asha bhosle and rabindranath thakur

বড়ো আশা করে…রবীন্দ্রসঙ্গীতের আশা

একদা এক সংগীত পরিচালক লতা মঙ্গেশকরের একটি গান শুনে কণ্ঠটি আশা ভোঁসলের বলে ভেবেছিলেন। ছোট্ট ঘটনা। তবু এটাই আশার মধ্যে জাগিয়ে দিল স্বতন্ত্র পরিচয়ের খোঁজ। শুরু হল নিজেকে আবিষ্কারের যাত্রা। 

নিজস্ব গায়কী তৈরির তাগিদে বিদেশি সিনেমা দেখা এবং পাশ্চাত্য সংগীত শোনা শুরু করলেন আশা। আমাদের গানে সাধারণত সোজা ও অকম্পিত স্বরের প্রচল বেশি। আশা পাশ্চাত্যের ‘অপারেটিক’ (operatic) বা মডুলেশন-নির্ভর গায়কীর দিকে গেলেন। 

রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তার কথা মনে পড়বে আমাদের এইখানে। সেই যে তিনি বলেছেন, ‘আজ অনেক রাত্রে নিরালায় একলা দাঁড়িয়ে জাহাজের কাঠরা ধরে’ সমুদ্রের দিকে চেয়ে অন্যমনস্কভাবে গুন্‌ গুন্ করে’ একটা দিশি রাগিণী ধরেছিলুম। তখন দেখতে পেলুম অনেক দিন ইংরাজি গান গেয়ে গেয়ে মনের ভিতরটা যেন শ্রান্ত এবং অতৃপ্ত হ’য়ে ছিল। হঠাৎ এই বাংলা সুরটা পিপাসার জলের মত বোধ হ’ল। সেই সুরটি সমুদ্রের উপর অন্ধকারের মধ্যে যে রকম প্রসারিত হল, এমন আর কোনো সুর কোথাও পাওয়া যায় বলে’ আমার মনে হয় না। আমার কাছে ইংরাজি গানের সঙ্গে আমাদের গানের এই প্রধান প্রভেদ ঠেকে যে, ইংরাজি সঙ্গীত লোকালয়ের সঙ্গীত, আর আমাদের সঙ্গীত প্রকাণ্ড নির্জন প্রকৃতির অনির্দিষ্ট অনির্বচনীয় বিষাদের সঙ্গীত। কানাড়া টোড়ি প্রভৃতি বড় বড় রাগিণীর মধ্যে যে গভীরতা এবং কাতরতা আছে সে যেন কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়—সে যেন অকূল অসীমের প্রান্তবর্তী এই সঙ্গীহীন বিশ্বজগতের।’

গানের শ্রোতার আসমুদ্রহিমাচল লোকালয়কে স্পন্দিত করেছেন আশা ভোঁসলে। তারই সঙ্গে কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডও করেছেন। রবীন্দ্রসংগীতে আশা ভোঁসলের সাফল্যের একটা কারণ তো ছিল তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করার আগেই বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ও নিবিড় সংযোগের ইতিহাস আছে। তাঁর বাংলা গানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৮ সালে এইচএমভি (HMV) লেবেলে, মান্না দে-র সুরে। ১৯৫৯ সাল থেকে নিয়মিত পুজোর গান বা শারদ অর্ঘ্য প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর। 

বাংলার প্রতি তাঁর এই ভালোবাসার শেকড় ছিল তাঁর শৈশবে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস কলকাতা আর বাঙালি সমাজের দিকে তাঁকে প্রথম টানে। ১৯৫২-তে প্রথম বার কলকাতায় এলেন  এবং এই শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হলেন। পরবর্তী দশকগুলোতে সলিল চৌধুরী, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত, শ্যামল মিত্র এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি বাঙালি সুরকারদের সঙ্গে তাঁর কাজ বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষত প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণের (আর. ডি. বর্মণ) সঙ্গে তাঁর জুটি আধুনিক বাংলা গানের পথটাই বদলে দিল। 

রবীন্দ্রসংগীতে আশা ভোঁসলের প্রথম সাড়া-জাগানো প্রকাশ ষাটের দশকের শেষের দিকে। ১৯৬৯ সালে সলিল সেন পরিচালিত ‘মন নিয়ে’ চলচ্চিত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় তিনি প্রথম রবীন্দ্রসংগীত ‘আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি’ রেকর্ড করেন এবং এর কিছুকাল পরেই ১৯৭১ সালে ‘কুহেলী’ ছবিতে তাঁর একক কণ্ঠে ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’ বিপুল খ্যাতি পায়। 

এই গানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দ্বৈত কণ্ঠ ভারতীয় সাঙ্গীতিক প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দেয়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ছিল ব্যারিটোন (Baritone) ধর্মী, অত্যন্ত উদাত্ত, গভীর এবং গাম্ভীর্যে পূর্ণ। অন্যদিকে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ ছিল তীক্ষ্ণ সোপ্রানো (Soprano) রেঞ্জের, যা অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং স্পষ্ট। এই দুই সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কণ্ঠস্বরের বৈপরীত্য গানটিতে এক অভাবনীয় মাধুর্য এবং নাটকীয়তা তৈরি করেছিল। এই গানের মাধ্যমেই প্রথম প্রমাণিত হয় যে, নেপথ্য সংগীতে ব্যবহৃত একজন অবাঙালি শিল্পীর চপল ও তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরকেও যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়, তবে তা রবীন্দ্রসংগীতের নির্দিষ্ট গায়কী এবং ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখেও অসাধারণ এক শিল্পকর্মের জন্ম দিতে পারে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পরিচালনায় আশা ভোঁসলে রবীন্দ্রসংগীতের যে অন্তর্নিহিত মেজাজটি ধরতে পেরেছিলেন, তা তাঁর পরবর্তী রবীন্দ্রসংগীত চর্চার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

হিন্দি ছবিতে আশা ভোঁসলে নিজের ইচ্ছামতো সুরের অলংকরণ বা ‘হরকত’ করতে পারতেন, কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতে সেই স্বাধীনতা ছিল না। এখানে স্বরলিপিই ছিল ধ্রুবসত্য। আশা ভোঁসলেকে তাঁর চেনা গায়কী বদলে এই কঠোর ব্যাকরণ মেনে নিজেকে সঁপে দিতে হয়েছিল। সলিল চৌধুরীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার সময় প্রতি মুহূর্তে তাঁকে সতর্ক থাকতে হতো যাতে একটি সুরও এদিক-ওদিক না হয়, কারণ বিশ্বভারতীর নিয়মের সামান্যতম লঙ্ঘন মানেই রেকর্ড বাতিল হয়ে যাওয়া। এই সচেতনতা তাঁর শিল্পীসত্তার এক অসাধারণ নমনীয়তার প্রমাণ দেয়।

বিশ্বভারতীর মানদণ্ড স্পর্শ করার জন্য আশা ভোঁসলের নেপথ্য সাধনার ইতিহাস সংগীত শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। ১৯৭৯ সালে বিখ্যাত রেকর্ড লেবেল কোম্পানি এইচএমভি (দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়া লিমিটেড) তাঁকে ১৪টি রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। এই গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য তিনি বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও শিক্ষিকা সংঘমিত্রা গুপ্তের শরণাপন্ন হন। সংঘমিত্রা গুপ্ত নিজে ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের দিকপাল সুবিনয় রায় এবং মায়া সেনের সুযোগ্য ছাত্রী।

সংঘমিত্রা গুপ্তের স্মৃতি বলছে, আশা ভোঁসলে এই প্রকল্পটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিলেন। সংঘমিত্রা গানগুলো নিখুঁত স্বরলিপি ও গায়কী অনুসরণ করে গেয়ে একটি ক্যাসেটে রেকর্ড করে দিয়েছিলেন। সেই রেকর্ড করা গানগুলি রোজ আশা শুনতেন, প্রতিদিনের যাতায়াতের পথে, পুরো এক বছর ধরে। শুনে শুনেই আয়ত্ত করলেন প্রতিটি বাংলা শব্দের উচ্চারণ, মীড়, গমক এবং স্বরক্ষেপণের সূক্ষ্মতাগুলো, নিখুঁতভাবে। ১৯৮০ সালে কলকাতায় এসে টানা সাত দিন ধরে গানগুলো রেকর্ড করেন। রেকর্ডিং শেষ হল যখন তখন আশার আনন্দের মূল কারণ কী? নিজেই উপস্থিত সবাইকে বলেছিলেন যে, তিনি সফলভাবে তাঁর শিক্ষিকার গায়কী “কপি” করতে পেরেছেন। মহাতারকা এক শিল্পী এই ভাবেই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রতি তাঁর চরম আত্মনিবেদন প্রকাশ করলেন।

১৯৮০ সালে এইচএমভি (HMV) স্টুডিওতে রেকর্ড করা এই গানগুলি “বড়ো আশা করে এসেছি – সংস অব রবীন্দ্রনাথ” (Baro Asha Kore Esechhi – Songs Of Rabindranath) শিরোনামে একটি ১২ ইঞ্চি স্টেরিও এলপি (LP) রেকর্ড হিসেবে প্রকাশিত হয় (ক্যাটালগ নম্বর: ECSD.2606)। অ্যালবামটি আন্তর্জাতিক বাজারের কথা মাথায় রেখে এইচএমভি-র পরিবর্তে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ইএমআই’ (EMI) লেবেলে প্রকাশ করা হয়েছিল। এই অ্যালবামে মোট ১২টি গান ছিল।

অ্যালবামটি প্রকাশের প্রায় দুই দশক পর ১৯৯৯ সালে গ্রামোফোন কোম্পানির আর্কাইভে অমলকান্তি বন্দ্যোপাধ্যায় তেরো নম্বর গানটি— “এবার উজাড় করে লও হে আমার যা কিছু সম্বল”—আবিষ্কার করেন। এলপি রেকর্ডের সময়ের অভাবে গানটি তখন বাদ পড়লেও ২০০০ সালের শুরুর দিকে তা প্রথমবারের মতো ক্যাসেট ও সিডিতে প্রকাশিত হয় । ২০০২ সালে সারেগামা (Saregama) থেকে অ্যালবামটির পূর্ণাঙ্গ সিডি সংস্করণ প্রকাশিত হয় (ক্যাটালগ নম্বর: CD NF 142459), যেখানে এই পুনরুদ্ধারকৃত গানগুলিও স্থান পায়।

১৯৪১ সালে প্রকাশিত শান্তা আপ্তের বেসিক রবীন্দ্রসংগীতের পর আশা ভোঁসলে ছিলেন দ্বিতীয় মারাঠি কন্যা, যাঁর কণ্ঠের রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির প্রাত্যহিক সাঙ্গীতিক চর্চায় এক স্থায়ী আসন করে নিয়েছে । তাঁর রবীন্দ্রসংগীত গায়কীর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর “অভিনয়ধর্মী গায়কী” বা Expressive Rendition। সংগীততাত্ত্বিকদের মতে, তিনি কেবল গান গাইতেন না, বরং শব্দের ভেতরে থাকা আবেগের সূক্ষ্ম ভাঁজগুলোকে কণ্ঠে জীবন্ত করে তুলতেন।

আশা ভোঁসলের কণ্ঠের ভিত্তি ছিল হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত। রবীন্দ্রসংগীত মূলত রাগাশ্রয়ী, বাউল, কীর্তন এবং পাশ্চাত্য সুরের সংমিশ্রণ। “জগতে আনন্দযজ্ঞে” বা “তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে”-এর মতো গানে তাঁর কণ্ঠের সোপ্রানো (Soprano) বিস্তৃতি এবং স্বরের স্থিরতা (vocal stability) গানটির গাম্ভীর্যকে প্রকাশ করেছে। তাঁর কণ্ঠের অনায়াস বিচরণ (vocal agility) উচ্চ গ্রামেও গানের মাধুর্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়তা করেছে।

চলচ্চিত্রের নেপথ্যসংগীতে কণ্ঠের যে অত্যধিক নাটকীয়তা বা ‘ভাইব্রেটো’ (vibrato) প্রয়োজন হয়, রবীন্দ্রসংগীতে তার প্রয়োগ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। রবীন্দ্রনাথের গানে ‘অতিরিক্ত’ অলংকরণ বা অযাচিত তান-গমক সম্পূর্ণ বর্জনীয়। আশা ভোঁসলে অত্যন্ত সচেতনভাবে তাঁর স্বাভাবিক চপলতা ও প্লেব্যাক গায়কী পরিবর্তন করে রবীন্দ্রসংগীতের নিজস্ব ধ্রুপদী পরিমিতিবোধ (economy of ornamentation) বজায় রেখেছিলেন। “ডেকো না আমারে ডেকো না” গানে তাঁর কণ্ঠের বিষণ্ণতা বা “চক্ষে আমার তৃষ্ণা” গানে প্রেম ও বিরহের যে আকুলতা, তা শ্রোতার মর্মমূলে সরাসরি আঘাত করে কোনো রকম কৃত্রিম সাঙ্গীতিক আতিশয্য ছাড়াই। লতা মঙ্গেশকরের গায়কীতে যেখানে শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতা এবং এক ধরনের ঐশ্বরিক মাধুর্য (divine purity) পরিলক্ষিত হয়, আশা ভোঁসলের গায়কীতে সেখানে পাওয়া যায় মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের আবেগ, যা শ্রোতার আবেগের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়।

১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ৯২ বছর বয়সে আশা ভোঁসলের জীবনাবসান ভারতীয় সংগীতের একটি বর্ণাঢ্য, বৈচিত্র্যময় এবং অতুলনীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনেছে। শিল্পীর প্রতি সম্মান জানিয়ে মহারাষ্ট্র পুলিশের ব্যান্ডে বেজে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথেরই সুর “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে”।

সেই আনন্দলোকের সুর ও স্বরই তো ছিল আশার রবীন্দ্রসঙ্গীতে।