অষ্টমীর ভিড় আর ট্রাফিক সামলিয়ে দক্ষতার সঙ্গে আমার সফরসঙ্গী সোমক গাড়ি চালিয়ে চলল পূর্ব বর্ধমান জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। উদ্দেশ্য সেখানকার ২৮৫ বছরের দূর্গাপুজো দেখা আর শহর কলকাতার কোলাহল থেকে মুক্তি নিয়ে শ্যাম বাংলার প্রকৃতির মধ্যে ঢাকের শব্দ শোনা। ডানকুনি ছাড়িয়ে দিল্লি রোড ধরে বেশ দ্রুততার সঙ্গে গাড়ি এগিয়ে চলল গন্তব্যর উদ্দেশে। আড়চোখে লক্ষ করলাম ঝাঁ চকচকে দিল্লি রোডে পড়তেই চালক অ্যক্সিলেটরে চাপ দিয়ে আমাদের চলা আরও দ্রুততর করে দিল। কিলোমিটারের কাঁটা কখনও ১২০ আবার কখনও ১২৫ ছুঁয়ে ফেলছে! ঘন্টা দুই পরে ২৯ নম্বর জাতীয় সড়ক অর্থাৎ দিল্লি রোড থেকে গাড়ি বাঁক নিল ডাইনে যেদিকে চলে গেছে মন্তেশ্বর। পুলিশের অনুগ্রহে নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত রাস্তার পরিবর্তে কালনা, কাটোয়ার অপরিচিত আর অপরিসর রাস্তার মধ্যে দিয়ে অবশেষে পৌঁছলাম, ‘চান্ডুলি’ গ্রামে। বড় রাস্তার মোড়ে গৃহস্বামী উৎপল মিত্র আমাদের আপ্যায়ন করে নিয়ে গেলেন বাকি পথটা। ক্লান্তিকর যাত্রার শেষে মিত্র পরিবারের ঠাকুরদালানে গিয়ে দেবী দর্শন করে মন খানিকটা শান্ত হল।

এখানে দেবী দ্বিভুজা। মনের অজান্তেই কবির একটা গানের সুর গুনগুনিয়ে উঠল, ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে’। এরকম একে একে বলব প্রতিমার ইতিহাস, মিত্রবাড়ির ইতিহাস যা পাঠকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হবে বলেই আশা রাখি। আনুমানিক ১৭৪০ সালে ত্রিপুরার রাজা লক্ষণ মানিক্যর মৃত্যুর পরে অনেক বছর যাবৎ ত্রিপুর রাজ্য রাজাবিহীন ছিল। ১৭৬০ সালে মানে দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে কৃষ্ণ মানিক্য রাজা হবার আগে রাজ্যের অশান্ত সময় ত্রিপুরার বহু প্রভাবশালী ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা দেশের অন্যান্য প্রদেশে চলে যান। ত্রিপুর রাজ্যের প্রধান নায়েব হটুবল্লভ মিত্র ছিলেন তাদের অন্যতম। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং বিদ্বান হটুবল্লভ ছিলেন হিসাবশাস্ত্র ও গণিত বিশেষজ্ঞ। তাঁর দূরদৃষ্টি এবং বাণিজ্যবুদ্ধি ত্রিপুররাজ্যকে একটি সম্পদশালী রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলেছিল। হটুবল্লভ মিত্র প্রভূত সম্পদসহ বাস করতে শুরু করলেন দক্ষিণবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া সংলগ্ন চান্ডুলি গ্রামে। এই অঞ্চলে ছিল বহু তাঁতির বাস। বিচক্ষণ হটুবল্লভ মিত্র চান্ডুলি গ্রামেই কাপড়ের ব্যবসার পত্তন করলেন। কথিত আছে কাটোয়ার সন্নিকটে পাওয়া যেত বলে সেই ধুতি প্রথমে, ‘কেটে ধুতি’ এবং পরে, ‘খেঁটে ধুতি’ নামে প্রসিদ্ধিলাভ করে। এইসব কারণেই হটুবল্লভ ও তাঁর সমগ্র মিত্র পরিবারের সদস্যরা পরিচিত হন, ‘কাপড়ের মিত্তির’ নামে। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি এই গ্রামেই জমিদারি এবং কাছারী পত্তন করলেন।

সেই সময় দিল্লিতে আলমগীর ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয়েছে আর সেই একই সময় বাংলার মসনদে রয়েছেন সিরাজের দাদু আলীবর্দি খাঁ। ঠিক ওই সময়ই বর্গী এল দেশে। রঘুজী ভোসলের দুর্ধষ সেনাপতি ভাস্কর কোলাহটকরের নেতৃত্বে মারাঠা সেনারা সারা বাংলা জুড়ে লুটতরাজ হত্যালীলা চলতে থাকল। এই অত্যাচারের হাত থেকে বাদ গেল না মুর্শিদাবাদও। ভাস্কর পণ্ডিত ৭০০ ঘোড়সওয়ার নিয়ে মুর্শিদাবাদে আক্রমণ চালালো। সেখানকার ধনকুবের জগৎ শেঠের কাছ থেকে ৩ লক্ষ টাকা বলপূর্বক আদায় করে মারাঠা বাহিনী কাটোয়ার দিকে অগ্রসর হল। এদিকে নবাব আলীবর্দি খাঁ সেই সময় কটকের থেকে হুগলী জেলার আরামবাগ অঞ্চলে মোবারক মঞ্জিলে পৌঁছে মারাঠা সেনাদের আক্রমণের সংবাদ পেলেন। তখন আলীবর্দি খাঁ কাটোয়া ছেড়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা দিলেন। দু পক্ষই তাদের সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করতে লাগল। সুজাউদ্দিনের জামাতা মির হাবিব ছিলেন আলীবর্দির অন্যতম শত্রু। মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরে মারাঠা সৈন্যরা কাটোয়ায় তাদের ঘাঁটি গড়ে তুললো। মির হাবিব কার্যত এই সৈন্যদলের উপদেষ্টা ছিলেন। হুগলি জেলা এবং ওই অঞ্চলের বন্দর মারাঠাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হল। মারাঠাদের অন্যতম সেনাপতি শেষ রাও নতুন এলাকায় সৈন্যদলের দায়িত্ব নিলেন। সেই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ভাস্কর পণ্ডিত বিজয়ের উৎসব হিসেবে আড়ম্বর সহকারে দুর্গাপুজো করার সিদ্ধান্ত নিলেন। লুটতরাজের অর্থ ও ধনরত্ন ব্যয় করে জমকালো আয়োজন করা হল। নবমীর ভোর রাতে আলীবর্দি খাঁ তাঁর বাহিনী নিয়ে মারাঠা বর্গীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অতর্কিত সেই আক্রমণের জন্য বর্গীর দল প্রস্তুত ছিল না। নবাবের আক্রমণ প্রতিহত করার কোনও ক্ষমতা সেই মুহূর্তে মারাঠা সেনাদের ছিল না। তাই প্রাণ নিয়ে পলায়ন করাই ছিল তাদের কাছে একমাত্র পথ।

আলীবর্দি দখল করলেন কাটোয়ার অনতিদূরে ব্রহ্মানী নদীর তীরে দাঁইহাট-এর মারাঠা ছাউনি এবং উদ্ধার করলেন ভাস্কর পণ্ডিতদের ফেলে যাওয়া দু হাত বিশিষ্ট দূর্গাভবানীর মূর্তি। ধর্মপ্রাণ আলীবর্দি এই মূর্তি তুলে দিলেন দাঁইহাট সংলগ্ন জমিদার ও প্রথিত বস্ত্র ব্যবসায়ী হটুবল্লভ মিত্রের হাতে। এরপর দূর্গা বিগ্রহের কিছু গঠনগত পরিবর্তন করে হটুবল্লভ তাঁর বাড়িতে সূচনা করলেন দূর্গাপুজো। ত্রিপুরা রাজবাড়ীর বিগ্রহের আদলে গণেশকে করলেন লাল রঙ, কার্তিক এবং লক্ষ্মীর রঙ হল হলুদ, সরস্বতী শ্বেতশুভ্রই থাকলেন আর সিংহর মুখ হল ঘোড়ার আদলে। আলীবর্দির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হটুবল্লভ কার্তিক ঠাকুরের পায়ে ইসলামী নাগরা পরালেন। অবশ্য মূল দূর্গামূর্তির হাত কিন্তু দুটোই রইল। এই রূপের পুজো আজও হয়ে চলেছে চান্ডুলির মিত্তিরদের বাড়িতে। প্রথম দিন ওই বাড়ির পূজোর ইতিহাস এইটুকু শুনে ভুরিভোজ করে তিনশত বছরের অট্টালিকায় রাতের জন্য বিশ্রাম নিতে গেলাম। গভীর রাতে কানে এল শেয়ালদের মিলিত কণ্ঠস্বর। পরদিন সকালে যখন ব্রহ্মানী নদী দেখতে যাচ্ছি তখন কার্তিক মাসের শিশিরে সবুজ প্রকৃতি সিক্ত হয়ে আছে। সেই মুহূর্তে শরতের শীতের পরশ গায়ে এসে লাগছে, তারি মধ্যে নরম রোদের উষ্ণতা গায় মেখে দাঁড়ালাম নদীর ধারে। মনে পড়ে গেল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া, ‘শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি’ গানটির লাইন।

নদীর দুপাশে উঁচু-নীচু জমির কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে ফুটে রয়েছে কাশফুল। নদীর আরেক পাশে তাল গাছের সারি। দৃষ্টি যতদূর প্রসারিত হয়, চোখ আটকে যায় কাশের ঝালর দোলা শরতের শান্ত আকাশে। শরৎ প্রকৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই গ্রামের বিভিন্ন অংশ থেকে কানে আসে ঢাকের শব্দ। মিত্তিরদের বৃহৎ অট্টালিকায় ফিরে এসে পুনরায় প্রতিমাদর্শন। মাথায় ভর করলেন রবীন্দ্রনাথ, মনে পড়ে গেল তাঁরই রচিত একখানি লাইন, ‘আজিকে তোমার মধুর মুরতি হেরিনু শারদপ্রভাতে’। প্রাতঃভ্রমণের পর মিত্তিরবাড়িতে প্রাতঃরাশ, সঙ্গে একরাশ আন্তরিকতা। কিন্তু তখন আমার মনে অনেক প্রশ্ন অনেক জানা বাকি। চারদিনের পুজোর পদ্ধতি, প্রথা, নিয়ম-কানুন জানতে চাই। মিত্তিরবাড়ির অন্দরমহলে ফেলু মিত্তিরের মতো গোয়েন্দাগিরি করে মনের টেপরেকর্ডারে ধরে রাখতে চাই ২৮৫ বছরের পূজোর কথা।
বাড়ির অন্যতম গৃহস্বামী ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমস-এর পদক বিজয়ী সাঁতারু উৎপল মিত্র জানালেন পূজোর প্রতিদিনই বলি দেওয়ার প্রথা রয়েছে কিন্তু দেবী আরাধনার শেষদিন অর্থাৎ নবমীতে মোট পাঁচটি ছাগবলি এবং একটি ভেড়া বলি দেওয়ার রীতি আছে। এখানে মহাঅষ্টমী ও নবমীর দিন কুমারীপূজোর প্রচলন রয়েছে। নবমীর হোম শেষ হলে ঢাকীর দল সারা গ্রামের বাড়িগুলোতে গিয়ে ঢাক বাজিয়ে জানান দেয় যে এবারের মত দুর্গাপুজো শেষ হল। অতীতে পূজোর চারটি দিন ঠাকুরদালানে নাটক এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। বর্তমানে সেসব ইতিহাস, এখন পূজোর দিনগুলোতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোনও আপনজন আর আগত অতিথিদের ভেতরে কেউ দিনের শেষে ঠাকুরদালানের সামনে বসে ঘরোয়া পরিবেশে গান করেন। দশমীর দিন মিত্র পরিবারের ছোট তরফ সহ গ্রামের অন্যান্য পূজোরগুলির প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাবার পরে বড় তরফ অর্থাৎ বাবুদের বাড়ির প্রতিমা নিরঞ্জনের পথে এগোয়। প্রতিমা নিরঞ্জন হয় ব্রহ্মনী নদীতেই।

কলকাতা মহানগরীর থিম পুজোগুলোর অত্যাচারে যখন প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে তখন ইতিহাসের হাতছানি দেওয়া চান্ডুলি গ্রামের মিত্র পরিবারের এই পূজোকে মনে হল মরুপ্রান্তরের এক কোনায় হঠাৎ করে আবিষ্কৃত এক জলাশয়! উষ্ণ আতিথেয়তার উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যখন কলকাতার পথ ধরেছি, তখন চলমান দূরাভাষে বন্দি করে রাখা প্রতিমা ছবি দেখতে গিয়ে আবারও রবীন্দ্রনাথের গানের লাইন মনে পড়ে গেল, ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে ‘।

