গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, কবিতা, সঙ্গীত ও চিরন্তন সৃষ্টিকে স্মরণ করে ঢাকার রাশিয়ান হাউস এবং ভারতের কলকাতাস্থ ‘ছায়ানট’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হল এক বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। অনুষ্ঠান শুরু হয় বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকার রাশিয়ান হাউসের পরিচালক আলেকজান্দ্রা এ. খলেভনয় কাজী নজরুল ইসলামকে এমন এক কালজয়ী কবি হিসেবে অভিহিত করেন, যাঁর রচনা ধর্ম, শ্রেণী, ভাষা, ভূগোল ও সময়ের সীমানা অতিক্রম করে সাম্য, স্বাধীনতা, প্রেম, মানবিকতা ও আশার কথা বলে। নজরুলের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে রাশিয়ান ও সোভিয়েত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উভয় সাহিত্যের মূল সুর স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সাহস ও মানবমর্যাদা।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নজরুলের ওপর সোভিয়েত ও রাশিয়ান সাহিত্যের প্রভাব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা। মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছায়ানট (কলকাতা) – এর সভাপতি ও নজরুল গবেষক সোমঋতা মল্লিক।
একই সঙ্গে রাশিয়ান হাউসের ‘রাশিয়ান ভাষা কোর্স’-এর শিক্ষার্থীরা রাশিয়ান ভাষায় নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে বাংলাদেশের জাতীয় কবির সৃষ্টিকে ভিন্ন এক ভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
ভারতের কলকাতাস্থ ‘ছায়ানট’-এর সংস্কৃতিবিষয়ক ভিডিও পরিবেশনায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় নজরুলের নির্বাচিত কবিতা উপস্থাপন করা হয়। কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ শ্রীমতী কল্যাণী কাজী, মধুমিতা বসু, নিবেদিতা নাগ তহবিলদার ও ইন্দ্রাণী লাহিড়ীর কণ্ঠে নজরুলের কবিতার ভিডিও উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। নবনীতা লাহিড়ী ও সুপ্রীতি চক্রবর্তীর কণ্ঠে ইংরেজি ভাষায় কবিতা শোনানো হয়। সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং এমজিআইএমও (MGIMO) বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিয়ান গ্র্যাজুয়েট—যাঁরা বাংলা ভাষা শিখেছেন—তাঁদের এবং বর্তমানে রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যৌথ ভিডিও পরিবেশনা অনুষ্ঠানটিকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

মনোরম এই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় পরিবেশিত হয় নজরুল-সঙ্গীত ও নৃত্য। ‘মেঘের ডমরু ঘন বাজে’ ও ‘এই রাঙা মাটির পথে লো’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনা করেন প্রমিতা বর্মন। পাশাপাশি ‘সেরোভ একাডেমি অব ফাইন আর্টস’-এর শিশু শিল্পীদের পরিবেশনায় ছিল একটি চমৎকার দলগত নৃত্য।
‘বর্তমান বিশ্বে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক আলোচনা করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও দৈনিক খবরের কাগজ-র সম্পাদক মোস্তফা কামাল। নজরুল-সঙ্গীত পরিবেশন করেন আবরার খান রিদম। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন আঙ্গিকের চারটি নজরুল-সঙ্গীত পরিবেশন করেন ছায়ানট (কলকাতা)-র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। তাঁর কণ্ঠে ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব’ গানটি অন্য মাত্রা পায়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন খন্দকার হাবিবা হুদা। অনুষ্ঠানে দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে নজরুল বর্ষ। এই সময় আয়োজিত ব্যতিক্রমী সন্ধ্যাটি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে রাশিয়া ও ভারতের সাংস্কৃতিক সংযোগকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ককে তুলে ধরে।


