বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে: প্রহরের শেষে নীরব প্রার্থনা

রবীন্দ্রনাথের ‘ফরাসডাঙ্গার বাগান’ কবিকে বহুভাবে বিমোহিত করেছিল। প্রকৃতির এক নীরব অভ্যর্থনা সেখানে তিনি পেয়েছিলেন। ভাগীরথীতীরে ফরাসডাঙ্গা বা চন্দননগরে নানা রঙের ঋতুবৈচিত্র্য বিশ্ববিশ্রুত কবিকে অন্তর থেকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। বহুকাল তিনি চন্দননগর যাপন করেছিলেন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ঘরোয়াতে’ লিখছেন, “জ্যোতি কাকামশাই থাকেন তখন ফরাসডাঙ্গার বাগানে। আমরা থাকি চাঁপদানির বাগানে। এই দুই বাগান আমাদের দুই পরিবারের। আমরা তখন ছোট ছোট ছেলে। এক একদিন বেড়াতে যেতুম ফরাসডাঙ্গার বাগানে। যেমন ছেলেরা যায় বুড়োদের সঙ্গে। সেই একদিনের কথা বলছি। তখন মাসটা কী মনে পড়ছে না, খুব সম্ভব বৈশাখ আমের সময়। বসে আছি বাগানে। খুব আম-টাম খাওয়া হোলো।”

আজও ভাগীরথীতীরে ফরাসি শহরের রূপ প্রত্যক্ষ করলে সেকালের সেই ছবি সম্বন্ধে খানিকটা উপলব্ধি জাগে। গঙ্গাতীরে চন্দননগরে রবীন্দ্রনাথ মোটরযোগে মতিলাল রায়ের প্রবর্তক আশ্রমে এসেছিলেন। এখানে তিনি ভাষণ দেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতি গঠনের লক্ষ্যে আশ্রমটি ছিল শ্রী অরবিন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত। এখানে ছিল গ্রন্থাগার, ছাত্র-ছাত্রীদের আবাস ও স্কুল।

তিনি আশ্রম পরিবেশে সারাদিনব্যাপী অতিবাহিত করেছিলেন। বিশ্রাম নেবার সময় দুপুরে স্বরচিত এক গান গাইলেন। সেই গান কার্তিক ১৩৬৭ সনে প্রবর্তক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বিপ্লবী মণীন্দ্রনাথ নায়েক। তিনি অত্যন্ত ভালো ফরাসি ভাষা জানতেন। সেই আমলে নিয়ম ছিল, পত্রিকা প্রকাশের আগে ফরাসিতে অনুবাদ করে পত্রিকার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হত। প্রবর্তক পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের চিঠিটি বাংলাতে প্রকাশ করা হয়।

chandan nagar
চন্দননগরে ‘প্রবর্তক’ কার্যালয়ে

ভাগীরথীতীরে এই জায়গায় অনুভবের আকাশ বিস্তীর্ণ। নদীর স্রোতে বিচিত্র মায়া। তার একপাশে রাস্তা। আর সে রাস্তার একপাশ ধরে কত অতীতের সময়।

গ্রীষ্মর সময়, শুষ্ক বাতাস চারদিকে। নদীর পাড় সংলগ্ন গাছপালা কিছুটা মলিন। তবু হাওয়া যথেষ্ট। যেন গরমকালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নিয়ে আসে নববর্ষ আর অক্ষয় তৃতীয়া। এমনই একটি দিনে কবি প্রবর্তকে বসে রচনা করেছিলেন গানটি।

২১ বৈশাখ, ১৩৩৪ কবি প্রবর্তক সংঘে অপরাহ্ণে ঘরে বসে নিজের কণ্ঠে গান গাইলেন। গানটি ছিল,
“বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে –
শূন্য ঘাটে একা আমি, পার করে লও খেয়ার নেয়ে
ভেঙে এলেম খেলার বাঁশি, চুকিয়ে এলেম কান্না হাসি,
সন্ধ্যাবায়ে শ্রান্তকায়ে ঘুমে নয়ন আসে ছেয়ে।
ও পারেতে ঘরে ঘরে সন্ধ্যাদীপ জ্বলিল রে,
আরতির শঙ্খ বাজে সুদূর মন্দির-পরে।
এসো এসো শ্রান্তিহরা, এসো শান্তি-সুপ্তি-ভরা,
এসো এসো তুমি এসো, এসো তোমার তরী বেয়ে।”

তিনি নিজেকে বলতেন গাঙ্গেয়। গঙ্গা শুধুমাত্র এক নদী নয়, বরং তাঁর কাছে ছিল এক জীবন্ত সত্তা। নদীকে তিনি জীবনের রূপক হিসেবে দেখতেন। এই নদীর স্রোতে তিনি জীবনের অনন্ত গতি, সুখ-দুঃখের ওঠানামা এবং সময়ের প্রবাহকে উপলব্ধি করতেন। নদীর মতোই জীবন কখনো শান্ত, কখনও উত্তাল, তবু তার চলা থামে না। তাই নদী তাঁর রচনায় হয়ে ওঠে অবিরাম যাত্রা, নবসৃষ্টির আহ্বান এবং চিরনবীনতার প্রতীক।

 

তথ্যসূত্র:
ঘরোয়া – অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রীহরিহর শেঠ
জীবনস্মৃতি – রবীন্দ্রনাথ

বৈশাখের নববর্ষ এবং পঁচিশে বৈশাখের রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে এই তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হল।