আশি পেরোলেন উস্তাদ আমজাদ আলি খান।
তাঁর দেশ-কাল-পেরনো সরোদটি আজও সেই নবীন প্রাণের আনন্দে বাজে। এই তো সে দিন এ শহরে তারই খোঁজে কলামন্দিরের বাইরের লাইন ডিঙিয়ে গেল রাজপথ।
উস্তাদজি অবশ্য সেই অমায়িক হাসি হেসে বলবেন, না না, ও আসলে ঈশ্বরের খোঁজ। আমিও স্বরের মধ্যেই সেই সন্ধান করে চলেছি। সরোদ তো তাঁর হাতে কেবল বাদ্যযন্ত্র হয়ে থাকে না, পেয়ে যায় নতুন প্রাণ, নতুন কণ্ঠ। ছড়িয়ে যায় বিশ্ব-দর্শনে।
কণ্ঠ বললাম কেন? কারণ আমজাদের সরোদের নিজস্বতা তাঁর গায়কী অঙ্গে। সরোদের জগতে উস্তাদ আমজাদ আলি খানের আবির্ভাব ছিল এক বিপ্লব। তাঁর আগে জোর দেওয়া হত ধ্রুপদাঙ্গের গাম্ভীর্য, দীর্ঘ তান ও বাদনের শক্তিতে। আমজাদ রূপান্তর আনলেন কণ্ঠস্বরের মতো এক কোমল ও সংবেদনশীলতায়। নিয়ে এলেন বিশুদ্ধ ‘গায়কী অঙ্গ’। খেয়াল বা ঠুমরিতে কণ্ঠসঙ্গীতের যে মাধুর্য, সরোদে তা ভারতীয় যন্ত্রসঙ্গীতের দিগন্ত আরও একটু বাড়িয়ে দিল। আমজাদ সেখানেই অবিসংবাদী।

বিশিষ্ট এই সঙ্গীতযাত্রাকে বুঝতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় আড়াইশো বছর আগে। তাঁর রক্তে যে সুর প্রবাহিত, তার শিকড় নিহিত মধ্য এশিয়ার দুর্গম পাহাড় ও আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ‘রবাব’-এর মধ্যে। উস্তাদ আমজাদ আলি খান সেনিয়া বঙ্গাশ ঘরানার ষষ্ঠ প্রজন্ম। অষ্টাদশ শতকে এই পরিবারের পূর্বপুরুষ মহম্মদ হাশমি খান বঙ্গাশ আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসেন। সঙ্গে এল তাঁদের আদি বাদ্যযন্ত্র রুভাব বা রবাব। পরে তাঁর বংশধর গোলাম বান্দেগি খান বঙ্গাশ এবং বিশেষ করে তাঁর পৌত্র উস্তাদ নিয়ামতউল্লাহ খান ও গুলাম আলি খান বঙ্গাশ ভারতীয় সঙ্গীতের সূক্ষ্ম অলঙ্করণ ও ভাবপ্রকাশের তাগিদে রবাবে বদল আনলেন। কাঠের ওপর চামড়া বসিয়ে, তারের সংখ্যা বাড়িয়ে এবং আঙুল চালনার জন্য কাঠের ডাণ্ডিতে ধাতব পাতের আস্তরণ জুড়ে জন্ম হল এক নতুন বাদ্যযন্ত্রের—যার নাম রাখা হয় ‘সরোদ’। ফারসি শব্দ ‘সরূদ’ থেকে এই নামের উৎপত্তি, যার আভিধানিক অর্থ ‘সঙ্গীত’ বা ‘মধুর সুর’।
পরে এই বংশের সুরসাধকেরা গোয়ালিয়র রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষণ পেলেন এবং তাঁদের এই অনন্য ধারা সেনিয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ‘সেনিয়া বঙ্গাশ ঘরানা’ হল।
তানসেনের শিষ্যপরম্পরার ধ্রুপদী ভাবগাম্ভীর্য এবং আফগান রবাবের বলিষ্ঠ ছন্দ—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে যে ঘরানার সৃষ্টি হয়েছিল, তারই রাজপুত্র আমজাদ আলি খান। ১৯৪৫ সালের ৯ অক্টোবর গোয়ালিয়রে জন্ম তাঁর। কিংবদন্তি সরোদিয়া উস্তাদ হাফিজ আলি খানের ছোট ছেলে তিনি। নাম প্রথমে ছিল মাসুম আলি খান। পরে এক সুফি সাধকের আশীর্বাদে নাম বদলে হল ‘আমজাদ’—মহৎ বা সম্মানিত। মাত্র ছবছর বয়সে বাবার সঙ্গে প্রথম মঞ্চে ওঠেন আমজাদ, বারো বছর বয়সে একক। ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সমন্বয় বারবার ঘটেছে আমজাদের স্বরসাধনায়। বেশ কিছু নতুন রাগ সৃষ্টি করেছেন তিনি—প্রিয়দর্শনী (ইন্দিরা গান্ধীকে নিবেদিত), শ্যামশ্রী, শিবঞ্জলি, হাফিজকৌষ, কমলশ্রী।

বিশ্বের প্রায় সব ঐতিহ্যময় কনসার্ট হলে ভারতীয় সরোদ নিয়ে গিয়েছেন তিনি—নিউ ইয়র্কের কার্নেগি হল, লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হল, সিডনি অপেরা হাউস বা প্যারিসের বিখ্যাত সঙ্গীতমঞ্চ। পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের ফিউশন তাঁর বিখ্যাত সরোদ কনসার্টো ‘সমাগম’। ২০১৪ সালে অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান মঞ্চে তিনি ও তাঁর দুই পুত্র পরিবেশন করেছিলেন শান্তির রাগমালা। কৈলাশ সত্যার্থী ও মালালা ইউসুফজাইয়ের উপস্থিতিতে সেই বিশ্বমঞ্চে আমজাদ আলি খানের স্বর সন্ধান করেছিল যুদ্ধহীন, শোষণহীন, এক প্রেমিক পৃথিবীর।

এই সূত্রেই এসে পড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতে আমজাদ আলি খানের আগ্রহের কথা। ১৯৮৯ সালে এইচএমভি-র উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর সরোদ এবং সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক ব্যতিক্রমী দ্বৈত ‘ট্রিবিউট টু টেগোর: ক্রিয়েশনস অ্যান্ড ট্রান্সক্রিয়েশনস’ (Tribute to Tagore: Creations & Transcreations)। গানে সহযোগী হিসেবে ছিলেন রমা মণ্ডল ও সুদেষ্ণা মুখোপাধ্যায়। গানের তালিকায় ছিল ‘আজি এ আনন্দসন্ধ্যা’, ‘ও আমার চাঁদের আলো’, ‘কোন্ খেলা যে খেলব কখন’, ‘ফিরে ফিরে ডাক দেখি রে, ‘আর নাই রে বেলা’, ‘ওগো শোনো কে বাজায়’ এবং ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’। শেষের গানটি একক সরোদেও বহু বার বহু অনুষ্ঠানে বাজিয়েছেন উস্তাদজি। সাধারণত রবীন্দ্রসংগীতে বাদ্যযন্ত্র কেবল কণ্ঠের অনুগামী হয়। কিন্তু ওই ঐতিহাসিক অ্যালবামে তৈরি হয়েছিল এক সংলাপ, সরোদে আর কণ্ঠে। যেন এক শিল্পী তাঁর গায়নে যে আকুলতা প্রকাশ করছেন আর এক শিল্পী তাঁর বাদনে তারই নীরব ভাষা প্রকাশ করছেন।

কলমে তাঁর আর এক ভাষা, তাঁর সংগীতস্মৃতি নিয়ে। বিংশ শতাব্দীর বারো জন প্রবাদপ্রতিমকে নিয়ে তিনি লিখেছেন মাস্টার অন মাস্টার্স। সে বইয়ে আছেন বড়ে গুলাম আলি খান, আমির খান, বেগম আখতার, আল্লারাখা, কেশরবাঈ কেরকর, কুমার গন্ধর্ব, এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মী, ভীমসেন জোশী, বিসমিল্লাহ খান, রবিশঙ্কর, বিলায়েত খান এবং কিষণ মহারাজ। রসবোধ আর আন্তরিকতায় সে-ও এক আশ্চর্য তর্পণ।
স্বরকেই ঈশ্বর মানেন আমজাদ। হয়তো তাই তাঁর সরোদের স্বর-লিপি এত উজ্জ্বল এই আশিতেও।

