গ্রামবাংলার বুকে অসংখ্য ঐশ্বর্য, মণিমুক্তো সমতুল্য প্রাচীন জমিদার বাড়ি, দীঘি, ঠাকুরদালান, মন্দিরস্থাপত্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নজরের আড়ালে রয়ে গিয়েছে।
পাণ্ডুয়া ব্লকের অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক স্থান বৈঁচিগ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে খড়ি নদী। শেষে ধাত্রীগ্রামের কাছে গঙ্গা নদীতে মিলিত হয়েছে। অনেকে এই নদীকে কানা নদী বলেন। যা দামোদরের একটি ক্ষীণ শাখা। কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ বলেছিলেন, যার প্রবাহ ‘গঙ্গার জলে মিলিয়া’ গেল। বাংলার লোকজীবনে, লোক সাহিত্য, উৎসবে এই নদীর কথা উঠে আসে। আজও নদীপথে চলাচল করে নৌকা। অতীতে এই প্রবাহ পথে চলত সওদাগরদের বাণিজ্যযাত্রা।

গ্রামে ব্রাহ্মণপাড়া, সাঁওতাল পাড়া, গোলন্দাজ পাড়া, বেনে পাড়া ইত্যাদি সব বহু পুরনো জায়গা রয়েছে। বৈঁচিগ্রামের অন্যতম এক ঐতিহাসিক বণিক পরিবার দাঁ বাড়ি। তাদের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর জন্য বিশেষ পরিচিত।
দিল্লির মসনদে তখন ক্ষমতার পালাবদল, সুরি বংশ। ষোড়শ শতকে ঠিক এরকমই এক কাছাকাছি সময়ে রচিত হচ্ছে একের পর এক আখ্যান, যেখানে দেবদেবীর মাহাত্ম্যের পাশাপাশি ধরা পড়ছে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, বিশ্বাস, জীবনযাপন ও সমাজের নানা অনুষঙ্গ। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর সৃষ্টি চণ্ডীমঙ্গল তেমনই এক কাব্য। যার পাতায় পাতায় জড়িয়ে রয়েছে ধনপতি সওদাগর ও তাঁর পুত্র শ্রীমন্তের কাহিনি। এই আখ্যান বাংলার লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির নানা ধারাতেও রেখে গিয়েছে তার ছাপ।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ড. দীনেশচন্দ্র সেন মঙ্গলকাব্যের কবিদের সংখ্যা সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন, তাতে বহু কবির রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের রচনাকাল নির্ধারণ নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবু এ কথা অনস্বীকার্য, মঙ্গলকাব্যের আখ্যানের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক ইতিহাসের বহু উপাদান আজও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। কল্পনার আবরণে ঢাকা সেইসব কাহিনির মধ্যে মিশে থাকে বাস্তব জীবনের স্মৃতি, জনশ্রুতি ও মানুষের চিরন্তন অনুভব। সেই সাহিত্যর ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের সূত্র ধরেই যেন এক আশ্চর্য যোগসূত্র তৈরি হয়েছে হুগলির বৈঁচিগ্রামের দাঁ পরিবারের দুর্গাপুজোকে ঘিরে।
বাংলার দুর্গাপ্রতিমার পরিচিত রূপের পাশে এই প্রতিমা যেন এক স্বতন্ত্র ব্যতিক্রম। এখানে দেবী দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি দ্বিভুজা, অভয়া। কমলাসনে বসে আছেন। একচালা প্রতিমায় তাঁর সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। কিন্তু সকলের চোখ আটকে যায় দেবীর হাত ধরে থাকা এক বালকের দিকে। এই বালকই আসলে শ্রীমন্ত সওদাগর। দেবীর এই রূপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক জনশ্রুতি – যে কাহিনির সূত্রে তিনি পরিচিত ‘ছেলেধরা দুর্গা’ নামে। গ্রামের মানুষেরা দেবীকে এই নামে ডাকেন।

দাঁ পরিবার গন্ধবণিক সম্প্রদায়ভুক্ত। পরিবারের প্রচলিত দাবি, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে ধনপতি সওদাগরের বংশধারার যোগ রয়েছে। শ্রীমন্ত একসময় হারিয়ে গিয়েছিলেন। জনশ্রুতি অনুসারে, দেবী তাঁকে উদ্ধার করেন। বৈঁচিগ্রামের প্রতিমায় দেবী প্রাণের সন্ধানদাত্রী, যিনি রক্ষাকর্ত্রী।
তবে এই প্রতিমার রূপ নিয়ে আরও একটি লোককথা প্রচলিত। কথিত আছে, দাঁ পরিবারের বহু আগে এক সন্তান হারিয়ে গিয়েছিল। দেবীর কৃপায় সেই সন্তান ফিরে আসে। সেই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতেই নাকি দুর্গার এমন মূর্তির প্রচলন। বৈঁচিগ্রামের এই দুর্গাপুজো তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের এক আশ্চর্য মিলনক্ষেত্র। মঙ্গলকাব্যের কথা এখানে যেন মাটির প্রতিমায় প্রাণ পেয়েছে।
ইতিহাসের দলিল হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, কিন্তু লোকগাথা বাঁচিয়ে রাখে মানুষের বিশ্বাসের ইতিহাস। বৈঁচিগ্রামের ‘ছেলে ধরা দুর্গা’ সেই ইতিহাসেরই এক অনন্য সাক্ষী।
তথ্যসূত্র:
শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য
ড. দীনেশচন্দ্র সেন
বৈঁচিগ্রামের দাঁ পরিবার

