– এই এই প্রশ্নের স্পষ্টবাদিতা আক্রমণ করে স্বামীটিকে, স্বামীর বার্মিজ স্ত্রীর সঙ্গে সুখের সংসারটিকে কিছুমাত্র আঘাত না করেই। আর এখানেই শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের জোর, পরিমিতিবোধ, আভিজাত্য।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের আরেক বিদ্রোহী নারী চরিত্র ‘শেষ প্রশ্ন’র কমল। যে প্রচলিত সমাজ নিয়ম ধর্মান্ধতা এবং সেকেলে প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার এক স্বাধীনচেতা নারী। যে মনে করে প্রেম এবং সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত নারী পুরুষের পারস্পরিক সম্মান ও স্বাধীনতা। সামাজিক জোড়াতালি দেওয়ার নিয়ম নয়। শরৎচন্দ্র এই ‘শেষ প্রশ্ন’ উপন্যাসের মাধ্যমে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের ভিত্তিমূলে এক তীব্র নাড়া দিয়েছেন|। প্রশ্ন তুলেছেন, নারী কি কেবল পুরুষের অধীনে থাকার জন্যই তৈরি? নাকি তার নিজস্ব সত্তা ও মত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার আছে?
শুধু সাহিত্য সৃজনেই নয়,শরৎচন্দ্রের ব্যক্তি জীবনেও নারীর মূল্যায়ন কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে, তার প্রামাণ্য দলিল হয়ে রয়েছে চার পর্বে বিভক্ত তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস শ্রীকান্ত। চার পর্বে চার নারী। যার প্রথম পর্বের নারী অন্নদা দিদি। যে স্নেহের আঁচল বিছিয়ে দিয়ে মাতৃস্নেহের খামতি ঢেকে দিয়েছে। বিজাতীয় স্বামীর সমস্ত অত্যাচার মুখ বুজে সয়ে।
দ্বিতীয় পর্বে যৌবনে পা রাখা শ্রীকান্তর বর্মার জীবনে দেখা নারী অভয়া। যে সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করাতে শিখিয়েছিল শ্রীকান্তকে।
তৃতীয় পর্বের শ্রীকান্তর বৈরাগ্য জীবনে আধ্যাত্মিক আশ্রয় হয়ে উঠেছিল কমললতা। যেখানে শ্রীকান্ত জীবনে ‘প্রেম পূজা মূর্তি ধরি দেখা দিল দুঃখের আলোকে।’ ভালোবাসা সেখানে রয়ে গেল অনুক্ত হয়ে। চতুর্থ পর্বে বাল্যসখি রাজলক্ষ্মীর দেখা মিলল পতিতা পিয়ারী বাইজি হিসেবে। কিন্তু সেই পিয়ারী বাইজিকে, সেই ঘরের কোণের পতিতাকে শরৎচন্দ্র রচনা করলেন অসামান্যতা দিয়ে। সমাজের অনুশাসনকে তুচ্ছ করে যে পিয়ারি বাইজি তার আর্থিক স্বাবলম্বনে জোরে মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে। সেই উদারতার পাঠ সমাজ কতটা নিতে পেরেছিল জানা
নেই, কিন্তু শরৎচন্দ্র দিতে পেরেছিলেন তাঁর ইমেজ চরিত্র শ্রীকান্ত’র মাধ্যমে।
উত্তরকালে নারীদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ‘অর্ধেক আকাশ’। কিন্তু শরতের নারীরা বহু যুগ আগের থেকে আলো ছড়িয়েছেন পুরো আকাশ জুড়ে। সেই আলো চোখ ধাঁধায় না, চোখ জুড়োয়। সেই আলোতে চলমান পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেওয়া নীড়ের শান্তি থাকে।
৩১ ভাদ্র শরৎচন্দ্রের ১৫০ তম জন্মদিন উপলক্ষে নিবন্ধটি ‘শনিবারের চিঠি’র শ্রদ্ধার্ঘ্য।

