Menstruation

মেয়েদের ঋতুস্রাবের সমস্যা এবং ঋতুস্রাব সম্বন্ধীয় কুসংস্কার।

মাসিক বা ঋতুস্রাব প্রতিটি মেয়ের জীবনের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে এটি শুরু হয় এবং মেনোপজ পর্যন্ত চলে। তবে অনেক কিশোরী ও নারী এই সময়ে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হন। সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে এই সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ঋতুস্রাব হয় কেন?

ঋতুস্রাব (মাসিক/পিরিয়ড) হয় কারণ নারীর শরীর প্রতি মাসে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। যদি গর্ভধারণ না ঘটে, তখন জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ ভেঙে রক্তসহ শরীর থেকে বেরিয়ে আসে—এটিই ঋতুস্রাব।

ফিজিওলজিঃ

ডিম্বাশয় (Ovary) থেকে প্রতি মাসে একটি ডিম্বাণু তৈরি হয়।
ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন জরায়ুর ভেতরে নরম আস্তরণ তৈরি করে, যাতে নিষিক্ত ডিম্বাণু বসতে পারে।
যদি শুক্রাণুর সাথে মিলন না হয় এবং গর্ভধারণ না ঘটে, তাহলে সেই আস্তরণ আর প্রয়োজন হয় না।
তখন হরমোন উইথড্রয়ালের ফলস্বরূপ শরীর আস্তরণটি ঝরিয়ে দেয়—রক্ত ও টিস্যু তরল আকারে যোনিপথ দিয়ে বের হয়। এটিই ঋতুস্রাব বা মাসিক অথবা মেন্স্ট্রুয়েশন বা পিরিয়ড বলা হয়।

কখন শুরু হয়?

সাধারণত ১০–১৫ বছর বয়সে শুরু হয় (বয়ঃসন্ধিকালে)
৪৫–৫৫ বছর বয়সে বন্ধ হয়। (মেনোপজ)

কতদিন থাকে?

সাধারণত ৩–৭ দিন।
মাসিকচক্র সাধারণত ২১–৩৫ দিন পরপর হয়।

সাধারণ মাসিকজনিত সমস্যাঃ

ডিসমেনোরিয়া – তলপেটে ব্যথা: ৮০% এর বেশি মেয়ে পিরিয়ডের সময় তলপেট, কোমর ও ঊরুতে ব্যথা অনুভব করে। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন হরমোনের কারণে জরায়ু সংকুচিত হয় বলে এই ব্যথা হয়।

অনিয়মিত ঋতুচক্র: স্বাভাবিক চক্র ২১-৩৫ দিনের। প্রথম ২-৩ বছর অনিয়মিত হওয়া স্বাভাবিক। স্ট্রেস, ওজন পরিবর্তন, থাইরয়েড, পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিসিস এর জন্য চক্র অনিয়মিত হতে পারে।

মেনোরেজিয়া – অতিরিক্ত রক্তপাত: ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া বা ২-৩ ঘণ্টায় প্যাড পাল্টাতে হলে তাকে অতিরিক্ত রক্তপাত হিসেবে ধরা হয়। এতে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে।

PMS অর্থাৎ প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম: পিরিয়ডের কয়েক দিন আগে থেকে মুড সুইং, বিরক্তি, কান্না পাওয়া, স্তনে ব্যথা, মাথাব্যথা, ইত্যাদি।

PCOS – পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম: বর্তমানে ১০ জনে ১ জন মেয়ের PCOS আছে। সাধারণত ওভারিতে ছোট ছোট সিস্টের ফলে হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে অনিয়মিত পিরিয়ড, মুখে অবাঞ্ছিত লোম, ব্রণ, ওজন বাড়া, চুল পড়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়।

সামাজিক সমস্যা ও কুসংস্কারঃ

গ্রামাঞ্চলে এখনও মাসিক নিয়ে অনেক ট্যাবু আছে। পিরিয়ড চলাকালীন মেয়েদের রান্নাঘরে ঢুকতে না দেওয়া, আলাদা ঘরে রাখা, স্কুলে না যাওয়া – এসব ঘটে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম ও সহজলভ্যতার অভাবেও অনেকে পুরনো কাপড় ব্যবহার করে, যা ইনফেকশনের কারণ হয়। UNICEF এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ৭১% কিশোরী মাসিক শুরুর আগে মাসিক সম্বন্ধে কোন কিছুই জানে না।

সমস্যা মোকাবিলার উপায়ঃ

ব্যথা কমাতে: তলপেটে গরম সেঁক দিন। হালকা ব্যায়াম, যোগা করুন। দরকার হলে পেনকিলার খেতে হতে পারে।
পরিচ্ছন্নতা: প্রতি ৪-৬ ঘণ্টায় প্যাড বদলান।
খাবার: আয়রনযুক্ত খাবার – প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, ফল, সম্ভব হলে ডিম, মাছ ইত্যাদি এবং পরিমিত জল পান।
ডাক্তারের পরামর্শ নিন: যদি ৯০ দিনের বেশি পিরিয়ড বন্ধ থাকে , অসহ্য ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব হলে। মাসিক এর সময় সুস্থ থাকতে মেয়েদের মেন্স্ট্রুয়াল হাইজিন সম্বন্ধে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। মেন্স্ট্রুয়াল হাইজিন বা ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা প্রতিটি মেয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO এর মতে, পরিষ্কার শোষণ সামগ্রী ব্যবহার এবং সঠিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই মেন্স্ট্রুয়াল হাইজিন। ভারতে এখনও ৬২% তরুণী পিরিয়ডের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে, যা নানা ইনফেকশনের কারণ। সঠিক জ্ঞানের অভাব ও কুসংস্কার এর মূল কারণ।

মেন্স্ট্রুয়াল হাইজিন কেন জরুরিঃ

পরিচ্ছন্নতা না মানলে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI), রিপ্রোডাক্টিভ ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (RTI), ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চুলকানি ও দুর্গন্ধ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বন্ধ্যাত্বের কারণও হতে পারে। পরিষ্কার থাকলে মেয়েরা স্কুল, কাজ ও দৈনন্দিন জীবনে আত্মবিশ্বাসী থাকে।

সঠিক মেন্স্ট্রুয়াল হাইজিনের নিয়মঃ

সঠিক শোষণ সামগ্রী বাছাই:
স্যানিটারি প্যাড সবচেয়ে সহজলভ্য। প্রতি ৪-৬ ঘণ্টায় বদলাতে হবে। মেন্স্ট্রুয়াল কাপ: সিলিকনের কাপ, ৮-১২ ঘণ্টা পরপর খালি করে ধুয়ে আবার ব্যবহার করা যায়। ৫-১০ বছর চলে।
ট্যাম্পুন: ইন্ট্রাভ্যাজিইনালি ব্যবহার করতে হয়। ৪-৮ ঘণ্টার বেশি রাখা উচিত নয়।
পিরিয়ড অন্তর্বাস: শোষণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বাস, হালকা ফ্লো-এর জন্য ভালো।
কাপড়: দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাস্তবিক যে ভারতবর্ষে কাপড়ের ব্যবহার এখনও যথেষ্ট পরিমাণে হয়ে থাকে। নিতান্তই ব্যবহার করতে হলে পরিষ্কার সুতির কাপড় ব্যবহারের পর ভালো করে কেচে রোদে শুকিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা:

দিনে অন্তত ২ বার জেনিটাল এরিয়া ঈষৎ উষ্ণ জল দিয়ে ধুতে হবে। সাবান ব্যবহার না করাই ভালো।সামনে থেকে পিছনে মুছতে হবে, যাতে মলদ্বারের জীবাণু না ছড়ায়। প্যাড বদলানোর আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

ব্যবহৃত সামগ্রীর ডিসপোজালঃ

ব্যবহৃত প্যাড বা ট্যাম্পুন কাগজে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলুন। টয়লেটে ফ্লাশ করবেন না।
মেন্স্ট্রুয়াল কাপ প্রতিবার ব্যবহারের পর ফুটন্ত জলে ৫-১০ মিনিট স্টেরাইল করে নিন।

সামাজিক চ্যালেঞ্জ ও সমাধানঃ

অনেক স্কুলে আলাদা টয়লেট না থাকার ফলে মেয়েরা পিরিয়ডের সময় স্কুলে যায় না। ভারতে অনেক মেয়েরা পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর স্কুল ছেড়ে দেয়। এর সমাধানে সরকার ‘মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন স্কিম’ এর আওতায় ৬ টাকায় ৬টি প্যাড দিচ্ছে। বাড়িতে ও স্কুলে খোলামেলা আলোচনা এবং ছেলেদেরও এই বিষয়ে সচেতন করা দরকার। দ্বিধাহীনভাবে বয়ঃসন্ধিকালের আগে থেকেই স্কুলে সেক্স এডুকেশন পাঠক্রমের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

মাসিক বা ঋতুস্রাব নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার:

প্রচলিত কুসংস্কার ও আসল সত্যঃ

1. ‘মেয়েরা অপবিত্র হয়ে যায়’
কুসংস্কার: পিরিয়ড চললে মেয়ে অশুচি, তাই মন্দিরে যাওয়া, পূজা করা, ধর্মগ্রন্থ ছোঁয়া যাবে না।
সত্য: মাসিকের রক্তে কোনো দূষিত উপাদান নেই। এটি প্রজনন ক্ষমতার লক্ষণ। এই নিষেধের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই। কামাখ্যা মন্দিরে দেবীর মাসিককে উৎসব হিসেবেও পালন করা হয়।

2. ‘রান্নাঘরে ঢুকলে খাবার নষ্ট হবে’
কুসংস্কার: ঋতুমতী নারী রান্না করলে খাবার নষ্ট হবে।
সত্য: খাবার নষ্ট হয় ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের জন্য, মাসিকের জন্য নয়। পরিষ্কার হাতে রান্না করলে কোনো সমস্যা নেই।

3.‘গাছ মরে যায়, তুলসী ছোঁয়া পাপ’
কুসংস্কার: পিরিয়ডের সময় গাছে হাত দিলে গাছ শুকিয়ে যায়।
সত্য: গাছের সালোকসংশ্লেষ বা বেঁচে থাকার সাথে মানুষের হরমোনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

4. ‘আলাদা ঘরে থাকতে হবে’
কুসংস্কার: ভারতের কিছু গ্রামে মেয়েদের গোয়ালঘর/কুঁড়েঘরে রাখা হয়।
সত্য: এটি বিপজ্জনক ও অমানবিক। ঠান্ডা, সাপ-বিছের কামড়, শ্বাসকষ্ট, এমনকি মৃত্যুও হয়েছে।

5.‘টক খাওয়া ও ব্যায়াম নিষেধ’
কুসংস্কার: তেঁতুল, লেবু খেলে রক্তপাত বাড়ে। দৌড়ালে জরায়ু নিচে নেমে যাবে।
সত্য: খাবারের সাথে ফ্লো-এর সম্পর্ক নেই। ভিটামিন-C বরং আয়রন এই সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । হালকা ব্যায়াম, হাঁটা, যোগা করলে বরং ব্যথা কমে।

6.‘পিরিয়ডের রক্ত খারাপ রক্ত’
কুসংস্কার: শরীরের দূষিত রক্ত বের হয়।
সত্য: এটি সাধারণ রক্ত জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু । দূষিত হলে শরীরেই ক্ষতি হত।

সমাধানের উপায়ঃ

শিক্ষা: ক্লাস 6 থেকেই ছেলে-মেয়ে উভয়কে পিরিয়ড নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা দেওয়া।
পরিবারে আলোচনা: মা-বাবা, দাদু-ঠাকুমাকে আগে বোঝানো যে এটি স্বাভাবিক।
পরিকাঠামো: স্কুলে মেয়েদের টয়লেট,পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থা , প্যাড ভেন্ডিং মেশিন রাখা।

অজ্ঞতাই কুসংস্কারের জন্ম দেয় । মাসিক লজ্জার নয়, এটাই স্বাভাবিক।বাড়ির পুরুষরা যখন দোকান থেকে স্যানিটারি প্যাড কিনে আনবে, তখনই সমাজ বদলাবে। সুস্থ মেয়ে মানেই সুস্থ ভবিষ্যত ।

মাসিক বা ঋতুস্রাব প্রতিটি মেয়ের জীবনের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে এটি শুরু হয় এবং মেনোপজ পর্যন্ত চলে। তবে অনেক কিশোরী ও নারী এই সময়ে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হন। সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে এই সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে।