সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে ভারতবর্ষের পরাধীনতার সেই দুঃসহ মুহূর্তে জাতির কণ্ঠে জাতীয়তাবোধর এক মহামন্ত্র সংযোজিত করে সমগ্র দেশবাসীকে আত্মশক্তি আহরণে সঞ্জীবিত করেছিলেন৷ লোকোত্তর প্রতিভার গুণে তিনি মুমূর্ষু একটি জাতির প্রাণে অমিতশক্তির এই গীতরস সৃষ্টি করে তাদের স্বদেশচেতনায় দীক্ষিত করেছিলেন৷ প্রকৃতপক্ষে, তাঁর ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতখানি সেদিন পরাধীন জাতির কাছে একটি পবিত্র বীজমন্ত্র রূপে মর্যাদা লাভ করেছিল৷
১৮৭৫ সালের নভেম্বর মাসে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র ‘আমার দুর্গোৎসব’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন৷ আর সেই পত্রিকার পরবর্তী একটি সংখ্যায় তিনি ‘একটি গীত’ নামে একটি লেখা লিখেছিলেন৷ আসলে এই দুই লেখার মধ্য দিয়ে সেই ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের মূল মর্মটি মূর্ত হয়ে উঠেছিল৷ আর এর কিছুদিন পরে অর্থাত্ ১৮৭৫ সালের একেবারে শেষের দিকে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতখানি রচনা করেছিলেন৷ এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর দেশজননীর প্রতি স্তুতি ও একটি মহান জাতির ভাগ্যে এমন পরাধীনতার জন্য ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন৷ তাঁর এই মধুর সংগীতখানি যাতে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা লাভ করে তার জন্য সমকালীন পর্যায়ের বিশিষ্ট সংগীতসাধক যদুনাথ ভট্টাচার্যকে তিনি তাঁর সংগীতের ভাষা ও ভাব অনুযায়ী সুরারোপ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন৷ আর বিশিষ্ট শিল্পী গোপালচন্দ্র ধর তখন সেই গানটি দেশমল্লার রাগে পরিবেশন করে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন৷ এর পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালে তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসখানি প্রকাশিত হয়৷ ‘আনন্দমঠ’ প্রকাশিত হওয়ার বেশ কিছুকাল পূর্বেই ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি রচিত হয়েছিল৷ উল্লেখ করা যায় যে, বঙ্কিমচন্দ্রের উপস্থিতিতে সাবিত্রী লাইব্রেরির এক সভায় ‘আনন্দমঠ’ প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে ‘বন্দে মাতরম্’ গানখানি সকলকে শোনানো হয়েছিল৷
১৮৯৬ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজের সুরে ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি পরিবেশন করেছিলেন৷ আর সেই অধিবেশনে এই গানটিকে ‘জাতীয় সংগীত’-এর মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল৷ আবার ১৯০১ সালে কলকাতার জাতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে বিশিষ্ট পাশ্চাত্য সংগীত বিশেষজ্ঞ দক্ষিণারঞ্জন সেন ‘বন্দে মাতরম্’-এর নতুন সুর দিয়ে তা পরিবেশন করেছিলেন৷ সেই অধিবেশনে গান্ধীজি নিজে উপস্থিত ছিলেন৷
মহারাষ্ট্রের এক স্বাধীনতাসংগ্রামী বাসুদেব বলবন্ত ফড়কে তো একটা সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করে সারা দেশে উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিলেন৷ তাঁর জীবন ও কর্মধারা ‘আনন্দ মঠ’-এর সন্ন্যাসীদের সবিশেষ প্রভাবিত করেছিল৷ এখানে উল্লেখ করা যায় যে, সেই বিপ্লবীর জীবন তো বঙ্কিমচন্দ্রকে রীতিমতো আকৃষ্ট করেইছল৷ আর তাঁর লেখা সেই অপূর্ব সংগীতখানি তিনি ‘আনন্দ মঠ’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন৷ সেটি মুদ্রিত আকারে প্রথম জনসমক্ষে এসেছিল ১৮৮২ সালে৷ ‘আনন্দ মঠ’ গ্রন্থখানি প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ সেই গানের প্রথম স্তবকটি সুরারোপ করে বঙ্কিমচন্দ্রকে শুনিয়েছিলেন৷ কলকাতার ন্যাশনাল থিয়েটারে ‘আনন্দ মঠ’ প্রথম অভিনীত হয়েছিল ১৮৮৩ সালের ২৪শে মার্চ৷ সেইদিন সেই নাট্যমঞ্চে দেশজননীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়েছিল৷ এরপর ১৮৮৫ সালে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভা দেবী ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের যে স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন তা ঠাকুরবাড়ির ‘বালক’ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল৷ সেই পত্রিকাতে ‘আনন্দ মঠ’-এ দেশমাতৃকার ধ্যানমূর্তির সুরম্য চিত্ররূপটি প্রকাশিত হয়েছিল৷ সেই চিত্ররূপটি অঙ্কন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বেঙ্গল একাডেমির সতীর্থ হরিশচন্দ্র হালদার। ১৮৯৬ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজের সুরে ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি পরিবেশন করেছিলেন৷ আর সেই অধিবেশনে এই গানটিকে ‘জাতীয় সংগীত’-এর মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল৷ আবার ১৯০১ সালে কলকাতার জাতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে বিশিষ্ট পাশ্চাত্য সংগীত বিশেষজ্ঞ দক্ষিণারঞ্জন সেন ‘বন্দে মাতরম্’-এর নতুন সুর দিয়ে তা পরিবেশন করেছিলেন৷ সেই অধিবেশনে গান্ধীজি নিজে উপস্থিত ছিলেন৷ এখানে একটি কথা বলা যায় যে, ‘আনন্দ মঠ’ প্রকাশের পরেই ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতখানি সর্বাধিক প্রচার লাভ করেছিল৷ আর সেই প্রচারটা মূলত জাতীয় সংগীত রূপেই সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছিল বলে মনে করা হয়৷ স্বদেশচেতনার মহামন্ত্র হিসেবে এখনও তা সেইভাবে মর্যাদা লাভ করেনি৷ ১৮৮৩ সালে ইলবার্ট বিলকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়েছিল৷ তাছাড়া, আদালত অবমাননার দায়ে তখন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযুক্ত হয়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন৷ ঠিক সেই সময়ে ওই ঘটনার প্রতিবাদে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় ছাত্রদের নিয়ে এক আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন৷
এইসব আন্দোলনে স্বাদেশিকতার উদ্দীপনাময় ধ্বনি হিসেবে তখনও পর্যন্ত ‘বন্দে মাতরম্’ তেমনভাবে কোথাও উচ্চারিত হয়নি৷ তবে পরবর্তীকালে ১৯০৫ সালে বঙ্গ বিভাজনের বিরুদ্ধে বাংলার যুব সম্প্রদায় পরম প্রেরণার শক্তি হিসেবে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনিটিকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছিল৷ ব্রিটিশ শাসনকালে তাদের অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষেরা ব্রিটিশবিরোধী নানা ধরনের আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন৷ এরই পরিপ্রেক্ষিতে এদেশে ১৯৯৫ সালে একটি স্থায়ী সুসংগঠিত মঞ্চ হিসেবে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল৷ জাতীয় পর্যায়ের সেই সংগঠনের পক্ষ থেকে তখনও পর্যন্ত সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদন করা ছাড়া তেমন কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়নি৷ তার ফলে দেশের সাধারণ মানুষ এই সংগঠনের ওপর ক্রমান্বয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে৷ ওই সংগঠন গড়ে ওঠার এক দশক পরে বঙ্কিমচন্দ্র মন্তব্য করেছিলেন, ‘দেশের সাধারণ লোকদিগকে দূরে এবং অন্ধকারে রাখিয়া কতিপয় শিক্ষিত লোকের অভিপ্রায় অনুরূপ কার্য সাধিত হইলে কখনওই উহার গৌরব বর্ধিত হইবে না এবং দেশের লক্ষ লক্ষ অশিক্ষিত লোক কখনওই উহার আবশ্যকতা ও মহত্ত্ব অনুভব করিতে সমর্থ হইবে না৷ দেশের সাধারণ জনসমষ্টিকে মন্ত্রণাগৃহ হইতে দূরে রাখিযা বৎসরান্তে একবার ক্ষণস্থায়ী আন্দোলনে প্রমত্ত হইলে তাহাতে দেশ জাগিবে না, … যতদিন ধর্মনীতি ও সমাজনীতি রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল ভিত্তি না হইবে, ততদিন কেবলমাত্র নীরস রাজনৈতিক আন্দোলনে দেশের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধিত হইবার কোন সম্ভাবনা নাই৷’
বঙ্গবিভাজনের সেই উত্তাল মুহূর্তে সমগ্র বাংলায় কংগ্রেসের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়েছিল৷ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেদিন সরকারের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল৷ তাতে সারা দেশ তখন উত্তাল হয়ে উ্ঠেছিল। আর সমগ্র বাংলায় সেই মুহূর্তে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দ মঠ’-এর কাহিনির পটভূমিকায় উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দেশপ্রাণ সকল নাগরিককে সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেই ধ্বনি ইংরেজ রাজশক্তির গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে বিপুল শক্তি সঞ্চারিত করেছিল। ‘আনন্দ মঠ’-এর উদ্দীপনাময় পটভূমিকায় সেই ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল বলে বঙ্গবিচ্ছেদের সেই তপ্ত মুহূর্তে তা দেশবাসীর প্রাণকে অনায়াসে স্পর্শ করতে সমর্থ হয়েছিল।
সমকালীন পর্যায়ে ‘বন্দে মাতরম্’ ও ‘স্বদেশি আন্দোলন’-এর ধারা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণ করলে বেত্রাঘাত ও আর্থিক জরিমানা করার কথা সরকার একদা ঘোষণা করেছিল। এমনকি, সরকারি চাকুরি থেকে বঞ্চিত করার কথা জানানো হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সেই সময় কলকাতায় ও শহরতলি এলাকায় ‘বন্দে মাতরম্’ ও অন্যান্য স্বদেশি সংগীত পরিবেশন করে শোভাযাত্রা বের করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সেই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ মহামান্য ব্যক্তিবৃন্দ। স্বেচ্ছাসেবকগণ রাজপথে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দিতে দিতে নগ্নপদে গৈরিক বসন ও মাথায় গৈরিক উষ্ণীষ পরিধান করে অতি সম্ভ্রমের সঙ্গে অগ্রসর হত।
বঙ্কিমচন্দ্রের ন্যায় শ্রীঅরবিন্দও ১৮৯৪ সালে ‘ইন্দ্রপ্রকাশ’ পত্রিকায় কংগ্রেসের কাজকর্মের প্রতি অসন্তোষ ব্যক্ত করেছিলেন৷ কংগ্রেস নেতৃত্বের আচরণ, আদর্শ ও কাজকর্মের মদ্যে সামঞ্জস্য ছিল না বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন যে, কংগ্রেসের আন্দোলন কার্যত জনসংযোগশূন্য হয়ে পড়েছিল৷ বঙ্গবিভাজনের সেই উত্তাল মুহূর্তে সমগ্র বাংলায় কংগ্রেসের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়েছিল৷ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেদিন সরকারের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল৷ তাতে সারা দেশ তখন উত্তাল হয়ে উ্ঠেছিল। আর সমগ্র বাংলায় সেই মুহূর্তে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দ মঠ’-এর কাহিনির পটভূমিকায় উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দেশপ্রাণ সকল নাগরিককে সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেই ধ্বনি ইংরেজ রাজশক্তির গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে বিপুল শক্তি সঞ্চারিত করেছিল। ‘আনন্দ মঠ’-এর উদ্দীপনাময় পটভূমিকায় সেই ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল বলে বঙ্গবিচ্ছেদের সেই তপ্ত মুহূর্তে তা দেশবাসীর প্রাণকে অনায়াসে স্পর্শ করতে সমর্থ হয়েছিল। সেই ধ্বনির মধ্যে দেশজননীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির ভাব প্রদর্শিত হত। সেই ধ্বনির মধ্যে সনিষ্ঠ আহ্বান ও সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ এবং উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের গভীর ব্যঞ্জনা অনুভূত হত। সেই ধ্বনি মানুষের প্রাণে মনে এমনই মোহ সৃষ্টি করত, কোনও ত্যাগস্বীকার করতে তারা দ্বিধা প্রকাশ করত না। এর ফলে দেশপ্রাণ মানুষজন সেই ধ্বনি কণ্ঠে নিয়ে হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। সেই ধ্বনি তখন সকলের কাছে দেশপ্রীতি উন্মাদনার মহামন্ত্র রূপে গণ্য হত। ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গবিচ্ছেদ আইন কার্যকর করার সেই জাতীয় শোকের দিনে শ্যামবাজারে পশুপতিনাথ বসুর বাড়ির প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সভায় রবীন্দ্রনাথ তো দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের সম্মিলিত হৃদয়ে ‘বন্দে মাতরম্’ গীতধ্বনি এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্তে পরিব্যাপ্ত হইয়া যাক।”
সমকালীন পর্যায়ে ‘বন্দে মাতরম্’ ও ‘স্বদেশি আন্দোলন’-এর ধারা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণ করলে বেত্রাঘাত ও আর্থিক জরিমানা করার কথা সরকার একদা ঘোষণা করেছিল। এমনকি, সরকারি চাকুরি থেকে বঞ্চিত করার কথা জানানো হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সেই সময় কলকাতায় ও শহরতলি এলাকায় ‘বন্দে মাতরম্’ ও অন্যান্য স্বদেশি সংগীত পরিবেশন করে শোভাযাত্রা বের করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সেই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ মহামান্য ব্যক্তিবৃন্দ। স্বেচ্ছাসেবকগণ রাজপথে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দিতে দিতে নগ্নপদে গৈরিক বসন ও মাথায় গৈরিক উষ্ণীষ পরিধান করে অতি সম্ভ্রমের সঙ্গে অগ্রসর হত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে বিমলার কথাতে বলেছেন, ‘বন্দে মাতরম্’ শব্দের সিংহনাদক্রমে ক্রমে কাছে আসছে, আমার বুকের ভিতরটা গুর গুর করে কেঁদে উঠছে। হঠাৎ পাগড়ি বাঁধা গেরুয়া পরা যুবক ও বালকের দল খালি পায়ে আমাদের প্রকাণ্ড আঙিনার মধ্যে মরা নদীতে প্রথম বর্ষার গেরুয়া বন্যার ধারার মতো, হুড় হুড় করে ঢুকে পড়ল, বন্দে মাতরম্! বন্দে মাতরম্! বন্দে মাতরম্! আকাশটা যেন ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে পড়বে মনে হল।’
সেই সময় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মন্ত্র হয়ে উঠেছিল ‘বন্দে মাতরম্! আর সেই সঙ্গে একটি জাতীয় পতাকারও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট স্বেচ্ছাসেবকরা তাঁদের পরিকল্পিত জাতীয় পতাকাটি রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাতে লাল, হলুদ ও সবুজ রঙ ছিল। উপরে আটটি অর্ধস্ফুট পদ্ম আর নীচে ছিল হিন্দু ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য নির্দিষ্ট প্রতীক চিহ্ন সূর্য ও বাঁকা চাঁদ। আর মাঝখানে ছিল দেবনাগরী অক্ষরে লেখা ‘বন্দে মাতরম্’। ভগিনী নিবেদিতাও একটি পতাকা তৈরি করেছিলেন। তার রঙ ছিল গৈরিক বর্ণ। ১৯০৬ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে সেই পতাকাটি দেখা গিয়েছিল।
ইতিমধ্যে সরকার পূর্ববঙ্গের সর্বত্র ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি সহকারে সকল প্রকার শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা, ইংরেজরা সেই ধ্বনি শুনে রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছিল। সর্বোপরি, পূর্ববঙ্গের বরিশালে স্বদেশি আন্দোলনের প্রকৃতিটা তখন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। বিপ্লবী অশ্বিনীকুমার দত্ত সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন। ঠিক সেই সময়ে জেলার সর্বত্র ‘বন্দেমাতরম্’ ধ্বনি সহ বিপ্লবীদের শোভাযাত্রা বের হতে শুরু করেছিল। অন্যদিকে, ১৯০৬ সালের ১৪ই ও ১৫ই এপ্রিল বরিশালে প্রাদেশিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সরকার ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় প্রতিনিধিরা অতিশয় ক্ষোভ ব্যক্ত করেছিলেন। সরকারের শত নিষেধ সত্ত্বেও একটা মুহূর্তে সেই প্রতিনিধিবৃন্দ উদাত্ত কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দিতে শুরু করলে পুলিশ তা প্রতিরোধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তাতে পুলিশের লাঠির আঘাতে অনেকেই আহত হয়েছিলেন। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি কোনোমতে বন্ধ হয়নি, বরং সেই ধ্বনিতে চতুর্দিক মুখরিত হয়েছিল। পুলিশ সেখান থেকে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথকে গ্রেফতার ও অবৈধ শোভাযাত্রায় ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দেওয়ার অভিযোগে ২০০ টাকা জরিমানা করে। সেই প্রাদেশিক সম্মেলনের সাহিত্য বিষয়ক সভায় সেদিন উপস্থিত হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণকরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় ব্রিটিশ সরকারকে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। বরিশালের সেই সম্মেলন থেকে প্রতিনিধিগণ আত্মশক্তির প্রতীক হিসেবে ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রকে আরও বেশি উচ্চারণ করার অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি সমগ্র পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতা মহানগরী এবং সেখান থেকে সমগ্র দেশে পৌঁছে গিয়েছিল। সেই ধ্বনির মাধ্যমে দেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হতে শুরু করেছিল।
এরপর দ্বিতীয় পর্ব

